নূরজাহানের ঘটনা ঘটেছিল মৌলভীবাজারে।

আলো ভুবন ভরা
ইমদাদুল হক মিলন
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার ছাতকছড়া গ্রামে জন্মেছিল নূরজাহান। অষ্টাদশী নূরজাহানকে বিয়ে দিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা। সেই স্বামীর ঘর নূরজাহানের করা হয়নি। স্বামীর শারীরিক সমস্যা ছিল। তারপর নূরজাহানের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ বিয়ে নিয়েই তৈরি হলো সমস্যা। গ্রামের মসজিদের ইমাম মাওলানা মান্নানের চোখ ছিল নূরজাহানের দিকে। তার চোখ এড়িয়ে নূরজাহানের বিয়ে হয়ে গেছে দেখে ভেতরে ভেতরে নূরজাহান এবং তার পরিবারের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল সে। দ্বিতীয় বিয়ের পর এ পরিবারটির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করল সে। বলল, নূরজাহানের দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ নয়। মেয়েকে অবৈধভাবে বিয়ে দেওয়ার জন্য নূরজাহানের মা-বাবাকে দশটি করে দোররা মারা হবে। নূরজাহানের স্বামীকেও দেওয়া হবে একই শাস্তি, আর নূরজাহানকে বুক পর্যন্ত মাটির গর্তে পুঁতে তার ওপর ১০১টি পাথর ছুড়ে মারা হবে।

তাই করা হলো। গ্রামের মানুষজনের সামনে নূরজাহানের অসহায় মা-বাবা এবং স্বামীকে দোররা মারা হলো, আর নূরজাহানকে আরব দেশের মধ্যযুগীয় কায়দায় মাটির গর্তে বুক পর্যন্ত পুঁতে ১০১টি পাথর ছুড়ে মারা হলো। এই অপমান সইতে না পেরে সে রাতেই কীটনাশক পান করে আত্দহত্যা করল নূরজাহান।

১৯৯৩ সালের ঘটনা। এই ঘটনা বিশাল আলোড়ন তুলল বাংলাদেশে। পত্রপত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হলো। মাওলানা মান্নানকে জেলে পোরা হলো। তারপর ফতোয়ার ঘটনা একটু কমে এল। কিন্তু কিছুদিন ধরে আবার শোনা যাচ্ছে ফতোয়ার কথা। ধর্মের নামে আবার শুরু হয়েছে নারী নির্যাতন। ১৬ বছর বয়সী একটি মুসলমান মেয়ে তাদের গ্রামের এক হিন্দু ছেলেকে ভালোবেসেছে। একটা পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে সে। জানাজানি হওয়ার পর এলাকার তিনজন ইমাম এবং দু-একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা একত্র হয়ে সালিস বসিয়েছেন। সালিসে দুজনকেই ১০১টি করে দোররা মারার রায় হয়েছে। ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, মেয়েটিকে ধরে আনা হয়েছে এবং তার চাচার মাধ্যমে দোররা মারা শুরু হয়েছে গ্রামের শয়ে শয়ে মানুষের সামনে। বেত দিয়ে চালানো হয়েছে দোররার কাজ। ২৫টি বেত মারার পর মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার পরও থামেনি চাচা, বেত চালিয়েই গেছে।

এ রকম নিষ্ঠুরতার নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের তৈরি করা আইনে এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ মানুষ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী। কয়েক বছর আগে একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে গেছি। ক্লাস সেভেনে পড়া একটি মেয়ে খুব ভালো অভিনয় করল। তার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ। বিটিভিতে ধারাবাহিক নাটক করব ‘কোন গ্রামের মেয়ে’। মনে পড়ল সেই মেয়েটির কথা। তাকে ঢাকায় নিয়ে এলাম। চার-পাঁচটা পর্বে মোটামুটি ভালোই অভিনয় করল। নিজেদের এলাকায় বিখ্যাত হয়ে গেল।
হঠাৎ একদিন বোরকা পরে সেই ছোট্ট মেয়েটি আমার ফ্ল্যাটে এসে হাজির। কী ব্যাপার? বলল, বাড়ি থেকে পালিয়ে বাসে করে আমার কাছে চলে এসেছে। বোরকা পরার কারণ, তাকে যেন কেউ চিনতে না পারে।

কেন সে এমন করেছে?

মেয়েটি বলল, গ্রামের এক বখাটে লেগেছে তার পেছনে। বখাটের উৎপাতে স্কুলে যেতে পারছে না সে। বখাটের পরিবার প্রভাবশালী। ভয়ে মেয়েটির মা-বাবা, আত্দীয়-স্বজন কেউ মুখ খুলতে পারছে না। এ জন্য মা-বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এইটুকু মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবেন। বিয়ে দিলে যন্ত্রণার হাত থেকে তাঁরা মুক্তি পাবেন। বিয়ের কথাবার্তা চলছে। পাত্র রেডি। মেয়েটি আমার কাছে এসেছে, যাতে তার মা-বাবাকে বুঝিয়ে বিয়েটা আমি ঠেকিয়ে দিই। আর সম্ভব হলে এলাকার প্রভাবশালী লোকজনকে বলে বখাটে ছেলেটির উৎপাত বন্ধ করি। মেয়েটি কিছুতেই এই বয়সে বিয়ে করবে না। তার স্বপ্ন সে লেখাপড়া করে স্কুল টিচার হবে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত করবে মানুষকে।

আমি মেয়েটির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। এখন সে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করছে। এবার এসএসসিতে এ প্লাস পেয়েছে।

বখাটেদের উৎপাত এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সমাজজীবন বিষিয়ে তুলেছে। তাদের উৎপাতের কারণে বহু কিশোরী আত্দহত্যা করেছে। বহু মেয়ের ঘর থেক বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছে, লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মা-বাবা বখাটের ভয়ে তাঁদের কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। বখাটেদের কারণে ঝরে যাচ্ছে বহু মেয়ের জীবন।

এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ একটাই, সমবেতভাবে এদের প্রতিহত করা। এদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা, আইনের সাহায্য নেওয়া। দেশের আইন এবং মানুষের সচেতনতা নিশ্চয়ই এ অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দেবে।

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]