দার্শনিক দারিদ্র্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জনজীবনের মধ্যে যে শক্তি ঘুমিয়ে আছে, তাকে মুক্ত করতে হবে অতি অবশ্যই; এবং সেই অত্যাবশ্যক কাজে সহায়তা পাওয়া যাবে সঠিক দর্শনের কাছ থেকে। দার্শনিক দারিদ্র্য না ঘুচলে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ঘুচবার নয়।

আমার এমন ইচ্ছা ছিল যে, ছাত্র হবো দর্শনের। শৌখিন নয়, পেশাদার ছাত্র। পড়ব আঁটঘাট বেঁধে, পরীক্ষা পাসের জন্য। বাধা দিয়েছিলেন তিনিই, যাঁর দেয়ার কথা আমার পিতা। তিনি স্পষ্ট করে না বলুন, তাঁর আপত্তির প্রবল ভঙ্গির মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই পরিচিত অভিযোগটি, যা সবাই করতেন আমাদের আশপাশে, প্রায়ই করতেন, সব সময়ই বলতে গেলে, দর্শনের কথা উঠলেই। অভিযোগ যে, দর্শন হচ্ছে মেয়েদের বিষয়। অর্থাৎ কিনা মেয়েলি বিষয়। দুই ভিন্ন অর্থে, অথবা বলা যায়, দুই সংলগ্ন অর্থে। এক. মেয়েরাই পড়ে দর্শন সাধারণত, বেশিরভাগ পড়ুয়াই মহিলা, তারাই ভিড় করেন দর্শন বিভাগে। দুই. তারা পড়তে পারেন। কেননা, দর্শন বিষয়টা অত্যন্ত কোমল, নিতান্তই নরম, অতিশয় কল্পনাবিলাসী। সেজন্য কাজে লাগে না, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব রাখতে পারে না এই গভীর অর্থে নয়; দর্শন পড়লে চাকরি পেতে সুবিধা হয় না, অসুবিধাই হয়, বরং এই সরল ও সংকীর্ণ অর্থেই। আমার পিতা অর্থনীতিতেই পাঠাতে চেয়েছিলেন আমাকে, দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান সংযুক্ত করতে সক্ষম হবো এ রকম উচ্চচিন্তায় উদ্বেলিত হয়ে নয়, পারিবারিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারব ভালো চাকরির সাহায্যে এ রকম আশা নিয়ে।

দর্শন পড়া হয়নি আমার, কিন্তু দর্শন বিষয়ে মেয়েলিপনার ওই অভিযোগটি মনের মধ্যে গেঁথে আছে। কারা পড়েন দর্শন, কাদের ভিড় ওই বিভাগে, পুরুষরা কত সংখ্যায়, কী সংখ্যা মেয়েদের, মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে নাকি কমছে বছর বছর এ ধরনের পরিসংখ্যান দিয়ে এই অভিযোগ খ-ানো যাবে না। এমনকি সিলেবাসে কী কী গ্রন্থ আছে তালিকাভুক্ত, তা জানিয়েও নয়। তবু অভিমান করে, মূর্খরা বোঝে না কিছুই বলেও উড়িয়ে দেয়া যাবে না কথাটা। কেননা অভিযোগটা আছে, থাকছেই, যাচ্ছে না চলে। দর্শন চর্চায় মেয়েলিপনা আছে এই সন্দেহটাকে সামনাসামনি, মুখোমুখি, সরাসরি আক্রমণ করতে হবে। প্রমাণ করা আবশ্যক হবে যে, এ নিতান্তই গুজব। এবং সেই দায়িত্ব দর্শন চর্চায় নিয়োজিত যারা, তাদেরই। এ এক বিশেষ ধরনের দায়িত্ব বলা যায়, বিশেষভাবে বঙ্গদেশীয়।

এই যে মনে করা হয় দর্শন চর্চা কোমল ও কল্পনাবিলাসী, এর মধ্যে যে একটা অনুকম্পা থাকে, তাও স্বীকার্য। মনে করা হয়, দার্শনিকতা কাব্যিকতারই নামান্তর, দার্শনিকরাও কবিই, তেমনি উদাসীন, অন্য মনস্ক, বাস্তবের সঙ্গে সত্যের পার্থক্য নিরূপণে অক্ষম, তাঁরাও কবি সাহেবই একেকজন। কবি সাহেবরা সাহেব নন কিছুতেই। সাহেবরা কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারেন, আবৃত্তিও করতে পারেন সুযোগ পেলে, কেনেনও হয়তো কবিতার বই মাঝেমধ্যে, বিশেষ করে বই যদি হয় দেখতে সুশ্রী। কিন্তু ওই পর্যন্তই। নিজের ছেলে কবি হোক অথবা নিজের জামাতা এটা কেউ চান না কখনো। দার্শনিকদেরও চান না সাহেবরা কিছুতেই নিজেদের ঘরের মধ্যে। অনুরূপভাবে কিন্তু দাম যে দেন না দর্শনকে, তাও নয়। অর্থাৎ তফাৎ করেন কবি ও কবিতায়, দর্শন ও দার্শনিকে। কবিতা ও দর্শন উপভোগ্য, তবে কবি ও দার্শনিক অনুকম্পাযোগ্য।

কিন্তু কোমল হওয়ার কথা তো নয় দর্শনের। দার্শনিকের হওয়ার কথা নয় অবজ্ঞা বা অনুকম্পার পাত্র। দর্শনের হওয়ার কথা জীবনের মতোই কঠিন। কেননা, জীবনের বাইরে নয় দর্শন, জীবনেরই ব্যাখ্যাতা সে। যেকালে বিজ্ঞান ছিল না, সেকালে দর্শন ছিল। দর্শনকেই বিজ্ঞানের কাজ করতে হতো সেই সময়। এই যে সামর্থ্য ছিল দর্শনের বিকল্প হওয়ার বিজ্ঞানের, তাতে প্রমাণ হয়, দর্শনের প্রধান ভিত্তি দুটি একটি বৈজ্ঞানিকতা, অপরটি বাস্তবতা। যুক্তিকে বাদ দিয়ে চলে না দর্শন, বরং যুক্তির ওপরই তার অন্যতম প্রধান নির্ভরশীলতা। বিজ্ঞান যেখানেই প্রযুক্তিবিদ্যায় পর্যবসিত, সেখানে দর্শনের সঙ্গে তার বিরোধ ঘটা অনিবার্য। কিন্তু বৈজ্ঞানিকতা যাকে বলি, সেখানে দৃঢ় মৈত্রী বিদ্যমান দর্শন ও বিজ্ঞানে। দ্বিতীয় কথা, দর্শনের বাস্তবিকতা। দর্শনে কল্পনা অস্পৃশ্য নয়, বিশেষ করে দর্শনের বক্তব্যের যে উপস্থাপনা, তাতে কল্পনা থাকেই। থাকে বলেই সে বিজ্ঞান নয় যথার্থ। তথাপি বাস্তবকে অস্বীকার করে তো নয়ই, বাস্তবের ওপর ভিত্তি করেই অবস্থান দর্শনের।

তা-ই যদি হবে, বাস্তবিকতা ও বৈজ্ঞানিকতাই যদি হবে তার নির্ভর, তবে কেন এসেছে এই কোমলতা বাংলাদেশের দর্শন চর্চায়, যে কোমলতা দর্শনবিরোধী-চরিত্রের দিক থেকে? এসেছে, কেননা, জীবন কোমল এই দেশে। জীবন মাত্রই কোমল নয়। সেই শ্রেণীর জীবন কোমল, দর্শনে যাদের একক আধিপত্য। এই শ্রেণী উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কহীন, বিলাসী, অবকাশভোগী ও পরিশ্রমবিমুখ। তাদের আলস্য ও কল্পনাবিলাসই প্রতিফলিত হয়েছে দর্শনে, প্রতিফলিত হয়ে দর্শন চর্চাকে মেয়েলিপনায় পর্যবসিত করেছে। এক অর্থে তাই জীবনের বাস্তবতা অস্বীকৃত হয়নি দার্শনিক অভ্যাসে। খ-িত জীবনের খ-িত বাস্তবতা।

আমাদের দর্শন চর্চার একটা বিশেষ প্রবণতা জবধংড়হ-এর পরিবর্তে জবাবষধঃরড়হ-এর প্রতি পক্ষপাত। জীবনের কোথাও বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি কিছু এসেছে বটে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি আসেনি ব্যাপকভাবে। তেমনি আসেনি দর্শনেও। সেখানে কবিতার রাজত্ব। কবিতা সুন্দরের সন্ধান করে। কিন্তু জীবনে যে অসুন্দর আছে, সে যাবে কোথায়, কোন দেশে? অশুভ নেই, এমন ভান করলেই অশুভ অসত্য হয়ে যাবে, অন্তর্হিত হবে সমূলে অথবা চোখ ফিরিয়ে নিলে তার কাছ থেকে? অশুভকে দর্শন দেখে না, চোখ পড়লেও ফিরিয়ে নেয় দ্রুত, ভান করে অশুভ অসত্য। কিন্তু অশুভ তো আছে, ভীষণভাবে আছে সমাজে। এবং সমাজে আছে যেমন, মনের মধ্যেও আছে তেমনি মানুষের। তাকে অস্বীকার করে দর্শনের সৌন্দর্য চর্চাই বরং দুর্বল হয়ে পড়ছে। একদিকে আসছে অবাস্তবতা, অন্যদিকে আত্মসচেতনতা। অশুভ যে আছে, দর্শন তা জানে, কিন্তু মানে না। তাই আত্মসচেতন থাকতে হয়, সন্দিগ্ধচিত্ত না হয়ে তার উপায় থাকে না। ভয় থাকে ভেতরে ভেতরে, কখন কোন বাঁকে মুখোমুখি হতে হয় অশুভের। অশুভের সঙ্গে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হওয়া, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করা দর্শনের পক্ষে এ কাজ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অসুন্দরের মধ্যে বাস করে সৌন্দর্যের দার্শনিক বিলাস যে বিকৃত হতে বাধ্য, তাতে সন্দেহ নেই।

দ্বন্দ্বকে ভয় করাটা একটা সামাজিক সত্য। কাব্য হচ্ছে সমন্বয়, যার অপর নাম আত্মসমর্পণ। দ্বন্দ্ব ভিন্ন দর্শন টেকে কী করে, কী করেই বা গড়ে ওঠে?

কবিতার জগৎটা সময়হীন, বিজ্ঞানের জগৎ আপেক্ষিক। দর্শন যখন কবিতা হতে চায়, তখন সময়হীন, চিরকালীন হওয়ার অভিপ্রায় রাখে ভেতরে ভেতরে। আপেক্ষিকতাকে, যার আরেক নাম বাস্তবতা, তাকে উপেক্ষা করে। কাব্যময় দর্শন আপেক্ষিকতাকে মনে করে সম্মানের পক্ষে হানিকর। কেননা, আপেক্ষিক হলে সীমাবদ্ধ হতে হয়, অসীম না হয়ে। কিন্তু সেই সঙ্গে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ওই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দর্শনকে যে বায়বীয় ও অবাস্তব হয়ে যেতে হয়, সেটা খেয়াল থাকে না তার। মনে করা হয়, অনুভূতি থেকেই সবকিছুর জন্ম, এমনকি চিন্তারও। অত্যন্ত খ্যাতিমান শিক্ষাবিদের লেখায় পড়েছি, ‘আমাদের বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি আছে, যে অনুভূতিগুলো একত্র হলে আমরা কবি হই, সাহিত্যিক হই, চিন্তাবিদ হই।’ অনুভূতি থেকে দুশ্চিন্তা আসতে পারে, আসেও। কিন্তু যাকে বলি যুক্তিবাদী চিন্তা, তা আসবে কী করে? অনুভূতিকে প্রধান করার প্রবণতা ব্যতিক্রম নয়, নিয়মই বটে।

জবধংড়হ-এর পথটা শক্ত। সেই পথে রয়েছে শ্রমের আবশ্যকতা। তদুপরি আছে অনিশ্চয়তা। জবাবষধঃরড়হ-এর পথে অনুপ্রেরণা ও কল্পনাই বড়। কঠিন পরিশ্রম সেখানে অনাবশ্যক। সেই পথে অনিশ্চয়তাও নেই। পাওয়া যাবেই ফল। এবং যে ফল পাওয়া যাবে, তার ভেতর থাকবে অলৌকিকতার, আধিদৈবিকতার স্বাদ, সেটা খেতে ভালো, মানুষকে দিতেও ভালো। স্বপ্নপ্রাপ্ত ওষুধের মস্ত সুবিধা এই যে, পেতেও কষ্ট নেই এবং লোকে যদি দৈবে বিশ্বাসী হয়, তাহলে বেচতেও সুবিধা। কিন্তু তাতে রোগ নিরাময় হয় কিনা, সেটা অন্য একটা প্রশ্ন। রোগ সারে না সত্যি সত্যি। সমস্যাগুলো থেকেই যায়, দর্শন সমাধান করে না তাদের, সমাধান করতে চায়ও না। কেননা, আমাদের দেশের মূল সমস্যাগুলো অবশ্যই অর্থনৈতিক, সামাজিক; এবং তাদের সমাধান আদৌ সম্ভবপর নয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন না আনলে। এবং মুশকিল সেখানেই। একদিক দিয়ে কাজটা কঠিন, অন্যদিক দিয়ে আবার বিপজ্জনক, যদিও উভয় দিক দিয়েই অভিপ্রেত। বিপজ্জনক এজন্য যে, পরিবর্তন আনলে স্বার্থহানি ঘটবে সেই বিশেষ শ্রেণীর, যারা সুবিধাভোগী, যাদের অনেক সুযোগ-সুবিধার একটি হচ্ছে কাব্যময় দর্শন চর্চার। তখন দর্শনও যাবে, অন্যান্য সুবিধাও যাবে। তাই পরিবর্তন তারা চান না, দর্শনের নামে কবিতা চান।

যারা দর্শন চর্চা করেন, তাদের শ্রেণী-চরিত্রই দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই শ্রেণীর আলস্য ও পরিবর্তনভীরুতাই বড় হয়ে ফুটে আছে দর্শনে। আরোহণের বন্ধুর পথে না গিয়ে দর্শন যে চলেছে অবরোহণের মসৃণ পথ ধরে, তার প্রধান কারণ বোধ করি শ্রমবিমুখতা। দ্বিতীয় কারণ, সব সময় উপরমুখো তাকানোর অতি পুরাতন সমাজ সমর্থিত অভ্যাস। যুক্তির দারিদ্র্য ঢাকার চেষ্টা হয় কাব্যের পোশাক গায়ে চড়িয়ে।

আর পরাধীনতার দীর্ঘ ঐতিহ্য। ওপরওয়ালাই সব করেন এবং করবেন, মারবেন কিংবা রাখবেন। ওপরে আছেন কর্তা, তারও ওপরে আরো বড় কর্তা। তারা যা বলবেন, তা-ই গ্রাহ্য। এই পরনির্ভরশীলতা মানুষকে দার্শনিক করে না, কর্তাভজা করে।


জীবনদর্শন কথাটা খুব চালু দেশে। কিন্তু আমাদের দার্শনিক চিন্তাগুলো মূলত জীবনবিমুখ। ‘মরলে বাঁচি’ এ কথাটা সাধারণ, নিরন্ন মানুষ অহরহ বলে। বলে যে তার কারণ, জীবন তার কাছে দুঃসহ। সে ভাবে, মৃত্যুতে মিলবে মোক্ষ। বাঁচতে চায় বলেই সে মরতে চায়। এই যে বাঁচা অর্থাৎ মরা, এবং মরা অর্থ বাঁচা এই জীবনবিরোধী তত্ত্ব দর্শনও প্রচার করছে। মৃত্যুকেই আকর্ষণীয় করে তুলছে নানাভাবে। সাধারণ মানুষের খেদোক্তি অসাধারণ মানুষের তত্ত্বকথায় সমর্থিত হচ্ছে বার বার। আর এই জীবনবিমুখ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই উৎসারিত হচ্ছে অন্যান্য অনুষঙ্গীয় ধারণা। যেমন, আত্মাই অধিক মূল্যবান, অন্য সবকিছুর চেয়ে। যেমন, ত্যাগেই মুক্তি, ভোগে নয়। অর্থাৎ আত্মার কল্যাণ কর, ত্যাগ কর। তোমরা কর ত্যাগ, আমরা ভোগ করি। তোমরা সাধনা কর আত্মিক বিকাশের, ইতিমধ্যে বস্তুকে দখল করে রাখি আমরা, যারা দর্শন চর্চা করি অবকাশের বিলাস ও বিনোদন হিসেবে। এর মধ্যে যে প্রতারণা আছে মস্ত বড়, তাকে অস্পষ্ট করে রাখা হয় ভাববাদের রাসায়নিক সংমিশ্রণের সাহায্যে।

বলা হয়, চর্চা কর সত্যের, শিবের, সুন্দরের। ধরে নেয়া হয়, সত্য শিব ও সুন্দর; সময় ও কালনিরপেক্ষ। বলা হয়, আপনি ভালো তো জগৎ ভালো। অথচ উল্টোটাই সত্য। জগৎ ভালো না হলে আপনার ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নিতান্তই অল্প। ভালো হলেও সেই ভালোত্ব বিপজ্জনক, তা বোকামিরই ভিন্ন নাম হিসেবে বিবেচ্য।
এসব তত্ত্বের মূল কথাটা হচ্ছে, আবার বলতে হয়, দর্শনে বিশেষ শ্রেণীর আধিপত্য। এই শ্রেণীর সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় লিপ্ত আছেন নানাবিধ; এবং সেই বহু প্রতারণারই একটি হচ্ছে তাদের দর্শন প্রচার। দর্শনকে অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তবিক করে রাখা, তাকে মেয়েলিপনায় পর্যবসিত করা এই যে কাজ, এর মধ্যে শ্রেণীস্বার্থ সংরক্ষণের অভিলাষ আছে প্রচ্ছন্ন। দর্শন যদি যুক্তিনির্ভর হতে চায়, তাহলে তার কাব্যময়তা যাবে ঘুচে, তাকে নেমে আসতে হবে বাস্তবে; এবং তখন সামাজিক অন্যায়গুলোকে অবজ্ঞা করা চলবে না তার পক্ষে কিছুতেই। অবজ্ঞা করা সম্ভব না হলে দায়িত্ব নিতে হবে সমাজ পরিবর্তনের। সেই দায়িত্বকে ভয় করে দর্শন তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায় সর্বক্ষণ।

এই দর্শন যে শুধু অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কবিচ্যুত তা-ই নয়, এই দর্শন অর্থনৈতিক প্রশ্নটিকে নিতান্তই গৌণ মনে করে। অথচ দর্শন চর্চার সুযোগ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরুনই এসেছে; অন্য কারণের তুলনায় এই কারণই প্রধান। সমাজে যে দারিদ্র্য আছে, তার প্রতি প্রচলিত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও এই শ্রেণীচরিত্র প্রতিফলিত। বলা হয়েছে, উচ্চ চিন্তাই বড় কথা, জীবনযাত্রা বরং সেই তুলনায় সামান্য হলেই ভালো। সেই প্রচারণাও ষড়যন্ত্রমূলক। সামান্যতাকে বড় করে তোলার অর্থ সামান্যতার বিরুদ্ধে অসন্তোষ তথা বিদ্রোহকে প্রদমিত করা। দারিদ্র্যকে অভিযুক্ত করা হয় আমাদের সব দুর্গতির কারণ হিসেবে। কিন্তু দারিদ্র্য দুর্গতির কারণ যতটা নয়, দুর্গতির লক্ষণ তার চেয়ে বেশি। সমাজে অন্যায় আছে, অবিচার আছে, আছে দুর্ভোগ ও দুর্গতি। এবং আছে বলেই দারিদ্র্য এমন বিপুল ও ব্যাপক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে আমাদের এই হতভাগ্য দেশে। ওই কারণ না গেলে দারিদ্র্য যাবে না কিছুতেই না। এই সত্যটা দর্শন পারে উন্মোচিত করে দিতে। আর দারিদ্র্যের মধ্যে যে শুধু দুর্নীতির সম্ভাবনাই নেই, প্রতিশ্রুতি যে আছে বিপ্লবেরও, সেই সত্যেরও স্বীকৃতি আবশ্যক দার্শনিক স্বীকৃতি।


দর্শন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, দর্শন সমাধান দেবে সমস্যার। দর্শন যেখানে নেই, সেখানে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখাও নেই। কিন্তু যে দর্শন অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব, সে শুধু অস্বচ্ছ করে দৃষ্টিকে, ঢেকে রাখে সত্যকে। এবং অন্যদিকে অবজ্ঞা জন্মায় দর্শনের প্রতি। তত্ত্বে তখন অশ্রদ্ধা জাগে লোকের, পরিসংখ্যান তখন তত্ত্বের স্থান দখল করে নেয়। ফলে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে না, প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রশ্রয় পায় ভীষণভাবে।
তাই দর্শনের দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। দর্শনের গুরুত্ব এত অধিক যে, তাকে কিছুতেই ছেড়ে দেয়া যায় না পেশাদার দার্শনিকের হাতে। সবারই উৎসাহ নেয়া আবশ্যক দর্শনে। এবং ঘুচানো দরকার তার মেয়েলিপনা। অর্থাৎ তার অলস ও অনর্থক কল্পনাবিলাস এবং অর্থনৈতিক জীবন থেকে তার দূরবর্তিতা। জনজীবনের মধ্যে যে শক্তি ঘুমিয়ে আছে, তাকে মুক্ত করতে হবে অতি অবশ্যই; এবং সেই অত্যাবশ্যক কাজে সহায়তা পাওয়া যাবে সঠিক দর্শনের কাছ থেকে।

দার্শনিক দারিদ্র্য না ঘুচলে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ঘুচবার নয়।

[ad#co-1]