বৃত্তের স্ফীতি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সমাজে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব থাকে, থাকবেই। আমাদের সমাজেও আছে। কিন্তু মূল দ্বন্দ্বটা কার সঙ্গে কার? সেটি অভিজাততন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের। এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত প্রাচীন, কিন্তু এটি এখনো বর্তমান। অভিজাততন্ত্রের সামন্তবাদী আনুগত্য রয়েছে। অতীতের একটি বিশেষ সামাজিক বিন্যাস তার উদ্ভব। কিন্তু সেই বিশেষ পরিচয়ে নয়, একটি সাধারণ, নির্বিশেষ অর্থের অভিজাততন্ত্রকে দেখলে দেখা যাবে নাম বদলেছে ঠিকই, কিন্তু অভিজাতরা রয়েই গেছে। বিপরীত দিকে গণতন্ত্র চায় সর্বসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। সেখানে ক্ষমতা, সুযোগ ও সুবিধা বিশেষ শ্রেণী বা গোষ্ঠীর কুক্ষিগত নয়, সবার আয়ত্ত এবং সবার জীবনে ব্যাপ্ত। এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব সমাজে সমানে চলছে।

এই দ্বন্দ্বে মধ্যবিত্তের অবস্থানটা কোথায়? স্বভাবতই মাঝখানে। কথা ছিল সমাজ বদলাবে। সেই লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু সমাজে উঠতি-পড়তি কিছু ঘটেছে বটে, ভাঙচুরও হয়েছে এখানে-সেখানে, কিন্তু সমাজ রয়ে গেছে পুরনো বৃত্তের মতোই। বৃত্তটা বড় হয়েছে, তার স্ফীতি ঘটেছে, সে ভেঙে পড়েনি, বদলে যায়নি। প্রসারিত বৃত্তে অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্র যে একটা সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে, তাতে মধ্যবিত্ত পুরোপুরি ওপক্ষেও নয়, এপক্ষেও নয়। তার ভূমিকা নেতার। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে; কিন্তু অভিজাততন্ত্রের যে উচ্ছেদ চায় তা নয়। ওপরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘৃণা-ভালোবাসার। নিচের মানুষের সঙ্গেও মোটামুটি ওই একই রকমের। অভিজাততন্ত্রের বিপক্ষে তার অবস্থান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে লোভ থাকে ওপরে ওঠার।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামে মধ্যবিত্তই নেতৃত্ব দিয়েছে। এই সংগ্রামের একটি নির্দিষ্ট ও অত্যন্ত স্পষ্ট স্তর হচ্ছে একাত্তরের যুদ্ধ। যুদ্ধে জনগণই ছিল প্রধান শক্তি, নায়ক বলা যায়। কিন্তু নেতৃত্ব জনগণের হাতে ছিল না, ছিল মধ্যবিত্তের হাতে। মধ্যবিত্ত জনগণকে নিয়ে লড়ল, পাকিস্তানি অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াল। সেই দাঁড়ানোর পেছনে নিজের ইচ্ছা ছিল; নিচ থেকে যে চাপ ছিল না, তাও নয়। একাংশ চাইছিল আপস করে ফেলবে, অপর অংশ ছিল আপসবিরোধী। আপসবিরোধীরা জনগণের নিকটবর্তী ছিল_তুলনায়। জনগণের চাপ তারা ধারণ করেছিল নিজেদের মধ্যে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল অন্য দৃশ্য। অধিকাংশই তখন ছুটছে নিজ নিজ লক্ষ্যে। সমষ্টিগত লক্ষ্য_অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা_পড়ে রইল একপাশে : মধ্যবিত্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ল ধনী হওয়ার ধান্দায়। যে যেভাবে পারে। শ্রেণীগতভাবে অবশ্যই, কিন্তু শ্রেণীগতভাবে যতটা তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগতভাবে। ‘আমরা’ থাকেনি, ‘আমি’ হয়ে পড়েছে। সবাই যে ধনী হয়েছে তা অবশ্যই নয়। সম্পদ অল্প, প্রার্থী প্রচুর। ফলে কাড়াকাড়িটাই বড় হয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে, প্রাপ্তির তুলনায়।

উন্নয়ন নিশ্চয়ই হয়েছে। দালানকোঠা, গাড়ি-বিলাস_সব দ্রুত বৃদ্ধির দিকে। কারো কারো জীবনযাপনের মান তাদের নিজের কাছেই অকল্পনীয় মনে হওয়ার কথা। বিদেশে যাচ্ছে প্রচুরসংখ্যক মানুষ। এর কারণ কেবল যে বিদেশে শ্রমবাজারের প্রসারণ তা নয়, কারণ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাও বটে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে, মেয়েরা ভালো করছে; লেখাপড়ায় তারা ছেলেদের হারিয়ে দিচ্ছে কোনো কোনো পরীক্ষায়। তারা বিদেশে যাচ্ছে, দেশে নানা ধরনের কাজ করছে। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই উন্নতির অসুবিধার দিকটা হচ্ছে এর উপকার সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। বরং অল্প কিছু মানুষের উন্নতির দায়ভার বহন করতে গিয়ে ৮০ শতাংশ লোক অবনত হচ্ছে। উন্নতির অন্তরালে রয়ে যাচ্ছে অবনতি। কেবল তা-ই নয়, উন্নতি ঘটছে শোষণের কারণে। বৈধ ও অবৈধ উভয় পথে সাধারণ মানুষ লুণ্ঠিত হচ্ছে।

দুই. আমাদের সমাজে পুঁজির অভাব ঐতিহাসিক। এখন কিছু কিছু পুঁজি দেখা যাচ্ছে। ভেতর থেকে গড়ে উঠছে, আসছে বাইরে থেকেও। কিন্তু উপযুক্ত সুযোগ পাচ্ছে না বিনিয়োগের। শেয়ারবাজারে স্বল্প সঞ্চয়কারীদের যে ছোটাছুটি তার সবটাই যে ফটকাবাজারি তা নয়, অনেকের ভেতরেই আগ্রহ আছে বিনিয়োগের, সে আগ্রহ বাড়ত আনুকূল্য পেলে। আনুকূল্য পায় না। সুযোগের অভাব উদ্বৃত্ত খরচ হচ্ছে বিলাসে, বিদেশ ভ্রমণে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে, বলা যায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কর্মহীনতা। কোনোমতে যারা কাজ পেয়েছে তাদের কাজও যথেষ্ট নয়; সংসার চলে না। অধিকাংশই কাজ পায়নি। পাবে যে এমন আশাও সামনে নেই। সন্ত্রাসের আতঙ্কজনক বৃদ্ধি বেকার সমস্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষরূপে জড়িত। সন্ত্রাস এখন কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপার নয়, সমাজে এমন এলাকা কম আছে, যেখানে সন্ত্রাস অনুপস্থিত। অপরাধপ্রবণতার পেছনে প্ররোচনা রয়েছে এই বাস্তবতায় যে অপরাধের শাস্তি হয় না। বড় অপরাধী পার পেয়ে যায়, ছোট অপরাধী মার খায়, সেও আবার বড় অপরাধীর হাতে_অনেক ক্ষেত্রে। সমাজের জন্য রাষ্ট্রের চেয়ে বড় একক প্রতিষ্ঠান তো আর কিছু নেই; সেই রাষ্ট্রই ছিনতাই হয়ে গেছে_একাধিকবার।

মেয়েরা ভালো করছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য যে মেয়েদের নিরাপত্তা একচুলও বাড়েনি, বরং কমেছে। মেয়েরা আগের তুলনায় বেশি চলাফেরা করে, কিন্তু মোটেই নিরাপদ বোধ করে না, বরং পদে পদে অস্বস্তি সহ্য করে। মৌলবাদীরা ফতোয়া ঝাড়ে, বখাটেরা মন্তব্য করে। এ কারণে আত্দহত্যার মতো মর্মন্তুদ ঘটনাও ঘটছে। ধর্ষণকারীরা ওত পেতে থাকে। যৌতুকের জন্য নিপীড়ন চলে। পরিবারের অভ্যন্তরে হত্যাকাণ্ড ঘটে। মৌলবাদের উৎপাত বাড়ছে। এই বৃদ্ধি সামাজিক অস্বাস্থ্যের একটি নির্ভরযোগ্য সূচক বটে। সমাজে হতাশা ও ব্যর্থতা বোধ বেড়েছে। পুঁজিবাদী বিকাশ মানুষকে পথের সন্ধান দিচ্ছে না, কেবল উৎসাধিত করছে ভোগবাদে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদার দুটি । রাষ্ট্র এ দুইয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এমনকি দায়িত্ব যে নেবে এমন আশ্বাসও দিতে পারছে না। আগের দিনে সরকারি হাসপাতাল রোগের চিকিৎসার না হলেও অন্তত রোগীর জন্য আশ্রয়স্থল ছিল। এখন তা নেই। চিকিৎসা চলে গেছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। রোগ হলে চিকিৎসা পাবে_এমন আশা তারাই করতে পারে, যাদের সামর্থ্য আছে। বাদবাকিরা ভুগবে এবং মরবে। শিক্ষাও ব্যক্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ব্যক্তিগত আয়োজনেই শিক্ষা সংগ্রহ করতে হবে, যতটুকু পারা যায়। কথা ছিল স্বাধীন দেশে একটি অভিন্ন শিক্ষারীতি প্রবর্তিত হবে। হয়নি। শিক্ষা এখন তিনটি নির্দিষ্ট ধারায় প্রবাহিত_ইংরেজি মাধ্যম, সাধারণ ও মাদ্রাসা। ইংরেজি মাধ্যমের জোর বাড়ছে, মাদ্রাসার সংখ্যাও বাড়ছে এবং সাধারণ ধারাটি ভেঙে পড়ার উপক্রম। সমাজ যে কতটা বিভক্ত, তা শিক্ষার ওই ত্রিধারা থেকেই বোঝা যাবে যে সামাজিক বিভাজনটা বাস্তবিক ও অগ্রসরমান।

শিশুর প্রতি যত্ন উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে বেড়েছে, নিচের দিকে বাড়েনি, দারিদ্র্যের কারণেই মুখ্যত। আমাদের দেশে শিশুশ্রম নিয়ে দেশি-বিদেশি অনেকেই খুব উদ্বিগ্ন। নিন্দা করে, কিন্তু খেয়াল করে না যে অনেক ক্ষেত্রেই উপার্জন করতে পারলে শিশু বেঁচে যায়। কেননা তার জন্য শ্রমের বিকল্প শিক্ষা নয়, বিকল্প হচ্ছে অনাহার। বিকল্প হচ্ছে হয়রানি, কোথাও কোথাও যৌন হয়রানিও সত্য। এনজিওদের তৎপরতা অনেক বেড়েছে। রাষ্ট্রের ভেতরে তারা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র_এমন ভাবেই বাড়ছে। এই বৃদ্ধি সরকারের সাফল্যের স্মারক নয়, ব্যর্থতার চিহ্ন। এনজিওরা ভালো কাজ করছে, একসময় যেমন মিশনারিরা করত। তফাত অবশ্যই আছে, মিশনারিদের লক্ষ্য ছিল ধর্মপ্রচার, এনজিওরা ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু তারা আদর্শ-বিবর্জিত নয়। তারা পুঁজিবাদী আদর্শের প্রচারক, সেও এক ধর্ম বটে, ঈশ্বরবিহীন নতুন ধর্ম। তাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে সমাজে বিদ্যমান ব্যবস্থাটা ভালো নয়, কিন্তু সেটা যে ভালো হবে এমন কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। সেই বদলের জন্য অপেক্ষা করা বোকামি। তুমি তোমারটা গুছিয়ে নাও, ভাগ্য ফেরাও। এও পুরনো আদর্শই, সেই লেখাপড়া শিখে গাড়িঘোড়ায় চড়ার আদর্শ। এই আদর্শবাদের ব্যবস্থা বদল হয় না, ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হয়, কেননা তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভ প্রশমিত হয়, মানুষ ব্যস্ত থাকে নিজ নিজ অবস্থা বদলের প্রাত্যহিক সংগ্রামে। গ্রাম থেকে মানুষ ছুটছে শহরে। গ্রামে কাজ নেই, টাকা নেই, নিরাপত্তাও নেই। শহরে যে আছে তা নয়। তবু কিছু আছে, গ্রামের তুলনায় অধিক সেটা।

তিন. বৃত্তের ভেতরই তৎপরতা। আশা ছিল বৃত্তটা ভাঙবে, ভাঙল না। সমাজ একটি আদিগন্ত বিস্তৃত ঐক্যবদ্ধ ভূমিতে পরিণত হলো না। আশার দিক যে নেই তা নয়। আশা রয়েছে এইখানে যে সমাজে বৈষম্য যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে অসন্তোষ। ধনবানরাও যে সন্তুষ্ট তা নয়। তাদের লোভ আরো পাওয়ার। তারা শঙ্কিত অপরাধ বাড়ছে দেখে। অসন্তুষ্ট বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান না থাকার কারণে। কিন্তু তাদের জন্য যেটা ভয়ের কারণ সেটা নিচের মানুষের লোভ। জনসাধারণ অভিজাততন্ত্রকে এখন আর মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে তারা ঘৃণা করে, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক পরিমাণে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যায়নি, যদিও তাকে অবদমিত করার চেষ্টা হয়েছে_অনবরত। মানুষ এখন বোঝে কী ঘটছে এবং কী ঘটা উচিত। বৃত্তটি মনে হয় আত্দসন্তুষ্ট, কিন্তু বৃত্তের ভেতরের মানুষ সন্তুষ্ট নয়। অনেকেই বলেন, আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন। আসলে যুদ্ধ একটা চলছে। বলা যায় আগেরটাই। সেটা শেষ হয়নি। তাকে বেগবান করা দরকার।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক