আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ জীবন ও সংগ্রামের মেটাফোর

নাজিব ওয়াদুদ
বাংলাদেশের প্রধানতম কথাসাহিত্যিকদের একজন আবু ইসহাক। তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্যদীঘল বাড়ীই (১৯৫৫) তাঁকে এই প্রতিষ্ঠা ও পরিচিতি এনে দিয়েছে। এই একটি মাত্র রচনার খ্যাতি এতটাই প্রবল ও ব্যাপক ছিল যে আড়ালে পড়ে যায় তাঁর অন্য সব কীর্তিগুলো। ছোটগল্পের সঙ্কলন হারেম (১৯৬২) ও মহাপতঙ্গ (১৯৬৩) এবং উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬) বাংলা কথাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলেও বিশেষ প্রচার পায়নি। সূর্যদীঘল বাড়ীর সাফল্য তাঁর পরবর্তী অন্যান্য রচনার প্রতি সাহিত্যসমালোচক ও সাধারণ পাঠকের আগ্রহ আকর্ষণ করবে সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার মতো। ৭৬ বছরের কিছু বেশি তাঁর জীবৎকাল। সে তুলনায় সাহিত্য রচনার সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। মাত্র দু’টি উপন্যাস আর দু’টি গল্পগ্রন্থ। কিছু লেখা অগ্রন্থিত থেকে গেছে। তার পরিমাণ এবং মান গণ্যকর নয়। তবে সাহিত্যের বাইরে সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান তাঁর একটি বড় কীর্তি।

সূর্যদীঘল বাড়ী এবং পদ্মার পলিদ্বীপ আবু ইসহাকের বড় দুটি কীর্তি। সূর্যদীঘল বাড়ী’র পটভূমি ‘দেশ ভাগের স্বপ্নভঙ্গ এবং মন্বন্তরের ভেতর দিয়ে মানুষের চিরন্তর অস্তিত্ব-সংগ্রাম’, অন্যদিকে পদ্মার পলিদ্বীপ-এর পটভূমি ‘মানব প্রবৃত্তির সেই আদি প্রবণতা, পশুত্বের মাধ্যমে সম্পদ তথা ভূমি দখল।’ তবে অস্তিত্বের সংগ্রাম এখানেও কম প্রকট নয়। হাসান আজিজুল হক, বশীর আল হেলাল, সেলিনা হোসেন, হরিপদ দত্ত প্রমুখ বরেণ্য কথাশিল্পী এ দুটি উপন্যাসের শিল্পসাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, এ দুটি উপন্যাসের কোনটিই আধুনিক নয়। সূর্যদীঘল বাড়ী-তে তবু ‘শিল্পের একটা সরল কিন্তু সংহত ছায়া পুরনো কাপড়ের তৈরি নকশিকাঁথার মতো বিছানো ছিল’, কিন্তু পদ্মার পলিদ্বীপ-এর ‘লেখ্যগত বা ডকুমেন্টারি মূল্য যথেষ্ট’ হলেও এবং তাতে ‘উপন্যাসটিকে শিল্পীত করার নানান উপাদান থাকলেও পাঠ শেষে মনে হয়, যে শিল্পসৌন্দর্য সাহিত্যে নান্দনিক উৎকর্ষ আনে, সে জায়গাটি ছুঁতে পারেননি লেখক।’ তবে এর বিপরীত অভিমতও দুর্লভ নয়। যেমন আবুল হাসানাত বলেন, ‘আবু ইসহাক সমস্যার গভীরে গেছেন; চর নিয়ে মারামারি কেন হয়, কিভাবে দখল করা হয়; আবার তা হাতছাড়া হয়ে যায় কেন এবং চরদখল করার কাজে নিয়োজিত মানুষগুলো কি সমস্যায় আবর্তিত হয় এবং দৈনন্দিন সাধারণ জীবন যাপনের জন্য কী অপরিসীম পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতে হয় তার বাস্তবধর্মী, জীবনঘনিষ্ঠ চিত্র আবু ইসহাক তাঁর নিজস্ব রচনাভঙ্গিতে উপস্থাপিত করেছেন যা একাধারে তাঁর সৃষ্টিধর্মিতা ও সার্থক শিল্পসৃষ্টির উৎকৃষ্ট ও প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আমি মনে করি।’ (পদ্মার পলিদ্বীপ, পৃষ্ঠা- ১৯৩)। কিংবা মুহম্মদ ইদ্রিস আলীর বক্তব্য- ‘উপন্যাসটির প্যাটার্নে সুনির্দিষ্ট কোনো জীবনবাদী বক্তব্য সুস্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও গঠনশৈলীগত নৈপুণ্যের কারণে এ উপন্যাসে আবু ইসহাক শিল্প-সিদ্ধির দ্বারপ্রান্তে উপনীত।’ (পদ্মার পলিদ্বীপ, পৃষ্ঠা- ১৯৬)। সূর্যদীঘল বাড়ীর তুলনায় পদ্মার পলিদ্বীপকে তিনি উৎকৃষ্ট আখ্যায়িত করেছেন। এই মতান্তরের আসল কারণ এই যে, আমাদের উপন্যাসবিচারের নিজস্ব কোনো পদ্ধতি বা মাপকাঠি নেই। পাশ্চাত্যের এবং মূলত ইংরেজী সাহিত্যের তুলাদণ্ডে আমরা আমাদের উপন্যাসকে বিচার করতে চাই। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় তখন যখন দেখি যে, আমাদের উপন্যাসের পটভূমি, বা পাত্র-পাত্রীদের জীবনাচরণ ও জীবনবোধ পাশ্চাত্যীয় লোকদের থেকে প্রায় পুরোটাই আলাদা। এই দুটোকে আমরা মেলাতে পারি না। সে কারণে বিচার করতে গিয়ে সমালোচক নিজেই বিভ্রান্তিতে পতিত হন এবং পাঠককেও বিভ্রান্ত করেন।

পশ্চিমে, শিল্পবিপ্লবের সূত্র ধরে, ব্যক্তির বিপর্যয় শিল্পপ্রকরণ হিসেবে উপন্যাসের উদ্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল। পুঁজির বিকাশ এবং সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে তার নানাবিধ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তির অবস্থানকে বিবেচ্য করে উপন্যাসের নানা রকম আঙ্গিক গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সূত্রে রেডিমেড শিল্পপ্রকরণ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের উদ্ভব হয়। কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রা ও জীবনবোধের খুব বড় ধরনের বিকাশ বা পরিবর্তন ঘটেনি। অথচ একের পর এক রেডিমেড উপন্যাসতত্ত্ব আমরা পেয়ে চলেছি যেগুলো প্রতীচ্যীয় জীবনের বিকাশের ফলে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ আমাদের জীবন ও জীবনচেতনার তুলনায় আমাদের হাতের কাছে উপস্থিত উপন্যাসের তত্ত্বগুলি অনেক বেশি অগ্রসর। বাংলা উপন্যাসকে এই বিষম পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে শুরু থেকেই, বিশেষত চল্লিশের দশক থেকে এই অবস্থার দ্রুত অবনতিই ঘটছে। সাহিত্য কখনো স্থান ও কালকে অস্বীকার করতে পারে না। সে কারণে জীবনঘনিষ্ঠ অর্থাৎ স্থান ও কালসংলগ্ন উপন্যাস পশ্চিমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রচিত হতে পারছে না, মনে হচ্ছে আমরা পিছিয়ে রয়েছি, বা এগোতে পারছি না। উপন্যাস বিচার করতে গিয়েও আমরা এই শাঁখের করাতে কর্তিত হচ্ছি। সূর্যদীঘল বাড়ী কিংবা পদ্মার পলিদ্বীপ-এর মতো স্থান-কালচেতন উপন্যাসের শিল্পবিচারে আমাদের সংকট এখানেই নিহিত।

বাংলাদেশ একটি নদীজালবেষ্টিত ভূখণ্ড হলেও নদীকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের সংখ্যা বেশি নয়। হাতেগোনা কয়েকটি রচনার মধ্যে আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ অন্যতম। দীর্ঘ সময়, প্রায় পঁচিশ বছর, ধরে উপন্যাসটি লিখেছেন তিনি। ১৯৬০ সালে শুরু, শেষ ১৯৮৫-তে। মুখর মাটি নামে এর ষোলটি অধ্যায় ১৯৭৪-৭৬ কাল-পরিসরে বাংলা একাডেমী’র সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ ছাপা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের নাম থেকেই এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা করা যায়। পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা পলিমাটির দ্বীপ অর্থাৎ চরের কাহিনী এটি। চর মানে তো নিছকই নদী, ভাঙ্গন এবং মাটি ও ফসল নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে মানুষ, মানুষের সমাজ, মানুষের আশা-আকাঙক্ষা, আনন্দ-বেদনা, হারানো-প্রাপ্তি, প্রেম-বিরহ, মিত্রতা-শত্রুতা, মানুষের জীবনের সঙ্গে যা কিছু সম্পৃক্ত তার সবই। শুধু নদীর কথা, চরের কথা, উপন্যাসের বিষয় হতে পারে না, তাকে ঘিরে মানুষের যে কার্যক্রম তা-ই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য।

পদ্মার বুকে প্রতি বছর কত চর জাগে, কত চর বিলীন হয়ে যায়, আবার জেগে ওঠে। কোনো কোনো চর টিকে থাকে বেশ কিছুকাল। এসব চরের দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চিরকালীন অনুষঙ্গ। সে রকমই এক চর লটাবনিয়া। এরফান মাতব্বর ও চেরাগ আলী সরদারের দ্বন্দ্ব বাধে এই চরের দখল নিয়ে। নিহত হয় এরফান মাতব্বরের জোয়ান ছেলে। তখন থেকে এই চরের নাম হয় ‘খুনের চর’। চরটি এক সময় পদ্মার করালগ্রাসে বিলীন হয়ে যায়। প্রকৃতির নিয়মে দশ বছর পরে জেগেও ওঠে। এরফান মাতব্বর তখন বৃদ্ধ। তার ছেলে ফজল অর্ধশিক্ষিত তরুণ। এই চরের দখল নেয় তারা। তেড়ে আসে নতুন শত্রু জোতদার জঙ্গুরুল্লা। সে দখল করে নেয় ‘খুনের চর’। ফজল এই চর পুনর্দখলের সংগ্রামে নামে। এই চর দখল ও পুনর্দখলের ইতিবৃত্তই পদ্মার পলিদ্বীপ-এর আখ্যান গড়ে তুলেছে। কিন্তু এই দখলী সংগ্রামের সমান্তরালে চলেছে কয়েকটি পার্শকাহিনী। বিশেষ করে ফজল, তার বর্তমান স্ত্রী রূপজান এবং তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী জরিনার ত্রিভূজ সম্পর্কের উপকাহিনী এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় অংশই। প্রায় সমবয়সী ফজল ও জরিনার বাল্যবিবাহ হয়। পরে, দম্পতির যৌবনের প্রারম্ভকালে, ছেলের শিক্ষাজীবন বিঘিœত হবে এই আশঙ্কায় এরফান মাতব্বর জোরপূর্বক তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটায়। জরিনার বিয়ে হয় এক পেশাদার চোরের সঙ্গে। আর ফজল বিয়ে করে তুলনামূলকভাবে অভিজাত আরশেদ মোল্লার মেয়ে রূপজানকে। রূপজানের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে এরফান মাতব্বর ও আরশেদ মোল্লার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আরশেদ মোল্লা রূপজানকে তার বাড়িতে আটকে রাখে এবং তার সঙ্গে যোগসাজস করে জঙ্গুরুল্লা তাকে তার পীর ফুলপুরীর সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। ফজলকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে, জোর খাটিয়েও তারা তার কাছ থেকে তালাক আদায় করতে পারে না। রূপজানও ফজলের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদে সম্মত হয় না। এর মধ্যে কাকতালীয়ভাবে জরিনার সঙ্গে ফজলের সাক্ষাৎ ঘটে এবং তাদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্কও স্থাপিত হয়। শেষ পর্যন্ত ফজল যেমন চর পুনর্দখল করে, তেমনি রূপজানকেও উদ্ধার করে। একটি সফল সমাপ্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয় উপন্যাসের কাহিনী। আয়তনে উপন্যাসটি বেশ বড়ই। ঘটনার ঘনঘটা ও নাটকীয়তা, লোকজ জীবনের সংস্কৃতি ও নানা অনুষঙ্গ, কালিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থার ইঙ্গিত, লোকজ গান-প্রবচন, আঞ্চলিক ভাষা, সবই আছে এই উপন্যাসে।

আখ্যানের নায়ক ফজল ‘নতুন চর জাগা থেকে ঃ দয়িতাকে নিজের কাছে নিয়ে আসা পর্যন্ত মূল ঘটনাবলিকে যে সংকল্প ও কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেছে তাতে এই সকল কিছুকেই তার অর্জন বলেই বিবেচনা করতে হয়’ তথাপি একথা মানতেই হয় যে সে আসলে সমষ্টিরই প্রতিনিধি, ব্যক্তি হিসেবে তার সংকট ও বিকাশ এখানে গতিশীল হয়নি। উপন্যাসের মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে ‘খুনের চর’ দখল ও পুনর্দখলকে ঘিরে। এ যেন ‘চর পুনরুদ্ধারের লড়াই, ভূমি-সন্ধানী দুই পক্ষ মানুষের ভূমি সম্পদের স্বত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জেদাজেদি’। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন থাকলেও তাকে ছাপিয়ে কোনো বৃহত্তর ও মহত্তর জীবনবোধ গড়ে ওঠে না।

পদ্মার পলিদ্বীপ একটি কাহিনী-নির্ভর উপন্যাস। এখানে একটি মোটা দাগের গল্প আছে, তার মধ্যে আছে উপকাহিনীও। ঘটনার ঘনঘটা ও নাটকীয়তায় সেসব গল্প ও গল্পাংশ জমাট ও আকর্ষণীয়। কাহিনী থাকা কোনো ব্যর্থতার পরিচায়ক নয়। কিন্তু কাহিনীকে কার্যকারণসূত্রে বেঁধে ও বিশ্লেষণ করে যে আখ্যান গড়ে তুলতে হয় সেদিকে ঔপন্যাসিকের আগ্রহ কম ছিল বলে মনে হয়। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, হেনরি জেমস যেমন বলেন- উপন্যাস হলো atemp to represent life সেইরকম সংশ্লিষ্ট স্থান, কাল ও জীবনকে তার সকল আকার-রূপ-গন্ধসমেত কালির অক্ষরে তুলে আনা। নদী, চর, প্রকৃতি, মানুষ, মানুষের জীবিকা ও জীবনাচরণ, আঞ্চলিক ভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, বিশিষ্ট সংলাপ, সব কিছুকে ঔপন্যাসিক এতটাই বিস্তৃত ও বিশ্বস্তভাবে চিত্রিত করেছেন যে তা ‘ডকুমেন্টারি’ হয়ে উঠেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় কাজ। পাশ্চাত্য শিল্পবিচারে পদ্মার পলিদ্বীপ-কে যাচাই করতে গেলে নিশ্চিতরূপেই মনে হবে এটি বিংশ শতাব্দীতে লেখা উনবিংশ শতাব্দীর রচনা। সে রকম অবমূল্যায়ন উচিত হবে না। কেননা বিষয়ই আঙিক নির্ধারণ করে। ‘খুনের চর’-এর প্রকৃতি ও প্রতিবেশ, সেখানকার মানবমণ্ডলির জীবনের আচার, সংকট ও সম্ভাবনা এবং ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় অনন্যসাধারণ, প্রতীচ্যের সঙ্গে তাকে কোনোক্রমেই মেলানো সম্ভব নয়। সে কারণে সেই জীবনের শৈল্পিক আচরণও সঙ্গত রূপ-কাঠামো দাবি করে। যেহেতু বাংলা সাহিত্যের সে রকম নিজস্ব কোনো সংরূপ নেই, সেহেতু ঔপন্যাসিককে পশ্চিমেরই দ্বারস্থ হতে হয়। বাঙালি ঔপন্যাসিকের জন্যে এ এক বড় সংকট। যতদিন নিজস্ব বিচারশৈলি গড়ে না উঠছে ততদিন এই সংকট এড়ানো অসম্ভব। আবু ইসহাক এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন না এমনটি ভাবা যায় না। এই সংকট উত্তরণেই তিনি ডকুমেন্টারির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয়। সেটাকে দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। আর ব্যক্তির প্রশ্নে একটি সমান্তরালবর্তী বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করতে হবে। সেটা হলো নায়ক ফজলের একইসঙ্গে দুটি সংগ্রাম- একদিকে জেগে ওঠা চর পুনর্দখল করা, অন্যদিকে রূপজানকে পুনরায় অধিকার করা, তীব্র ও প্রাণপণ সংগ্রাম। এ দুটি বিষয়কে পরস্পরের মেটাফোর হিসাবে দেখতে হবে। তাহলেই কাহিনীকে ছাড়িয়ে আখ্যানের বিস্তার ও যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

পদ্মার পলিদ্বীপ আঞ্চলিক না জাতীয়, প্রেমের নাকি জীবনদ্বন্দ্বের, আধুনিক কি অনাধুনিক, এসব প্রশ্ন অবান্তর। এটি একটি আখ্যান। এতে আছে বিশাল মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপট, কাহিনী ও প্লট। আছে নদী, চর এবং মানুষের জীবনের আন্তঃসম্পর্কের বিস্তারিত চিত্র। আছে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ, প্রকৃতি ও কালের করাল আক্রমণ, জীবনজয়ের অবিরাম সংগ্রাম ও বীরত্বের কথা। সকল দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পদ্মার পলিদ্বীপ-এর ‘ডকুমেন্টারি গুরুত্ব’ অনেক। কোনো সংজ্ঞার নিক্তিতে ফেলে তার কপালে এক কথায় ‘সফল’ অথবা ‘ব্যর্থ’ লেবেল সেঁটে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং নির্দ্বিধায় একথাই বলতে হবে যে, পদ্মার পলিদ্বীপ বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

[ad#co-1]