ঝিনুক নিরবে সহো

নূর কামরুন নাহার
আমার পাড়ার এক ভাবী। মাঝে মাঝেই দেখা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। আমার লেখা পড়েন। লেখা নিয়েও কথাও হয়। এই সেদিন হঠাৎ বাসায় এসে ঝরঝর করে কাঁদলেন। বললেন তার স্বামীর কথা। বিয়ের দু-তিন বছর পর থেকেই বুঝতে পারেন স্বামী বহুগামী। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে স্বামীর সাথে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন । নানাভাবে বুঝিয়েছেন। কিন্তু কোনোভাবেই স্বামীকে ফেরাতে পারেন নি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি দু পক্ষের অভিভাবক পর্যন্ত গড়িয়েছে। তারাও বুঝিয়েছেন। তারপর বছর চারেক ভালোই চলছিলো। কিন্তু গত মাস ছয়েক ধরে আবারো সেই পুরোনো অসুখ। প্রায়শঃই অনেক রাত করেন। প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান। সংসার খরচের হিসেবে গোজামিল দেন। অভিযোগ করলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সামান্যতেই মেজাজ দেখান। বাচ্চাদের প্রতিও কোন দায়িত্ব পালন করেন না। ভাবী কিছু বললে সরাসরি বলেন-“না পোষালে চলে যাও”। এসব বলতে বলতে ভাবী একসময় চোখ মুছেন, শান্ত গলায় বলেন-“অনেক হয়েছে। এবার চলে যাবো”। তারপর তিনি যা বলেন তার সারমর্ম হচ্ছে ভাবীর দু’ভাই আমেরিকায় থাকে। বাবার ঢাকায় বাড়ী আছে, আর্থিক অবস্থা ভালো। বোনের এসব শুনে সংসার ছেড়ে চলে আসতে বলেছে। ভাবী বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। মেয়ের এই অশান্তি দেখে বাবা-মাও এবার ভাইদের পক্ষেই মত দিয়েছেন।

আমি চুপ করে থাকি কোন উত্তর করি না। ভাবী আবার বলেন-“চলেই যাব ভেবেছি ,বাবার বাসায় থাকব। এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। আপনি না মেয়েদের সমস্যা নিয়ে লেখেন। বলেন এই সমস্যার সমাধান কি”? আমি আবারও উত্তর করি না। এসময় নিস্তেজ কণ্ঠে বোঝানোর চেষ্টা করি। তারপর মিথ্যে স্বান্তনার ভঙ্গিতে বলি -“দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে”।

আমার কথা শুনে ভাবী উত্তেজিত হয়ে পড়েন- কি ঠিক হবে বলেন, কি ঠিক হবে? সতের বছরেও যে ঠিক হলো না, এত বছরেও যার সংসারে মন আসলো না,সে কি করে সংসারী হবে? ভাবীর প্রশ্নের কাছে একেবারে অসহায় বোধ করি। সত্যি কি ঠিক হবে? সত্যি কি ঠিক হয়। ভাবী আবার বলেন- আপনিই না লেখেন মেয়েদের সাহসী হতে হবে। মেয়েদেরও প্রতিবাদী হতে হবে। আত্মসম্মান বোধ জাগাতে হবে। তাহলে বলুন আমি কেন প্রতিদিন আমার সব থাকতেও নিগৃহীত হবো। কেন আমি সম্মানহীন হয়ে সংসার করে যাবো?

খুব কঠিন প্রশ্ন,বিপন্ন বোধ করি। সত্যি কি সম্ভব এভাবে বিশ্বাসহীনের সাথে বসবাস। প্রতিদিন দহনে পোড়া। সংসার সংসার খেলা। একটা সংসারে প্রেমহীন,ভালোবাসাহীন,মূল্যহীন আসবাবের মতো পড়ে থাকা। ভাবীর প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করি। একটা সমাধানের কথা বলতে চাই। ভাবতে চাই একটা সমাধান। সমাধান কি? সংসার ছেড়ে চলে যাওয়া?

ভাবীর তিনটে সন্তানের দিকে তাকাই। বড় মেয়ের বয়স পনের বছর। মেঝ মেয়ের দশ আর ছেলেটার ছয় বছর।

পনের বছরের মেয়েটা কৈশোরের সুন্দর সময় পার করেছে। ক্লাশ নাইনে পড়ে। দু’চোখে তার স্বপ্ন। মনের ভেতর চলছে তার রহস্যের ভাঙ্গাগড়া। জগৎ সংসার তার কাছে নতুন নতুন লাগছে। এক বছর পরেই স্কুল ছেড়ে কলেজে যাবে। মনের ভেতর তার দানা বাধবে প্রেম,জীবনের লক্ষ্য সে স্থির করবে। জীবন হবে তার কাছে প্রত্যাশার,গড়ার, ভালোলাগার। দশ বছরের মেয়েটা চঞ্চল এক প্রজাপতি। ক্লাস ফোরে পড়ছে। এক বছরের মাথায় সে প্রাইমারী পার হবে। কৈশোর এসে তাকে রাঙিয়ে দেবে। তার ভুবন নতুন ছন্দে ভরে উঠবে। ছেলেটা মাত্র দু’বছর স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন মা তাকে মজার মজার টিফিন বানিয়ে দেয়। রঙ পেন্সিলে সে আঁকে রঙিন ফুল, প্রজাপতি। এই বাচ্চাগুলোর কি হবে? মেয়ে দুটো কি ভালোভাবে নিজেদের গড়তে পারবে ? এই নিষ্ঠুর সমাজে কি তারা ভালো থাকতে পারবে? তাদের দিকে কি কদর্য পশুরা প্রতিনিয়ত বাড়াবে না লোভী হাত । আর বিয়ে? ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়েদের কি ভালো পরিবার গ্রহণ করবে? ছেলেটাকেই বা কে দেখবে? এত ছোট বয়সে পরিবারের এই ভাঙ্গন তছনছ করে দেবে শিশুমন। এই শিশু যদি সমাজ বিরোধী হয়ে উঠে যদি অসামাজিক ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে তবে তার দায় কে নেবে? বড় হয়ে সে কি পারবে সাহসী তরুণ হতে, স্বপ্নময় প্রেমিক হতে?

আর ভাবী যদি সংসার ত্যাগ না করে। যদি অধিকার আদায়ে আইনের আশ্রয় নেয়, তবে কি হবে? আইন হয়তো ভাবীর পাশে দাড়াবে, অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে অপরাধীর শাস্তিও হবে,কিন্তু সংসার কি টিকবে? একি ছাদের নিচে বাস করে এভাবে কি দাঁড়ানো যায় মুখোমুখি? আস্থাহীনতার এই নগ্ন প্রকাশ, উভয়ের প্রতি নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্মানবোধ কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? আইন কি সংসারে আনতে পারে সুখ? মনের বিরুদ্ধে কি চলে মামলা? জবরদস্তির নাম কি হতে পারে সংসার? এভাবে ধরে রাখা সংসার কি সত্যিই কোন সংসার! আর বাবা-মার এসব আইনী যুদ্ধে কি হবে সন্তানদের কি অবস্থা হবে? কি হবে তাদের সামাজিক মানসিক অবস্থান? খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভেঙ্গে যাবে তাদের মানসিক বল, সমগ্র জীবনের উপর পড়বে এর নেতিবাচক প্রভাব। সমাজে তারা মাথা উচু করে চলতে পারবে না। সীমাহীন কষ্ট আর লজ্জা নিয়ে বন্ধু, স্বজন , প্রতিবেশীর সাথে স্বাভাবিক সর্ম্পক রাখতে পারবে না। একটি অস্বাভাবিক জীবনের ভার নিয়ে ধুকে ধুকে চলা এ জীবনগুলো স্বাভাবিকভাবেই জীবনবিমুখ হবে, জন্ম নেবে বিচ্ছিন্নতাবোধ। নানা জটিলতা তাদের জীবনকে ব্যাধিগ্রস্ত করে রাখবে।

এসময় ভাবী তাই যাই করুক না কেন সংসারটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে তিনটে জীবন। জীবন তাদের কাছে হয়ে যাবে বিতৃষ্ণার । সমাজের প্রতি নষ্ট হয়ে যাবে শ্রদ্ধা, আস্থা হারিয়ে ফেলবে সামাজিক সর্ম্পকগুলোয়। আমি আস্তে আস্তে বলি -“ভাবী কি আর করবেন মেনে নেন”। তীর্যক ভাবে তাকিয়ে তীক্ষ¦ কণ্ঠে বলে ভাবী- কি মেনে নেবো , বলেন কি মেনে নেবো ? আবারও নত হয়ে আসে আমার চোখ। সত্যি কি মেনে নেবেন তিনি? এ অন্যায়, এ লাম্পট্যকে। এটা কি মেনে নেবার। আমি কি মানি এ লাম্পট্য, এ অন্যায়? মানি না। আমরা কেউ মানি না। আমাদের সমস্ত সত্ত্বা চিৎকার করে বলে মানি না, মানি না। তারপরও আমাদের মানতে হয়। আমরা মানি। যে অন্যায়কে আমরা ঘৃণা করি। যার প্রতিবাদে খুব কঠোর হওয়া প্রয়োজন,সে অপরাধীর শাস্তি হওয়া উচিৎ, সে শাস্তি তাকে আমরা দিতে পারি না। অন্যায়ের প্রতিবিধান করতে পারি না। অন্যায়ের কাছে নয় আমাদের আত্মসর্মপন করতে অসহায়ত্বের কাছে। পারিপার্শ্বিকতা, পরিস্থিতির কাছে হার মানতে হয়।

তিনটে ফুটফুটে প্রাণের দিকে তাকিয়ে সমাজ, সংসার সন্তানের সাথে সমঝোতা করতে হয়। পরাজিত হতে হয় নিজের কাছে, কলমের কাছে ,বিচার বোধের কাছে। আমার ন্যায় বিচার, বিবেচনা বোধকে সমাঝোতা করে তাই বলতে হয়- “ভাবী আর একবার চেষ্টা করুন। আর একটু সহ্য করুন,দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে”। বলতে হয়- “ঝিনুক নিরবে সহো, ঝিনুক নিরবে সহো। ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজিয়া মুক্তা ফলাও।”

[লেখক: কথাশিল্পী]

[ad#co-1]