বাংলা গান ও বর্তমান প্রজন্ম

নূর কামরুন নাহার
আমার এক সহকর্মীর ছেলেকে দেখলাম খুব করে ইংরেজী গান শুনছে। একটু ধাক্কা খেলাম। ধাক্কাটা আরো প্রবল হয়ে উঠল যখন জানতে পারলাম যে ছেলেটি ইংরেজী গানেরই শ্রোতা। হিন্দি শুনে মাঝে-মধ্যে। বাংলা গান শোনে না মোটেও। ইংরেজী গানের শ্রোতা আমাদের দেশে আছে এবং ব্যাপারটি নতুনও নয়। সেই শ্রোতাদের আবার ভিন্ন একটা শ্রেণীও রয়েছে, যাদের অনেকেরই দূরত্ব রয়েছে এদেশের জীবন-সংস্কৃতি থেকে। এদের কেউ কেউ ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে, যে শিক্ষার অনেকটাই আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও মাটি থেকে উৎসারিত নয়। তারা এদেশেই তাই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চর্চা করে। তাদের পোশাক-আশাক, চলাচল, চিন্তার জগৎ, জীবনাচরণও এ দেশের সাধারণ মানুষের থেকে ভিন্ন। এ শ্রেণীটিকে সহজেই পৃথক করা যায়। কিন্তু আমার সহকর্মীর ছেলেটি কোনো ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশোনা করেনি। শ্রেণী বিচারে সেও আমার মতই নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের। আমার সহকর্মীর অতীত, দু’জনের পারিবারিক বেড়ে উঠা প্রায় একই রকম। বর্তমানে আমাদের কর্মপরিবেশ, চিন্তা-চেতনা, টানাপোড়েন, সংকট ও স্বপ্ন একই বৃত্তের। ভবিষ্যৎ চিন্তা, অনাগত দিনকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিও প্রায় সমপর্যায়ের। তাই আমার সহকর্মীর ছেলের বেড়ে উঠার সাথে আমার সন্তানের বেড়ে উঠার পার্থক্য নিতান্তই অনুল্লেখ্য। আমাদের এই শ্রেণীর মানুষের জীবনে এখনো এদেশীয় সংস্কৃতি-বোধ-বিবেচনা খানিকটা হলেও জীয়ন্ত রয়েছে। আমার সহকর্মীর সন্তানের চিন্তা-চেতনা, রুচিবোধ, অন্তর্জগৎ, জীবনবোধ, অনেকটা আমার সন্তানের মতই হবে এমনটিই ধারণা ছিল। তাই ধাক্কাটাও একটু বেশি লেগে ছিল।

যাই হোক সময় হয়তো আমাদের অজান্তেই অনেকটা গড়িয়েছে। আমাদের সন্তানদের রুচিবোধেও বিরাট পরিবর্তন এসেছে। আমাদের পরিপার্শ্ব, চাহিদায় ব্যাপক পরিবর্তন এসে গেছে। আমাদের সংস্কৃতি, পোশাক, চিন্তা-ভাবনায় বিজাতীয় বিষয়গুলো ক্রমেই গেঁড়ে বসেছে। পুঁজিবাদী, ভোগবাদী সমাজ একেবারে মজ্জার গভীরে ঢুকে গেছে,ভিন্ন ভিন্ন চাহিদায় আমাদের ভাসিয়ে নিয়েছে। এর অনেক কিছুই আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে কিন্তু আমরা সচেতন নই কিংবা সচেতন হবার মত সামর্থ্যটুকু হারিয়ে ফেলেছি। অথবা আমাদের বোধ, সৌন্দর্য, ও আনন্দের স্বরূপ এখনকার বোধ থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে, জানতেই পারিনি বর্তমান প্রজন্মের অন্তর্জগতে কত ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত। হয়ে গেছে, কতখানি ওরা দূরে চলে গেছে বাঙালির বিশ্বাস ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে!

বাংলা গানের বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যকেই শুধু সমৃদ্ধ করেনি, আমাদের মনন, চিন্তাশক্তি এবং এর প্রকাশের শক্তিকে প্রখর করেছে। বাংলার মাঠে, ঘাটে, নিভৃত পল্লীতে খুব সাধারণ মানুষের রচিত, সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত পল্লী, জারী, সারি ও এধরনের গান এ প্রজন্মের কাছে খানিকটা অচেনা, অজানা অথবা যুগের কারণে গ্রহণযোগ্য না হলেও বাংলা আধুনিক গান তাদের কাছে অজানা এবং অগ্রহণীয় থাকবে এমনটি প্রত্যাশিত নয়। বাংলা গানের বাণীর কমতিটা কোথায়? কোথায় এর ঘাটতির জায়গাটি! বাংলা গানের কথা, সুর, গায়কী সবই অসাধারণ। হাজার বছরের ঐতিহ্যে বাংলা গান বৈচিত্র্যমণ্ডিত ও অনন্য। বাংলা গান এক স্বর্ণযুগ অতিক্রম করে এসেছে। সেই সব আধুনিক বাংলা গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, মনে দোলা দেয়া অসংখ্য গানের মাধুরী আমাদের এ প্রজন্মকে কেন দোলাবে না।

মানুষের আবেগ অনুভূতি খুব কি খুব বেশী বদলে গেছে। যৌবনের দ্বারে দাঁড়িয়ে মনের যে পরিবর্তন, ভালো লাগার জগৎকে একটু একটু করে বুঝে নেয়ার যে আকুলতা, এই পৃথিবী, এই আকাশের নীল, বাতাসের স্পর্শ, বৃষ্টির ছন্দ, মানবিক সম্পর্কের বিচিত্র দোলা; এগুলো কি খুব বেশী বদলে গেছে। প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে অনেক কিছু, সহজ করে দিতে পারে যোগাযোগ মাধ্যম, ভাষায় হয়ত তারল্য এসেছে, সাজে এসেছে আধুনিকতা, কিন্তু মনের আকাশ ভরে যে রংধনু, বেজে চলা বীণার সুর তা কি খুব বেশী বদলে গেছে। যদি বদলেই না যাবে তাহলে এই প্রজন্মকে কেন বাংলা গান টানবে না। কেন দোলা দেবে না! কেন মনে হবে না ঐ গান আমার। আমার হৃদয়ের অপ্রকাশিত সব কথা।

বাংলা গান যে চিত্র তুলে ধরে ভেতরের অবস্থাকে বর্ণনা করে। মনের ভাব প্রকাশে তাকে কেন আশ্রয় করে তুলবে না আমাদের বর্তমান প্রজন্ম।“ ক’টা রাত কাটিয়েছ জেগে/স্বপ্নের মিথ্যে আবেগে/কি এমন দুঃখ কে সয়েছ যে তুমি ভালোবাসবে”। এই যে মনের চিরায়ত ইচ্ছার প্রকাশ, সুরের ঘোর, সৃষ্টি, আত্মময়তা, মগ্নতা তা কেন আমাদের আবেগের, সৃষ্টির জায়গাটাকে কাঁপাবে না! আবার “খোলা এলো চুল বুকের দু’পাশে ছড়ায়ে/তুমি ঘুমায়ে আছো কি মোর দেয়া সে ঝরা মালা বুকে জড়ায়ে”.এই যে বাংলা গানের চোখের সামনে ছবির মত চিত্রকে তুলে ধরার এক অসাধারণ কৃতিত্ব, অসাধারণ মাধুর্য এটি থেকে কেন আমাদেরও বর্তমান প্রজন্ম এত দূরে! অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীতে- “মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে/সে দিন ভরা সাজে/যেতে যেতে দুয়ারও হতে কি ভেবে ফিরালে মুখখানি/কি কথা ছিল যে মনে মনে।” ভরা সন্ধ্যায় দ্বিধান্বিত চলে যাওয়া, যেতে যেতেও ফিরে চাওয়ার এই যে চিত্রকল্প, স্মৃতি কাতরতা এগুলোও বাংলা গানের এক অনন্য বৈশিষ্ট, অসাধারণত্ব। সুরে ও বর্ণনায় বাংলা গানের এ বিশিষ্টতা, সৌন্দর্য, সুর মাধুর্য, চিত্রকল্প নতুন প্রজন্মের কাছে কেন আবেদনহীন!

বাংলা গানের বাণীর গভীরতা ও ব্যাপ্তি এ প্রজন্মের কাছে একেবারেই অজানা। হৃদয়ের একেবারে গভীরতম যে ভাব যে ব্যথা, যে আনন্দ, বাংলা গানে স্বচ্ছ স্ফটিকের মত প্রতিবিম্বত তার স্বরূপ যেন একবারেই অচেনা আমাদের এ প্রজন্মের কাছে। নজরুল সঙ্গীতে যেমন-তুমি শুনিতে চেও না আমার মনেরও কথা/দখিনা বাতাস ইঙ্গিতে বোঝে কহে যাহা বনলতা/এই যে গভীরতা, অভিমান, আকুলতা বাংলা গানের মত কোথায় আর এত নিবিড়ভাবে প্রকাশিত। কোথায় আর আমরা আমাদের মনের সাথে এত বেশি আপন অনুভব করি, সাযুজ্য অনুভব করি লালন যখন বলে- আশা পূর্ণ হলো না/মনের বাসনা/এতটা সহজভাবে কোথায় আর আমরা নিজেকে প্রকাশ করতে পারি। কিংবা মিলন হবে কত দিনে/আমার মনের মানুষের সনে। এই যে অতি সাধারণভাবে একেবারে সরাসরি মনকে তুলে ধরা সুরে মনের ভাবের প্রকাশ, চিরন্তন ইচ্ছার সহজ বহিঃপ্রকাশ বাংলা গান ছাড়া কিভাবে আর তা সম্ভব। হাসন রাজা যখন বলে- নেশা লাগিল রে/বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিল রে- এর চেয়ে বেশী সহজ করে, নিবিড় করে আর কোথায় প্রেম বর্ণিত। আমার মাটির, আমার মনের, আমার সংস্কৃতির প্রকাশকে অন্য কোন ভাষায়, অন্য কোন গানে এত সহজ, এত সুন্দর, এত সাবলীল প্রকাশ কি সত্যিই সম্ভব?

যে আকাঙক্ষাকে আমি পোষণ করি, যে আবেগ আমাকে তাড়ায়, যে চেতনা, আনন্দবোধ আমি ধারণ করি,যে যন্ত্রণায় আমি দগ্ধ হই, যে পরম পাওয়ায় আমি কানায় কানায় পূর্ণ হই, যে শব্দ আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে, যা আমার নিত্যদিনের সকল কাজে, সকল প্রেরণায় নিত্যসহচর, সেই শব্দ, সেই বাণী, সেই বহিঃপ্রকাশ একমাত্র আমার নিজস্ব ভাষাতেই সম্ভব। এবং অবধারিতভাবে তার পরিপূর্ণ প্রকাশ আমি আমার নিজস্ব শব্দমালাতেই করি। তার সবটুকু আমি নিজস্ব শব্দমালাতেই সাজাই। তাই বাংলা গান আমার নিজস্ব। আমার আবেগকে একবার আমার নিজের মত করে প্রকাশের মাধ্যম। অন্য কোন ভাষার গান আমার এই আবেগ, আমার মনের অবস্থাকে এতটা আপনভাবে, এতটা পরিপূর্ণ, এতটা আমার করে প্রকাশের ক্ষমতা রাখে না। অথচ আবেগ প্রকাশ, আবেগকে বোঝা, মনকে বোঝা, একটা বিশেষ সময়ে মনের পরিবর্তন, ক্ষণে ক্ষণে মনে জেগে উঠা ভাব, বিশ্বজগতের ভালোলাগা বোঝার জন্য, নিজেকে বোঝার জন্য, নিজেকে বোঝানোর জন্য আমাদের বর্তমান প্রজন্ম অন্য ভাষার গানের উপর নির্ভরশীল। অন্য ভাষার গান থেকে সে তার আবেগকে বোঝার চেষ্টা করছে, আবেগকে গঠন করছে, মনের চাহিদা মেটাচ্ছে, নির্যাস টেনে নিচ্ছে। যা কখনই তার নিজের মাটির, নিজের সংস্কৃতির এক কথায় নিজস্ব জগতের অথবা সে যেভাবে জগতকে চিনেছে সেভাবে হচ্ছে না। স্বভাবত:ই তাতে সংস্কৃতির, কৃষ্টির, ভাষার একটি ফাঁক থেকে যাচ্ছে। যা তাদের আবেগ এবং মনের বিকাশকে যেমন ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করছে, ভিন্নভাবে চিহ্নিত করছে এবং কখনও কখনও বাস্তব ও সমাজ ব্যবস্থার বৈপরীত্য তৈরি করছে। তেমনি আমাদের প্রজন্মকে সঠিকভাবে তাদের আনন্দ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি এবং আনন্দের উৎস চিনিয়ে দিতে না পারার ব্যর্থতায় একটি সুন্দর সম্ভাবনাময়, সঠিক বিচার-বুদ্ধি-বোধ নিয়ে বেড়ে উঠা প্রজন্ম থেকে দেশ ও জাতিও বঞ্চিত হচ্ছে। আর এভাবে ক্রমশ: বিকৃতির দিকে অগ্রসর হওয়া এই প্রজন্ম একদিন ভুলেই যাবে নিজস্ব আনন্দ কি? হৃদয়ের গভীরতা কি, জীবন কত দ্যোতনাময়। তারা শুধু জানবে খুব জোরে ড্রাম পিটিয়ে কিছুক্ষণ খুব নেচে আসলেই জীবন উপভোগ করা হয়। মাতাল হাওয়া মানে আনন্দ। গান মানে চিৎকার, আনন্দ মানেই ভিনজাতীয় কোন কিছু খোঁজা। জীবন উপভোগ মানেই পার্টি, ড্যান্স, চিৎকার, চেঁচামেচি, উম্মাতাল নৃত্য।

ভিন্ন ভাষার গান, ভিন্ন দেশের গান যেকেউ শুনতেই পারে। সেটিও মনে দোলা দিতেই পারে। কারণ সুর মাত্রই ভালো লাগার বিষয়। তাই অন্য গান সে শুনাবে না, এমনটি হয় না। কিন্তু তা বাংলা গানকে কবর দিয়ে নয়। ভিন্ন সংস্কৃতিকেও জানতে হবে। বিশ্বের অপরাপর অনেক কিছুই আমাদের প্রজন্ম জানবে, দেখবে, শুনবে, তার ভালোটা গ্রহণও করবে, তবে তা অবশ্যই তার সংস্কৃতি ও রুচিবোধের কষ্টি পাথরে যাচাই করে। এই রুচিবোধ, বিচার করার ক্ষমতা আমাদেরই তৈরি করে দিতে হবে। তাই তার বোধ-বুদ্ধিকে গড়ে দিতে হবে, পরিপক্ক করে দিতে হবে তার মেধা ও মননকে, যেখানে থেকে আলো ফেলে ফেলেই সে পথ চলবে। সে পথে অন্ধকার আসলে সে তা দূর করবে। সে পথে পরিবর্তন আসলে সে তা মানিয়ে নেবে। সে পথ আরো বেশি মসৃণ ও পোক্ত করতে হলে তাও সে-ই করবে। শুধু ভিত মজবুত থাকা দরকার, পথটা চিনিয়ে দেয়া দরকার। আর সেই ভিত গড়াবার, পথ চেনাবার দায়িত্ব আমাদের। সেখানটায় কোনভাবেই অবহেলা করলে চলবে না। পরে আফসোস করলেও হবে না। সবকিছুতেই যুগের দোহাই দিলেও চলবে না। সবটুকুর দায় সময় কখনোই নেবে না। মাটি আমার, আমাকেই চাষ দিতে হবে। অন্যথায় একদিন দেখা যাবে সব আগাছা, একটিও গাছ নেই।

[লেখক: কবি ও কথাশিল্পী]

[ad#co-1]