স্বামী শ্বশুর শাশুড়িসহ আটজনকে আসামি করে মামলা

জুরাইন ট্র্যাজেডি
রাজধানীর জুরাইন আলমবাগে মা ও দুই সন্তান আত্মহত্যার ঘটনায় নিহত রিতার মা মাজেদা বেগম কদমতলী থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে রিতার স্বামী রাশেদুল কবির (৪৫), শ্বশুর শফিকুল কবির (৭০), শাশুড়ী নূর বানু কবির (৬০), ননদ কবিতা কবির (৩৬), ননদের স্বামী দোলোয়ার হোসেন (৪২), ননদ সুকন কবির (৩২), গাড়ি চালক আল আমিন (২৬) ও রাশেদুলের দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতি।

এদিকে গতকাল শনিবার বাদ আছর আজিমপুর কবরস্থানে মা ও দুই সন্তানকে দাফন করা হয়েছে। এর আগে মিটফোর্ড হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে তিনজনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আলমবাগ নতুন জুরাইনে। সেখানে তিনজনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

কদমতলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি ) কাজী আইয়ুবুর রহমান জানান, নিহত রিতার মা মাজেদা বেগমের দায়ের করা মামলায় রিতা ও তার দুই সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এজন্য গত ৬ মে আলমবাগের সোনারতরী এলাকার একটি ক্লাবে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুলের পরিবারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐ বৈঠকে রিতাকে জোর করে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়। এতে বলা হয়, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে রিতা তার স্বামী রাশেদুলের বাড়ি থেকে চলে যাবে। রিতার শ্বশুর শফিকুল কবির, শাশুড়ি নূর বানু, স্বামী রাশেদুল কবির, ননদ সুকন, কবিতাসহ পরিবারের সদস্যরা রিতা ও তার দুই সন্তানের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এ কারণে রিতা তার দুই সন্তানসহ আত্মহত্যা করেছে।

মামলার অভিযোগের ব্যাপারে শফিকুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বৈঠকটি এলাকার গণমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে হয়েছে। সেখানে রিতার ওপর কোন জোর করা হয়নি। রিতার দাম্পত্য কলহের জের ধরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বৈঠকে রিতার মামা আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। আব্বাস তার ভাগ্নির দাম্পত্য কলহ থেকে মুক্তি পেতে ঐ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়েছেন তিনি, রিতা, রিতার মামা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল আলম ও চাঁন মিয়া।

পুলিশের ওয়ারী অঞ্চলের উপ-কমিশনার তওফিক মাহবুব চৌধুরী বলেছেন, আসামীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হয়েছে। রিতার বাসার বাথরুম থেকে পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিষপান না করে তারা গায়ে পেট্রোল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে পারত। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করার জন্য মৃতদের শরীরের বিভিন্ন আলামত (ভিসেরা রিপোর্ট) মহাখালী রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ইত্তেফাক
———————————————————-

দুই শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে বাবার প্রেমে পড়ে স্মৃতি

ইশরাত কবির পাবন ও রাইসা রাশমিন পায়েল এক বছরের মাথায় এই দুই ভাই-বোনের জন্ম। দুজনের যত্ন নিতে মা ফারজানা কবির রীতার কাছে কষ্টসাধ্য হলে নিয়ে আসেন মামাতো বোন স্মৃতিকে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়ার কারণে ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এ বাসায় থেকেই দৈনন্দিন কাজকর্ম ও পড়ালেখা শেখে স্মৃতি। রীতার ইচ্ছা ছিল এখানে রেখেই নিজের খরচে মামাতো বোনকে ধুমধাম করে বিয়ে দেবে। সেখানে থেকে বিয়ে হলো ঠিকই, সে বিয়ে হলো নিজের স্বামীর সঙ্গে। রীতার পারিবারিক সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রীতার মা মাজেদা বেগম ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, নাতি-নাতনিকে দেখাশোনার জন্য স্মৃতিকে কাজের মেয়ে হিসেবে ঘরে তোলেন রীতা। পাবন ও পায়েল দুজন ধানমি র মাস্টারমাইন্ড স্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ত। মাঝেমধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে রীতা তাদের স্কুলে যেত। এই সুবাদে রাশেদ ও স্মৃতি অবৈধ মেলামেশায় জড়িত হতো বলে রীতা ধারণা করে। তখন থেকে রীতার সংসারে কলহ শুরু হলে রাশেদ তার কর্মস্থল উত্তরায় স্মৃতিকে লুকিয়ে রাখে এবং গত রমজানের চাঁদের সময় তাদের মধ্যকার বিয়ের কথা ফাঁস করে দেয়। এরপর থেকেই রীতা ও রাশেদের মধ্যে বিদ্যমান কলহ চরমে ওঠে।

আমাদের সময়

———————————————————-

জুরাইনে মা ও দুই সন্তানের আত্মহত্যা, ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

রাজধানীর পূর্ব জুরাইনে মা ও তার দুই সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যুর ব্যাপারে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে কদমতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আজ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা এই মামলায় নিহত গৃহবধূ ফারজানার শ্বশুর ইত্তেফাক-এর বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল কবির, শাশুড়ি নূর বানু, স্বামী রাশেদুল কবির ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতি, দুই ননদ সুখন কবির ও কবিতা কবির, ননদের স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও গাড়িচালক মান্নানকে আসামি করা হয়েছে। মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর পূর্ব জুরাইনের আলমবাগ এলাকার ২২৯ নম্বর ৩য় তলা বাড়ির দোতলায়। এ বাড়িটির মালিক শফিকুল কবির দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি। পুলিশ গতকাল শুক্রবার সকালে মৃতদেহ তিনটি উদ্ধার করে। এরা হলেন মা ফারজানা কবির রিতা (৩৫), তার ছেলে কবির ইশরাক পাবন (১২) ও মেয়ে রাইসা রাশমিন পায়েল (১০)। এদিকে আজ সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাসার দেয়ালে দেয়ালে রং পেনসিল দিয়ে লেখা, আমাদের মৃত্যুর জন্য আমার বাবা রাশেদুল দায়ী; আমার মায়ের অপমান চাই না, তাই আমি আর আমার ভাইয়া এ পথ বেছে নিলাম। দরজা-জানালা, ঘরের দেয়াল, মেঝে কোথাও খালি নেই। সবখানে বিভিন্ন কথা লেখা। মেঝেতে শায়িত মা আর দুই সন্তানের মৃতদেহ। ফারজানার মা মাজেদা বেগম অভিযোগ করেন, নির্যাতন করে তার মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের ওয়ারী অঞ্চলের উপকমিশনার তৌফিক মাহবুব চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, লাশ উদ্ধারের পর দেয়াললিখন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পারিবারিক কলহের কারণে বিষজাতীয় কিছু খেয়ে মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে ক্ষোভের কথাগুলো বাসার দেয়ালজুড়ে লিখে গেছে তারা। এই মৃত্যুর জন্য দুই শিশু দেয়াললিখনে তাদের দাদা-দাদি ও বাবাকে দায়ী করেছে।

তবে সাংবাদিক শফিকুল কবির জানান, আগে থেকেই তার পুত্রবধূ রিতার আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। সে তার দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ছেলের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। রাশেদুল একটি টেক্সটাইল মিলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। স্ত্রী-সন্তান এখানে থাকলেও রাশেদুল থাকেন উত্তরায় দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতিকে নিয়ে। আত্মীয়রা জানান, তাদের পারিবারিক বিরোধ এই দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করেই। ফারজানার মামাতো বোন আসমা জানান, ১৮ বছর আগে রাশেদুল ও ফারজানার বিয়ে হয় তাদের নিজেদের পছন্দে। এ নিয়ে পারিবারিক ঝামেলা ছিল। বিয়ের পর তাদের প্রথম সন্তান পাবনের জন্ম হলে দেখাশোনার জন্য ফারজানা তার মামাতো বোন স্মৃতিকে এ বাসায় নিয়ে আসেন। বোনের সন্তানকে দেখাশোনার পাশাপাশি স্মৃতি এ বাসায় থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান। একপর্যায়ে স্মৃতির সঙ্গে রাশেদুলের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শেষমেষ তারা গোপনে বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস শুরু করে। ফারজানা এ বিষয়টি জানতে পারেন দেড়বছর আগে। এরপর থেকেই পারিবারিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। শফিকুল কবিরের এক আত্মীয় মুহিত জানান, এ নিয়ে রাশেদুলের পরিবারের সঙ্গে ফারজানার তিক্ততা বাড়তে থাকে। রাশেদুল মাঝেমধ্যে এ বাড়িতে এসে ফারজানাকে মারধর করতো, নানা হুমকিও দিতো। তবে স্ত্রী-সন্তানের জন্য নিয়মিত খরচ দিতো রাশেদুল। দুই সন্তান ধানমি র একটি স্কুলে পড়াশোনা করতো; পাবন ষষ্ঠ ও পায়েল চতুর্থ শ্রেণীতে।

ফারজানার গৃহকর্মী জিন্নাত আরা জানান, আগের দিন বিকালে রান্না করে তিনি চলে যান। ফারজানা পরদিন তাকে দেরি করে আসতে বলে। এ জন্য তিনি সকালে একটু দেরি করে বাসায় আসেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিন্নাত এসে দেখেন, বাসার সব কক্ষের দরজা খোলা। ভেতরে সাড়াশব্দ নেই। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখেন, আগের দিনের সব খাবার পড়ে আছে। শোবার ঘরে গিয়ে দেখেন, এক পাশে মা ও পাশাপাশি দুই সন্তানের মৃতদেহ পড়ে আছে। তিনি চিৎকার করে সবাইকে ডাকেন। এরপর পুলিশ আসে। কদমতলী থানার ওসি কাজী আইয়ুবুর রহমান বলেন, তারা ঘরে ঢুকে দেখেন, দেয়ালে অনেক কথা লেখা। মৃত্যুর আগে ফারজানা আত্মহত্যা ও পারিবারিক বিরোধের বিভিন্ন কারণ লিখে যান দেয়ালে ও কাগজে। ফারজানার লাশের ওপর থেকে এমন একটি কাগজ পুলিশ উদ্ধার করে। মৃতদেহগুলো ছিল কাঁথা দিয়ে ঢাকা। তখন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।

এই ঘটনার কয়েকদিন আগে ফারজানার শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামের বাড়ি যান। তারা বাড়িটির নিচতলায় থাকতেন। মৃত্যুর খবরে সিআইডি, ডিবি ও র‌্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সিআইডির অপরাধচিহ্ন শনাক্তকরণ দলও বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। আজ সকালে ওই বাসায় গিয়ে প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। দোতলায় চার কক্ষের বাসার বসার ঘর ও শোবার ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চলছিল। বসার ঘরের সবকিছু তছনছ। আসবাব এলোমেলো, বই-খাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বেশিরভাগ জিনিসপত্র ভাঙাচোরা। শোবার ঘরের মেঝেতে পাতা বিছানার ওপর মা ও দুই সন্তানের মৃতদেহ। একদিকে লেখা, ‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ডাইনি দাদা ও দাদি’। আরেক দিকে লেখা ‘পাবন ও পায়েলের মৃত্যুর জন্য তুমি রাশেদুল কবির অবশ্যই দায়ী।’ বসার ঘরে লেখা, ‘আমার মৃত্যুর জন্য রাশেদুল কবির দায়ী, পায়েল’। ‘আব্বু তোমার বাবা তোমাকে অপরাধ থেকে বাঁচানোর জন্য যা করেছে, তাতে আমরা মরে যাচ্ছি। ৬ মে তোমরা যা করেছ, ভালোই করেছ। আমার বাবা আমাদের মরার জন্য স্ট্যাম্পে লিখে নিয়েছে। আমি পাবন তোমাকে ঘৃণা করি।’ ’ ‘মাথা নিচু করে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো।’ এ রকম অসংখ্য লেখা পুরো বাসার তিনটি কক্ষজুড়ে। বেশির ভাগ লেখা কালো ও লাল কালি দিয়ে। পুলিশের ওয়ারী অঞ্চলের উপকমিশনার জানান, মৃতদেহ পরীক্ষার পর তিনজনের মুখে ও শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ পাওয়া গেছে। বিষের কারণে পাবনের হাতে ফোসকা পড়ে গেছে। ফারজানার মুখের কাছেও ফোসকার চিহ্ন আছে। এ ছাড়া বিছানার ওপর একটি পানির বোতল, জগ ও ঘুমের ওষুধের প্যাকেট পড়ে আছে। তিনি বলেন, এটি আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু, তদন্ত শেষ না করলে নিশ্চিত করে বলা যাবে না। হাতের লেখা ফারজানা ও তার দুই সন্তানের কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করাচ্ছে। উপকমিশনার বলেন, শফিকুল কবির ও তার ছেলেকে পাওয়া গেলে অনেক প্রশ্নের জবাব মিলবে।

দিনের শেষে

——————————————————–

জুরাইনে মা ও দুই সন্তানের মৃত্যু নানা প্রশ্ন

জুরাইনের আলমবাগে মা ও দুই সন্তানের মুত্যু রহস্যের কোন কূল-কিনারা হয়নি এখনও। সেদিন কি ঘটেছিল এ প্রশ্ন পুলিশেরও। তারা বলছে, বিষপানে আত্মহত্যা করলে লাশগুলো বিছানায় সুন্দরভাবে পড়ে থাকার কথা নয়।

শেষ রাতে আত্মহত্যা করলেও এত দ্রুত লাশে পচন ধরার কথা নয়। তবে কি তাদের হত্যা করে বিছানায় শুইয়ে রেখে লাশগুলো কম্বল ঢাকা দেয়া হয়েছিল? যদি হত্যা হয় তবে দেয়ালের লেখাগুলো কার? মোবাইল ফোনের সিমকার্ডটি কোথায় গেল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। গতকাল লাশ উদ্ধারের পর থেকেই চালক আল আমিন গাড়িসহ পলাতক রয়েছে। সন্দেহের তীর তার দিকেও। অনেক জায়গায় খোঁজ করেও আল আমিনকে পাওয়া যাচ্ছে না। নিহত ফারজানা কবির রীতার লাশের ওপর যে মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায় তাতে সিমকার্ড ছিল না। ফলে মৃত্যুর আগে রীতা কার সঙ্গে কি কথা বলেছিলেন তা উদ্ধার করা যাচ্ছে না। নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, লাশ শুইয়ে রাখা ও ফ্ল্যাটের দরজা খোলা থাকা নিয়ে তাদের সন্দেহ হচ্ছে। পুলিশ বলছে, লাশগুলোর ভিসেরা রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাবে না এটি হত্যা না আত্মহত্যা। ভিসেরা রিপোর্ট পেতে ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে জানিয়েছে পুলিশ। রীতার মা বলেছেন, প্রায় দু’ মাস আগে একবার রীতার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল তার স্বামী রাশেদুল কবির। ওই ঘটনায় রীতাকে ১ মাস বেসরকারি সিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। পরে রীতার মুখের কিছু অংশ প্লাস্টিক সার্জারিও করতে হয়। কিন্তু গত ৬ই মে রীতাকে বাসা থেকে চলে যেতে বলার পর চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেন রাশিদুল।

অন্যদিকে স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃতুর খবর পেয়েও ঘটনাস্থলে যাননি পাবন-পায়েলের বাবা রাশিদুল কবির। রীতার শ্বশুর বাড়ির লোকজনও কেউ কোন খবর নিচ্ছেন না। উল্টো তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ নিহত রীতার মা মাজেদা বেগমের। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রীতার মামা আব্বাস দেওয়ান ও দুলাভাই কাজী মোহাম্মদ আরিফকে অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। পরে ওই নম্বরগুলোতে ফোন করে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

ওদিকে গতকাল রাতে ৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন রীতার মা মাজেদা বেগম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯-ক ধারায় (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) কদমতলী থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। আসামিরা হলেন- নিহত রীতার স্বামী রাশিদুল কবির, শ্বশুর শফিকুল কবির, শাশুড়ি নূরবানু, ননদ কবিতা, কবিতার স্বামী দেলোয়ার, সুখন ও চালক আল আমিন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, ৩ টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। যে ঘরে লাশ পাওয়া গেছে সে ঘরসহ ফ্ল্যাটের কিছু আলামতের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পরই আসল ঘটনা জানা যাবে।

মৃত্যুর আগের সেই জিডি: মৃত্যুর আগে একাধিকবার নির্যাতনের কথা বলে পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন গৃহবধূ রীতা। গত ৮ই জানুয়ারি কদমতলী থানায় করা জিডিতে তিনি লিখেছিলেন, তার স্বামী রাশিদুল কবির দীর্ঘদিন থেকে বাসায় ফিরছেন না। একটি নারীকণ্ঠ মোবাইল নম্বর ০১৯১৪-২৫৯৩১৭ থেকে রীতা ও তার দুই ছেলেকে অপহরণ করে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছিল- এমন অভিযোগ জিডিতে উলেখ করেছিলেন রীতা। ওই জিডি’র তদন্তের ভার পড়ে কদমতলী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক আসাদের ওপর। আসাদ জানিয়েছেন, তিনি অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি একান্ত পরিবারিক হওয়ায় তিনি ফিরে আসেন। তখন পরিবারের সদস্যরাও বলেছিলেন, এটি পারিবারিক ব্যাপার। পারিবারিকভাবেই মীমাংসা হয়ে যাবে।

ডিভোর্স হয়নি: রীতার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলছেন, রীতাকে রাশিদুল ডিভোর্স দিয়েছেন। কিন্তু রীতার মা মাজেদা বেগম বলেছেন, গত ৬ই মে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে রাশিদুল উত্তেজিত হয়ে ৩ বার তালাক উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু ওই তালাকের বিষয়ে কোন রেজিস্ট্রেশন হয়নি। এমনকি ঘটনার ক’দিন পরেই তালাকের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে রীতাকে দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে বলেছিলেন রাশিদুল কবির।

অসমাপ্ত চিঠি: নিহত রীতার লাশের ওপর একটি অসমাপ্ত চিঠি পাওয়া গেছে। ২/৩টি ডায়েরির পাতা একত্রে পিন মেরে লেখা হয় চিঠি। কিন্তু ওই চিঠি লেখা সমাপ্ত হয়নি। চিঠিতে কাউকে সম্বোধন করা হয়নি। তবে চিঠিতে রীতা নিজের এবং সন্তানদের মৃত্যুর জন্য তার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে দায়ী করেছেন। লেখা হয়েছে- ‘জানি আমাকে সবাই দোষ দিবে। কিন্তু আল্লাহ জানেন আর আমার দুই সন্তান জানে আসল দোষী কে।’ এ চিঠি নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আসলেই কি এ চিঠি রীতা লিখেছেন। এ প্রশ্নও সর্বত্র।

চিরনিদ্রা আজিমপুরে: গতকাল বিকালেই আজিমপুর কবরস্থানে মা ও তার ২ সন্তানকে দাফন করা হয়েছে। এক পাশে মায়ের কবর অন্যপাশে ছোট দু’টি কবরে পাবন আর পায়েল। দুপুরে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশের উপস্থিতিতে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গ থেকে রীতা ও তার দুই সন্তানের লাশ বুঝে নেন রীতার মামা আব্বাস দেওয়ান ও দুলাভাই কাজী আরিফ। তারা জানিয়েছেন, লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় দ্রুত দাফন করে ফেলতে হচ্ছে।

মানবজমিন

—————————————————-

‘দুই সন্তানসহ রিতাকে ওরা হত্যাই করেছে’

দুই শিশুর কোলাহলে আর মুখর নেই বাড়িটি। নেই কোনো চাঞ্চল্য। শুধু তাদের লেখাগুলো পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ আর একজন নারীর ওপর মানসিক নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে আছে। কী এক বিষাদে ছেয়ে আছে পুরো বাড়িটি। তিন অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে রাজধানীর পূর্ব জুরাইনে সোনারতরী নামের বাড়িটি রাতারাতি হয়ে গেছে বিষাদপুরী।

গতকাল শনিবার রাজধানীর জুরাইনে দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল কবিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল এমনই দৃশ্য। উৎসুক মানুষের আনাগোনা থাকলেও কথা বলতে চাইলেন না কেউ।

তৃতীয়তলার ভাড়াটিয়ারা জড়াতে চান না এ মর্মস্পর্শী ঘটনার কোনো কিছুতে। বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যথেষ্ট সময় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন গৃহবধূ রিতা। বিকেলে বিদায়ের সময় গৃহকর্মী জিন্নাতকে রাতে আসতে বারণ করেছেন। এর আগে মা ও বোনদের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। বন্ধ রাখেন মোবাইল ফোনসেট।

তবে রিতার মায়ের পরিবার ঘটনাটি আত্দহত্যা বললেও একে হত্যার শামিল বলেই মনে করছে। ‘ওরা দুই সন্তানসহ রিতাকে হত্যাই করেছে। দিনের পর দিন নির্যাতনে আত্দহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ খোলাও ছিল না। বাবার অপকর্মে মরতে হয়েছে নিষ্পাপ দুই শিশুকেও।’ বৃদ্ধ মাজেদা বেগম আহাজারির মতো করেই কালের কণ্ঠকে বললেন কথাগুলো। তিনি দুই সন্তানসহ মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার ফারজানা কবির রিতার মা। এ ঘটনায় ‘আত্দহত্যা প্ররোচনা’র অভিযোগে তিনি রিতার স্বামী ও শ্বশুরসহ আটজনকে আসামি করে মামলাও করেছেন। গত রাত পর্যন্ত পুলিশ আসামিদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

ঘটনার আলামত যাচাইয়ের পর পুলিশ কর্মকর্তারাও প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অমর্যাদার কারণেই শফিকুল কবিরের ছেলে রাশেদুল কবিরের স্ত্রী ফারজানা কবির রিতা (৩৫), তাঁর ছেলে ইশরাক কবির পাবন (১৩) ও মেয়ে রাইসা রাশমিন পায়েলকে (১২) সঙ্গে নিয়ে বিষপানে একযোগে আত্দহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে তিনটি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে আজিমপুর কবরস্থানে।

এদিকে গতকাল সকালে রিতার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদসহ আটজনকে আসামি করে কদমতলী থানায় মামলা করেছেন রিতার মা। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের পাশাপাশি এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে আত্দহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন রিতার শ্বশুর শফিকুল কবির, শাশুড়ি নূর বানু, স্বামী রাশেদুল কবির, রাশেদুলের দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতি আক্তার, রিতার দুই ননদ সুখন কবির ও কবিতা কবির, সুখনের স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও রাশেদুলের গাড়িচালক আল আমিন।

গতকাল সকালে সোনারতরীতে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা তালাবদ্ধ। তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ঝর্ণা আক্তার জানান, মাত্র ১২ দিন আগে তিনি এ বাসা ভাড়া নিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে রিতা ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তারা সচরাচর বের হতেন না_উল্লেখ করে ঝর্ণা বলেন, ‘শুক্রবার দুপুরে লাশ উদ্ধারের সময় পারিবারিক বিরোধের কথা শুধু শুনেছি।’

রিতা ফোন বন্ধ করে দেন : জুরাইনের ৩৭০ আলমবাগে বসবাস করেন রিতার মাসহ পরিবারের সদস্যরা। শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি মায়ের বাসা হলেও সেখানে রিতার যাতায়াত ছিল খুবই কম। বরং মা ও বড় বোন মিতা দেখা করতে যেতে চাইলে তাতেও উৎসাহ দেখাতেন না রিতা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

রিতার বড় বোন মিতা জানান, ‘বৃহস্পতিবার সারা দিন রিতার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি; কিন্তু বারবার ফোন বন্ধ পেয়েছি। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে গৃহকর্মী জিন্নাত জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার সকালে রিতার বাসায় কাজ করেছে। সবাই বাসায় আছে। বেলা ৩টায় রান্না শেষ করে বের হওয়ার সময় রিতা তাকে রাতে যেতে বারণ করেছেন। তখন বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। শুক্রবার লাশ উদ্ধারের পর বোঝা গেল মানসিক অস্থিরতার কারণেই রিতা এসব করেছেন।

রিতার মা মাজেদা বেগম (৬৫) বলেন, ‘গত রবিবার রিতার বাসায় বেড়াতে গেলে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু কষ্ট বেড়েছে। নাতিদের পরীক্ষার খবর নিয়ে আদর করে চলে আসি। এরপর মঙ্গলবার রিতাকে ফোন করে আবার দেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে নিষেধ করে। পরদিনও কথা হয়। রিতা জানায়, শ্বশুর শফিকুল কবির নানাভাবে চাপ দিচ্ছে বাসা ছেড়ে দিতে। দুই বাচ্চা নিয়ে কি হবে, তা নিয়ে অনেক কথা বললেও রিতা দেখা করতে রাজি হয়নি। এরপর শুক্রবার পেলাম ওদের লাশ।’ মাজেদা বলেন, মাস্টার্স পাস হলেও রিতা চাকরির চেষ্টা করেনি সন্তানের কথা ভেবে। স্বামীর সম্পর্কে অনেক কথা জানলেও লুকিয়েছে সংসারে শান্তির আশায়।
মাজেদা বেগম বলেন, ‘শুধু রাশেদুল নয়, তার মা-বাবা ও বোনেরা নির্যাতন করেছে রিতার ওপর। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক অত্যাচারে অংশ নিয়েছে রাশেদুলের বোনজামাই দেলোয়ারও। পাবন ও পায়েল রক্ষা পায়নি এসব নিষ্ঠুরদের হাত থেকে। ওদের মরে যাওয়া ছাড়া আর তো কোনো পথ খোলা ছিল না।’
বোন মিতা জানান, মামাতো বোন স্মৃতিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন রিতা নিজ আগ্রহেই। সেখানে থেকে স্মৃতি বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া করে। এর পরই রাশেদুলের সঙ্গে সম্পর্কের কথা প্রকাশ পায় এবং একপর্যায়ে তারা বিয়ে করে। মিতা অভিযোগ করেন, রিতার মৃত্যুর পরও রাশেদের বোন কবিতার স্বামী দেলোয়ার হোসেন ফোনে তাঁদের হুমকি দিচ্ছে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ক্ষতি হবে বলে তাঁরা শাসাচ্ছে।

রিতার মা-বোনসহ পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, গত ৬ মে রাশেদ তার বাবা, মা, বোন ও দুই বোনজামাইকে সঙ্গে নিয়ে রিতা ও তাঁর দুই সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এ সময় পুলিশও ডেকে আনা হয়। ৩০ জুনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য রিতাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় তারা একটি স্ট্যাম্পে রিতাকে দিয়ে জোর করে স্বাক্ষর নেয়। এ ঘটনায় রিতা অনেকটা মানসিক বল হারিয়ে ফেলেন। মানসিক অস্থিরতা ও তর্কের একপর্যায়ে রিতা তাঁর শাশুড়িকে চড় মেরেছিলেন বলেও স্বজনরা জানান। এর পরিণতিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ওই বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ জানিয়ে সোনারগাঁয়ে চলে যান। রিতা থাকলে ওই বাড়িতে তাঁরা ঢুকবেন না বলেও ঘোষণা দেন। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরেই রিতা দুই সন্তানকে নিয়ে আত্দহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে স্বজনরা মনে করছেন।

দেয়াল লিখন এক দিনের নয় : পিতৃকুলের প্রতি ঘৃণাভরা নানা কথার দেয়াল লিখন শিশু পাবন এক দিনে করেনি বলেই মনে করছেন স্বজনরা। নানি মাজেদা বেগম এ প্রসঙ্গে বলেন, দেয়ালে পাবনই লিখেছে। তবে এক দিনে এসব লেখেনি। কমপক্ষে এক সপ্তাহ ধরে তার সব কষ্টের কথা দেয়ালে চিরকুটে, স্কুল-খাতায় লিখেছে বলে মনে হচ্ছে। গত রবিবার ওদের বাসায় গেলে পাবন দুটি ঘরে ঢুকতে দেয়নি। সেখানে মালপত্র আছে বলে জানায়। এখন মনে হচ্ছে ওই লেখাগুলো লুকানোর জন্যই পাবন বাধা দিয়েছিল।

জানাজায়ও অনুপস্থিত : এদিকে রিতার শ্বশুর সপরিবারে সোনারগাঁয়ে অবস্থান করছেন বলে শোনা গেলেও গতকাল পর্যন্ত তাঁরা জুরাইনের বাসায় ফেরেননি। তাঁর মোবাইল ফোনসেটও বন্ধ। মামলা হওয়ার পর থেকে এ পরিবারের আর কোনো সদস্যের সংবাদ পায়নি বলে পুলিশ জানায়। রিতার স্বামী রাশেদুল কবির দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথমে ইস্কাটনে থাকলেও বর্তমানে উত্তরায় বসবাস করছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। তবে তার সঠিক ঠিকানা এখনো জানা যায়নি।

গতকাল বেলা পৌনে ৪টায় রিতার মামা আব্বাস দেওয়ান মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণ করেন। সন্ধ্যায় আলমবাগে জানাজা শেষে লাশ দাফনের জন্য নেওয়া হয় আজিমপুর কবরস্থানে। আলম মার্কেটের সামনের জানাজায় স্থানীয় প্রচুর মানুষ অংশ নিলেও ছিলেন না শফিকুল কবিরের পরিবারের কোনো সদস্য।

এর আগে মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ তিনটি লাশের ময়নাতদন্ত করেন। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য আজ নমুনা পাঠানো হবে মহাখালীতে। পুলিশের ওয়ারী জোনের ডিসি তৌফিক মাহবুব চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, ভিসেরা পরীক্ষার পরই প্রমাণ করা সম্ভব হবে, এটি হত্যা না আত্দহত্যা। তবে প্রাথমিক তদন্তে আত্দহত্যা ধরে নিয়ে মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।

কদমতলী থানার ওসি কাজী আয়ুবুর রহমান জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে আত্দহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তে অন্য কোনো আলামত যেমন_নির্যাতন বা অন্য কিছু পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মর্গ সূত্রে জানা গেছে, তিনটি মৃতদেহের কোথাও নতুন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পুরনো কিছু কাটা দাগ থাকলেও তা মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করছেন না চিকিৎসকরা।


কালের কন্ঠ

———————————————————

ফারজানা শ্বশুরের কাছে আশ্রয় চেয়েও পাননি
আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা: স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদসহ আসামি আট

‘স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ রিতা আশ্রয় চেয়েছিল শ্বশুরের কাছে। তিনি আশ্রয় দেননি, বরং পুলিশের ভয় দেখিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেছেন। না গেলে তালাক দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। আর কোনো পথ খোলা ছিল না ওর। শেষমেশ বিষ খেয়েছে, দুই সন্তানকেও খাইয়েছে।’ এ কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জুরাইনের ফারজানা কবির রিতার মা মাজেদা বেগম। বাসাভর্তি মানুষ তাঁকে ঘিরে আছে। সবার চোখে পানি, সেই পানিতে যেন ধুয়ে গেছে সান্ত্বনার সব ভাষা।

এরই মধ্যে একজন বললেন, ফারজানা নিজে না হয় মরতেন, কিন্তু সন্তানদের কেন মারলেন? আরেকজন বললেন, বাঁচার কোনো পথই খোলা ছিল না! দুই শিশুসন্তানসহ মায়ের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে এমন হাজারো প্রশ্ন মানুষের মনে। প্রশ্ন পুলিশের কাছেও: কীভাবে শিশুরা ছাদ-লাগোয়া দেয়াল পর্যন্ত উঠে তাদের কথা লিখল? অথবা তিনজনের লাশ কীভাবে পরিপাটি করে বিছানার ওপর কাঁথা দিয়ে ঢাকা ছিল। আত্মহত্যার পর কি এভাবে থাকা সম্ভব?

পুলিশের ওয়ারী অঞ্চলের উপকমিশনার তৌফিক মাহবুব চৌধুরী বলছেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলে এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে।

রাজধানীর জুরাইনের আলমবাগে মা ফারজানা কবির রিতা এবং তাঁর দুই সন্তান কবির ইশরাক পাবন (১২) ও রাইসা রাশমিন পায়েলের (১০) মৃত্যুর ঘটনায় ফারজানার স্বামী রাশেদুল কবির, শ্বশুর সাংবাদিক শফিকুল কবির, শাশুড়ি, দুই ননদসহ আটজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে কদমতলী থানায় এ মামলা করেন ফারজানার মা মাজেদা বেগম। মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি গ্রহণ করেছে। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ।

এদিকে ফারজানা ও তাঁর দুই সন্তানের লাশের ময়নাতদন্ত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। গতকালই তাদের লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এটা আত্মহত্যা না অন্য কিছু, প্রাথমিকভাবে তা বলতে পারেননি চিকিত্সকেরা।

গত শুক্রবার আলমবাগের বাসা থেকে পুলিশ তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। এর মধ্যে ফারজানা হলেন ইত্তেফাক-এর বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল কবিরের ছেলে রাশেদুল কবিরের স্ত্রী। মৃত্যুর আগে তিনি ও তাঁর সন্তানেরা আত্মহত্যার কারণ ও পারিবারিক বিরোধের নানা অভিযোগের কথা ঘরের দেয়াল, মেঝে, বাথরুমে ও কাগজে লিখে রেখে যায়। পাবন ও পায়েল দেয়াললিখনে তাদের মৃত্যুর জন্য দাদা-দাদি ও বাবাকে দায়ী করে।
পুলিশের উপকমিশনার তৌফিক মাহবুব চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শফিকুল কবির ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আসার পর এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আর আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেলে আরও অনেক বিষয় স্পষ্ট হবে।

মামলা: রাজধানীর কদমতলী থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, মামলায় ফারজানার মা মাজেদা বেগম অভিযোগ করেন, তিন বছর আগে তাঁর মেয়ে তাঁকে জানিয়েছিলেন বাসার কাজের মেয়ে (মামাতো বোন) রাজিয়া সুলতানা স্মৃতির সঙ্গে রাশেদুলের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। রাশেদুল ওই মেয়েটিকে বিয়ে করবেন বলেও হুমকি দিচ্ছেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, রাশেদুল মেয়েটিকে বিয়ে করে অন্যত্র বসবাসও করছেন। কিন্তু রাশেদুল বিয়ের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ফারজানা তাঁকে জানান, শ্বশুর শফিকুল কবির ও পরিবারের লোকজন তাঁকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেছেন। না গেলে তালাক দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। ফারজানা আরও অভিযোগ করেন, তাঁর কাছ থেকে স্ট্যাম্পে জোর করে সই নেওয়া হয়েছে। মামলায় মাজেদা বলেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় ফারজানার গৃহপরিচারিকা জিন্নাত আরা এসে জানায়, ফারজানা ও তাঁর দুই সন্তান মারা গেছে। তিনি দ্রুত বাসায় গিয়ে মেয়ে ও নাতিদের বিকৃত চেহারা দেখতে পান। পরে তিনি জানতে পারেন গাড়িচালক আল আমিনকে দিয়ে তাঁর মেয়ে ও নাতিরা বিষাক্ত দ্রব্য কিনে আনে। মাজেদা এ মামলায় শফিকুল কবির, তাঁর স্ত্রী নূর বানু, স্বামী রাশেদুল কবির, স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী স্মৃতি, দুই ননদ সুখন কবির ও কবিতা কবির, সুখনের স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও গাড়িচালক আল আমিনকে অভিযুক্ত করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়।

কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আয়ুবুর রহমান বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

সবাই পলাতক: জুরাইনে শফিকুর রহমানের বাড়িটি এখন তালাবদ্ধ। শফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মামলার পর তাঁরা গা ঢাকা দিয়েছেন। এখন ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। রাশেদুল ও তাঁর স্ত্রীও উত্তরার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

ফারজানার জিডি: ফারজানার দুলাভাই কাজী মোহাম্মদ আরিফ অভিযোগ করেন, ফারজানাকে আগে থেকেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি এমন একটি হুমকির ঘটনায় ফারজানা কদমতলী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে বলা হয়, বেশি বাড়াবাড়ি করলে সন্তানসহ ফারজানাকে অপহরণ করা হবে। কদমতলী থানার দারোগা হাফিজউদ্দিন এ বিষয়টি তদন্ত করেন।

চালককে গাড়ি উপহার: মাজেদা বেগম তাঁর মামলায় উল্লেখ করেন, গাড়িচালক আল আমিনকে দিয়ে তাঁর মেয়ে ও নাতিরা বিষাক্ত দ্রব্য আনায়। এর বিনিময়ে চালককে গাড়িটি দিয়ে দেয়। চালক গাড়িটি নিয়ে এখন উধাও। কদমতলী থানার ওসি বলেন, ফারজানার কাছে পাওয়া চিরকুটে এ কথা উল্লেখ রয়েছে।

চাপ প্রয়োগ: ফারজানার দুলাভাই ভাই কাজী আরিফের অভিযোগ, গত ৬ মে শফিকুর পুলিশ ডেকে এনে ফারজানাকে ভয় দেখান এবং তাঁকে দিয়ে আপসনামায় সই করতে বাধ্য করেন। ফারজানার মামা আব্বাস দেওয়ান বলেন, কদমতলী থানার এএসআই গোলাম কিবরিয়া ওই দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে শফিকুল কবির বাড়ি ছাড়ার কাগজে সই নেন। এ ছাড়া রাশেদুল তাঁর দ্বিতীয় বিয়েতে আপত্তি নেই—এমন একটি দলিলে সই নেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এএসআই গোলাম কিবরিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত তিনি শফিকুল কবিরের বাসায় ছিলেন। সেখানকার বাসিন্দা টিটু ও চানমিয়া সেখানে ছিলেন।

ময়নাতদন্ত: ফারজানা ও তাঁর দুই সন্তানের লাশ শুক্রবার বিকেলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। কিন্তু তখন চিকিত্সক না থাকায় ময়নাতদন্ত হয়নি। গতকাল সকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফারজানার পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে হিমঘর না থাকায় লাশে পচন ধরেছে। চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। সলিমুল্লাহ মেডিকেলের চিকিত্সক মোহাম্মদ মাকসুদ ময়নাতদন্ত করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, লাশ বিকৃত হওয়ায় শরীরে কোনো চিহ্ন তাঁরা দেখতে পাননি। শ্বাসরোধ করার লক্ষণও নেই। লাশের ভিসেরা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য মহাখালীর পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে জানা যাবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।

তবে গতকাল সলিমুল্লাহ মেডিকেল হাসপাতালের মর্গে শফিকুল কবিরের লোকজনকে দেখা যায়। আনোয়ার নামের এক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি শফিকুল কবিরের খালাতো ভাই। তাঁরা দুই সন্তানের লাশ নিতে এসেছেন। ফারজানার মায়ের বাড়ির লোকজন এ কথা পুলিশকে জানান। পুলিশ তিনটি লাশ ফারজানার দুলাভাই কাজী আরিফকে বুঝিয়ে দেয়। বিকেলে লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পুলিশের প্রশ্ন: পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ফারজানা ও দুই সন্তানের দেয়াললিখন ও হাতে লেখা চিরকুট থেকে তাঁরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, এটি আত্মহত্যা। তবে এখনো কিছু প্রশ্নের জবাব মেলেনি। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুরো বাড়ির দেয়ালজুড়ে যত লেখা, সেগুলো কত দিনে লেখা হয়েছে। আবার অনেক লেখা একেবারে ছাদ-লাগোয়া দেয়াল পর্যন্ত। তাহলে শিশুরা এত ওপরে উঠল কীভাবে। আবার গৃহপরিচারিকা পুলিশকে জানিয়েছে, বাড়ির সব কক্ষের দরজা খোলা ছিল। প্রশ্ন হলো, কেন সব দরজা খোলা? তিনজনের লাশ ছিল পরিপাটি করে বিছানার ওপর কাঁথা দিয়ে ঢাকা। আত্মহত্যার পর কি এভাবে থাকা সম্ভব? বাচ্চাদের একটি ঘর ছিল এলোমেলো, আবার আসবাব ও টাইলস পর্যন্ত ভাঙা ছিল। প্রশ্ন হলো, কে এসব ভাঙল? লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবার চেহারা বিকৃত ছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, তাহলে কবে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

প্রথম আলো

[ad#co-1]