সত্য কেন তন্দ্রা হয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
এই তন্দ্রাকে ভাঙতে হলে আমাদের কী করতে হবে। আমাদের এই সমাজটাকে বদলাতে হবে। আমরা শিক্ষার সংস্কার করতে পারি, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার করতে পারি। কিন্তু শিক্ষা পণ্য হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যও
আমাদের জেগে ওঠার যে বাস্তবতা তা সত্য নয়। সত্য হলো, আমরা একটা তন্দ্রাতে আচ্ছন্ন হয়ে আছি। কিন্তু এই তন্দ্রাটা কেন ঘটল? তা যদি অন্বেষণ করতে যাই, তাহলে ঐতিহাসিকভাবেই দেখতে পাব, আমাদের দেশের শাসকশ্রেণী সবসময় চেয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষ তন্দ্রাতেই আচ্ছন্ন থাকুক। ঘুমন্ত না থাকুন। ঘুমন্ত থাকলে কাজের অসুবিধা। তাই আধো জাগরণ, আধো ঘুমের মধ্যে অর্থাৎ তন্দ্রার মধ্যে থাকুক এবং তাদের সেবা করুক। এটা আমরা ব্রিটিশ আমল থেকেই দেখে আসছি। ব্রিটিশ আমলে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি করা হয়েছিল। যে শ্রেণীকে মনে করা হয়েছিল, তারা জেগে উঠেছে। এই জেগে ওঠাকে রেনেসাঁ বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলে ওই জাগরণ ছিল খুবই সীমিত এবং ওই জাগরণ ছিল নাগরিক। তা দেশবাসীকে স্পর্শ করেনি। সর্বোপরি ওই জাগরণকে জাগরণও বলা যাবে না। ওটাকে বলা যায়, ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠা বা কতগুলো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া। ওই মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে থেকেই আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এসেছেন, বুদ্ধিজীবীরা এসেছেন। তারা ব্রিটিশ আমলে একটা সাম্রাজ্যবাদবিরোধ মনোভাব তৈরি করছিল, যদিও তারা সাম্রাজ্যেরই অধীনে ছিল। সাম্রাজ্যবাদের দ্বারাই পুষ্ট হয়েছে, বিকশিত হয়েছে। আবার তাদেরই একাংশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু তারা কখনওই জনগণ জেগে উঠুক_ তা চায়নি। এটা গেল রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবীদের কথা। তারপর পাকিস্তান আমলে আমরা স্বাধীন হলাম একবার। তখন তো আমাদের নতুন করে জেগে উঠবার কথা। কিন্তু দেখা গেল, পাকিস্তানি যে আদর্শ এবং মতাদর্শ তা ঘুমপাড়ানিয়া। তারা উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছিল এবং তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তখনও মানুষ তন্দ্রাতেই ছিল। শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে ব্রিটিশের হাত থেকে। ক্ষমতা চলে এসেছে পাকিস্তানের হাতে; মূলত পাঞ্জাবিদের হাতে। তারা চাচ্ছিল জনগণ তন্দ্রাচ্ছন্নই থাকুক এবং বুদ্ধিজীবীরাও। বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু পাকিস্তানকে জাগানোর ব্যাপারে বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করেনি; বরং করেছে ছাত্ররা। তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছে, সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আন্দোলন করেছে, মুক্তিযুদ্ধে একাত্ম হয়েছে। এসব ছাত্র বুদ্ধিজীবীদের থেকে এ দেশের মানুষকে জাগানোর ব্যাপারে অনেক বেশি ভূমিকা পালন করেছে। তারা জনগণের সঙ্গে মিশেছিল। তারা জনগণের অধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে, জাগরণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিল। কিন্তু তারাও আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। যে কারণে দেখা গেল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এসব তরুণ সম্প্রদায়কে আর জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ভূমিকায় পাওয়া যাচ্ছে না। তারা তখন একটু বিত্তশালী শাসকশ্রেণীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। তাদের ক্ষমতার কাছাকাছি টেনে নেওয়া হচ্ছে। নানান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। এসব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে পুঁজিবাদ। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এ সময় পর্যন্ত পুঁজিবাদই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। সংবিধানের স্বীকৃতি পাওয়া, অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্ম হওয়া এবং সমাজতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষাটা ছিল, তা পুঁজিবাদ গ্রাস করে নেয়। জনগণকে জাগিয়ে তোলার স্বপ্নটা ছিল। এটাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধ হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়ে উঠল না।

মানুষের জেগে ওঠা, সাম্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠা এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত না হওয়ায় একটা অন্তঃসারশূন্যতা তৈরি হলো। এর কারণে এখন আমরা তন্দ্রাচ্ছন্নই রয়ে গেছি। আমরা ভেবেছিলাম একাত্তরে আমরা জেগে উঠেছি, আমরা জেগে উঠব। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। এখন কথা হলো, আমরা কোনোভাবেই জেগে উঠতে পারব না, যদি সমাজটাকে বদলাতে না পারি। এই সমাজ বদলের সঙ্গে রাষ্ট্রের বদল করতে হবে। যেটা ‘৪৭-এ ঘটল ক্ষমতার হস্তান্তর, প্রকারান্তরে কিন্তু ‘৭১-এও সেটাই ঘটল।

এভাবে শাসকশ্রেণী, তাদের যে মুরুবি্ব তারা কেউই চায় না জনগণ জেগে উঠুক। তারা চায় মানুষ তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকুক। তাদের তাঁবেদার শ্রেণীই দেশকে শাসন করুক।

এই তন্দ্রাকে ভাঙতে হলে আমাদের কী করতে হবে। আমাদের এই সমাজটাকে বদলাতে হবে। আমরা শিক্ষার সংস্কার করতে পারি, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার করতে পারি। কিন্তু শিক্ষা পণ্য হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যও। সেজন্য আমাদের দরকার হবে সমাজটাকে বদলানো। এখানে বুদ্ধিজীবীদের একটা ভূমিকা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকাশের নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বদলানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সংস্কৃতিকর্মীরা। তারা গানের মধ্য দিয়ে, নাটকের মধ্য দিয়ে, লাইব্রেরি তৈরির মধ্য দিয়ে, আলাচনার মধ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারে। সচেতন করবে কেন? সচেতন করবে এই বোধ থেকে যদি আমরা মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারি, তাহলে মানুষ জেগে উঠবে। মানুষের জেগে ওঠা মানে রাষ্ট্রের জেগে ওঠা। জীবনের জেগে ওঠা।