পরম করুণাময়, এই শোক সামলাবার শক্তি দাও

আমরা কেমন আছি
ইমদাদুল হক মিলন
ছোঁয়া মামণি, সেই বিভীষিকাময় রাতের পর থেকে তোমার কান্না আর থামছে না। তুমি কাঁদছ সুমাইয়ার জন্য। ১০ বছরের সুমাইয়া। তোমার প্রাইভেট টিউটর, শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজের ইংরেজির শিক্ষক জনাব দেলোয়ার হোসেনের ছোট মেয়ে। দুই মেয়ে আর স্ত্রী, তিনজন ভালোবাসার মানুষ নিয়ে তোমার টিচারের সুখী জীবন। তোমার মা, ডলি আরেফিন অনেক খুঁজে খুঁজে বের করেছিলেন এই শিক্ষককে। কথায় কথায় জেনেছিলেন শিক্ষকের স্ত্রী বরিশালের। ডলিও বরিশালের। দেখা হওয়ার পর জানা গেল, ডলির দূর-সম্পর্কের মামাতো বোন তোমার টিচারের স্ত্রী। তাঁর নাম নাসরিন আকতার। ডাক নাম রুনু। বড় মেয়েটির নাম ইবজা। বয়স ১৪ বছর।

৩ জুন বৃহস্পতিবার। রাত ৯টা। দেলোয়ার সাহেব গেছেন এশার নামাজ পড়তে। তখনই ঘটেছে ঘটনা। যে বাড়ি থেকে আগুনের সূত্রপাত সেই বাড়ির পেছন দিককার বাড়িটিতেই থাকেন তিনি। মসজিদ থেকে বেরিয়ে দেখেন কেমিক্যাল গোডাউনের দিক থেকে ছুটে বেরোচ্ছে আগুনের গোলা। কামানের গোলার মতো ছুটে গিয়ে ঢুকছে একেকটা ফ্ল্যাটে। সঙ্গে সঙ্গে ছাই হয়ে যাচ্ছে সেই ফ্ল্যাটের মানুষজন, আসবাব।

দেলোয়ার সাহেব পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে ঢুকেছেন নিজের ফ্ল্যাটে। স্ত্রী আর বড় মেয়েটিকে কোনো রকমে টেনে বের করে এনেছেন। ছোট মেয়েটি, সুমাইয়া, ছোঁয়া মামণি, তুমি পড়তে গেলেই ফুলের মতো যে মিষ্টি মেয়েটি ছুটে এসে তোমার হাত ধরত, সেই সুমাইয়াকেও বের করা হলো, কিন্তু আগুন, নিষ্ঠুর আগুন তাকে ছিনিয়ে নিল মায়ের বুক থেকে, বাবার কোল থেকে। গলাগলি করে বড় হয়ে ওঠা ইবজার দুই হাতের বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে। পড়তে গেলেই যে মেয়েটি ছুটে এসে তোমার হাত ধরত, সেই মেয়ে এ জীবনে আর কখনো তোমার হাত ধরবে না।

দেলোয়ার সাহেবের স্ত্রী রুনু আর বড় মেয়ে ইবজা এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে সিএমএইচ হাসপাতালে। আগুন তাদের শরীর ঝলসে দিয়েছে অনেকখানি। মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এলেও শরীরে যে ক্ষত থাকবে আজীবন, মনের ক্ষত থাকবে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। সমগ্র জীবন তাড়া করবে আগুনের বিভীষিকা। সমগ্র জীবন তারা চোখের জলে ভাসবে সুমাইয়ার জন্য।

সুমাইয়া ছিল বাড়ি মাতিয়ে রাখা মেয়ে। ডলি, ছোঁয়া ওরা যখন যেত কী যে আনন্দে ফেটে পড়ত মেয়েটি! ডলিকে আন্টি আন্টি করছে, ছোঁয়াকে আপু আপু করছে। জলতরঙ্গের মতো মিষ্টি খিলখিল শব্দে হাসছে। এই এদিকে ছুটছে, এই ওদিকে ছুটছে। ডলি প্রায়ই তার জন্য টুকটাক গিফট নিয়ে যেত। সে সব হাতে পেয়ে নিজের উচ্ছ্বাস যে কত রকমভাবে প্রকাশ করত! দেলোয়ার সাহেব সুমাইয়াকেও বের করে নিয়ে এসেছিলেন। আতঙ্কের ঘোরে দু-একটি কথাও সে বলছিল। ওদিক আগুনের লেলিহান শিখায় তার ছোট কোমল শরীর থেকে খসে পড়ছিল…। না, তারপর আর কলম চলে না। তার পর স্তব্ধ হয়ে আসে লেখার হাত।

ছোঁয়ার বাবা সানাউল আরেফিন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। হাতের কাছে সকালবেলার কাগজ। কাগজের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেন না। প্রতিটি কাগজ ভরে আছে নিমতলী ট্র্যাজেডির ছবিতে। হাজার হাজার মানুষের মাঝখান দিয়ে চলেছে কফিনের মিছিল। কনে সাজার জন্য পার্লারে গিয়েছিল রুনা, শুধু সে বেঁচে আছে। পরিবারের আর কেউ নেই। এনগেজম্যান্টের অনুষ্ঠানে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরাও অনেকেই চলে গেছেন, অনেকে দহনযন্ত্রণায় হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। কারো কারো শিয়রে এসে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। স্বজন হারানোর ব্যথায় কাঁদছে মানুষ। মা-বাবা, ভাইবোন হারানো দুঃখী মানুষ, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান হারানো অসহায় মানুষ, প্রিয়তম বন্ধু-স্বজন হারানো মানুষ শোক প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কফিনে জড়ানো সন্তানের লাশ একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। আকাশের দিকে হাত তুলে আহাজারি করছেন মা-বোনরা, স্বামী-সন্তানহারা স্ত্রী। নারী-পুরুষের কান্নায় ভারি হয়ে গেছে বাতাস। ছোট্ট এক শিশুর লাশ শোয়ানো টেবিলে। তার ন্যাড়া মাথাটি আর গালের একপাশ পুড়ে খাক হয়ে গেছে।

এই ছবির দিকে তাকানো যায় না। আরেফিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। চোখের জল মুছতে মুছতে ছোঁয়া এল তাঁর কাছে। কান্নাকাতর গলায় বলল, বাবা, সুমাইয়ার অনেক পাখি ছিল। সে পাখি পালত। বড় একটা খাঁচায় অবিরাম কিচিরমিচির করত পাখিগুলো। সেই পাখিগুলোর কী হয়েছে, বাবা?

আরেফিনের বড় ভাগি্ন কাঁকন। নিমতলীতে ঢোকার মুখে কাঁকনের শ্বশুরবাড়ি। ১৫ বছরের মেয়ে তাতাকে নিয়ে টিভি দেখছিল। কাজের মেয়েটি বসে আছে দরজার সামনে। কাঁকনের বর খালেদ বাইরে গেছে। এ সময় কাঁকনের মনে হলো তার দোতলা বাড়ির ছাদে যেন একটি নভোযান এসে নেমেছে, এমন হঠাৎ আলোর ঝলকানি। তাতার হাত ধরে ছুটে বেরিয়েছে সে। পাগলের মতো নিচের উঠোনে এসেছে। এসে দেখে নিজের অজান্তে কাজের মেয়েটির হাতও সে ধরে রেখেছে।

বাড়ির পেছন দিকে তখন শুধু আগুন আর আগুন।

খালেদ ততক্ষণে এসে পড়েছে। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। দিগ্বিদিক ছুটছে। কে কেমন করে কাকে বাঁচাবে সেই চেষ্টা। দমকল বাহিনী এসেছে, এসেছে পুলিশ-র‌্যাব। নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে মানুষ ছুটছে প্রিয়জনকে বাঁচাতে। কাঁকন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির উঠোনে।

তারপর শুধু শিশুদের লাশ। তারপর শুধু দগ্ধ মানুষ, আর্তনাদ, লাশ। এক মা তাঁর দগ্ধ শিশুটিকে বুকে নিয়ে দিশেহারা ভঙ্গিতে ছুটছেন। হঠাৎ পায়ে পা বেধে পড়ে গেলেন। তবুও বুকের মানিককে পড়তে দিলেন না। হায় অভাগিনী মা, তোমার সেই সন্তান আর তোমার কোলে ফেরেনি।

আমার শিশুকালের কিছুদিন কেটেছিল পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার থার্ড লেনে। ১৯৬০-৬১ সালের কথা। গলির একটা লেপতোশকের দোকানে আগুন লাগল। মা আমাকে সওদা কিনতে পাঠিয়েছেন মুদি দোকানে। মুহূর্তে চোখের সামনে জ্বলে উঠতে দেখলাম লেপতোশকের দোকান। কোনো এক পথচারী থাবা দিয়ে আমাকে কোলে নিয়ে একটা দৌড় দিল।

ঠিক আমার সেই বয়সের মতো করে মুদি দোকানে সওদা কিনতে গিয়েছিল এক শিশু। নিমতলীর ৪৩/৩ নম্বর বাড়ির নিচতলায় মুদি দোকান। দোকানের মালিক রহিম মিয়া। তখন দোকানে রহিম মিয়ার এক কর্মচারীও ছিল। শিশুটি এসে দোকানের সামনে মাত্র দাঁড়িয়েছে, তখনই বিস্ফোরণ। রহিম মিয়া দিকপাশ না ভেবে শিশুটিকে জাপটে বুকে তুলে নেন। বুঝতে পারছিলেন না কী হয়েছে! শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরেই দোকানের শাটার বন্ধ করে দেন। ৫৭ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা ইকবাল হোসেন। তিনি এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। বললেন, রহিম মিয়া, তাঁর কর্মচারী আর ওই শিশুটি, তিনজনকেই শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। তখন দেহে প্রাণ নেই একজনেরও। রহিম মিয়া তখনো দুই হাতে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন সেই শিশুটিকে।

এ রকম আর কত বর্ণনা দেব, আর কত বলব মৃত্যুকথা!

কয়েক দিন আগে আলেয়া নামের এক তরুণীকে মিরপুরের রাস্তায় গায়ে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিল তিন বদমাশ। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে আলেয়াকে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। দোতলার আইসিইউতে ছিল সে। ওঠার সময় দেখি দগ্ধ হওয়া একটি শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডাক্তার। সেই শিশুর চিৎকার আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আলেয়া মারা গেছে। তার পুরো শরীর ঝলসে গিয়েছিল, রক্ষা পেয়েছিল শুধু মুখখানি। সেই মুখ এখনো আমার চোখজুড়ে। আলেয়া টুকটাক কথাও বলেছিল আমার সঙ্গে। তার সেই সব কথা ছাপিয়ে আমার কানে লেগে আছে শিশুটির দহনযন্ত্রণা। নিমতলী ট্র্যাজেডির শিকার যারা এই মুহূর্তে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, আমি তাদের শরীরের কষ্ট নিজের শরীরে উপলব্ধি করছি। যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের কাউকে আমরা আর ফিরে পাব না। যাঁরা বেঁচে আছেন, যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে তাদের, দেশের প্রতিটি মানুষকে দাঁড়াতে হবে তাঁদের পাশে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, রাষ্ট্র বহন করবে তাঁদের চিকিৎসার ব্যয়ভার। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লি. ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে দেবে এক লাখ করে টাকা। নিশ্চয় আরো বহু সংস্থা এগিয়ে আসবে এসব মানুষকে সাহায্য করতে। আমরা বাঙালি জাতি দেশ এবং মানুষের যেকোনো ক্রান্তিকালে পরস্পরের হাত ধরে দাঁড়াই। এই বিপদেও দাঁড়াব, বাঁচিয়ে তুলব আমাদের বিপন্ন মানুষগুলোকে। আর পরম করুণাময়কে বলব, শোক সামলাবার শক্তি আমাদের দাও। তোমার করুণাধারায় আমাদের জীবন শান্তিময় করো।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]