রাশেদ ও স্মৃতিকে খুঁজছে পুলিশ

রাজধানীর জুরাইনের আলমবাগে মা ও দুই শিশুসন্তান আত্মহননের ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি রাশেদুল কবির ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতিকে খুঁজছে পুলিশ। গতকাল রোববার তাদের গ্রেফতার করতে পুলিশ রাশেদুল কবিরের উত্তরা ও ইস্কাটনের বাসায় অভিযান চালায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোস্তফা সমকালকে বলেন, ঘটনার পর থেকেই আসামিরা পলাতক। তাদের গ্রেফতারে সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান চলছে। পুলিশের একাধিক টিম অনুসন্ধানে নেমেছে। একইসঙ্গে মা ও দুই সন্তান ইশরাক কবির পাবন এবং রাইশা রাশমিন পায়েলের আত্মহত্যা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতেই রিতার মা মাজেদা বেগম বাদী হয়ে রাজধানীর কদমতলী থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে রিতার স্বামী রাশেদুল কবির, শ্বশুর শফিকুল কবির, শাশুড়ি নুর বানু কবির, ননদের স্বামী দেলোয়ার হোসেন, ননদ কবিতা কবির, ননদ সুকন কবির, গাড়িচালক আল আমিন ও রাশেদুলের দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতিকে। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংবাদদাতা শফিকুল কবিরের সন্তান রাশেদুল কবিরের স্ত্রী রিতা, তার ছেলে পাবন ও মেয়ে পায়েল গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার সকাল ১০টার মধ্যে কোনো এক সময়ে আত্মহত্যা করে। পুলিশ তাদের লাশ শুক্রবার সকালে ২২৯ নতুন জুরাইন আলমবাগ (সোনারতরী) সাংবাদিক শফিকুল কবিরের বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে উদ্ধার করে। কদমতলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আইয়ুবুর রহমান সমকালকে বলেন, এজাহারভুক্ত সব আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে স্মৃতিকে গ্রেফতার করতে পারলে অনেক অজানা রহস্য বেরিয়ে আসবে।

উল্লেখ্য, ফারজানা কবির রিতাকে প্রায় ১৮ বছর আগে সাংবাদিক শফিকুল কবিরের একমাত্র ছেলে রাশেদুল কবির প্রেম করে বিয়ে করে। তাদের সংসারে পাবন ও পায়েল নামের দুটি সন্তান রয়েছে। পরে রাশেদুল প্রথম স্ত্রীর অমতে ও অজান্তে স্মৃতি নামে রিতার এক নিকটাত্মীয়কে বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়িতে ওঠানোর জন্য রিতা ও তার দুই সন্তানকে ২২৯ নম্বর আলমবাগ নতুন জুরাইনের দ্বিতীয় তলার বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল রাশেদ। একপর্যায়ে জুনের মধ্যে তাদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য স্ট্যাম্পে লিখিতও নেয় শ্বশুর শফিকুল কবির ও রাশেদ। এরই জের ধরে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন রিতা। এদিকে ২২৯ নম্বর আলমবাগের সোনারতরী ভবনটি পুলিশ সিলগালা করে দিয়েছে। বাইরে রয়েছে পুলিশ প্রহরা।

সমকাল

———————————————————–

পুলিশ আসামি ধরছে না, রিতার বিরুদ্ধে উল্টো শ্বশুরের অপপ্রচার

জুরাইনে নিহত ফারজানা কবির রিতার বিরুদ্ধে তার শ্বশুর শফিকুল কবির মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের দুলাভাই মো. আরিফ। তিনি বলেন, এলাকার সাধারণ মানুষ ও পুলিশের কাছে শফিকুল কবির বলে বেড়াচ্ছেন, ‘রিতা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগী ছিল’। আরিফ বলেন, এটা ডাহা মিথ্যা কথা। তিনি বলেন, ‘রিতার স্বামী রাশেদুল কবিরের সঙ্গে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতির অবৈধ সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার পর আমি রাশেদুল কবিরের বাবা শফিকুল কবিরের সঙ্গে ঘটনা মীমাংসা করতে বসেছিলাম। তখন তিনি আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে বলেন, আমি সাংবাদিক শফিকুল কবির ইচ্ছে করলে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে পারি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে রিতাকে মানসিক রোগী বানিয়ে ১ হাজার টাকা খরচ করে ডাক্তারের কাছ থেকে মিথ্যা সার্টিফিকেট এনে উল্টে মামলা দেবো। এমনকি মিথ্যা কাবিননামা তৈরি করে সবাইকে জানিয়ে দেবো, রাশেদুল কবির রিতাকে তালাক দিয়েছে।’

মো. আরিফ জানান, সেদিনের এই কথাগুলো হুবহু আমার মোবাইলে রেকর্ড করা আছে। এ ছাড়া মৃত্যুর আগে নিহত পাবন ও পায়েল ৫০ টাকার স্ট্যাপে তাদের মৃত্যুর জন্য কে দায়ী তা লিখে গেছে। এদিকে রিতার মা মাজেদা বেগম ও মামি জেবিন পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে বলেছেন, আসামিরা এলাকায় দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ বলছে, আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা আরো বলেন, শুক্রবার রাতে থানায় মামলার পর থেকে অজ্ঞাত স্থান থেকে অপরিচিত নম্বর থেকে একের পর এক মামলা তুলে নিতে হুমকি আসছে। হুমকিদাতারা বলছে, মামলা তুলে না নিলে তোদের অবস্থাও রিতার মতো হবে। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কদমতলী থানার এসআই গোলাম মোস্তফা জানান, পরিবারের অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছি। তবে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আর লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখানো আমাদের হাতে আসেনি। উল্লেখ্য, জুরাইনের আলমবাগের ২২৯ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয়তলায় ছেলে পাবন ও মেয়ে পায়েলসহ গৃহবধূ ফারজানা কবির রিতার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। শুক্রবার পুলিশ ওই বাসা থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে।

দিনের শেষে

————————————————————

দুই সন্তানসহ মা নিহত, দেয়াল ও চিরকুটের লেখা কার?

জুরাইনে মা ও দুই শিশু নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আট আসামির কাউকে ধরতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনাটি হত্যা না আত্মহত্যা সে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া চিরকুট ও দেয়াল লিখনের সঙ্গে নিহত শিশুদের হাতের লেখার মিল না থাকায় এ ঘটনা নিয়ে সন্দেহ বেড়েছে পুলিশের।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলী থানার এস আই গোলাম মোস্তফা বলেন, দুই শিশুসন্তানসহ মায়ের এ অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। আসামিদের গ্রেফতার, ময়না তদন্ত প্রতিবেদন ও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামতের রাসায়ানিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, দেয়াল লিখনগুলো নিহত দুই শিশুর বলে দাবি করেছিলেন বাদি। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলের হোমওয়ার্কের খাতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, দেয়াল লিখনের সঙ্গে দুই শিশুর হাতের লেখার মিল নেই।

এদিকে ঘটনাস্থল জুরাইনের শফিকুর রহমানের বাড়িটি এখন তালাবদ্ধ। শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মামলার পর এখন তারা গা ঢাকা দিয়েছেন। এখন তাদেরও হদিস মিলছে না। রাশেদুল ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতিও উত্তরার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

কদমতলী থানার ওসি কাজী আয়ুবুর রহমান বলেন, নিহত রীতার মা মাজেদা বেগম মামলায় উল্লেখ করেছেন গাড়িচালক আল আমিনকে দিয়ে বিষাক্ত দ্রব্য সংগ্রহ করে রীতা ও তার দুই সন্তান আত্মহত্যা করেছে। এর বিনিময়ে চালককে গাড়িটি দিয়ে দেয়া হয়। চালক গাড়িটি নিয়ে পালিয়ে গেছেন। লাশের পাশ থেকে উদ্ধারকৃত চিরকুটেও এ কথা উল্লেখ আছে। গাড়ি চালককে ধরতে নানা জায়গায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

গত শুক্রবার সকালে পুলিশ রাজধানীর পূর্ব জুরাইনের আলমবাগের ২২৯ নম্বর তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল কবিরের পূত্রবধূ ফারজানা কবির রীতা (৩৫), নাতি ইশরাক কবির পাবন (১২) ও নাতনি রাইসা রাশমিন পায়েলের (১০) লাশ উদ্ধার করে। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, তারা বিষ জাতীয় কিছু খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

আমাদের সময়

——————————————————————-

বঞ্চনার কথা ও আত্মহননের কারণ স্টাম্পে লিখে গেছে পাবন ও পায়েল

সরোয়ার আলম
আব্বু-দাদা-দাদী ও ফুফুরা শুধু বাড়ি-গাড়ি-আসবাবপত্র ও স্মৃতিকে ভালোবেসেছে। আমাদের একটুও ভালোবাসেনি তারা। কি অপরাধ ছিল আমাদের। বিচারের নামে পুলিশ ও এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে তারা আমার মাকে নির্যাতন করেছে। উচ্চস্বরে কয়েকবার আম্মুকে তালাক দিয়েছে বলে উচ্চারণ করেছে আমার বাবা। আব্বু ও দাদা-দাদু বারবার বলত কেন তোরা যন্ত্রণা করিস, বাসা থেকে বের হয়ে যেতে পারিস না? মায়ের ওপর নির্যাতন অনেক সহ্য করেছি। আমরা বেঁচে থাকলে স্মৃতি ও তার সন্তানের গোলামি করতে হবে। তা কখনও সম্ভব নয়। তাই দুই ভাইবোন মিলে সিন্ধান্ত নিয়েছি ‘নিজেদের প্রতিশোধ নিজেরাই নিব। চিরদিনের জন্য এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিব।’ মৃত্যুর আগে পাবন ও পায়েল এ কথাগুলো লিখে গেছে পঞ্চাশ টাকার দুটি স্ট্যাম্পে। বাসার লোকজনের উপস্থিতিতে পায়েলের স্কুলব্যাগ থেকে দুটি পঞ্চাশ টাকার স্ট্যাম্প উদ্ধার করার পর এসব তথ্য উদঘাটন করে পুলিশ। লেখাগুলো পড়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আÍীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা পর্যন্ত কেঁদেছেন। এখনও পুরো এলাকায় চলছে শোকের মাতম। রিতার মা মাজেদা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বলছে আমার দুটি পদ্মফুলকে এনে দাও। কে আমার দু’গালে চুমু খাবে? তারা কিছুতেই আÍহত্যা করতে পারে না। কৌশলে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। সাত মাস ধরে অঝোরে কেঁদেছি। কোথাও বিচার পাইনি। পুলিশ সাংবাদিক পরিবারের পক্ষে কাজ করায় মেয়ে ও আদরের দুই নাতীকে হারাতে হয়েছে। রোববার দুপুরে নিহত রিতার মায়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা অঝোরে কাঁদছেন। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, মামলা প্রত্যাহার করতে এখনও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। মামলার এজাহারে অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা থাকলেও পুলিশের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। রাশেদুল কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি একটি পত্রিকায় চাকরি করায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না। মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে পুলিশের দুটি টিম ঢাকার বাইরে অবস্থান করছে। মা ও দুই সন্তান কি আসলেই আÍহত্যা করেছে, নাকি হত্যা করা হয়েছে এ প্রশ্নও খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, তিনটি আলামত পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে রিতা ও দুই সন্তানের মৃত্যু রহস্য।

এলাকাবাসী সূত্র জানায়, শফিকুল কবির প্রভাবশালী সাংবাদিক হওয়ায় এলাকার লোকজন তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে পারত না। রাশেদুল ও তার পরিবারের সদস্যরা যেভাবে রিতা ও তার দুই সন্তানকে নির্যাতন করেছে, তা দেখেও না দেখার ভান করতেন প্রতিবেশীরা। এমনকি পরিবারের লোকজনও তাদের ভয়ে কারও কাছে অভিযোগ করত না। ফারজানা কবির রিতা ও তার দুই শিশু সন্তান ইসরাফ কবির বিন রাশেদ ওরফে পাবন ও রাইসা রাশমিন পায়েলও নীরবে সবকিছু সহ্য করেছে। অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় জানুয়ারি ও মার্চ মাসে রিতা বাদী হয়ে কদমতলী থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডি করার পরও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশই বা কেন ব্যবস্থা নিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা। এলাকার লোকজন অভিযোগ করেছেন, রাশেদুলের বাবা সাংবাদিক হওয়ায় পুলিশ তাদের পক্ষ নিয়েছে। আর না হয় পুলিশের সামনে কিভাবে রাশেদুল তার স্ত্রীকে মারধর করেন। স্ত্রী ও আদরের সন্তানদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এসব দৃশ্য পুলিশ দেখেও কোন কিছুই বলেনি। এলাকার লোকজন আরও অভিযোগ করেন, রাশেদুলের দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতিও সাংবাদিক হওয়ায় পরিবারের লোকজন তার ভয়ে কথা বলত না। স্মৃতি রাশেদুলের বাসায় থাকাকালীন উচ্ছৃংখলভাবে চলাফেরা করতেন। কাউকে তোয়াক্কা করতেন না তিনি।

দুটি স্ট্যাম্পে কি লেখা ছিল : শনিবার সকালে পায়েলের স্কুলব্যাগ থেকে দুটি পঞ্চাশ টাকার স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের কাছে কিভাবে স্ট্যাম্প এলো তাও লিখে গেছে দুই ভাইবোন। বাইরে থেকে স্ট্যাম্প আনার আগে পাবন ও পায়েল তার খালু কাজী মোহাম্মদ আরিফের কাছে জানতে চায়। তখনও আরিফ বুঝতে পারেননি তারা কেন স্ট্যাম্প সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে। পাবন ও পায়েল খালুর পাশাপাশি আরিফকে মামাও ডাকত। আরিফের কাছে তারা জানতে চায়, আব্বু ও দাদা মিলে আম্মুর কাছ থেকে কেন স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছে। তিনি স্ট্যাম্প সম্পর্কে অবহিত করলে তারা বলে আচ্ছা ঠিক আছে। আর বলতে হবে না। আরিফ কারণ জিজ্ঞাসা করলে পায়েল তাকে বলে, সব বিষয়ে জানতে চেওনা তো খালু। একটু ধৈর্য্য ধর। তারপরই জানতে পারবে কেন স্ট্যাম্প সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। রাশেদুল কবিরকে ঘৃণা করে বাবা উচ্চারণ করে তাকে মৃত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে স্ট্যাম্পে।

দুই ভাইবোন মিলে স্ট্যাম্পে লিখে যায় ‘আমি পাবন, পিতা মৃত রাশেদুল কবির, আমি সবার কাছে বলছি যে, আমার মরনের পিছনে একমাত্র, একমাত্র, একমাত্র রাশেদুল কবির, শফিকুল কবির, নুরবানু কবির, কবিতা কবির, সুখন কবির, দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারী দায়ী। কারণ আমার দাদার বাড়িতে থাকি বলে আমার মার কাছে লিখিত নিয়েছে যে, পহেলা জুলাইতে বাসা ছাড়তে হবে। আমি আমার বাবার একমাত্র ছেলে ছিলাম। আমার দুই ফুফু আর দাদু মিলে সম্পত্তির জন্য অনেক আগ থেকে ষড়যন্ত্র করে আসছে। আমাদের যদি বাড়ি থেকে বের করা যায় তাহলে আমার দুই ফুফুর মেয়েরা সম্পত্তি পাবে। এ জন্যই আমার দাদা, দাদু, দুই ফুফু আমার বাবার অপকর্মকে সাপোর্ট করছে। আনিস ভাইয়া ও ড্রাইভার আংকেলকে বলেছে যে, আমার গাড়ি আমাকে দেবে না। আব্বু-দাদা-দাদী ও ফুফুরা শুধু বাড়ি-গাড়ি-আসবাবপত্র ও স্মৃতিকে ভালোবেসেছে। আমাদেরকে একটুও তারা ভালোবাসেনি। কি অপরাধ ছিল আমাদের। বিচারের নামে পুলিশ ও এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে তারা আমার মাকে নির্যাতন করেছে। উচ্চস্বরে কয়েকবার আম্মুকে তালাক বলে উচ্চারণ করেছে আমার বাবা। তাই কৌশলে ডাইভার আংকেলকে গাড়িটা দিয়ে স্ট্যাম্প পেপার ও ওষুধ এনেছি আমাদের এই অপমান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আমার বাবা ও ফুফুরা বলে, ১৮ বছর ধরে আমার মা তাদের যন্ত্রণা দিয়েছে। তাদের প্রতিশোধ তারা নিল স্মৃতি বেইশ্যাকে সাপোর্ট করে। তাই আমরা দুই ভাইবোন মিলে সিন্ধান্ত নিয়েছি আমাদের প্রতিশোধ আমরাই নিব। আমাদের পথ আমাদেরকেই নিতে হবে।’ আরেকটি স্ট্যাম্পে পায়েল লিখেছেÑ ‘আমি পায়েল, আমার এবং আমার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ী। আমার বাবা রাশেদুল কবির (ইংরেজিতে লেখা) আমাদের সাথে যা করসে সে টা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমা দাদা শফিকুল কবির (ইংরেজিতে লেখা) আমার মায়ের থেকে স্ট্যাম্পে সই নিয়েছে যে ১ জুলাইয়ের মধ্যে আমাদেরকে বাসা ছেড়ে দিতে হবে। আমরা কি অবৈধ সন্তান বাবার। মেঘনা যদি এই বাড়িতে থাকতে পারে তো আমরা কেন থাকতে পারবো না। আমার বাবা সবার সামনে কেন বললো আমাদের মতন সন্তান তার দরকার নাই। আমার আব্বু সেদিন পুলিশ ও সমাজের পাঁচজনের সামনে কেন আমাদের সন্তান হিসাবে অস্বীকার করলো? আমার মা দোষী না বাবা দোষী। আপনারা বলুন আমাদের জীবনটা এমন হওয়ার পিছনে কে দায়ী। এই জন্য আমি আর আমার ভাইয়া এই পথ বেছে নিয়েছি। এই পথ ছাড়া আমরা অন্য কোন পথ পাই নাই। আমরা যা করেছি আমাদের জীবনে কি হবে তা ভেবেই করেছি। আমরা স্মৃতি তার বাচ্চার চাকরামী বা গোলামী করতে পারবো না। সেটা আমার দাদা, দাদু বড় ফুফু, ছোট ফুফু সবাই চায়। কারণ আমার বাপ ওদের টাকা দিয়ে কিনে নিসে। আমাদের টাকা নাই তো তাই আমরা আমাদের ডাইভার আংকেল (ইংেরেজিতে লেখা) আল আমিনকে তাকে গাড়ি দিয়ে তার বিনিময়ে এইসব ওষুধ ও এই পেপার আনিয়াছি। আমরা চাই না আমাদের কোন জিনিস স্মৃতি বা মেঘনা ভোগ করুক। আমাদের জীবনের প্রতিশোধ আমরাই নিচ্ছি।’

কেমন আছে রিতার আÍীয়-স্বজন : রোববার দুপুরে রিতার বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা মাজেদা বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছেন। বাসার ভেতর রিতার কিছু আসবাবপত্র তার স্মৃতি বহন করছে। সেগুলো ধরে মা মাজেদা বেগম বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। কেউ বাসার ভেতর ঢুকলে তার কাছে জানকে চান, আমার রিতা মা ও দুটি পদ্মফুল কোথায়। তারা কেন আসছে না। তারা কিছুতেই মরতে পারে না। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মৃত্যুর ধরন দেখে মনে হচ্ছে তিনজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাসায় গেলে পাবন ও পায়েল দুই গালে চুমু খেয়ে আমার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত। এখন আমাকে কে চুমু খাবে। অপনারা পারেন না আমার এই পদ্মফুলদের এনে দিতে? রাশেদুল ও তার ২য় স্ত্রী স্মৃতিসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিষাক্ত কিছু খাইয়ে তাদের হত্যা করেছে।

রিতার ভগ্নিপতি কাজী মোহাম্মদ আরিফ জানান, মৃত্যুর পর বুঝতে পেরেছি তারা কেন স্ট্যাম্প সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। স্ট্যাম্পে লেখাগুলো পড়ে আবেগ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। নিজের সন্তানের মতো পাবন ও পায়েলকে দেখেছি। তারা আÍহত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে পারছি না। তাদের মৃত্যুর পেছনে তৃতীয় শক্তি কাজ করেছে। পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে। জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছে তারা। ওই স্ট্যাম্পে লিখে নিয়েছে, রিতা মারা গেলে কেউ দায়ী থাকবে না। কেন তারা এই কথা লিখে নিয়েছে তা এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিক শফিকুল কবির কি ধরনের হুমকি দিতেন তা রেকর্ড করে রাখা হয়েছে। শফিকুল কবির বলতেন, রিতা মারা গেলে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কি করতে হবে তা আমার জানা আছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতারা আমার পরিচিত। কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না। মামলা প্রত্যাহার করতে এখনও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এজাহার যেভাবে লেখার ইচ্ছা ছিল পুলিশের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাদের সাজেসন নিয়ে এজাহারে সবকিছু উল্লেখ করা হয়েছে।

রিতার মোবাইল সিম কোথায় :
মৃত্যুর দিন রিতার বুকের ওপর থেকে মোবাইল সেট উদ্ধার করা হলেও তার সিমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সিমটি উদ্ধার করতে পুলিশ মোবাইল ফোন কোম্পানির সহযোগিতা নিচ্ছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ৯ জুন থেকে সিমটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে। সর্বশেষ কার সঙ্গে তার কথা হয়েছে তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। তার ধারণা, রিতা মারা যাওয়ার আগে যোগাযোগ বন্ধ করতে সিমটি কোথাও ফেলে দিয়েছে। তারপরও সিমটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

স্মৃতি সাংবাদিক হওয়ায় পুলিশ ধরছে না! :
রাশেদুল কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি দৈনিক আমাদের সময়, দৈনিক ইত্তেফাক ও ফোকাস বাংলার স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রকাশিতব্য নিউজ এজেন্সি বাংলা নিউজে কর্মরত রয়েছেন। সাংবাদিক হওয়ায় তাকে সবাই ভয় পেত। রিতার পরিবারও টুঁ-শব্দ করার সাহস পেত না। রিতার মামা আব্বাস দেওয়ান জানান, স্মৃতি বাসায় থাকাকালীনও অশ্লীলভাবে চলাফেরা করত। মাঝে মধ্যে অপরিচিত লোকজন নিয়ে আসত। রিতা জিজ্ঞাসা করলে বলত তারা সাংবাদিক। স্মৃতি সাংবাদিক হওয়ায় রিতা ও তার দুই সন্তান ভয়ে তার কাছে যেত না। এলাকার লোকজন অভিযোগ করেছেন, সাংবাদিক হওয়ার কারণেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না।

তিনটি রিপোর্টই বলে দেবে মৃত্যুর কারণ : ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও একজগ পানি পরীক্ষা করতে মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে রিপোর্টটি পুলিশের কাছে আসবে বলে আশা করছেন ওয়ারী বিভাগের পুলিশের উপ-কমিশনার তওফিক মাহবুব চৌধুরী। তিনি বলেন, পাবন ও পায়েলের হাতের ছাপ সিআইডির কাছে রয়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে এ রিপোর্ট পাওয়া যাবে। জগের মধ্যে থাকা পানির মধ্যে বিষাক্ত কিছু ছিল কিনা সে জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাসার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া পেট্রল কেন রাখা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আপাতত মনে হচ্ছে তিনজনই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আÍহত্যা করেছে। তাছাড়া হত্যাকাণ্ডের মতো কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা সে ব্যাপারেও তদন্ত চলছে। ৬ মে পুলিশ কারও পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করেছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিদের গ্রেফতার করতে উত্তরা ও সোনারগাঁয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। আল আমিনকে ধরা সম্ভব হলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। অপরাধী যেই হোক তাকে কিছুতেই ছাড় দেয়া হবে না। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

যুগান্তর

[ad#co-1]