‘সময় গেলে সাধন হবে না’

ড. মীজানূর রহমান শেলী
গণতন্ত্র ফিরেছে বটে; কিন্তু যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ঘাটতির ফলে গণতান্ত্রিক ধারা বারবার ব্যাহত হয়েছে, তা বলিষ্ঠভাবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া কি শুরু হয়েছে? বিবর্তনশীল অবস্থা দেখে তা তো মনে হয় না।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলোর বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমে আন্দোলনের সূচনা ঘোষণা করেছে। ১৯ মে ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৯ জুন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ এবং ১৭ জুন সাংবাদিক নির্যাতন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন প্রতিরোধে দেশব্যাপী সমাবেশ ও প্রতিবাদ এবং সর্বশেষ ২৭ জুন নানা দাবিতে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করা হবে।

এদিকে সরকারি দল এই হরতাল ও অন্যান্য কর্মসূচিকে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াস-অপপ্রয়াস বলে অভিহিত করেছে। আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের অন্যান্য দলের বিশিষ্ট নেতা-নেত্রীরা একে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত করার অপচেষ্টা বলেও বর্ণনা করেছেন। তারা বলছেন, বিএনপি এসব কর্মসূচি জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য পালন করবে বললেও এর ফলে জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়বে বৈ কমবে না। তাদের অনেকে আবার বিরোধী দল ঘোষিত হরতালসহ অন্যান্য কর্মসূচি প্রতিহত করার অধিকার জনগণের রয়েছে বলে বক্তব্য পেশ করেছেন।
বিদ্যমান নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের পটভূমিতে ঘনায়মান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে, এমনটি আশংকা করা অমূলক নয়। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি আরও তীব্র ও প্রবল দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তাহলে পরিবেশ সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে। এই সংঘাত ও সংঘর্ষ অদূর অতীতের মতো প্রচণ্ড রূপ নিলে তা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির জন্য আর এক মহাসংকটের সৃষ্টি করতে পারে। পুরনো ধারার এই সাংঘর্ষিক রাজনীতি দেশ ও জাতির কাম্য নয়, হতেও পারে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, এক-এগারোর ফসল বলে অভিহিত যে প্রক্রিয়া ও ঘটনাবলী দেশকে দু’বছর ধরে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির শিকারে পরিণত করেছিল, তা থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের নেতা-নেত্রীরা কি সত্যিই কোন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন? ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির আগের যে রাজনৈতিক সংকট গণতন্ত্রে সাময়িক যতিচ্ছেদের জন্য দায়ী, তার মূলে সক্রিয় ছিল সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চায় দুঃখজনক ব্যর্থতা। ১৯৯০-এর দশকের সূচনায় প্রবল ও ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের পরিণতিতে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। সে সময় থেকে ২০০১ পর্যন্ত তিন তিনটি অবাধ ও গ্রহণীয় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তদারকিতে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচন যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিধি-ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে মজবুতভাবে গড়ে তুলতে পারেনি, তার প্রমাণ ২০০৬ সালের শেষ পর্যায়ের সংঘাতময় রাজনৈতিক ঘটনাবলী। মারাত্মক এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের সুযোগ নিয়েই দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা, পত্তন করা হয় প্রায় দুই বছর স্থায়ী অনির্বাচিত ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করে, ওই সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দেশে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়াকে স্থায়ী করা। বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। জনগণের রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে ওই প্রচেষ্টা বিফল হয়। পরিণতিতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তার ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। নির্বাচনে জাতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট।

গণতন্ত্র ফিরেছে বটে; কিন্তু যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ঘাটতির ফলে গণতান্ত্রিক ধারা বারবার ব্যাহত হয়েছে, তা বলিষ্ঠভাবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া কি শুরু হয়েছে? বিবর্তনশীল অবস্থা দেখে তা তো মনে হয় না।

আসলে গণতন্ত্রের ব্যর্থতা রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রকে সামগ্রিকভাবে দেখার ও উপলব্ধি করার অপারগতার ফল। সমাজতাত্ত্বিক কার্ল ম্যানহাইমের বিশ্লেষণে গণতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে সাধারণ রাজনীতির পরিধির বাইরে বিস্তৃত এক বিশাল প্রক্রিয়া। তিনি যথার্থই বলেন, ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র এক পরিব্যাপ্ত সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার একটি অংশের প্রকাশ মাত্র। এর ভিত্তিমূলে রয়েছে সরকারের ক্ষমতায় সবার সমান অংশ নেয়ার রীতিনীতি। কারণ গণতন্ত্রের মূলে রয়েছে সব মানুষের সমতায় স্থির বিশ্বাস। এ ব্যবস্থা সমাজে উচ্চ-নিচের ভেদাভেদ স্বীকার করে না। সব মানুষের অনস্বীকার্য এই সাম্যে বিশ্বাস গণতন্ত্রের প্রথম ও মৌলিক শর্ত।’

এই কাক্সিক্ষত সাম্য মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিরপেক্ষ, অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। মূল জাতীয় বিষয়গুলোয় ঐকমত্য, পরমতসহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উপায়ে বিবাদ ও বিরোধ মীমাংসা, আইনের শাসনের আওতায় মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সংগঠন ও সমাবেশের অধিকারের নিশ্চয়তা এবং সর্বোপরি সংবিধান অনুমত ও আইনসিদ্ধ রাজনৈতিক বিরোধিতার অধিকারসম্পন্ন বিরোধী দল সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের মতো যেসব উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র বারবার হুমকির মুখে পড়ে, হোঁচট খায়, সেখানে প্রায়ই এসব প্রয়োজনীয় শর্ত পালিত হয় না। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যায় বিরোধী দলের প্রকৃত অবস্থান ও ভূমিকার বিষয়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সুসংগঠিত বিরোধী দল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তন ও অগ্রগতির জন্য ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে পার্লামেন্টে প্রতিনিধি নির্বাচনে ও সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়ার পাশাপাশি সংগঠিত বিরোধী দলকে তার মূল অধিকার দিতে হবে। আর এই অধিকার হচ্ছে নির্বাচনে সরকারের বিরোধিতা করে ভোট চাইবার ও পার্লামেন্টে প্রতিনিধি প্রেরণের অধিকার।

রাজনৈতিক দলবিহীন অবস্থায় গণতন্ত্র পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দলবিহীন সরকারব্যবস্থা প্রায়ই অত্যাচারী স্বৈরতন্ত্রের রূপ নেয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনে পরাজিত পক্ষ আইন অনুমতভাবে তার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এর ফলে আইন পরিষদে সংখ্যালঘিষ্ঠ হলেও তারা তাদের নীতি ও মতামত প্রকাশের এবং জনসমর্থন আদায়ের কাজটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে করে যেতে পারেন। জনগণকে সপক্ষে আনতে পারলে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ীও হতে পারেন। এ ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতার হাতবদল সম্ভবপর হয়। দেশ ও জাতির স্থিতিশীলতা অক্ষুণœ থাকে এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। গণতন্ত্রের উৎকর্ষ এখানেই। সিডনি ডি. বেইলি তার ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে যথার্থই লিখেছেন, ‘যে কোন গণতন্ত্রে বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে মর্যাদাবান করে গড়ে তোলা’।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ কাজ যথার্থভাবে করার নজির পাওয়া যায় না। দৃশ্যত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে যথার্থ মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিতে পারেনি। বিরোধী দল হিসেবে নানা উপেক্ষা, অবহেলা, বিধিনিষেধ ও হয়রানির শিকার হয়ে সংশ্লিষ্ট দল ক্ষমতায় আসার পর অতীতের সরকারি ও বর্তমানের বিরোধী দলের প্রতি একই আচরণ করে গণতন্ত্রের ভিতকে দুর্বল করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী দলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দল অনেক সময়ই দিশেহারা ও অধৈর্য আচরণ করে গণতন্ত্রের জন্য সংকট সৃষ্টি করেছে। এর ফলে দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রী ও কর্মীরা। ১/১১ এই প্রবণতারই অতি সাম্প্র্রতিক অবাঞ্ছিত পরিণতি। ওই ধরনের বা অন্য কোন ধাঁচের অনাকাক্সিক্ষত, অরাজনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকারে পরিণত হতে না চাইলে আজকের রাজনীতির কুশীলবদের এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সাবধান হতে হবে। তা না হলে অহেতুক অহর্নিশ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে সময় ফুরিয়ে যাবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ‘ঃ সময় গেলে সাধন হবে না’।

ড. মীজানূর রহমান শেলী : সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক

[ad#co-1]