ডিজিটাল যুগে সংস্কৃতির চর্চা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ডিজিটাল যুগে আমাদের প্রবেশ অবধারিত। তার লক্ষণ ও প্রমাণ চতুর্দিকে যে কম দৃশ্যমান এমনও নয়। মানুষের হাতে ও কানে মোবাইল ফোন দেখা যাচ্ছে, ইন্টারনেটের বহুল প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, কম্পিউটার যত্রতত্র পাওয়া যাবে এ সমস্তই উন্নতির নিদর্শন বৈকি। তবে সংস্কৃতির খবর কী এই প্রশ্নটিও সঙ্গে সঙ্গে ওঠে, না উঠে পারে না, তাকে থামিয়ে রাখার উপায় নেই। মূল জিজ্ঞাসাটা হলো প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মধ্যে কি কোনো বিরোধ আছে, অর্থাৎ প্রযুক্তি কি সংস্কৃতিবিরোধী হবে?

তা কেন হবে? প্রযুক্তি তো সংস্কৃতিকে সকলের কাছে পৌঁছে দেয়; অবাধ তথ্যপ্রবাহের মতো সংস্কৃতিরও অবাধ বিচরণ ঘটছে। সারা বিশ্বের সংস্কৃতি আমার ঘরের ভেতর চলে আসছে, আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিও সবার কাছে সহজলভ্য হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা একটা আসবে। সেটা হলো প্রযুক্তির ওই ব্যবহারটা নিয়ে। প্রযুক্তি যখন পুঁজিবাদের অধীনে চলে যায়, এখন যেমন গেছে, তখন সে পুঁজিবাদের যে আদর্শ সেটাই প্রচার করে। পুঁজিবাদের যে নিজস্ব একটা সংস্কৃতি আছে তা তো আমরা জানি। সেটা হলো ব্যক্তিকে আত্মকেন্দ্রিক করা এবং পারলে সব কিছুকেই ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্যে রূপান্তরিত করে ফেলা। সেই সঙ্গে ভোগবাদিতাকে উৎসাহদান। পুঁজিবাদের অধীনে বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়াতে পারে ধ্বংসের অস্ত্র, যেমনটা এখনকার বিশ্বে বিলক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

আর সংস্কৃতি বলতে যা আমরা বুঝি সেটা হলো মানুষকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার একটি মানবিক অবলম্বন ও প্রচেষ্টা, সংস্কৃতি প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনে; তবে তাদের কাউকেই ধ্বংস করে ফেলতে চায় না। প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতার পরিবর্তে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে সংস্কৃতির লক্ষ্য, যাতে প্রকৃতি একদিকে তার নিষ্ঠুরতা প্রয়োগ না করে, অন্যদিকে মানুষ তার নিজের জীবনকে প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন যান্ত্রিক প্রাণীতে পরিণত করে না ফেলে। মানুষের ভেতর নানা ধরনের প্রবৃত্তি রয়েছে, সংস্কৃতির কাজ সেগুলোকে জীবন্ত অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। এই প্রবৃত্তিগুলোকে মানুষের ভেতরকার আদিম প্রাণিত্ব বলে চিহ্নিত করা সহজ, কিন্তু এদের সাহায্য ছাড়াতো মানুষের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না, পারেনি কখনো। হিংসারও ইতিবাচক ভূমিকা থাকে, যদি তা হিংস্রতায় পরিণত না হয়। লোভও মানুষকে কাজে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যদি তা অপরিমেয় না হয়ে পড়ে।

এককথায় সংস্কৃতির কাজটা হচ্ছে মানুষকে স্বাভাবিক রেখে সামাজিক করে তোলা। এই সামাজিকতাটা সংস্কৃতির একেবারেই অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওই যে প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ ওটি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিষয় হতে পারে। কিন্তু মূলত তা সামাজিক অনুশাসনের কাজ। সমাজ যখন মানুষের প্রবৃত্তিকে শাসন করে তখন মানুষ সামাজিক হয়ে ওঠে। মানুষের একটি গুণ হচ্ছে সামাজিকতা, অপরটি বুদ্ধিমানতা। এদের কোনোটিই কিন্তু তার প্রাণিত্বকে বাদ দিয়ে নয়। সংস্কৃতি মানুষকে প্রাণী হিসেবে মানে, কিন্তু কেবল প্রাণী হলে মানুষ তো আর মানুষ থাকে না, বন্যপ্রাণীর সমগোত্রীয় হয়ে যায়, সে জন্যই দরকার হয় সামাজিকতার এবং বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনের। ওই দুটি কাজ তাকে তার অগ্রগতিতে সাহায্য করেছে, সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত করেছে।

সভ্যতার অগ্রগমন ও সংস্কৃতির উন্নয়নের একটি প্রমাণ তো অবশ্যই প্রযুক্তির অসামান্য বিকাশ। কিন্তু ওই যে পুঁজিবাদের মালিকানা, সমস্যাটা সেখানেই। এই মালিকানা মানুষের সামাজিকতাকে পীড়িত করবে এবং বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনকে সামাজিক মুক্তির পক্ষে কাজে না লাগিয়ে ব্যক্তির উন্নয়নের জন্য নিয়োজিত রাখছে।

আমরা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি যে, চারপাশের মানুষ সমাজের ভেতরে থেকেও সামাজিক থাকছে না। বিচ্ছিন্ন, উৎপাটিত, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। নিজেরটা ছাড়া অপরেরটা বোঝে না। দীর্ঘকাল ধরে মুক্তির যে সমষ্টিগত স্বপ্ন আমরা দেখছিলাম সে স্বপ্নটা এখন আর আমাদের সামনে নেই, এখন প্রত্যেকে ব্যক্তিগত মুক্তির স্বপ্ন দেখছে, যার জন্য প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটছে। রাস্তায় যানজট, সড়কে দুর্ঘটনা, ছিনতাই, ছিনতাইয়ের কাজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশগ্রহণ, সিন্ডিকেটের তৎপরতায় দ্রব্যমূল্যের আকাশস্পর্শী ঊর্ধ্বগমন, দুর্নীতি, সংহিসতা, যত কিছু ব্যাধির দ্বারা আজ আমরা আক্রান্ত তাদের সকলের উৎস ওই একটিই, সেটা হলো পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্যে ব্যক্তির আত্মসর্বস্বতা।

শিক্ষা ও চিকিৎসা ভয়ঙ্করভাবে বাণিজ্যের অধীনে চলে গেছে, যেমটা আগে কখনো ছিল না। ডিজিটাল বাংলাদেশ মানুষকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসবে এটাই তো আশা করা গিয়েছিল। মানুষ একে অপরের অত্যন্ত কাছে চলে এসেছিল আমাদের মুক্তি আন্দোলনের সময়ে, বিশেষ করে একাত্তরে; কিন্তু এখন তো সেই সংলগ্নতা ও ঐক্যকে মনে হয় দূরের স্বপ্ন। ব্যক্তিগত উন্নতির স্বপ্ন এখন পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত, যে জন্য সড়ক দুর্ঘটনার মতো দৃশ্য-অদৃশ্য দুর্ঘটনা সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ঘটছে। রক্তপাত স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ব্যাপারটা দৃশ্যত যতটা না ঘটছে, অদৃশ্য পর্যায়ে ঘটছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশ এখন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের লালনভূমি ও লীলাভূমি।

যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বিশেষ করে রাজনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে, তারা নিজেদের স্বার্থ দেখছেন এটা বোঝা যায়। কিন্তু দেখতে গিয়ে যে সুবিধা করে দিচ্ছেন বিদেশিদের মস্তবড় বিপদ রয়েছে সেখানে, কেননা বিদেশিদের হাতে টাকা আছে, সেই টাকা ক্ষমতাবান দেশীয় ব্যক্তিদের অনুগত সেবকে পরিণত করছে। অথচ এই ক্ষমতাবানরাই তো দৃষ্টান্ত, এদের আদর্শেই দেশের মানুষ দীক্ষিত হচ্ছে, এদের অনুকরণে যে যা পারে হাতিয়ে নেয়ার আকাক্সক্ষাকে লালন করছে। দেশপ্রেম এখন মোটামুটি ভূলুণ্ঠিত। আমাদের বড় দুই দল উভয়েই জাতীয়তাবাদী, উভয়েই জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু কোনো দলই সেই স্বার্থের পাহারাদার নয়, কেননা তারা আত্মসমর্থন করেছে নিজেদের স্বার্থের কাছে। এটাই হচ্ছে নির্মম বাস্তবতা। এদের কাজ সংস্কৃতির পক্ষে নয়, সম্পূর্ণ বিপক্ষে। অবশ্য এদের কাজকেও একটা সংস্কৃতি বলা চলে, সেটি হচ্ছে দেশবিরোধী রাজনীতির সংস্কৃতি। সফল রাজনীতিকদের মুখের দিকে তাকাতে ভয় হয়, কেননা জানা আছে যে এঁরা আমাদেরকে নিয়ে রাজনীতি করেন বটে, কিন্তু কোনো মতেই আমাদের লোক নন।

২.
এই যে মানুষের হাতে ও কানে এত মোবাইল ফোন, এদের চলমানতা এটা প্রমাণ করে না যে এর মাধ্যমে সামাজিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বরঞ্চ যা ঘটছে তা উল্টো ঘটনা, বৃদ্ধি পাচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। যোগাযোগ ঘটছে নিজেদের মধ্যে, জনগণের সঙ্গে নয়। এখন মানুষের ঘরে ঘরে তো বটেই, কামরায় কামরায়ও বিচ্ছিন্নতা টের পাওয়া যায় যখন দেখা যায় যে একেক কামরায় একেক চ্যানেল চলছে। এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য সাংস্কৃতিক কাজ হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি।

সেই রকমের সাংস্কৃতিক কাজ যা মানুষ একত্র করবে। মঞ্চে ও খোলা মাঠে নাটক চাই। চাই গানের আসর। দরকার আবৃত্তির ও নৃত্যের। স্যাটেলাইটে যা চলবে তা অনেক ক্ষেত্রেই বিকৃতি বটে। তার উদ্দেশ্য মানুষকে সামাজিক করা নয়, বরঞ্চ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলা, যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তি হচ্ছে ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার। পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্যই টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলো হয়, তাদের কথিত সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো বিজ্ঞাপন প্রচারে সাহায্য করে মাত্র। আর বিজ্ঞাপনগুলো হচ্ছে বিকৃত রুচির, তারা যত বেশি স্থূল হয় তত তাদের আকর্ষণ বাড়ে এবং দর্শকের রুচি নিম্নগামী হতে থাকে। টেলিভিশনে নাটক হয়। সে-সব নাটকের সংলাপে বাংলাভাষার যেমন বিকৃতি ঘটছে তেমটা আগে কখনো দেখা যায়নি। আগে তথাকথিত গ্রাম্য উচ্চারণে সংলাপ ব্যবহার করা হতো, কিন্তু তার উদ্দেশ্য থাকতো কৌতুক সৃষ্টি করা। এখন যে ইংরেজিমিশ্রিত এবং বিকৃত উচ্চারণে বাংলা ব্যবহার করা হচ্ছে তার পেছনের ইচ্ছাটা কৌতুক সৃষ্টি নয়, এই ভাষাকেই মানভাষা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। নাটকের ‘হীরো’রা এ ভাষায় কথা বলে প্রমাণ করে যে, তারা এতটা উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত যে, তাদের ভাষা সাধারণ শিক্ষিত মানুষের ভাষার মতো নয়, অনেক উঁচু স্তরের। এ ক্ষেত্রে বিকৃতি ব্যর্থতার নয় গৌরবের কাজ। সাধারণ মানভাষা তো সাধারণ মানুষ ব্যবহার করবে, দামি দামি নায়ক-নায়িকারা ওপথে যাবেন কেন, গেলে তারা তো সাধারণ হয়ে যাবেন। ভাষার এই বিকৃত ব্যবহারই প্রমিত ভাষার রূপ নিচ্ছে বলে মনে হয়।

তবে শেষ পর্যন্ত যে হবে না সে ভরসা আমরা রাখি। রাখবার কারণটি সাংস্কৃতিক। বাংলাভাষার ওপর নানা প্রকারের হামলা হয়েছে। পাকিস্তান আমলে চেষ্টা হয়েছিল পাকিস্তানিকরণের, সেই অতি কিম্ভূত ও কদাকার প্রচেষ্টা এদেশের মানুষ কৌতুক ও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, নিজেদের অন্তর্গত সংস্কৃতি উত্তরাধিকার ও রুচির কারণে। এখনকার আধুনিকীকরণের চেষ্টাও অচিরেই কৌতুক ও ঘৃণার সৃষ্টি করবে।

তবে সেটা এমনি এমনি ঘটবে না। পাকিস্তানিকরণের চেষ্টা যে এমন সাফল্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল তার পেছনে সংস্কৃতি যেমন কাজ করেছে, তেমনি সক্রিয় ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। যে আন্দোলন ছিল একাধারে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। এমন আন্দোলনের প্রয়োজন হবে। কেবল যে ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে তা নয়, ভাষা বিকৃতি যে কারণেই সম্ভব হচ্ছে সেই পুঁজিবাদী/আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই। পুঁজিবাদীই ভাষাগত আধুনিকতার ওই ধারণাকে লালনপালন করছে।

৩.
সাংস্কৃতিক একটি বড় অবলম্বন হচ্ছে বই। বই এখন বেশ বিপন্ন। বই কি বাঁচবে, এই প্রশ্নও কারো কারো মনে দেখা দিয়েছে। কেননা বই মার খাচ্ছে, নানাভাবে জব্দ হচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিজ্ঞাপন বইকে বহুরকমের সাহায্য দিয়েছে। মুদ্রণের উদ্ভাবনা বইকে স্থানীয়ভাবে বহুপ্রচলিত করেছে, তার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তার প্রচার সম্ভব করেছে। কিন্তু বিজ্ঞানের দুটি উদ্ভাবনা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এরা দুটোই বিনোদনের বড় মাধ্যম। বই মানুষকে যে আনন্দ দেয় তা চলচ্চিত্র দেওয়া শুরু করলো, তারপরে টেলিভিশন এসে যুক্ত হলো। মনে হলো এরা বুঝি বইয়ের বিকল্প হবে। কিন্তু হয়নি। হওয়া সম্ভব নয়। কেননা বই বইই, তাতে ছবি থাকে, বই পড়ে ছবি পাওয়া যায়, কিন্তু বই পড়ার আনন্দ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন দিতে পারে না, পারবে না। এক কথায় বলতে গেলে প্রতিটি বইয়ের ভেতর একটা গান থাকে যে গান আওয়াজ দেয় না, কিন্তু যিনি পড়েন তিনি শুনতে পান। ওই বিশেষ গান কেবল পড়ার মধ্য দিয়েই লাভ করা যায়, অন্য কোনোভাবে পাওয়া সম্ভব নয়।

তবে বইয়ের এখন দাম বেড়েছে। কেনাটা অনেকের জন্য কষ্টকর। তাছাড়া প্রযুক্তি বইয়ের কপি তৈরি করা সহজ করে দিয়েছে। আস্ত বইটির দরকার পড়ে না। প্রয়োজনীয় পাতাগুলো কপি করে নিলেই চলে। যন্ত্রই দেয় কপি করে। কিন্তু এই যে বইকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা, এতে বই আর বই থাকে না। প্রতিটি বই হচ্ছে জীবন্ত একটি সভা, তাকে পরিপূর্ণভাবে পেতে ও পড়তে হয়। সব বই একভাবে পড়ার কথা নয়। দ্রুতপঠন, বাদ দিয়ে বাদ দিয়ে পড়া, এসব সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু গোটা বইটাকে হাতের কাছে না পেলে ওই বাছ-বিচারটা সম্ভব হয় না, প্রেক্ষিত বোঝা যায় না, খবর হয় তো পাওয়া যায়, কিন্তু বিষয়টা কি তা ধরা দেয় না।

ইন্টারনেটেও বইয়ের খবর, তার অংশবিশেষ, এমনকি পুরো বইও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেও যান্ত্রিক পাওয়া। পাঠক ও বইয়ের মধ্যে একটা দূরত্ব রয়ে যায়। বইকে আমরা চাইবো একবারের হাতের কাছে জীবন্ত রূপে, চাইবো থাকবে সঙ্গে, অথবা এমন জায়গায় যেখানে গেলেই তাকে পাওয়া যাবে। পুরো বইটিকে চাই, তার অংশবিশেষ নয়।

এটা তো জানাই আছে আমাদের যে বইয়ের চাইতে ভালো বন্ধু আর হয় না। সে আনন্দ দেয়, দেয় জ্ঞান, সর্বোপরি দেয় সঙ্গ। নির্জন দ্বীপে কেউ যদি নিক্ষিপ্ত হয় তবে সঙ্গে বই থাকলে নিঃসঙ্গতার হাত থেকে মানুষটি কিছুটা হলেও বেঁচে যায়। বইয়ের ভেতর থাকে শ্রেষ্ঠ মানুষদের জ্ঞান, তাদের কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা। স্বৈরাচারী শাসকেরা বইকে যত ভয় করে অস্ত্রশস্ত্রকেও ততটা ডরায় না। যে জন্য দেখা যায় তারা তাদের বিপক্ষে যাবে এমন বইকে নিষিদ্ধ করে দেয়, বই পুড়িয়ে ফেলে, গোটা গ্রন্থাগারকেও পুড়িয়ে দিয়েছে এমন দৃষ্টান্ত আছে। সূর্য স্থির, পৃথিবীই তার চারদিকে ঘুরছে এই মত প্রচার করে বই লেখার জন্য ষোড়শ শতাব্দীর দার্শনিক ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এর কিছুকাল পরে গ্যালিলওকেও হত্যা করা হতো, যদি সৌরজগৎ সম্পর্কে তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে না নিতেন। বাংলাদেশে যে জঙ্গিদের তৎপরতার খবর পাওয়া যায় তাদের আস্তানায় কেবল যে বোমা থাকে তা নয়, জেহাদি বইও নাকি স্তূপ করা থাকে। বোঝা যায় যে জঙ্গি হওয়ার অনুপ্রেরণা তৈরির জন্য বই ব্যবহার করা হয়েছে। জঙ্গিরা অন্য বই পড়ে বলে মনে হয় না, তবে জেহাদি বই যে পড়ে তা টের পাওয়া যাচ্ছে। বইয়ের শক্তি সম্বন্ধে তারাও ওয়াকিবহাল।

আমাদের কৈশোরে বই ছিল বিনোদনের প্রধান উৎস। কোথাও গেলে আমরা সেই বাড়িতে বই আছে কি না খুঁজতাম। এ বাড়ি ও বাড়িতে বইয়ের আদান-প্রদান চলতো। অভিভাবকরা বই কিনে দিতেন। পাড়ায়-মহল্লায় গ্রন্থাগার ছিল।

এখানকার দৃশ্যপট বদলে গেছে। আর সে জন্যই বইয়ের প্রয়োজন বেড়েছে। স্কুল-কলেজে গ্রন্থাগার থাকার কথা, কোথাও কোথাও তা নেই, যেখানে আছে সেখানেও ব্যবহারে ঘাটতি থাকে। সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই গ্রন্থাগারিকের পদ থাকার কথা, আছেও, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ নেই বলেই ধারণা। তাছাড়া সামাজিকভাবে গ্রন্থাগারিকরা কম মর্যাদাবান। শিক্ষকদের মর্যাদা যে খুব উঁচুতে তা নয়, গ্রন্থাগারিকদেরটা তার চেয়েও নিম্নে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো অবশ্যই, পাড়ায়-মহল্লাতেও গ্রন্থাগার দরকার। অনেক জায়গাতেই এখন কমিউনিটি সেন্টার দেখা যায়; কিন্তু সেখানে গ্রন্থাগার চোখে পড়ে না।

আসলে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনাকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। যেমন খেলার মাঠ চাই, তেমনি গ্রন্থাগার চাই। দুটোই দরকার। ডিজিটাল যুগের বিচ্ছিন্নতা দূর করার প্রয়োজনে এবং মানুষকে সুস্থ রাখার অত্যাবশ্যকতায়। গ্রন্থাগার হতে পারে সামাজিক মিলনের একটি কেন্দ্র, খেলার মাঠও ওই ভূমিকা পালন করতে পারে যদিও সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।

৪.
কিন্তু বই তো কেবল পড়বার বিষয় নয়, বুঝবার বিষয়ও বটে। বই যদিও বা পড়া হয় কিন্তু তাকে বুঝবার জন্য চেষ্টাটা হয় যৎসামান্য। অনেক সময়ে একা বোঝা সম্ভব হয় না, অন্যের সাহায্য দরকার পড়ে। সে জন্য চাই পাঠচক্র। সেখানে সব বয়সের মানুষেরা আসবেন। বই নিয়ে কথা বলবেন পরস্পরকে সাহায্য করবেন বুঝতে।
এই কাজটা করা হয় না। অতীতেও আমরা বই পড়েছি বটে; কিন্তু বই কী বলতে চায় সেটা যে বুঝতে চেষ্টা করেছি তা নয়। ফলে বোঝার ব্যাপারটা পরিপূর্ণ হয়নি, এবং একজনে যা বুঝলাম তা অপরাপরের ভেতর সংক্রমিত সম্ভব হয়নি। না বুঝে পড়াতেও আনন্দ থাকতে পারে, থাকেও কিন্তু বুঝে পড়ার আনন্দের সঙ্গে তার তুলনা চলে না। ওই যে না-বুঝে পড়া সেটা একটা বড় কারণ যে জন্য দার্শনিকভাবে আমরা এগুতে পারিনি। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির সামাজিক অনুশীলন আশাপ্রদ মাত্রায় ঘটেনি। আমরা পিছিয়ে গেছি। আমাদের হৃদয় যতটা এবং যত সহজে উদ্বেলিত হয়েছে, দার্শনিক চিন্তাশক্তি সেভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে হৃদয় অনিয়ন্ত্রিত এবং বুদ্ধি দুর্বল রয়ে গেছে।

সাংস্কৃতিকভাবে না এগুলে আমাদের অগ্রগতির বয়ানগুলো ব্যর্থ পরিহাসে পরিণত হবে। রাজনৈতিকভাবে আমরা এগিয়েছি। দুই দুইবার স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু সেই অগ্রগতি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়নি। এর কারণ রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিটা সবল ছিল না, ছিল বেশ দুর্বল। সেই দুর্বলতার দরুন জাতীয়তাবাদী বিজয়কে গণতান্ত্রিক সমাজ-রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি।

বলাবাহুল্য এর জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এবং সে আন্দোলন মোটেই আদর্শনিরপেক্ষ হবে না। তাকে হতে হবে পুঁজিবাদবিরোধী, যার দৌরাত্ম্য বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি উন্নতি মানুষকে সামাজিক না করে উৎপাটিত ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।

আর এ ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের মাতৃভাষার চর্চা হবে একটি প্রধান বিষয়। বইয়ের কথা বলছিলাম, বইয়ের পঠনপাঠন মাতৃভাষার মাধ্যমেই হবে। অন্য ভাষায় লিখিত বই আমরা অবশ্যই পড়বো, কিন্তু মূল কাজটা চলবে বাংলাভাষার মাধ্যমেই এবং সেই সঙ্গে অন্য ভাষায় লিখিত জরুরি বইগুলো আমরা অনুবাদ করে নেবো, যাবে সকল শিক্ষিত বাঙালিই তা পড়তে ও বুঝতে পারেন।

আমরা সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছি, সেটা ছিল অতীতের বাংলা। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা শুনছি, সেটা হচ্ছে ভবিষ্যতের বাংলা; ভবিষ্যতের এই বাংলাকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক হতে হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশেরই অংশ। উল্টোটা করতে চাইলে মস্তবড় ভুল করা হবে।

[ad#co-1]