সাগর পাড়ে আরও এক ভয়াল হানা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
যে কোনো দেশের জন্যই সমুদ্র একাধারে সম্পদ ও সুযোগ বটে, আমাদের জন্যও সে রকমই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এমনই কপাল আমাদের যে তা তো হয়ইনি; উপরন্তু সমুদ্র আমাদের জন্য নানাবিধ বিড়ম্বনা, এমনকি বিপদেরও কারণ হয়েছে। আমাদের জলসীমায় বিদেশিরা এসে নির্বিঘ্নে মাছ ধরে নিয়ে চলে যায়। তবে সেটা তো সামান্য ব্যাপারই বলতে হবে। কেননা আমাদের সমুদ্রসীমা নিজেই বেহাত হয়ে যাবে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র দুটি সমুদ্রসীমানার ব্যাপারে আমাদের ন্যায্য দাবি মানতে চাইছে না। ওদিকে দেশের ভেতরকার ব্যবসায়ীরা আরেক বিপদ ঘটিয়ে বসে আছে। তাদের সাহায্যে চোরাচালানের ব্যাপারটা তো রয়েছেই, ব্যবসায়ীদের তৈরি নতুন এক উৎপাত তা আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মস্ত এক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর নাম জাহাজভাঙা শিল্প।

আমাদের সমুদ্রসৈকতে, বিশেষ করে সীতাকুণ্ড এলাকায় শত শত অব্যবহারযোগ্য জাহাজ আমদানি করে এনে দিনের পর দিন ভাঙা হচ্ছে। দেশে সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি হচ্ছে সেটা একটি চমৎকার খবর, সেগুলো বিদেশে রফতানি হচ্ছে দেখে আমরা খুশি; কিন্তু সে তুলনায় পরিত্যক্ত জাহাজ, যেগুলো আসলে বর্জ্য হিসেবে গণ্য, তাদেরকে আমাদের দেশে নিয়ে এসে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত করব। এ কেমন কথা! অথচ সেই অবৈধ ও অন্যায় কাজটিই কিছু ব্যবসায়ী মহোৎসাহে করে চলেছে। তাতে দেশের যে কী ক্ষতি হচ্ছে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করছে না। এসব জাহাজ নিয়ে কী করা যাবে তা নিয়ে এদের ব্যবহারকারী ধনী দেশগুলো বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল। কেননা তারা জানে যে এগুলো ২৫-৩০ বছরের পুরনো, সে জন্য ব্যবহারের অযোগ্য বর্জ্যে পরিণত হয়েছে, এগুলোকে ফেলে দেওয়া দরকার, কিন্তু ফেলবে কোথায়, কে নেবে? কেউ নিতে চায় না, কেননা জানে যে যেখানে এদের নিয়ে ভাঙা হবে সেখানে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মস্ত হুমকির সৃষ্টি হবে। ১৯৮৯ সালের বাসেল কনভেনশনে তারাই ঠিক করেছে, কেননা ঠিক না করে পারেনি যে এসব জাহাজ অন্য দেশে রফতানি করার আগে রফতানিকারক রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে বর্জ্য পরিষ্কার করে এদের বিষমুক্ত করা। কিন্তু কাজটা ব্যয়বহুল। তাই জাহাজের মালিক রাষ্ট্রগুলো, যারা মূলত ইউরোপীয়, অতসব ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে এদের এমন কয়েকটি দেশের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে যারা ওই কনভেনশনের আওতার মধ্যে পড়ে না। জাহাজের নাম, দেশের পতাকা সবই বদলে ফেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ওইসব দেশ থেকে মহোৎসাহে জাহাজ কিনে নিয়ে এসে আমাদের সমুদ্রসৈকতে তুলছে এবং অবিরাম ভাঙার কাজ চালাচ্ছে। জাহাজ নিয়ে আসার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা নেই। সমুদ্রসৈকত উন্মুক্ত, বেআইনি তৎপরতা বাধা দেওয়ার কেউ নেই এবং জোয়ারের সময় বড় বড় জাহাজ সৈকতে এনে তোলা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। রাতের অন্ধকারে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকেই ঘটছে এ কাজ। কোনো গোপনীয়তার আবশ্যকতা নেই।

জাহাজ ভাঙার এই শিল্প যে মারাত্মক রকমের ঝুঁকিপূর্ণ তা সারাবিশ্ব জানে। যে জন্য বাংলাদেশের বাইরে আর মাত্র চারটি দেশে এ কাজ এখন চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের গুজরাট। যেটি রাষ্ট্র নয়, প্রদেশ বটে এবং সেরকমের একটি প্রদেশ যেখানে অরাজকতার নানা ঘটনা অহরহ ঘটছে, এমনকি মানুষকেও পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। জাহাজ ভাঙার কাজে রয়েছে চীনও। চীন এখন পুঁজিবাদী উন্মাদনায় পড়ে উন্নতির তৎপরতায় ভীষণভাবে ব্যস্ত, তাই তারা অনেক কিছুই করছে, আগে যা করত না; নদীর পানিকে দূষিত করছে এবং বিদেশি জাহাজও দেশে এনে ভাঙছে। তবে ভুললে ভুল করা হবে যে চীনের অতিশয় উন্নত প্রযুক্তিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা রয়েছে; তাই তারা জাহাজ ভাঙলেও নিশ্চয়ই এমন ব্যবস্থা নিতে সমর্থ যাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিপদটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, এমনও হতে পারে যে তারা নিজেদের জলসীমায় প্রবেশের আগেই জাহাজকে বিষাক্ত বর্জ্য থেকে মুক্ত করে নেয়। জাহাজ ভাঙার ব্যাপারে একসময় শীর্ষে ছিল তুরস্ক, এখন তারা ঘটনার বিপদ বুঝেছে এবং ভাঙাভাঙিকে কমিয়ে ফেলেছে। পাকিস্তান অবশ্য এখনও জাহাজ ভাঙছে, তবে পাকিস্তান নিশ্চয়ই কোনো অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, জাহাজ ভাঙার ব্যাপারে বাংলাদেশ এখন শীর্ষস্থানে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের যে সম্মান এনে দিয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তাকে ভূলুণ্ঠিত করে ফেলেছি; বেশকিছু বাজে কাজে আমরা শীর্ষে উঠে এসেছি, জাহাজ ভাঙা তাদের একটি।

বর্জ্য জাহাজ ভাঙার ব্যাপারটা যে বিপজ্জনক সারাবিশ্ব তা জানে। সবচেয়ে বেশি বোঝে যারা জাহাজগুলোকে বিষমুক্ত করে তবেই রফতানির কথা বলেছে; অথচ এমনই তাদের দুষ্ট বুদ্ধি যে, বিষমুক্ত না করেই জাহাজগুলোকে অখ্যাত কিছু দেশের কাছে সজ্ঞানে বিক্রি করে দিচ্ছে। ভাগ্যিস বাংলাদেশ ছিল, তা না হলে ওইসব জাহাজের জন্য উপযুক্ত আঁস্তাকুড় খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হতো।

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা সহজ হওয়ার একটি বড় কারণ সস্তা শ্রম। বিশেষ করে মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য যে কোনো কাজ করতে প্রস্তুত থাকে। তারা জাহাজ ভাঙার কাজ নেয়। এ এমন কাজ যেখানে কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে মাথা ঘামানো হয় না, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারে স্বীকৃতির প্রশ্নই ওঠে না। শ্রমিকরা কাজ করে প্রাগৈতিহাসিক পরিবেশে। ভারতীয় হাইকোর্টে প্রদত্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজরাটের জাহাজ ভাঙার শ্রমিকদের ভেতর শতকরা ১৬ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত। বাংলাদেশে এর পরিমাণ বেশি ছাড়া কম হবে না। এখানে ইয়ার্ডের সবগুলোই উন্মুক্ত, খোলা আকাশের নিচেই কাজ চলছে, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের নূ্যনতম ব্যবস্থা নেই। বর্জ্য কেবল স্থলে নয়, জলেও দূষণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তেলসহ নানা রাসায়নিক বস্তু সমুদ্রের পানিতে গিয়ে মিশছে, মৎস্য ও মৎস্যজীবীদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। ওদিকে ইয়ার্ড তৈরির জন্য বন কেটে উজাড় করা হচ্ছে। ভাঙার কাজের সময় উৎপাদিত ও জাহাজ থেকে অবমুক্ত নানা প্রকারের দূষিত পদার্থ অবাধে পরিবেশের দূষণ ঘটাচ্ছে। আর সবকিছুই ঘটছে সরকারের চোখের সামনে।

যারা জাহাজ ভেঙে নানা রকমের বিপদ ঘটাচ্ছে তাদের একমাত্র বিবেচনা হচ্ছে মুনাফা। তারা অবশ্য দুটি ক্ষেত্রে দেশের মহাউপকার করছে বলে দাবি করে। একটি হচ্ছে কর্মসংস্থান, অপরটি সস্তায় লোহা সরবরাহ। কর্মসংস্থানের যুক্তিটি একেবারেই খোঁড়া ও অন্তঃসারশূন্য। তাদের পক্ষ হয়ে কেউ কেউ অতিরঞ্জনও করছেন। যেমন_ গত ৮ মার্চ, ২০১০-এ নৌপরিবহনমন্ত্রী সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই ‘উপকারী’ শিল্পে দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করে। দু’সপ্তাহ যেতে না যেতেই গত ২১ মার্চ তারিখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় প্রদত্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, এ শিল্পে কাজ করছে মাত্র ১৮ হাজার ৮৮৮ জন, যাদের মধ্যে স্থায়ী হচ্ছে ৩ হাজার ৫৪৩ জন, বাকি সবাই অস্থায়ী। এদের মধ্যে আবার শিশু শ্রমিকও রয়েছে। কোথায় দেড় লাখ আর কোথায় ১৮ হাজার ৮৮৮! কাকে বিশ্বাস করবেন? সংসদীয় কমিটিতে প্রদত্ত তথ্য সংগৃহীত হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে; ধরে নিতে হবে যে তাদের দেওয়া তথ্যই গ্রহণযোগ্য। তাহলে? এই হচ্ছে কর্মসংস্থানের চিত্র আর যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এই শ্রমজীবীরা কাজ করছে তারা কিছুতেই এখানে আসত না, যদি না-আসার বিকল্পটা নিজের ও পরিবারের সদস্যরা অনাহারে না থাকত। তাছাড়া এদের তো জানারও সময় নেই যে, বিষ খাওয়ানো হচ্ছে।

লোহা সরবরাহের দাবিটাতেও অতিশয়োক্তি আছে। কেননা রডের দাম অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন নিজেরাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছে, প্রকৃত তথ্য হচ্ছে যে, তারা মাত্র ২৫-৩০ ভাগ কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে, বাকি ৭৫ ভাগ আসে বিলেট আমদানি থেকে। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৪টি দেশে লোহার বড় ধরনের মজুদ রয়েছে, বাদবাকি সবাই লোহা আমদানি করে। প্রয়োজনে আমরাও তাই করব, তাই বলে দেশের মানুষের ক্ষতি করে কম দামে লোহা আনতে হবে_ এটা তো কোনো মানবিক যুক্তি হতে পারে না। শিপব্রেকার্সরা অবশ্য বসে নেই, তারা ইতিমধ্যে একদফা ধর্মঘটও করেছে। পরে সরকারের ‘আশ্বাসের’ প্রেক্ষিতে তা প্রত্যাহার করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময় রডের দাম আকাশচুম্বী হয়। অভিজ্ঞ মহল বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই ব্রেকার্স ও রি-রোলিং মিলের মালিকরা অভিন্ন ব্যক্তি। চট্টগ্রামে আমাদের একটি আধুনিক স্টিল মিল ছিল। সেটাকে আমরা বন্ধ হতে দিয়েছি, এখন রি-রোলিং মিল মালিকরা রডের দাম নিয়ে যা ইচ্ছা তা কারবার করছে। বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইন রয়েছে এবং লোহা ও স্টিল যেহেতু অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় পড়ে, তাই রডের দাম নিয়ন্ত্রণে আইনের বিধি প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) যে পরামর্শ দিয়েছে সেটি গ্রহণযোগ্য বৈকি।

বিষাক্ত বর্জ্য বহনকারী বলে চিহ্নিত একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি গত বছর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করলে জাহাজ ভাঙার পুরো ব্যাপারটি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট এ মর্মে রায় দেন যে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, বাসেল কনভেনশন ১৯৮৯, ফ্যাক্টরি আইন ১৯৬৫ এবং শ্রম আইন ২০০৬কে বিবেচনায় রেখে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। অপরিশোধিত বর্জ্য জাহাজ যাতে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের সুযোগ না পায়। সেই সঙ্গে পরিবেশ অধিফতরের অনুমতি না নিয়ে স্থাপিত জাহাজ ভাঙার সব ইয়ার্ড ভেঙে ফেলতেও বলেন। জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৪টি ইয়ার্ড রয়েছে, যার কোনোটিই পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রের তোয়াক্কা না করেই স্থাপিত হয়েছে। শিপব্রেকার্সরা নিজেদের শিল্প মালিক না বলে জাহাজ ভাঙার মালিক বলেই যে সন্তুষ্ট রয়েছে তার একটি রহস্য হয়তো এখানেই নিহিত যে, শিল্প-কারখানার মালিক হিসেবে হাজির হলে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেওয়াটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, যা তারা নেয়নি এবং নেবেও না বলে স্থির করেছে। কারণ নিতে গেলেই তো কারখানা খোলাটা যে অবৈধ হয়েছে এবং তা ভেঙে ফেলতে হবে_ এ সত্যটা অবমুক্ত হয়ে যাবে।
হাইকোর্ট যে নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন তাতে কিছুটা কাজ হয়েছিল বৈকি। ২৬ জানুয়ারি, ২০১০ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের আমদানি নীতির অধীনে আদেশ জারি করেছিল যে, ‘স্ক্র্যাপ ভ্যাসেল আমদানির ক্ষেত্রে উহা বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত এই মর্মে রফতানিকারক দেশের সরকার বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পত্র শিপিং ডকুমেন্টসের সহিত অবশ্যই দাখিল করিতে হইবে।’

ব্যস আর যায় কোথায়, সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ভাঙার ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠেছেন। ৪ এপ্রিল, ২০১০-এ সংবাদপত্রে খবর বের হয়, ওই আমদানি আদেশ শিথিল করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তারপর অতি দ্রুতগতিতে ১১ এপ্রিল, ২০১০-এ গেজেটের একটি অতিরিক্ত সংখ্যায় জানানো হয়, ‘স্ক্র্যাপ ভ্যাসেল আমদানির ক্ষেত্রে শিপিং ডকুমেন্টের সহিত, জাহাজে ইনবিল্ট দ্রব্যাদি ব্যতীত অন্য কোনো বিষাক্ত বা বিপজ্জনক বর্জ্য পরিবহন করা হইতেছে না মর্মে সর্বশেষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বা মালিকের প্রত্যয়নপত্র এবং আমদানিকারকের ঘোষণাপত্র দাখিল করিতে হইবে।’ অর্থাৎ রফতানিকারক দেশের সরকার বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র লাগবে না, রফতানিকারক ব্যবসায়ীদের প্রত্যয়নপত্র পাওয়া গেলেই চলবে। সেটা যে পাওয়া যাবে তা তো স্বতঃসিদ্ধই, রফতানিকারকরা কি বিষ রফতানি করতে পারে, তারা তো মধু পাঠাচ্ছে! আর আমদানিকারকদের ঘোষণাপত্র? সেটা তো দেওয়াই আছে, পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই যে তারা কারখানা খুলে বসেছে তাতেই তো বোঝা যায়, তাদের আমদানি করা জাহাজগুলোতে কোনো প্রকার ক্ষতিকর দ্রব্য নেই, থাকলে তাদের মতো দেশপ্রেমিকরা কি দেশের জন্য অমন ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিত?

রফতানিকারক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রত্যয়ন ও ঘোষণা চাওয়া প্রবাদপ্রতিম শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা রাখা ভিন্ন অন্যকিছু নয়! নয় যে তার প্রমাণও আছে। যে রিট আবেদনের কথা উল্লেখ করলাম ওই মামলাতেও দেখা যাচ্ছে যে, চিহ্নিত ট্যাঙ্কারটি বিষাক্ত দ্রব্যাদি বহন করে কি-না_ এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দ্বারা গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি তদন্ত করেছিল এবং ওই ধরনের একটি ট্যাঙ্কারে যে পরিমাণ বিপজ্জনক বর্জ্য থাকাটা স্বাভাবিক, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ নেই বলে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিল। ওই ধরনের মানে কোন ধরনের? ট্যাঙ্কারটি তো ছিল পরিত্যক্ত, অর্থাৎ নিজেই একটি বর্জ্য। বলা বাহুল্য, আদালত ওই প্রত্যয়নপত্রকে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? বিষাক্ত জাহাজ ভাঙা কি চলতেই থাকবে? হাইকোর্টের নির্দেশে আইন তৈরি হবে, আবার ত্বরিতগতিতে তা পাল্টানো হবে? ইউরোপ তাদের অনেক বর্জ্যই আমাদের দেশে ফেলে রেখে গেছে, সেগুলোর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বর্জ্যও রয়েছে, এখন ফেলবে বর্জ্য পদার্থ। সমুদ্রপথে ব্যবসায়ীরা এসে অতীতে আমাদের অনেক অনিষ্ট করে গেছে, তাদের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল দেশি ব্যবসায়ীদের, এখনও কি তেমনটাই চলবে? হ্যাঁ, চলবেই_ যদি প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষাবিদ

[ad#co-1]