সংবাদপত্রের শিল্প হয়ে ওঠা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

নূহ উল আলম লেনিন
সংবাদপত্র যে কেবল ‘সংবাদ’ বা ‘তথ্য’র বাহন নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু এ কথা সর্বজনবিদিত। গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ সংবাদপত্র। এটাও পুরোনো সংবাদ। গণতন্ত্রের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেই মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম যে সংবাদপত্র, তাকে শতাব্দী আগেই ফোর্থ স্টেট হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে সংবাদপত্রের ভূমিকা যেমন আরো বহুবিস্তৃত হয়েছে, তেমনি সংবাদমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের একক কর্তৃত্বের অবসান হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীতে রেডিও টেলিভিশন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে ইন্টারনেট প্রভৃতি হয়ে উঠেছে সংবাদপত্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। বহুমুখী এবং বহু ধরনের সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেট নিয়ে যে অভিনব ‘জগৎ’ গড়ে উঠেছে, তাকে এখন নতুন অভিধায় চিহ্নিত করা হচ্ছে। এক কথায় নতুন অভিধাটি হচ্ছে ‘গণমাধ্যম’।

‘গণমাধ্যম’ শব্দটির ব্যাঞ্জনা বহুমাত্রিক। কেবল সংবাদপত্র যেমন গণমাধ্যম নয় তেমনি ইলেকট্রনিকস বা বৈদ্যুতিক মাধ্যমও এককভাবে গণমাধ্যম না। প্রিন্টমিডিয়া ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সমাহার গণমাধ্যম বটে, কিন্তু গণমাধ্যমের পরিধি আরো বিস্তৃত এবং ক্রমোপ্রসারমান। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বা কানেকটিভিটিই হয়ে উঠেছে গণমাধ্যম। এই গণমাধ্যম মানুষের তথ্য জানার সক্ষমতাকে অভূতপূর্ব এক পর্যায়ে উন্নীত করেছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি তথ্য নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সরশিপকে অর্থহীন করে তুলেছে। মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন অতীতে আর কখনই এতোটা উন্মুক্ত হয়নি। আবার সংবাদপত্রে হলুদ সাংবাদিকতার মতো অনৈতিক-অসুস্থ উপসর্গের মতোই ডিজিটাল বা কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুরু হয়েছে ‘সাইবার ক্রাইম’Ñ যা হলুদ সাংবাদিকতার চেয়েও ভয়ঙ্কর। সাইবার ক্রাইম যেন মাদকের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিরে আসি সংবাদপত্রের কথায়। প্রশ্ন হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির এই বিস্ময়কর উন্নতি এবং সর্বত্রগামী অভিযানের যুগে সংবাদপত্র কি তার উপযোগিতা বা গুরুত্ব হারিয়েছে? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। একক কর্তৃত্ব বা একচেটিয়া নির্ভরতা হ্রাস পেয়েছে বটে, তবে সংবাদপত্রের ভূমিকা বেড়েছে বৈ কমেনি। বরং সংবাদপত্র এখন আর কেবল ‘সংবাদমাধ্যম’ নয়। বিপুল বিষয়-বৈচিত্র্য এবং নান্দনিক মুদ্রণ সৌকর্য নিয়ে সংবাদপত্র অবতীর্ণ হয়েছে নতুন ভূমিকায়। সংবাদপত্র যেমন সংবাদ মাধ্যম, তেমনি একটি দৈনিক একাধারে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন, ব্যবসা-বাণিজ্য-কৃষি-শিল্প প্রসারের অনুষঙ্গ, বিনোদন মাধ্যম, সৃজনশীল চিন্তা, কাজ, সাহিত্যচর্চা সর্বোপরি একটি রাষ্ট্রের সুশাসনেরও অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। চতুর্থ রাষ্ট্র হিসেবে সংবাদপত্রের ভূমিকার ব্যত্যয় যেমন ঘটেনি, তেমনি এই ভূমিকা সম্প্রসারিত হয়েছে রাজনীতির গণ্ডি অতিক্রম করে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।

দুই

অষ্টাদশ শতককে বলা হয়ে থাকে আলোকিত শতাব্দী। এ শতকে ইউরোপে যন্ত্রযুগের সূচনা মানবেতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। স্টিম ইঞ্জিন, কাপড়ের কল, রেলগাড়ি, মুদ্রণযন্ত্র ও বিদ্যুৎ আবিষ্কার গোটা মানব সভ্যতাকে হাজার বছরের মধ্যযুগীয় অচলায়তন ভেঙে এক ঝটকায় ‘আধুনিক’ যুগে উত্তরণ ঘটায়। মুক্ত করে দেয় মানুষের সৃষ্টিশীলতার মুক্তধারা। শিল্প সভ্যতার সূচনা উৎপাদিকাশক্তির অকল্পনীয় বিকাশের দ্বারোদ্ঘাটন করে। অন্যদিকে সামাজিক শ্রেণী-বর্গ বিন্যাসকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করে। আরো সহজ করে বলা যায় মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গর্ভে জন্ম নেয় নতুন বুর্জোয়া ব্যবস্থা। নবোদ্ভব বুর্জোয়া ব্যবস্থা সহজে বা বিনাবাধায় সামন্ততন্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হয়নি। সংগ্রাম ষড়যন্ত্র আপস সমন্বয় বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব এবং রক্তপাতের ভেতর দিয়ে নতুন বুর্জোয়া শ্রেণী উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে রাষ্ট্র ও সমাজে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। এ ব্যাপারে ইংল্যান্ডে চার্টিস্ট আন্দোলন এবং ফরাসি বিপ্লব নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। বুর্জোয়া বিপ্লবের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে সংবাদপত্র ও সাময়িকী। আলোকিত অষ্টাদশ শতাব্দীতেই ফরাসি দেশ এবং ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক, দার্শনিক ও সামাজিক চিন্তার সৃজনশীল বাহন হিসেবে প্রচুর সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়। বলাবাহুল্য মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার এবং শিক্ষার বিস্তার এ কাজটিকে সহজ করে দিয়েছিল।

উনিশ শতকে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকরা যেমন সংবাদপত্র-সাময়িকীর প্রকাশের পাশাপাশি বিশাল প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলে, তেমনি স্বাধীন সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সেন্সরশিপ প্রথাকেও ‘আইনসঙ্গত’ রূপ দেয়। স্বভাবতই কায়েমি স্বার্থের বিরোধী এবং নতুন নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার বাহন সংবাদপত্র ও সাময়িকী সেন্সরশিপের খড়গ এড়িয়ে গোপনে, আধা প্রকাশ্যে এবং প্রকাশ্যে প্রকাশিত হয়ে থাকে।

মজার ব্যাপার হলো বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিকাশে সংবাদপত্র অত্যন্ত মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, নতুন বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও তার শাসকশ্রেণী কিন্তু পুরাতন সেন্সরশিপের ঐতিহ্যকে অক্ষুণœ রাখলো। তত্ত্বগতভাবে বুর্জোয়া ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের সংঘ-সমিতি বা রাজনৈতিক দল করার ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ স্বীকৃত। কিন্তু এই ব্যবস্থার অসঙ্গতি উন্মোচন এবং এর প্রতিপক্ষরূপে নতুন শ্রেণী, দর্শন ও সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি যাতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য নতুন রাষ্ট্রশক্তিও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ বা তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ব্যাপারে দ্বিধা করেনি।

উনিশ শতকে বুর্জোয়া ব্যবস্থা সংহত ও পরিপক্ব হয়ে ওঠে। এ ব্যবস্থার কর্তৃত্বপরায়ণ ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণীর পাশাপাশি ‘প্রলেতারিয়েত’ বা ‘সর্বহারা’ শ্রেণী যেমন নতুন সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তেমনি বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মধ্যবর্তী আরো একটি সামাজিক বর্গের উদ্ভব হয়। এই বর্গটিই হলো আমাদের অতিপরিচিত ‘মধ্যশ্রেণী’ বা মধ্যবিত্ত। এই মধ্যশ্রেণীটিই হলো নতুন প্রতিবাদী সামাজিক চৈতন্যের ধারক-বাহক। কান্ট, হেগেল, রবার্ট ওয়েন, চার্লস ফুরিয়ে, মার্কস, এঙ্গেলস, কার্ল কাউৎস্কি প্রমুখের সামাজিক মুক্তি, সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিজমের চিন্তা এই মধ্যশ্রেণীকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। বুর্জোয়া ব্যবস্থার নির্মম শোষণ, বঞ্চনা ও মানবেতর জীবনধারা থেকে মুক্তির আকুতি শ্রমিকশ্রেণী বা প্রলেতারিয়েতের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জন্ম দেয়। এই বৈধ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রমিকশ্রেণী নতুন সভ্যতার নিয়ামক হিসেবে সমাজ বিপ্লবের নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেÑ এমনটিই আশা করেছিলেন উল্লিখিত মনিষীরা।

পৃথক পৃথকভাবে তারা তাদের চিন্তাধারাকে সূত্রবদ্ধ করেন। এই চিন্তাধারা ও মতবাদ প্রচারের বাহন হয়ে ওঠে সংবাদপত্র ও সাময়িকী। বস্তুত বুর্জোয়া গণতন্ত্র বিকাশের প্রক্রিয়ায় যে বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে ওঠে তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মতাদর্শানুসারীদের পৃথক পৃথক স্বতঃস্ফূর্ত বা সংগঠিত গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এই প্রতিটি গোষ্ঠীই তাদের মতামত ও চিন্তাধারাকে প্রকাশ এবং জনপ্রিয় করে তোলার জন্য সংবাদপত্র ও সাময়িকীকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেন। অষ্টাদশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে।

সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো হয়ে ওঠে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক ও আদর্শগত চিন্তাধারার মুখপত্র।

তবে এ কথাও সত্য একটি সংবাদপত্র প্রকাশের পেছনে যে বিনিয়োগ বা মূলধন লাগে তার জোগান দেয়া এবং সংবাদপত্রটি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় এর বাণিজ্যিক উপযোগিতা। বাণিজ্যিক উপযোগিতার প্রেরণা থেকেই সংবাদপত্রকে লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ সৃষ্টি হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় ধীরে ধীরে সংবাদপত্র শিল্প হিসেবে নতুন এক পণ্যে পরিণত হতে শুরু করে।

বিংশ শতাব্দীতে সংবাদ আর নিছক কোনো ঘটনার তথ্য বা বিবরণ থাকে না। ‘সংবাদ’ হয়ে ওঠে ‘পণ্য।’ সংবাদ সংগ্রহ ও বিপণনের জন্য গড়ে ওঠে সংবাদ সংস্থা। সংবাদপত্রের নিজস্ব সংবাদ সংগ্রাহক ছাড়াও পেশাদার সংবাদ সংস্থার কাছ থেকে পণ্য হিসেবে সংবাদ ক্রয় এবং তা সংবাদপত্রে মুদ্রণ করে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়া হতে থাকে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয় দেশ-বিদেশের বিশাল জনশক্তির নেটওয়ার্ক এবং বিপুল বিনিয়োগ। সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, মুদ্রণ, বাজারজাতকরণের সমাহার হচ্ছে আধুনিক সংবাদপত্র শিল্প।

কোনো দুর্বলতর শ্রেণী অথবা মধ্যবিত্তÑ যারা ছিল এবং এখনো আছে যে কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক আলোড়নের চালিকাশক্তি, তাদের পক্ষে এরূপ সংবাদপত্র শিল্পের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। তারা হতে পারে ভোক্তা।

উনিশ ও বিশ শতকের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার অগ্রণী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলো তাদের মুখপত্র হিসেবে যেভাবে সংবাদপত্রকে/সাময়িকীকে মুখপত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে, একুশ শতকের নতুন বাস্তবতায় তা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

তিন

বাংলাভাষায় প্রথম সাময়িকপত্র মাসিক ‘দিগদর্শন’ প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালে। এর কিছুদিন পর প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ।’ শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারিরা ছিল এর প্রকাশক। দিগদর্শন ও সমাচার দর্পণ প্রকাশের দু’শ বছর পূর্তির আর মাত্র ৮ বছর বাকি। ১৮৩১ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে এবং ১৮৩৯ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশিত হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায়। বস্তুত আর ২১ বছর পর বাংলা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের দ্বিশতবর্ষ পূর্তি হবে।

আমাদের বাংলাদেশ ভূ-খণ্ড থেকে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ প্রকাশিত হয় ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাময়িকীটিও রংপুর থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে। মধুসূদন ভট্টাচার্য সম্পাদিত এই সাময়িকীটির নাম ‘রঙ্গপুর দিক প্রকাশ।’ মজার ব্যাপার হলো ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সাময়িকীটি প্রকাশিত হয় কবিতা মাসিক হিসেবে। হরিশচন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় ‘কবিতা কুসুমাবলী’ মাসিক পত্রিকাটির আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র এক বছর। বিবিধ বিষয়ক সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘ঢাকা প্রকাশ’ ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি ছিল উনিশ শতকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদপত্র। ১৮৪৭-১৯০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূ-খণ্ড থেকে বিভিন্ন আয়ুষ্কালের সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়েছে মোট ১৪৪টি। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ৩২টি, পাক্ষিক ১৬টি, মাসিক ৯২টি এবং অন্যান্য ৪টি। এর মধ্যে কেবল ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে ৫৪টি সাময়িকপত্র। প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর বিষয়ভিত্তিক পরিসংখ্যান হচ্ছে কবিতা ও সাহিত্য ৪৫টি, ধর্ম ও সমাজ ৩২টি এবং বিবিধ বিষয়ক ৬৭টি। এসব সংবাদ সাময়িকী প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পূর্ব বাংলার আলোকিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী।

উনিশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্তের মানসলোক, তাদের সামাজিক, দার্শনিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক চিন্তার প্রবণতাগুলো শনাক্ত করা যাবে এসব সাময়িকপত্রের বিষয়-বৈচিত্র্য থেকে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত পূর্ব বাংলা ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও দেশভাগের আগে পর্যন্ত ঢাকা-কেন্দ্রিক কোনো সংবাদপত্র শিল্প গড়ে ওঠেনি।

বস্তুত দেশভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ার পর ঢাকা থেকে কয়েকটি দৈনিক সংবাদপত্র ও প্রচুর সাময়িকপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে। ১৮৪৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল কার্যত সাময়িকপত্রের দেশ। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে দৈনিক আজাদ ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। পরে ইত্তেফাক ও সংবাদ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান অবজারভার ইংরেজি দৈনিক হিসেবে যুক্ত হয়।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যেসব দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো তার মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ও বাংলাদেশ অবজারভার টিকে আছে। এর মধ্যে একমাত্র ইত্তেফাকই সবার্থে লাভজনক শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্য দুটি কোনো রকমে টিকে আছে।

স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত আমাদের মূলধারার সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক আলোড়নের সংগঠক ও মুখপত্র হিসেবে। ইত্তেফাক ও সংবাদ সে ভূমিকা পালন করেছিল বলেই ১৯৭১ সালে এ দুটি পত্রিকাই পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এসব পত্রিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং ভূমিকার পেছনে বাণিজ্যিক প্রেরণা নিয়ামক ছিল না। এটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যে বাংলাদেশের স্বাধিকার ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে মূলধারার সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো যথার্থই জনগণের সংগঠক ও মুখপত্র হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশে বিলম্বিত পুঁজিবাদী বিকাশ এবং এলিট শ্রেণী গড়ে ওঠার কারণে শিল্প হিসেবে, বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ‘সংবাদ’ তথা সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশও বিলম্বিত হয়। বলা যেতে পারে বাংলাদেশে যথার্থ অর্থে সংবাদপত্র শিল্পেরÑ যেখানে রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন আঙ্গিক, মুদ্রণ সৌকর্য সর্বোপরি প্রতিযোগিতাÑ শুরু হয় গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে। শিল্প বা বাণিজ্যিক সংবাদপত্রের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তা নিয়ামক নয়।

নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকের চলতি দশকে বাংলাদেশে সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এমনকি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়াÑ এক বিশাল বাণিজ্যিক শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে টেলিভিশন-রেডিও এবং বিপুল কলেবরের দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের পেছনে। মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বজনীন নিয়ম অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে উন্মোচিত হয়েছে অবাধ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যারা টিকে থাকবেÑ তারাই শিল্পের শিরোপা পাবে।

শিল্প বা বাণিজ্যের পেছনে নিয়ামক যে মুনাফা এ কথা আমি আগেই বলেছি। কেউ তো অর্থ বিলানো বা বিলাসিতার জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে না। সম্পাদকীয় নীতি অথবা রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই থাক, শেষ বিচারে বিনিয়োগের অর্থ লাভসহ তুলে আনতে না পারলে কারো পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। উচ্চ নৈতিক আদর্শ, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টি প্রায়শই গৌণ হয়ে পড়ে। আর এরকমটি হলে সংবাদপত্র আর ফোর্থ স্টেট বা জনগণের সংগঠক থাকে না। পরিণত হয় নিছক ব্যবসায়।

শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠার নিরন্তর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ‘ভোরের কাগজ’। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার আদর্শ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ‘ভোরের কাগজ’-কে এ জন্য বিশাল ঝুঁকি নিতে হয়েছে। প্রচার সংখ্যার শীর্ষে উঠেও ‘সমদূরত্বের’ নীতি এবং ‘মুনাফা’-ই নিয়ামক, এই অবস্থান থেকে সরে আসার ঝুঁকি নিতে হয়েছিল ‘ভোরের কাগজ-কে’।

পাঠক হিসেবে লক্ষ করেছি গত প্রায় এক দশক জুড়ে আদর্শগত অবস্থানে দৃঢ় থেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ‘ভোরের কাগজ’-এর নিরন্তর সংগ্রামী অভিযাত্রা। সৎ সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় থাকা এবং সেই সঙ্গে পাঠকের চাহিদা এবং শিল্প হিসেবে লাভজনক হয়ে ওঠার সংগ্রামে যদি ভোরের কাগজ সিদ্ধিলাভ করে, তাহলে তা হবে আমাদের দেশের গণমাধ্যমের জন্য এক প্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত। ভোরের কাগজ দেশ এবং জনগণের প্রতি বরাবরের মতো দায়বদ্ধ থেকেই দীর্ঘজীবী হোক।

[ad#co-1]