বিছানাতেই কাটছে আবদুর রহমান বয়াতির জীবন

আমাদের দেশে লোকসংগীতের ক্ষেত্রে কীর্তিধন্য ব্যক্তিত্ব আবদুর রহমান বয়াতী। তার পথ ধরেই পরবর্তীতে আগমন ঘটেছে অনেক বয়াতীর, যার মাধ্যমে দেশীয় সংগীত হয়েছে সমৃদ্ধ। ১৯৩৯ সালে ঢাকার জয়াগনিতে জন্মগ্রহণ করা আবদুর রহমান বয়াতী একাধারে অসংখ্য জনপ্রিয় লোক গানের শিল্পী, গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক।

তার গানের মাধ্যমে সব সময়ই মাটি ও মানুষের কথা উঠে এসেছে। গান গেয়ে এক সময় দেশ-বিদেশও মাতিয়েছেন আবদুর রহমান বয়াতী। অনেকেরই হয়তো অজানা, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের (সিনিয়র) আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসের এক জমকালো অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশন করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন আবদুর রহমান বয়াতী। কিন্তু সেই আবদুর রহমান বয়াতী এখন একদমই ভাল নেই। বার্ধক্য এবং বিভিন্ন রোগ বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টাই বিছানায় থাকছেন। ২০০৩ সালে একটি চ্যানেলের আমন্ত্রণে গান গাইতে গিয়ে হঠাৎ করেই সেখানে পড়ে যান আবদুর রহমান বয়াতি। সে সময়ই স্ট্রোক করেছিলেন তিনি। তারপর থেকে আর তেমন একটা সুস্থ হয়ে ওঠেননি। বয়াতীর পরিবারে রয়েছে তার তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তবে তাদের কেউই তেমন একটা উপার্জনক্ষম নন। সে কারণে বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসা হচ্ছে না ৭১ বছর বয়সী আবদুর রহমান বয়াতীর। ফিজিওথেরাপি দেয়ার কারণে দু’মাস আগ পর্যন্ত কিছুটা চলাফেরা করতে পারলেও এখন সম্পূর্ণ বিছানাতেই কাটছে তার জীবন। অর্থের অভাবে দু’মাস ফিজিওথেরাপিও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দুই চোখে ছানিও পড়ে গেছে তার। চিকিৎসকরা বলেছেন খুব শিগগিরই দুই চোখের অপারেশন করতে। আর তাতে খরচ হবে মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা। কিন্তু টাকার অভাবে পরিবারের সদস্যরা অপারেশন করাতে পারছেন না আবদুর রহমান বয়াতীর। ২০০৮ সাল থেকে ২০১০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতীর চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ বহন করেছে বলে জানান তার মেজো ছেলে মোহাম্মদ আলম। তিনি বলেন, চ্যানেল আই’র কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। টানা দুই বছর তারা আমার বাবাকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে আমরা বড় অসহায়। বাবার চিকিৎসা করাতে পারছি না। ফিজিওথেরাপি দিতে মাসে খরচ হয় ৯০০০ টাকা। আমরা এ টাকা কোনভাবেই যোগাড় করতে পারছি না। তাই বাবা এখন পুরোপুরি বিছানায় পড়ে গেছেন। এদিকে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আবদুর রহমান বয়াতীর চিকিৎসার জন্য গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত দু’বার সাহায্যের আবেদন করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। বেসরকারিভাবেও তেমন একটা সাহায্য-সহযোগিতা মিলছে না। চিকিৎসার অভাবে আবদুর রহমান বয়াতী কথাও বলতে পারছেন না ঠিকমতো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে শুধু এতটুকু তিনি বললেন, আমি ভাল নেই। আমাকে আপনারা দেখতে আসবেন তো? ছোটবেলা থেকে গান করলেও আবদুর রহমান বয়াতী ১৯৫৬ সাল থেকে পেশাগতভাবে গান বেছে নেন। দোতরা, বেহালা, হারমোনিয়াম ও খুঞ্জুরি দিয়েই তিনি গান করেছেন। দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বাইরে তিনি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, অস্ট্রিয়াসহ প্রায় ৪২টি দেশে নিজের গান দিয়ে মাতোয়ারা করেছেন শ্রোতাদের। ৫০০টি একক এবং ২০০টি মিক্সডসহ প্রায় ৭০০টি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে আবদুর রহমান বয়াতির। ১৯৮৯ সালে হাফিজউদ্দিন পরিচালিত ‘অস্বতি’ নামক একটি ছবিতে অভিনয়ও করেছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে তিনি ফিডব্যাক ব্যান্ডের ‘দেহঘড়ি’ অ্যালবামে গান গেয়েছেন। এটি ছিল বাংলাদেশে প্রথম ফোক-ফিউশন অ্যালবাম। সেই ধারা অনুসরণেই পরবর্তীতে অনেকের ফোক-ফিউশন অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ফোক গানে অসামান্য অবদানের জন্য আবদুর রহমান বয়াতী ৬টি জাতীয় পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।

[ad#co-1]