জনগণের জন্য পরিচ্ছন্ন কাগজ দরকার

ফয়েজ আহমদ
দেশের জনগণ সর্বদাই তার জন্য একটি কাগজ চায় এবং তারা চায় একটি পরিচ্ছন্ন পত্রিকা এখানে রাষ্ট্র, জনগণের অধিকার ও কল্যাণ প্রধান। এখন দেখা যায়, এমন ধরনের পত্রিকা শুধু আমাদের স্বপ্নে বিধৃত। এর কোনো বাস্তব রূপ যারা দেয়ার চেষ্টা করবেন তারা হয় পরাজিত হয়েছেন অথবা তাদের জীবনের সংগ্রাম জনগণকে যথেষ্ট উদ্দীপিত করতে পারেনি। এখানে তাদের ব্যর্থতার ঔজ্জ্বল্য।

পাকিস্তান হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল ও নতুন চিন্তার জনগণের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার পত্রিকা প্রকাশের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ডামাডোলে সেভাবে জনমত গঠনের জন্য পত্রিকা প্রকাশের দিকটা কার্যকর হয়নি। এখানে একটি ভয়ানক ব্যর্থতা কাজ করেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাক্সক্ষাই সম্ভবত সব উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে কালিমাযুক্ত করে। তখন যদি কোনো সাহসী পুরুষ, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল জনকণ্ঠ হওয়ার বাসনা পোষণ করতেন, তবে হয়তো পরবর্তীকালে কোনো দিগন্তের সন্ধান আমরা পেতাম।

দুটো দ্বিমুখী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের অতীত, তাদের সভ্যতা ও ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষা ছিল ভিন্নতর দুই বিপরীত ধারায় প্রবাহিত ছিল দুই জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা। ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ লড়াই ছিল গোড়া থেকেই, পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বাস্তু নেতৃবর্গের চাতুর্য আমাদের সার্বিক রাজনীতিকে কলঙ্কিত করেছে। তার ফলে স্বাভাবিক ধারাতেই অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে। শোষণের তীব্র আকাক্সক্ষায় উত্থিত ধনীগোষ্ঠী সমগ্র পাকিস্তানকেই গ্রাস করার চেষ্টা করেছে। সেখানে বাঙালির পৃথক সত্তা, অস্তিত্ব অর্থনীতিকে স্বীকার করা হয়নি। শাসক ও শোষিতের দুই পৃথক সত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মৃত্যুঞ্জয়ী বাঙালি আবার নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

এই সময় দেখা গেল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশে প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার উন্মেষ ঘটলেও তারা নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য, সংস্কৃতি ও সমাজ-ব্যবস্থার বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি নয়।

অন্যভাবে বাঙালির খাদ্য, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি কোনো দিক তারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করতে বা আস্থায় নিতে রাজি নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা পশতু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি ও বেলুচিস্তানি হলেও এমনকি তাদের মধ্যেও কঠিন কোনো বন্ধন ছিল না। দেশ বিভাগের পর কতিপয় মুসলিম লীগের বড় নেতা এবং জমিদার, ভূমিপ্রভু এমনকি নবাবও ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে তাদের স্বাভাবিক মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করে বাংলাদেশকে নয়। এই সমস্ত ধনী ভূ-স্বামী, ব্যবসায়ী, উদ্বাস্তু বাংলাদেশে আসেনি বরং পশ্চিম পাকিস্তানকে তাদের দ্বিতীয় মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করে। ভারতীয় আমলের স্উুচ্চ পর্যায়ের অনেক অফিসার ছিল পশ্চিম পকিস্তানিপ্রেমী, তারা ‘অফট’ করে পশ্চিম পাকিস্তানের চাকরিতে, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মচারী, প্রাক্তন নবাব-জমিদার যারা এককালে ভারতে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার করতো, তারা সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেয় এবং তাদের সঙ্গে অর্থ স্থানান্তরিত হয়। এর প্রধান কারণ লক্ষ করা গেছে ভাষা ও সংস্কৃতিতে। বাংলা ভাষাকে তারা তাদের ভারতীয় ভাষার কাছাকাছি মনে করতো না। তারা হিন্দিকে অনেক নিকটতর মনে করতো। তাছাড়া উত্তর প্রদেশসহ কয়েকটি প্রদেশে মুসলমানদের মধ্যে উর্দুভাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৯০ ভাগ। ফলে বাংলাদেশে শুধু অস্থায়ী ব্যবসায়ী, গ্রুপ ছাড়া কোনো ধনী, কালচারাল সম্প্রদায় আসেনি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে এক একক ভাষাভিত্তিক প্রদেশে পরিণত হয়। যে সমস্ত মুসলমান ব্যবসা করার জন্য বাংলাদেশে আসে তাদের আধিপত্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে সঙ্গে তাদের আঞ্চলিক উর্দুও প্রসারিত হয়। এমন পরিস্থিতি একটি রাজ্যের পক্ষে এবং সে-দেশ শাসনের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে ভাষার দিক দিয়ে বাংলাদেশ ছিল ভিন্ন দেশ, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শোষণের ক্ষেত্র। পূর্ব পাকিস্তানের কোনো লোক কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো কথা বলতে গেলে উর্দু ছাড়া বলতে পারতেন না। এই পরিস্থিতিতে আমরা গোড়া থেকে দুটি অস্তিত্বে বিদ্যমান ছিলাম। পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি ভাষা শাসকদের আধিপত্যে অনেকাংশে ম্রিয়মাণ হয়ে আসে এবং অচিরেই উর্দু পাকিস্তানের প্রধান ভাষা হয়ে দাঁড়ায়, যা পাকিস্তানের ভাষা মোটেই নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ লোকও উর্দুতে কথা বলে না। এমন পরিস্থিতিতে ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। এই আধিপত্যকে শেষ পর্যন্ত আমরা মেনে নিয়েছিলাম, যা ছিল রাজনৈতিকভাবে আমাদের জন্য একান্তই ভ্রান্ত রাষ্ট্রসম্বন্ধীয় ধারণা।

এই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ভাষাগত পার্থক্য সীমার মধ্যে পৃথক সত্তার দুটি, পৃথক দুটি ভূখ-এক পাকিস্তানের মধ্যে বর্ধিত হতে থাকে। এটা আমাদের জন্য কোনোভাবেই কল্যাণকর ছিল না, এমনকি এই ভাষাগত ব্যবস্থার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছেও যে এই ব্যবস্থা শুভ নয়, তা পরবর্তীকালে বোঝা গেল।

পরবর্তী বছর ও মাসে রাজনৈতিক চিন্তার ব্যবধান আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং ২৪ বছর পর একটা পর্যায়ে একই দেশের দুই অংশের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক, ভাষা ও অর্থনীতিক দিকে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে দেশ শাসনের ক্ষেত্রে দ্বিমত হয় প্রকট এবং অস্ত্রের মুখোমুখি। সে-অবস্থাতেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের বিভক্তির পর্যায় নিয়ে দাঁড় করায়, এমনকি, আমরা তাদের কাছে ভারতীয়দের চেয়েও বিপরীতমুখী বলে গণ্য হই।

এই অবস্থায় আড়াই দশকের মধ্যেও একটি বাংলা সাপ্তাহিক পশ্চিম পাকিস্তানে দাঁড়াল না। অপরদিকে পাকিস্তানিদের একটি উর্দু বৈকালিক পত্রিকা সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সংখ্যক বেরোলেও, তার অস্তিত্ব কোনো বাঙালির ঘরে পাওয়া যেত না। ‘পাজমান’ বা এ জাতীয় বৈকালিক পত্রিকা উর্দুভাষীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্তেজিত করতে পারলেও, প্রভাবিত করতে পারেনি। সেখানে বাংলা ছিল বাঙালিদের একমাত্র অবলম্বন। যেই বাংলা পত্রিকা বহুতর সাপ্তাহিকরূপে প্রকাশিত হয় সেগুলোও ছিল রাজনৈতিক। পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো ধনী আমাদের বাংলা পত্রিকা বের করার ব্যাপারে সহায়তা করেনি, বরং তারা স্থানীয় ইংরেজি পত্রিকা ‘মর্নিং সান’, করাচির ‘ডন’, লাহোরের ‘পাকিস্তান টাইমস’ ও বহুল প্রচারিত ‘জং’ পত্রিকা প্রতিদিন পাঠ করত। সে-স্থানে বাঙালিদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য চিন্তা ও চেতনার দিক থেকে ব্যাপকভাবে ফারাক হয়ে দেখা দেয়। পত্রিকার প্রভাব সব মানুষের ওপরই ব্যাপক বা সামান্য হলেও প্রসারিত হয়। বাংলায় যে কাগজগুলো বের হয় সে-সমস্ত কাগজের পশ্চাতে সুবৃহৎ জমিদার, নবাব বা ব্যবসায়ী ছিল না বললেই চলে। কিছু সংখ্যক নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিক ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করত। পশ্চিম পাকিস্তানি ধনপতিদের কাছে মাওলানা আকরম খাঁ বা হামিদুল্লাহ খান মোটেই ধনী নয়। ফলে কোনো কোনো অতিউৎসাহী রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এবং উৎসাহী অর্থ সংগ্রহকারীদের চেষ্টায় ঢাকা থেকে দৈনিক বের করার প্রচেষ্টা হতো যা অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়নি।

কেন্দ্রীয় সরকার এ অবস্থার সুযোগ নিয়েছিল। কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ ও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী জনগণকে তাদের পেক্ষ রাখার জন্য পাকিস্তান শাসন আমলে দুই দশকে দুইবার দুইটি বৃহৎ দৈনিক পত্রিকা বের করে। কিন্তু প্রতিবারই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই পত্রিকাগুলোর মৃত্যু ঘটে।

সমগ্র পাকিস্তানের পরিস্থিতি যখন গণআন্দোলনে উত্তাল হয়, তখনই এই সমস্ত সরকারি কাগজের মৃত্যুর ডাক আসে। এই পরিস্থিতিতে কিছুসংখ্যক উৎসাহী রাজনৈতিক ব্যক্তি, বাংলাদেশে দৈনিক বের করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্যে কোনো পত্রিকা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে দাঁড়ায় না। আমাদের কাগজের উত্থান-পতনেরও খুব সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এখানেই।

কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি সংকটের এই যুগে আমাদের দেশের কোটিপতিদের নতুন জাগরণ হয়েছে। যারা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেই আজকের কোটিপতি, তাদেরই কারণে বাংলাদেশে একদিকে কোটি কোটি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়; অপরদিকে প্রত্যহ বাজারে চাল বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ৩৬ টাকা কেজি। এক বছর আগেও এই চাল ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে। সাধারণ মানুষের খাদ্য সয়াবিন তেল এক সময় ছিল আমাদের দেশে ৩০-৩৫ টাকা, একই ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে আমরা এখন সেই সয়াবিন তেল খাই ৮০-৮৫ টাকায়। যেই ইলিশ মাছ দুই বছর আগেও ছিল ৩৫ টাকা, তার দাম এখন সাড়ে তিনশ টাকা। এভাবে প্রতিটি কনজুমার গুডসের দাম বৃদ্ধি করেছে কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের এখন অর্থ রাখার জায়গা নেই। তারাই সমগ্র বাজারের দর নিয়ন্ত্রণ করছে, হাতের মুঠোয় নিয়েছে এবং একটার পর একটা নতুন বড় পত্রিকা প্রতিযোগিতা করে বের করছে। এই প্রতিযোগিতার ফলে যে টাকাটা নর্দমা দিয়ে যায় তাকেই তারা রক্ষা করার জন্য কেউ কেউ বৃহৎ আকৃতির দৈনিক কাগজ বের করছে। একটি পত্রিকা বের করতে খরচ পড়ে ৩০-৩৫ টাকা, সে-পত্রিকা তারা বিক্রি করে ৭-৯ টাকায়। এই চরম ঘাতটি চলছে কালো টাকায়। কালো টাকা সাদা করার প্রধান উপায় হচ্ছে এখন পত্রিকা বের করা। তাদেরই একটি বড় অংশ রাতারাতি ল্যান্ড ডেভেলপার হয়ে যাচ্ছে এবং সমাজের ঘুষখোর ও লুটেরাদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করছে। এভাবে কালো টাকাকে সাদাকরণের পর্যায় আমাদের অর্থনীতিতে বিরাজমান।

কাগজ এখন আমাদের কালোবাজারের হাতিয়ার এবং টাকাকে সাদা করার শ্রেষ্ঠ উপায়। সেই উপায়ের মধ্যে প্রত্যেকটি ধনকুবের পা বাড়িয়েছে।

[ad#co-1]