এ এক মাঝারি ধরনের সুন্দরী মেয়ের কাহিনী।

আলো ভুবন ভরা
ইমদাদুল হক মিলন
ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। শিল্পকলায় ঝোঁক আছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। স্বভাবের দিক দিয়ে খুবই প্রাণবন্ত। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যেভাবে চলাফেরা করে, চালচলন তেমন। স্পষ্ট কথা বলতে পছন্দ করে। প্রচুর বন্ধুবান্ধব আছে। বন্ধুদের নিয়ে বেশ অহংকার। একটি ছেলের সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল, ভেঙে গেছে। এখন নিজের ক্যারিয়ার ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবে না।

এই মেয়ের ওপর শুরু হলো অদ্ভুত ধরনের এক নির্যাতন।

এক ভদ্রলোক লাগলেন মেয়েটির পেছনে। তিনি বিবাহিত। দু-তিনটি বাচ্চাকাচ্চাও আছে। সামাজিকভাবে বেশ প্রতিষ্ঠিত। লতায়-পাতায় মেয়েটির ভাই হন। বয়সে মেয়েটির বাবার প্রায় কাছাকাছি। তিনি শুরু করলেন বেশ ধীর পদ্ধতিতে। প্রথমে কারণে-অকারণে মেয়েটিকে নির্লজ্জভাবে প্রশংসা করতে লাগলেন। মোবাইল ফোনে যখন তখন ফোন করতে লাগলেন। মেয়েটির বাড়িতে এসে হাজির হন নানা অছিলায়। যেহেতু দূর সম্পর্কের হলেও আত্দীয়, কে তাঁকে মানা করবে। বরং অর্থশালী, প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে মেয়েটির মা-বাবা, ভাইবোন সবাই তাঁকে তোয়াজই করতে লাগল। কিন্তু ভদ্রলোক ঘুরেফিরে কোনো না কোনোভাবে মেয়েটিকে পটাচ্ছেন। তার শারীরিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করছেন, মেধার প্রশংসা করছেন। মেয়েটি সব বুঝেও না বোঝার ভান করছে। হঠাৎ ভদ্রলোক এক দিন মেয়েটিকে তাঁর অফিসে ডাকলেন। সরাসরি মেয়েটিকে না, তার মাকে বললেন, ওকে একটু আমার অফিসে পাঠাও। কাজ আছে।

মেয়েটিকে সরাসরি ডাকলে সে হয়তো যাবে না, এ জন্য মাকে দিয়ে বলানো। মেয়ে বাধ্য হয়ে গেছে। ভদ্রলোকের রুমে তাঁর ম্যানেজার আছে। মেয়েটিকে শুনিয়েই ভদ্রলোক ম্যানেজারকে বললেন, এই মেয়ে তোমাদের নতুন ভাবি হতে যাচ্ছে।

ম্যানেজার খুবই অবাক হলো আর মেয়েটি পড়ল আকাশ থেকে। আরে, এসব কী বলছেন আপনি? ছি ছি। আপনি বয়স্ক, বিবাহিত, বাচ্চাকাচ্চার বাপ…

ভদ্রলোক নির্লজ্জের মতো হাসলেন। এসবের কোনোটাতেই বিয়ে আটকাবে না। তুমি তৈরি হয়ে যাও। তারপর ম্যানেজারকে বিদায় করে দিলেন। মেয়েটি ভয় পেয়ে গেল। লোকটা এখনই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না তো?

ভদ্রলোক অমন কিছু করলেন না। বললেন, ভয় পেও না। আমি তোমার সঙ্গে শারীরিক জোর খাটাব না। আমি তোমাকে চাই আমার স্ত্রী হিসেবে। আমার আগের স্ত্রীও থাকবে, বাচ্চাকাচ্চারা তো আছেই। ওদের সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তোমাকে আমি আলাদা ফ্ল্যাট কিনে দেব। তুমি সেই ফ্ল্যাটে থাকবে। আমি পালা করে দুই স্ত্রীর কাছে থাকব। আগের স্ত্রী তেমন স্মার্ট না, তুমি খুবই স্মার্ট। আমি অনেক বড় বড় জায়গায় বিভিন্ন পার্টিতে যাই, সেসব জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাব। মেয়েটি কোনো কথা না বলে বেরিয়ে আসে। এ অবস্থায় কী করবে সে? মা-বাবাকে জানাবে ব্যাপারটা? ভাইবোনকে জানাবে? নাকি ভদ্রলোকের স্ত্রীকে, সেই পরিবারকে জানাবে? নাকি নিজে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ভদ্রলোককে নিরস্ত করবে।

ভদ্রলোক ফোন করলেই বা দেখা হলেই মেয়েটি তারপর নানা রকমভাবে তাঁকে বোঝাতে লাগল। কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। আপনি এমন করবেন না। এটা ঠিক হচ্ছে না। আর এটা সম্ভবও না। ভদ্রলোক কোনো কথাই কানে তোলেন না। মেয়েটি সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাল, ভদ্রলোক নির্বিকার গলায় বললেন, জানিয়ে দাও। যা ইচ্ছে তা-ই করো, কিন্তু আমি তোমাকে বিয়ে করবই। নানা রকমভাবেই মেয়েটি তাঁকে এড়ানোর চেষ্টা করল, ফোন বন্ধ করে রাখল। কিছুতেই কিছু হলো না। ভদ্রলোক বাড়িতে এসে ওঠেন। মেয়ের মা-বাবা সামনে থাকলে সরাসরি তাঁদের বলেন, আমি একটু ওর সঙ্গে কথা বলব।

মা-বাবা সরল মনে চলে যান। তারপর ওই একই কথা। মেয়েটি ঘুমাতে পারে না, খেতে পারে না, লেখাপড়ায় মন বসাতে পারে না। পরীক্ষাগুলো খারাপ হতে লাগল। শরীর ও চেহারা ভাঙতে লাগল। একসময় বাধ্য হয়ে সে মা-বাবাকে জানাল। তার ভাইবোনরা জানল, আত্দীয়স্বজনরা জানল। ভদ্রলোকের মা-বাবা, স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চারা জানল। দুই পক্ষের মধ্যে নানা রকমের আলাপ-আলোচনা হলো, তার পরও কিছুতেই কিছু হলো না। ভদ্রলোক তাঁর জায়গা থেকে নড়ছেন না। মেয়েটিকে তিনি বিয়ে করবেনই। কোনো অশোভন আচরণ তিনি করছেন না, কিন্তু মানসিক চাপে মেয়েটিকে বিপর্যস্ত করে তুলছেন।

এই মেয়ে এখন কী করবে?

সে স্থির করল আত্দহত্যা করবে। আত্দহত্যা মহাপাপ_এ কথা সে জানে। আর এত সুন্দর পৃথিবী, চারদিকে দু-চারটা খারাপ মানুষ আছে ঠিকই কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই তো ভালো। কত প্রিয় বন্ধু, কত প্রিয় মানুষ, এদের ফেলে এই বয়সে একটি মানুষের উৎপাত সহ্য করতে না পেরে সে আত্দহত্যা করবে? মেয়েটির মন কাঁদে।

এ সময় হঠাৎ করেই তার মনে হলো, আচ্ছা, এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির কোনো পথ কি আমি বের করতে পারি না? লোকটা যা করছে, আমি যদি তার চেয়ে বেশি কিছু করি? গ্রাম্য একটা প্রবাদ আছে, ‘সেরের উপর সোয়াসের’। অর্থাৎ তোমার সঙ্গে যদি কেউ বদ আচরণ করে, তুমি তার সঙ্গে তার চেয়ে বেশি করো।

মেয়েটি পথ পেয়ে গেল। আলোর সন্ধান পেয়ে গেল।

পরদিন সকালবেলা লোকটিকে সে ফোন করল। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। লোকটি মহাখুশি। আমিও তো তা-ই চাই। তুমি আমার সঙ্গে দেখা করো। কথা বলো, আড্ডা দাও। আপনি বাড়িতে থাকেন। আমি আসছি।

বাড়িতে কেন, চলো অন্য কোথাও দেখা করি।

না, বাড়িতেই আসব।

মেয়েটি তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির। ভদ্রলোকের যৌথ পরিবার। বৃদ্ধ মা-বাবা, এক বিধবা বোন আর তিনটি ছেলেমেয়ে, স্ত্রী-বাচ্চাকাচ্চা ও কাজের লোকজন। মেয়েটি সেই বাড়িতে গিয়ে সবাইকে ডাকল। ডেকে বলল, ভদ্রলোক আমার জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। আপনারা যদি তাঁকে না থামান তাহলে আমি থানায় যাব। তারপর পত্রপত্রিকার সাংবাদিকদের জানাব। তাতেও যদি তিনি না থামেন আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তাঁর কথা লোকজনকে বলব। তাতেও যদি না থামেন তাহলে আমি আত্দহত্যা করে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে ফাঁসিয়ে দিয়ে যাব। আপনারা পারিবারিকভাবে উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে ঠিক করেন।

ভদ্রলোকের বড় মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ে। তাকে সে বলল, এই মেয়ে শোনো। তোমাকে এখন যদি তোমার বাবার বয়সী কেউ বউ-বাচ্চা থাকার পরও জোর করে বিয়ে করতে চায়, তখন তুমি কী করবে?

বাবার কৃতকর্মের জন্য এ ঘটনার পর থেকেই মেয়ে তার বাবার ওপর রেগে ছিল। এখন এসব শুনে তীব্র ঘৃণা নিয়ে একবার বাবার দিকে তাকাল। তারপর বলল, আমি আত্দহত্যার কথা ভাবতাম না, লোকটাকে উঠতে-বসতে জুতাপেটা করতাম।

এই কাহিনী আরো বিস্তৃত। আমি অতদূর যাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক নিরস্ত হয়েছিলেন। তাঁর ওই নাইনে পড়া মেয়েটি তাঁকে ঠিক করেছিল। মেয়েটির বুদ্ধিতে বাড়ির লোকজন ভদ্রলোককে বয়কট করে। কেউ কথা বলে না, তাঁর কথাও শোনে না কেউ। বাড়ির বুয়ারাও তাঁর খাবার দিতে আসে না। ওদিকে যাকে তিনি বিয়ে করার জন্য পাগল, সে সারা শহরে রটিয়ে দিচ্ছে লোকটির ভিমরতির কথা। সব মিলিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা। শেষ পর্যন্ত ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ বলে ভদ্রলোক পিঠটান দিলেন। বাড়িতে এসে মেয়েটির কাছে মাফ চেয়ে গেলেন।

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]

6 Responses

Write a Comment»
  1. amar mote luktake ura dura pitaner dorkar chilo jai pitani khaile 6 mash bicnay pore thakto!

  2. MANUSRUPY ESOB JANUARDER GOLATIPE MARA UCHIT.
    MUZAHID TITU
    SHAHJALAL UNIVERSITY OF SCIENCE & TECHNOLOGY, SYLHET.
    mujahidtitu@gmail.com

  3. Era manus noY. bcoz eder jonmoporichoy nei. ejonnoi prithibita a omanusgulir jonno bisia uteche.

  4. lekhati parlam,khoob interesting galpoo.as a journalist aamaro aei daraner
    ekti galpoer mukha mukhi hatee hayechilo.

    aami meyatike dhanyabad janai,kintoo meyatir baba-ma ra kemonparivar,je aei lookteka bozety parlo na.kintoo lookter nijer meyate kinto babar bisoye ta buzete parlo.

    aami mone kori lookter ek daraner meneya.aei daraner ghatana goli ke samajik baikot kara uchit looktake. aei lookteka,ebng meyatir baba-ma ke satarka hoya uchit.meyatir kono dosh nei. tai meyatir joy hoyecha mone kori.–thanks

  5. Sabash! for the girl.

  6. hhhhmz etai amader Munshigonj….i love it..!!!!!