মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিক্রমপুর নামটি রক্ষা করুন

আমরা কেমন আছি
ইমদাদুল হক মিলন
“বিক্রমপুরের ইতিহাস শুধু একটি পরগনার ইতিহাস নহে, ইহা বঙ্গেরই ইতিহাস। যে ‘বঙ্গ’ শব্দ সমস্ত দেশকে বঙ্গদেশ নামে অভিহিত করিয়াছে এবং সমস্ত দেশের অধিবাসীকে বাঙালি নামের অধিকারী করিয়াছে, সে দেশের ইতিহাসই বিক্রমপুরের ইতিহাস।” আজ থেকে ১২০ বছর আগে ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থে মহান ইতিহাসবিদ যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখেছিলেন এই কথা।

আরেক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক হিমাংশুমোহন চট্টোপাধ্যায় ১৩৩৮ সনের ৩ শ্রাবণ তাঁর চারখণ্ডে সমাপ্ত ‘বিক্রমপুর’ নামে একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বিশাল ইতিহাস গ্রন্থ ‘বিক্রমপুর’ অবিভক্ত বাংলার প্রতিটি হাই স্কুলের লাইব্রেরিতে রাখার জন্য তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ ডিপিআই এবং শিক্ষামন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন যৌথভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ‘বিক্রমপুর’ নামের এই ইতিহাস গ্রন্থটি ছাড়া এমন বিরল সৌভাগ্য অন্য কোনো বাংলা গ্রন্থের ক্ষেত্রে হয়নি।

বিক্রমপুর নামটি দেড়-দুই হাজার বছরের পুরনো কিন্তু বহুকাল নামটি সরকারি নথিপত্রে নেই। আছে কিংবদন্তি হয়ে, আছে গল্পগাথায়, মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর অঞ্চলের মানুষের মনে আর মুখে মুখে। আছে মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে, আছে বস্ত্রালয়ে, কোল্ডস্টোরেজে। আছে সমিতিতে, সংগঠনে, আছে গল্প-উপন্যাসে, কাব্যকথায় আর নাটকে। আছে পত্রিকার শিরোনামে, আছে পিতৃ-মাতৃভূমির পরিচয়ে। শুধু সরকারি নথিতে নেই, মানচিত্রে নেই। কবে কেমন করে মুছে গেছে সেই ইতিহাস বহুভাবে খুঁজেও বের করতে পারিনি। হতে পারে, বিক্রমপুর যেহেতু পরগনা ছিল সেহেতু জমিদারি প্রথা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো বিক্রমপুর নামটিও সরকারি নথি থেকে মুছে গেছে।

বিক্রমপুর নামটিকে পৃথিবীর কাছে পরিচিত করিয়েছেন দুজন মানুষ, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এবং আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। একজন ধর্ম এবং জ্ঞানের আলোয়, আরেকজন বিজ্ঞানের। একজনের জন্ম বজ্রযোগিনী, আরেকজনের রাঁঢ়িখাল। আজ থেকে এক হাজার বছর আগের সেই যুগে অতীশ দীপঙ্করের মতো জ্ঞানবান পণ্ডিত এই পৃথিবীতে ছিল না বললেই চলে। আর বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর অবদানের কথা বিজ্ঞানমনস্ক সারা পৃথিবীর মানুষই জানেন। এ রকম কত কৃতী মানুষ জন্মেছেন বিক্রমপুরে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সরোজিনী নাইডু। আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ প্রতিভা জীবনানন্দের আদিনিবাস লৌহজং থানার গাউপাড়া গ্রামে, বুদ্ধদেব বসু মালখানগরের। বুদ্ধদেব বসু তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার ছেলেবেলা’য় কী অসাধারণ ভাষায় এবং মমতায় বিক্রমপুরের কথা লিখেছেন। বাংলা ভাষার একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। এই উপন্যাসের পটভূমি বিক্রমপুরের গাউদিয়া গ্রাম। গাউদিয়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামাবাড়ি, নিজের গ্রাম মালপদিয়া। একদা বাংলা সাহিত্য কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সুবোধ ঘোষ। তাঁদের আদিনিবাস বিক্রমপুরের বহর গ্রাম। বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র বলা হতো সমরেশ বসুকে। তিনি বিক্রমপুরের। বিক্রমপুরের পটভূমিতে দেশভাগের সময় নিয়ে এক আশ্চর্য উপন্যাস লিখেছিলেন সমরেশ বসু। ‘সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’। বিক্রমপুর নিয়ে লেখা রাণীচন্দের চমৎকার স্মৃতিকথা ‘আমার মা’র বাপের বাড়ি’, প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’। অসীম রায়ের ক্লাসিকস্ ‘আবহমানকাল’জুড়ে আছে মুন্সীগঞ্জের কথা। বিক্রমপুরের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্দান্ত উপন্যাস লিখেছেন মাহমুদুল হক, ‘খেলাঘর’। বিক্রমপুরের কৃতী লেখক কবি ভাষাবিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ বিক্রমপুর নিয়ে লিখেছেন তাঁর অসামান্য গ্রন্থ ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’, দীর্ঘ কবিতা ‘বিক্রমপুর’। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘উজান’ উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা। প্রফুল্ল রায় বজ্রযোগিনীর, তাঁর ‘কেয়াপাতার নৌকো’ উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পূর্বপশ্চিম’-এ লিখেছেন মালখানগরের কথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তিন মহানায়ক বিনয় বাদল দীনেশ বিক্রমপুরের সন্তান। এ রকম বহু কৃতী মানুষের জন্মের অহঙ্কারে বিক্রমপুর এই উপমহাদেশে তো বটেই, পৃথিবীর মানচিত্রেও এটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। দুঃখের বিষয়, সেই নামটিই কোথাও নেই। দেড়-দুই হাজার বছর ধরে চলে আসা নামটি কখন যে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র এবং মানচিত্র থেকে মুছে গেছে, আমরা টেরই পাইনি। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ সগর্বে বলে, আমি বিক্রমপুরের লোক। মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি নামে একটি সংগঠন আছে, প্রায় ৬০ বছরের পুরনো। পৃথিবীর বিভিন্ন বড় শহরে যেখানে মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লোক আছে সেখানে এই সমিতির শাখা আছে। আমি নিউইয়র্ক এবং রোমে দেখেছি, টোকিওতে দেখেছি।

দেশব্যাপী বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার জনপ্রিয়। আমার হাতের কাছে বিক্রমপুর নাম ধারণ করা চারটি পত্রিকা আছে, ‘মাসিক বিক্রমপুর’, ‘আমাদের বিক্রমপুর’, ‘সাপ্তাহিক বিক্রমপুর বার্তা’, ‘মাসিক বিক্রমপুর সমাচার’। ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হতো ‘বিক্রমপুর পত্রিকা’, সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। এ সবই বিক্রমপুরের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ থেকে হয়েছে। এই উপমহাদেশে বিক্রমপুর একটি সম্ভ্রম জাগানো নাম। বাংলাদেশে তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেরও কোনো অঞ্চলে গিয়ে ‘বিক্রমপুর’ নামটি বললে, আমি বিক্রমপুরের লোক বললে মানুষের মধ্যে একধরনের সমীহের ভাব জেগে ওঠে। অথচ নামটি কোথাও নেই। না সরকারি নথিতে, না মানচিত্রে। এখনো যেটুকু মুখে মুখে আছে কালক্রমে তাও থাকবে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে যাবে বিক্রমপুরের নাম। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী, ইতিহাসের পৃষ্ঠা উজ্জ্বল করে তোলা মনীষীদের বিক্রমপুর নামটি থাকবে না, এ কি হতে পারে?

বিক্রমপুর নাম এভাবে মুছে গেলে ইতিহাসের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হবে।

বঙ্গভঙ্গের সময় বিক্রমপুরবাসীর কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন বলেছিলেন, ‘আমি বিক্রমপুরবাসীদের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে বেশ অবগত আছি। এ রকম সুনিপুণ রাজকর্মচারী পৃথিবীর আর কোথাও নেই।’ বিক্রমপুর সম্পর্কে লর্ড কার্জনের আরো দুটি উক্তি ‘দিস পার্ট অব ইন্ডিয়া ইজ দি মোস্ট অ্যাডভান্সড রুরাল ট্র্যাঙ্ক ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস পিপল আর একসেলেন্ট’ এবং ‘বিক্রমপুর ইজ টু দি রেস্ট অব ইন্ডিয়া হোয়াট এডিনবরা ইজ টু দি রেস্ট অব ইউরোপ’। ১৯১৫ সালে লর্ড কারমাইকেল বিক্রমপুর ভ্রমণ করে লিখলেন, ‘বিক্রমপুর অনেকটা আমার দেশ স্কটল্যান্ডের মতো। বিক্রমপুরের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা কর্মসংস্থানের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং স্কটদের মতোই জনসম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনে বড় অংশ নিয়ে থাকেন, আবার স্কটদের মতোই তাঁর নিজের দেশ ও পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে সর্বদা গর্বিত।’

লর্ড কারমাইকেলের এই মহান উক্তি আজ মিথ্যা প্রমাণিত হতে চলেছে বিক্রমপুরের মানুষের কাছে। নিজের দেশ এবং পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে সত্যি যদি আমরা গর্বিত হতাম, তাহলে বিক্রমপুর নাম সরকারি নথি এবং মানচিত্র থেকে কেমন করে মুছে যায়, উধাও হয়ে যায়? নিজেদের সম্মানের জন্যই তো, নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার কারণেই তো নামটি আমাদের ধরে রাখা উচিত ছিল। কেন আমরা তা করিনি? কেন বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবিনি?

বিক্রমপুর নামটিকে কিভাবে সরকারি নথিভুক্ত করা যায়, কিভাবে জায়গা করে দেওয়া যায় বাংলাদেশের মানচিত্রে এ নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর অঞ্চলের বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। প্রত্যেকেই একটি বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন যে, বিক্রমপুর নামটি শুধু মুখে মুখে নয়, অবশ্যই সরকারি নথিভুক্ত থাকা উচিত। এই সম্ভ্রম জাগানো নামটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু জেলা হিসেবে মুন্সীগঞ্জ ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। এখন ‘মুন্সীগঞ্জ’ জেলার নাম বদলে ‘বিক্রমপুর’ জেলা করতে যাওয়ার মানে হচ্ছে একটি বিতর্কের সৃষ্টি করা। মুন্সীগঞ্জ প্রপারের মানুষরা ক্ষুব্ধ হবেন, গজারিয়ার মানুষরা ক্ষুব্ধ হবেন। এমনিতেই আমাদের সমাজজীবনে তর্ক-বিতর্কের অভাব নেই। যেকোনো কর্মকাণ্ডের মধ্যেই একধরনের ধুরন্ধর মানুষ রাজনীতি আবিষ্কারের চেষ্টা করেন, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন কেউ কেউ। কিন্তু বিষয়টির সঙ্গে এসব ব্যাপার একেবারেই জড়িত নয়। এটি কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি আবেগের ব্যাপার। মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি। উদ্দেশ্য একটাই, হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি নামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। এ কারণে আমি একটি মধ্যপন্থা আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতির নাম ছিল ‘বিক্রমপুর সমিতি’। যখন ‘মুন্সীগঞ্জ’ জেলা হলো, তখন সংগঠনটি তার নাম পরিবর্তন করল। নতুন নাম হলো ‘মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি’। এই ধারণা মাথায় রেখে ‘বিক্রমপুর’ নামটি জেলার সঙ্গে যুক্ত মুন্সীগঞ্জ জেলার নামকরণ করা যায় ‘মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর জেলা’। এই নাম করা হলে বিক্রমপুর নামটির প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান যেমন দেখানো হবে, তেমনি মুন্সীগঞ্জকেও রাখা হবে তার আগের অবস্থানেই। কোনো তর্ক-বিতর্কের অবকাশ থাকবে না, কাউকে দুঃখিত বা ব্যথিত করার কারণ থাকবে না। বেশ সহজে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে আমরা পেঁৗছতে পারি। এখন কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, এত লম্বা নামকরণ একটি জেলার কেমন করে হয়? দুটো নাম মিলে একটি জেলা? ‘মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর জেলা’? শুনতে কেমন লাগবে? লিখতে কেমন লাগবে?

আমি মনে করি এটা অভ্যাসের ব্যাপার। অভ্যাস হয়ে যাবে। তা ছাড়া একটি জেলার নামকরণ একটু নতুন ধরনের, একটু অন্য রকম হলেই বা ক্ষতি কী? বিক্রমপুর নামটি তো চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি দয়া করে মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর অঞ্চলের মানুষের এই প্রাণের দাবিটা পূরণ করে দিন। বিক্রমপুর নামটিকে স্থায়ী করে দিন। তাহলে বিক্রমপুরের মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে আপনার নাম, তাদের বুকের গভীরে অঙ্কিত হয়ে থাকবে আপনার নাম।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]

2 Responses

Write a Comment»
  1. Dear milan sir,
    I’m giving you thanx to know us like such as informations.It will inspire our new generation.It is proud of us many of those information I didn’t know before.I’m hopeful that govt will take it seriously.

    Md.Sunmun Munshi
    Student,UK

  2. IT IS A GREAT STORY……………THANKS
    Muzahid titu
    Shahjalal University Of Science & Technology, Sylhet.
    mujahidtitu@gmail.com