মুন্সীগঞ্জে বাবা আদম মসজিদ

ঐতিহ্য ধরে রাখতে পদৰেপ জরুরী
বাবা আদম মসজিদ। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার দরগাবাড়ি গ্রামে এর অবস্থান। বাংলাদেশের প্রথম ইসলাম প্রচারক বাবা আদম এই মসজিদটি তৈরি করেন হিজরী ৮৮৮ অনুযায়ী ১৪৮৩ সালে। ৬ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণশৈলী মনোমুগ্ধকর। ভবনটির দৈর্ঘ্য ৪৩ ফুট, প্রস্থ ৩৬ ফুট। দেয়ালগুলো প্রায় ৪ ফুট চওড়া। ভিতের উপরের অংশ গাঁথা হয়েছে সুরকি ও পাতলা ইট দিয়ে। স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী ইমারতটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। সামনে খিলান আকৃতির একটি প্রবেশপথ রয়েছে। আর এর দু’পাশে রয়েছে সমান আকারের দু’টি জানালা। প্রবেশপথের উপরে ফারসী অক্ষরে খোদাই করে কালো পাথরের ফলক লাগানো হয়েছে। মূল দেয়াল থেকে সামনের দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে চার কোণায় ৪টি সত্মম্ভ্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো ষড়ভুজবিশিষ্ট। খিলান দরজা সত্মম্ভের পাদদেশে, মাঝে এবং পুরো ইমারতের ছাদের কার্নিশের তলা দিয়ে পাতলা ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার ঐতিহ্যবাহী নঙ্া ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া প্রবেশপথের দু’পাশে সামনের দেয়ালে ইটের ফলকের সুদৃশ্য কারম্নকাজ করা। এ রকম কারম্নকাজ রয়েছে উত্তর-দক্ষিণ দিকের দেয়ালেও।

শুধু সামনের দিকে দরজা-জানালা ছাড়া দু’পাশে জানালা না থাকায় মসজিদটির ভেতরের পরিবেশ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনেও বেশ আবছাময়। সামনের দরজা-জানালাগুলোতে চওড়া কাঠের ফ্রেমের পালস্না লাগানো। সব মিলিয়ে সুরক্ষিত দুর্গের মতো মনে হয় স্থাপনাটিকে। তার কারণ সম্ভবত এই, ইবাদতে মগ্ন থাকার সময় মুসলিস্নরা যাতে কারও হামলা বা আক্রমণের কবলে না পড়েন সে জন্যই এমন সুরম্য দুর্গের মতো করে নির্মাণ করা হয়েছে ইমারতটি।

বাবা আদম, যাঁর নামানুসারে এই মসজিদটি তিনি সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৫৬৯ হিজরী অনুযায়ী ১১৭৩ সালে তৎকালীন বিক্রমপুর পরগনার রামপালে এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য। রামপালের দরগাবাড়ি এলাকায় তিনি অবস্থান করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরম্ন করেন। তখন এ জনপদে সেন রাজাদের রাজত্বকাল চলছিল।

বিক্রমপুরের মহাপরাক্রমশালী রাজা বলস্নাল সেনের নেতৃত্বে হিন্দু সমাজে ইসলাম ধর্ম প্রচারকে কেন্দ্র করে সুসংহত বাবা আদমের সঙ্গে বলস্নাল সেনের যুদ্ধ বাধে। ওই ধর্মযুদ্ধে বাবা আদম শহীদ হন। এ যুদ্ধের বিষয়ে এলাকার লোকমুখে এখনও অনেক কিংবদনত্মি ছড়িয়ে আছে। একটি কাহিনী এ রকম_ বলস্নাল সেন যুদ্ধে যাওয়ার সময় তার পোষা কবুতর সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন এবং বাড়ির স্ত্রী-কন্যাদের বলে আসেন, যদি কবুতর ফেরত চলে আসে তাহলে বুঝতে হবে যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ঘটেছে এবং মহিলারা সবাই যেন তখন আগুনে আত্মাহুতি দেয়। কিন্তু ঘটনা ঘটল অন্য রকম। যুদ্ধে রাজার জয় হলো। ফিরতি পথে একটি পুকুরে রাজা যখন শরীরে লেগে থাকা রক্ত, ধুলা, ময়লা ধুয়ে নিচ্ছিলেন তখন হঠাৎ করে কবুতরটি উড়ে যায় রাজ প্রাসাদের দিকে। রাজা সমূহ সর্বনাশ ঠেকাতে উর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি তাঁর পরিবারকে। তাঁর পেঁৗছানোর আগেই কবুতরটি চলে আসায় অনত্মঃপুরবাসিনীরা যুদ্ধে রাজার পরাজয় হয়েছে ভেবে আত্মাহুতি দেন। তবে এটি নিছকই জনশ্রম্নতি। বাবা আদমের শহীদের তিন শতাব্দী পর ১৪৮৩ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়। সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের ভেতরের মেহেরাবটির দু’পাশে আরও দুু’টি দেয়ালে খোদাই করা র্যাকের মতো রয়েছে। ইট বিছানো মেঝে। মোট ছ’টি কাতারের ব্যবস্থা। মাঝখানে কালো পাথরের বিশাল আকৃতির দু’টি সত্মম্ভ উঠে গেছে ছাদ পর্যনত্ম। মূলত এই পাথরের সত্মম্ভ দু’টিই ছাদের গম্বুজগুলোর অধিকাংশ ভার বহন করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। মসজিদটিতে এখনও নিয়মিত নামাজের জামাত হয়ে থাকে। ভেতরে স্থানের স্বল্পতার কারণে সামনের প্রাঙ্গণে কংক্রিট ঢালাই করে আরও সাতটি কাতারের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান করা হয়েছে এবং প্রাঙ্গণসহ মসজিদ ভবনটি নিচু লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পুরাকীর্তি হিসেবে বাবা আদমের মসজিদটিকে অধিভুক্ত করেছে, তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এর আর কোন সংস্কার কাজ হয়নি বলে উলেস্নখ করেন প্রবীণ এলাকাবাসী শিক্ষক গিয়াসউদ্দিন ভূইয়া। মিরকাদিম পৌর মেয়র মোহাম্মদ হোসেন রেনু জানান, তত্ত্বাবধায়কের সময় উদ্বোধনের আগমুহূর্তে মুক্তারপুর সেতুটির নামকরণ এই বাবা আদমের নামেই করা হয়। সরকারীভাবে তথ্য বিবরণীও প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রিকায়। কিন্তু পরে আবার তা পরিবর্তন করে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৬ নামে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম ইসলাম প্রচারক বাবা আদমের স্মারক প্রাচীন মসজিদটির নির্মাণ কৌশল দেখার মতো। কিন্তু এ ব্যাপারে কৌতূহলী করতে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ জরম্নরী। প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ সাইনবোর্ড লাগিইে খালাস। কোন রকমের ভূমিকা নেই এই বিভাগের।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ আজিজুল আলম জানান, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থাপনার কাছে এ সংক্রানত্ম ইতিহাস জানতে হ্যান্ডবুক রাখারও গুরম্নত্বারোপ করেন।

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ

[ad#co-1]