‘সংবাদ’ বলতে কি বুঝি

মফিদুল হক
‘সংবাদ’ বলতে কোন ছবি মনে ভাসে? ক’দিন থেকে নিজের সঙ্গে নিজে বোঝাপড়া করছি। একটি দৈনিক পত্রিকা ৬৫ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে কেবল তো পথ পরিক্রমণ নয়, পথ তৈরি করে এগোতে হয়েছে অনেক সময়, পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা। এর মধ্যে দেশ ও সমাজের বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে, আত্মিক বন্ধনে জড়িত কয়েক লাখ মানুষের ছোট এক প্রাদেশিক শহর থেকে ফুলে-ফেঁপে ঢাকা হয়ে উঠেছে একবিংশ শতকের মেগাপলিসের একটি। কমবেশি এক কোটি লোকের জীবনধারণ ও জীবিকার প্রয়োজন মিটিয়ে আর সব নাগরিক ব্যবস্থা করতে প্রাণান্ত হয়ে উঠছে নগরীর দশা। স্ফীতি কেবল জনসংখ্যায় নয়, দেশজুড়ে আরো কত ধরনের স্ফীতি আমরা লক্ষ্য করছি। সম্পদের বাড়বাড়ন্তও নেহায়েৎ কম হয়নি। দেশ হিসেবে এখনও এলডিসি তালিকাভুক্ত রইলেও সম্পদের বণ্টনে ভাগ্যবানের বোঝারই ঘটেছে বিপুল বৃদ্ধি। ফলে দেশের ও সমাজের চেহারায় বদল ঘটেছে অনেক, নব্যধনিকদের জৌলুস দেশের জন্য মেকি এক ঔজ্জ্বল্য তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে। এর পরাকাষ্ঠা হিসেবে সোনারগাঁওতে আমরা পেয়েছি কদর্য এক তাজমহল, ধরাকে সরা জ্ঞানের যার চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর হতে পারে না। পাশাপাশি বিকল্প আরেক ধারাও রয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী শ্রমসাধনা ও সৃজনশীলতা দিয়ে যে সাফল্য অর্জন করে চলেছে। কৃষিতে আমরা দেখি এর বড় প্রতিফলন, উদয়াস্ত শ্রমের সঙ্গে দক্ষতার মিশেল ঘটিয়ে অর্জিত হচ্ছে অভাবিত প্রবৃদ্ধি এবং খাদ্যে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পর্যায়ে উপনীত হতে চলেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে কিংবা বলা যায় নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের সবরকম হিসেবের বাইরে দুটি খাত থেকে ঘটছে বিপুল অর্জন, প্রবাসী শ্রমিক এবং পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিক বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় নেমে নিজেদের মেহনত ও রক্তের বিনিময়ে দেশের জন্য এমন আয়ের সংস্থান করেছে যা আগে কারো ভিশন কিংবা কল্পনাতেও দেখা দেয়নি। এই সাথে পাল্টেছে প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি পাল্টে দিচ্ছে এমন কি সংবাদপত্রের প্রকাশনা।

এমনি পটভূমিকায় ছয়টি দশক পেরিয়ে আসা ‘সংবাদে’র মতো দীর্ঘস্থায়ী একটি পত্রিকার কথা বললে কোন দৃশ্য অন্তরে গাঢ় হয়ে ভেসে ওঠে? এমন বিপুল সব পরিবর্তনময়তার মধ্যে যে-পত্রিকা প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে তার একেক ছবি নিশ্চয় একেক জনের কাছে গাঢ় মনে হবে। তবে যদি বলতে হয় কোনো সর্বজনস্বীকৃত ভাষ্যের কথা তবে সবার নজর কাড়বে সংবাদ-এর মুক্তি-আদর্শ, পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে যে মুক্তিচেতনা ধারণ করে পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই চেতনা, সংবাদের ক্ষেত্রে, ছিল প্রগতিশীল চিন্তা বা বামপন্থার উপাদান। কিন্তু সেই প্রগতিশীলতা জাতীয় মুক্তি প্রয়াসের অনুবর্তী থেকেছে, কখনো বিকল্প হয়ে ওঠার দাবিদার হয়নি। ফলে বামপন্থার গ-িবদ্ধ বৃত্তের বাইরে কিংবা বলা যায় বৃত্ত ছাপিয়ে ছিল ‘সংবাদ’-এর অবস্থান ও ভূমিকা। যে কারণে জাতীয়তাবাদী ধারা সমাজে সর্বপ্লাবী হয়ে যখন উপনীত হলো মুক্তিযুদ্ধে তখন তার সমান্তরাল আরো কতক ধারা-উপধারার মধ্যে ‘সংবাদ’ও বলিষ্ঠ অবদান রাখলো মুক্তির সেই যুদ্ধে। বর্বর পাকিস্তানি আক্রমণকারীরা যেমন পুড়িয়ে দিয়েছিল ‘ইত্তেফাক’, তেমনি অগি্নদগ্ধ করেছিল ‘সংবাদ’ কার্যালয় ও প্রেস। ‘সংবাদ’ যে নৃশংস পাকিস্তানি আঘাতের লক্ষ্য হয়েছিল সেটা তার প্রভাবশালী ভূমিকার বড় স্বীকৃতি বহন করে। অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চেতনা-সিঞ্চিত জাতিসত্তার লালন ও প্রসারণে সংবাদের ভূমিকা তাই সর্বজনীন স্বীকৃতি ও ভালোবাসা অর্জন করেছিল।

‘সংবাদ’ বলতে যে ছবি মনে ভেসে ওঠে আমি কেবল সেই কথাই বলতে চাইছি। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকা শহরে আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে ‘সংবাদ’-এর গড়ে উঠেছিল আত্মিক যোগ। সেই বয়সে তো পত্রিকা দপ্তরের ভেতর প্রবেশের অধিকার পাওয়া যায় না, দূর থেকে সমীহ করা চলে, মাঝে-মধ্যে কোনো প্রেস রিলিজ পেঁৗছে দেয়ার সূত্রে, কিংবা সংবাদের অগ্রজ তরুণ কর্মীদের জামার খুঁট ধরে যখন সেই সমীহ-মন্দিরের ভেতর পা রাখবার সুযোগ ঘটে সেটা হয় বড় পাওনা। আমার কিংবা আমাদের মতো আরো কারো কারো কাছে ‘সংবাদ’ বলতে বোঝায় এখনও ২৬৩ বংশাল রোড। সাবেকি ধাঁচের দ্বিতল এই গৃহের নিচতলায় সংবাদকর্মীদের জায়গা এবং দোতলায় সম্পাদকীয় বিভাগ, আমাদের জন্য যেন তীর্থস্থান। এখানে কাজ করেন রণেশ দাশগুপ্ত, পাজামা ও শার্ট-পরা একেবারে সাধারণ দীনহীন ব্যক্তি, ছাতা হাতে হনহন করে চলছেন অফিস, দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁর অন্তরশক্তি কিংবা অপরিমেয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাদর্শন। রেলিং-ঘেরা দোতলার কোণের ঘরে যখন রণেশদার সামনে দাঁড়াবার সুযোগ পাই তখন নিজেকে ধন্য মানি। সংবাদে আরো রয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। ভোকসওয়াগন গাড়ি চালিয়ে আসেন পত্রিকা দপ্তরে, সবসময়ে ব্যস্ত ছোটখাটো এই মানুষটি, কেবল সাংবাদিকতা নয়, পত্রিকার ব্যবস্থাপনার সমস্ত দায়ও তিনি বহন করছেন। কিন্তু তাঁর প্রাণোচ্ছল হাস্যময় চেহারা দেখে বোঝার উপায় থাকে না কত গুরুভার দায়িত্ব তিনি বহন করছেন। তাঁর দেখা পাওয়ার সুযোগ আমাদের কম, কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মের সুবাদে তাঁর সানি্নধ্য পাই মাঝে-মধ্যে, তিনি যে সকলের স্বাভাবিক নেতা সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।

২৬৩ বংশাল রোড-এর বাড়িতে সসঙ্কোচে আমাদের প্রবেশ ঘটলেও খুব সহজ এক স্থান ছিল উল্টোদিকের ‘নিশাত’ সিনেমা হল-সংলগ্ন রেস্টুরেন্ট। পুরনো ঢাকার রেস্তোরাঁ বলতে বোঝাতো আড্ডার জায়গা, চলতো অবিরাম পান ও গুলতানি এবং সেইসাথে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজতো গান। খুব অবাক করে রেস্টুরেন্টে বাজতো পুরনো দিনের হিন্দি গান। তখন লতা-রফি-মহেন্দ্রকাপুরের যুগ হলেও এই রেস্টুরেন্টে বেশি করে বাজতো ‘মওলা, মেরে কিস্তি পার লাগা দেনা’, দিনে যে কতবার সেই গান শোনা যেত তার ইয়ত্তা নেই। আর বাজতো শামশাদ বেগম, সিএইচ আত্মা, নৌশাদ, নূরজাহান, কেএল সায়গল প্রমুখের কালজয়ী গান। হালফিল গায়ক-গায়িকাদের চটুল গান পরিহার করে চিরায়ত সুরের প্রবাহে ভিন্নতর পরিবেশ তৈরি হতো এই রেস্টুরেন্টে। এখানকার আড্ডায় প্রায় স্থায়ী আসন নিয়ে বিরাজ করতো কতক বন্ধু, যাদের মধ্যমণি ছিল মুনীরুজ্জামান, এখন সংবাদের গুরুদায়িত্ব যাঁর ওপর বর্তেছে।

আমাদের জন্য তাই বংশালের রাস্তা ছিল পরম আনন্দময়। একদিকে গীতিরস, আরেকদিকে মুক্তিস্নান; একদিকে গুলতানি, আরেকদিকে স্বপ্নচারিতা। আর এই পথ ধরে কিছুটা এগুলে মালিটোলার মোড়ে, বংশালেরই আরেক বাড়িতে, আমাদের মতো তরুণদের প্রশ্রয়ের স্থান মতিউর রহমানের আব্বাস। এই পথ আবার এঁকে বেঁকে পেঁৗছে যায় তাঁতিবাজারে। পুরনো স্যাঁতসেঁতে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন বাড়ির দোতলায় অপরিসর কক্ষে বাস করেন রণেশ দাশগুপ্ত। ঘরে কোনো আসবাব নেই, তাঁর জন্য পাতা রয়েছে ভূমিশয্যা, চারপাশে ছড়িয়ে আছে বই, কুলুঙ্গিতেও বই, সার্ত্রে দর্শন থেকে শুরু করে মার্কসবাদের চিরায়ত গ্রন্থ, কি না নেই সেখানে। এই রণেশদা ‘ঢাকায় থাকি’ শিরোনামে কলাম লেখেন সংবাদে, আমরা গ্রোগ্রাসে তা গিলি, কিছু বুঝি, কিছু বোঝার চেষ্টা করি, তবে বেশিরভাগ রয়ে যায় উপলব্ধির বাইরে, তবুও মুগ্ধ হই রূপের ছটায়, ভাষার বৈভবে এবং চিন্তার গভীরতায়।

সংবাদের তরুণ কর্মী আবুল হাসনাতের সূত্রে সাক্ষাৎ পাই শহীদ সাবেরের, তাঁর লেখা তখন কোনোভাবে লভ্য নয়, আমরা শুনি সেই কবে পঞ্চাশের দশকে ‘নতুন সাহিত্য’ শারদীয় সংখ্যায় ছেপেছিল শহীদ সাবেরের কারা-উপন্যাস ‘আরেক দুনিয়া থেকে’। মানসিক বৈকল্যের শিকার ছোটখাটো এই মানুষটি উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ালেও তাঁর ভিন্ন ধরনের এক স্থিতি ছিল। কেবল প্রেসক্লাব ও সংবাদ, এই দুই জায়গাতে তিনি বিচরণ করে ফিরতেন, এর বাইরে আর কোথাও তাঁকে পাওয়া যাবে না, নেয়াও যাবে না। পরনে ময়লা পোশাক, অবিন্যস্ত চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পারতপক্ষে কারো সঙ্গে বাক্যবিনিময় করেন না, আবুল হাসনাতের সঙ্গে কেবল তাঁর এক বিশেষ সম্পর্ক। মাঝে মাঝে হাসনাত ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত কণ্ঠে বলে উঠতেন, ‘চার আনা পয়সা হবে, চা খাব।’ হাসনাত ভাইয়ের পকেটে খুচরো সিকি সবসময়ে মজুত থাকতো, কখন শহীদ ভাই চেয়ে বসেন। এমনি এক দিনে হাসনাত ভাই এগিয়ে দিয়েছিলেন কাগজ, সংস্কৃতি সংসদের একুশে সংকলনের জন্য কবিতা লিখে দিতে। নিউজপ্রিন্টের সেই প্যাডে গুটি গুটি হরফে ঠিকই লিখে দিলেন কবিতা, মুক্তি সাধনার কঠোর পথপরিক্রমণে নানা চাপ ও পীড়নে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক শহীদ সাবের কী ভেবে লিখেছিলেন সেই পঙ্ক্তিমালা কে জানে! তিনি লিখলেন, ‘পাশাপাশি কিন্তু দূরে নয় এমন সঙ্গীত/দুই একটি কথা জানা থাকলেও/সব কিছুই জানা আছে এমন মনে করব না।’ শিহরণ জাগে সেই লেখা পড়ে, মনে হয় তাঁর দৃষ্টি যায় জীবনের অনেক গভীরে, তিনি যা বুঝছেন আমরা বুঝি তার হদিশ পাচ্ছি না। কবিতার কোনো শিরোনাম দেননি শহীদ সাবের, রণেশদা এর নামকরণ করলেন ‘মনে মনে’। ১৯৬৮ সালে এমন কবিতা লিখেছিলেন শহীদ সাবের, অনেক দিন পর আবার তাঁর লেখালেখি কোন খেয়ালে কে জানে! এরপর মাঝে-মধ্যে হাসনাত ভাইয়ের অনুরোধে এমনি কিছু কবিতা তিনি রচনা করে দিয়েছেন, প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে সংবাদে প্রকাশিত অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘দেখ দেখ/তমিস্রার পার হতে আলোক/সমুদ্রস্নাত যৌবনের কি অপূর্ব মহিমা এবার/এখানে সঙ্গীত হয় প্রত্যহ।’

এর এক বছরের স্বল্পকাল পর, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘সংবাদ’ অফিসের সমস্ত কিছুর সঙ্গে পুড়ে কাঠকয়লা হয়ে গেলেন শহীদ সাবের। আমি তাঁর অগি্নশয্যা স্মরণ করবার চেষ্টা করি। মনোবিকলন সত্ত্বেও প্রাণরক্ষার স্বাভাবিক তাগিদে ক্রমপ্রসারমাণ আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা তিনি নিতে পারতেন। তাতে হয়তো আগুনের হাত থেকে তিনি বাঁচতেন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে বাঁচতেন কি-না বলা যায় না। তবে শহীদ সাবের ‘সংবাদ’ দপ্তর ছেড়ে কোথাও যাননি, চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যেও তিনি রইলেন অবিচল। গোটা জাতির হয়ে তিনি বরণ করলেন অগি্নপরীক্ষা, সার্থক করে তুললেন নিজের নাম ও জীবন।

‘সংবাদ’ বলতে এমন সব দৃশ্য আমার দৃষ্টিসীমায় ভেসে ওঠে। মনে হয় এমন এক পত্রিকায় লিখতে পারছি এ আমার পরম সৌভাগ্য। জয় হোক ‘সংবাদ’-এর চিরকালের মুক্তিসাধনার। মফিদুল হক

‘সংবাদ’ বলতে কোন ছবি মনে ভাসে? ক’দিন থেকে নিজের সঙ্গে নিজে বোঝাপড়া করছি। একটি দৈনিক পত্রিকা ৬৫ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে কেবল তো পথ পরিক্রমণ নয়, পথ তৈরি করে এগোতে হয়েছে অনেক সময়, পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা। এর মধ্যে দেশ ও সমাজের বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে, আত্মিক বন্ধনে জড়িত কয়েক লাখ মানুষের ছোট এক প্রাদেশিক শহর থেকে ফুলে-ফেঁপে ঢাকা হয়ে উঠেছে একবিংশ শতকের মেগাপলিসের একটি। কমবেশি এক কোটি লোকের জীবনধারণ ও জীবিকার প্রয়োজন মিটিয়ে আর সব নাগরিক ব্যবস্থা করতে প্রাণান্ত হয়ে উঠছে নগরীর দশা। স্ফীতি কেবল জনসংখ্যায় নয়, দেশজুড়ে আরো কত ধরনের স্ফীতি আমরা লক্ষ্য করছি। সম্পদের বাড়বাড়ন্তও নেহায়েৎ কম হয়নি। দেশ হিসেবে এখনও এলডিসি তালিকাভুক্ত রইলেও সম্পদের বণ্টনে ভাগ্যবানের বোঝারই ঘটেছে বিপুল বৃদ্ধি। ফলে দেশের ও সমাজের চেহারায় বদল ঘটেছে অনেক, নব্যধনিকদের জৌলুস দেশের জন্য মেকি এক ঔজ্জ্বল্য তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে। এর পরাকাষ্ঠা হিসেবে সোনারগাঁওতে আমরা পেয়েছি কদর্য এক তাজমহল, ধরাকে সরা জ্ঞানের যার চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর হতে পারে না। পাশাপাশি বিকল্প আরেক ধারাও রয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী শ্রমসাধনা ও সৃজনশীলতা দিয়ে যে সাফল্য অর্জন করে চলেছে। কৃষিতে আমরা দেখি এর বড় প্রতিফলন, উদয়াস্ত শ্রমের সঙ্গে দক্ষতার মিশেল ঘটিয়ে অর্জিত হচ্ছে অভাবিত প্রবৃদ্ধি এবং খাদ্যে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পর্যায়ে উপনীত হতে চলেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে কিংবা বলা যায় নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের সবরকম হিসেবের বাইরে দুটি খাত থেকে ঘটছে বিপুল অর্জন, প্রবাসী শ্রমিক এবং পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিক বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় নেমে নিজেদের মেহনত ও রক্তের বিনিময়ে দেশের জন্য এমন আয়ের সংস্থান করেছে যা আগে কারো ভিশন কিংবা কল্পনাতেও দেখা দেয়নি। এই সাথে পাল্টেছে প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি পাল্টে দিচ্ছে এমন কি সংবাদপত্রের প্রকাশনা।

এমনি পটভূমিকায় ছয়টি দশক পেরিয়ে আসা ‘সংবাদে’র মতো দীর্ঘস্থায়ী একটি পত্রিকার কথা বললে কোন দৃশ্য অন্তরে গাঢ় হয়ে ভেসে ওঠে? এমন বিপুল সব পরিবর্তনময়তার মধ্যে যে-পত্রিকা প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে তার একেক ছবি নিশ্চয় একেক জনের কাছে গাঢ় মনে হবে। তবে যদি বলতে হয় কোনো সর্বজনস্বীকৃত ভাষ্যের কথা তবে সবার নজর কাড়বে সংবাদ-এর মুক্তি-আদর্শ, পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে যে মুক্তিচেতনা ধারণ করে পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই চেতনা, সংবাদের ক্ষেত্রে, ছিল প্রগতিশীল চিন্তা বা বামপন্থার উপাদান। কিন্তু সেই প্রগতিশীলতা জাতীয় মুক্তি প্রয়াসের অনুবর্তী থেকেছে, কখনো বিকল্প হয়ে ওঠার দাবিদার হয়নি। ফলে বামপন্থার গ-িবদ্ধ বৃত্তের বাইরে কিংবা বলা যায় বৃত্ত ছাপিয়ে ছিল ‘সংবাদ’-এর অবস্থান ও ভূমিকা। যে কারণে জাতীয়তাবাদী ধারা সমাজে সর্বপ্লাবী হয়ে যখন উপনীত হলো মুক্তিযুদ্ধে তখন তার সমান্তরাল আরো কতক ধারা-উপধারার মধ্যে ‘সংবাদ’ও বলিষ্ঠ অবদান রাখলো মুক্তির সেই যুদ্ধে। বর্বর পাকিস্তানি আক্রমণকারীরা যেমন পুড়িয়ে দিয়েছিল ‘ইত্তেফাক’, তেমনি অগি্নদগ্ধ করেছিল ‘সংবাদ’ কার্যালয় ও প্রেস। ‘সংবাদ’ যে নৃশংস পাকিস্তানি আঘাতের লক্ষ্য হয়েছিল সেটা তার প্রভাবশালী ভূমিকার বড় স্বীকৃতি বহন করে। অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চেতনা-সিঞ্চিত জাতিসত্তার লালন ও প্রসারণে সংবাদের ভূমিকা তাই সর্বজনীন স্বীকৃতি ও ভালোবাসা অর্জন করেছিল।

‘সংবাদ’ বলতে যে ছবি মনে ভেসে ওঠে আমি কেবল সেই কথাই বলতে চাইছি। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকা শহরে আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে ‘সংবাদ’-এর গড়ে উঠেছিল আত্মিক যোগ। সেই বয়সে তো পত্রিকা দপ্তরের ভেতর প্রবেশের অধিকার পাওয়া যায় না, দূর থেকে সমীহ করা চলে, মাঝে-মধ্যে কোনো প্রেস রিলিজ পেঁৗছে দেয়ার সূত্রে, কিংবা সংবাদের অগ্রজ তরুণ কর্মীদের জামার খুঁট ধরে যখন সেই সমীহ-মন্দিরের ভেতর পা রাখবার সুযোগ ঘটে সেটা হয় বড় পাওনা। আমার কিংবা আমাদের মতো আরো কারো কারো কাছে ‘সংবাদ’ বলতে বোঝায় এখনও ২৬৩ বংশাল রোড। সাবেকি ধাঁচের দ্বিতল এই গৃহের নিচতলায় সংবাদকর্মীদের জায়গা এবং দোতলায় সম্পাদকীয় বিভাগ, আমাদের জন্য যেন তীর্থস্থান। এখানে কাজ করেন রণেশ দাশগুপ্ত, পাজামা ও শার্ট-পরা একেবারে সাধারণ দীনহীন ব্যক্তি, ছাতা হাতে হনহন করে চলছেন অফিস, দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁর অন্তরশক্তি কিংবা অপরিমেয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাদর্শন। রেলিং-ঘেরা দোতলার কোণের ঘরে যখন রণেশদার সামনে দাঁড়াবার সুযোগ পাই তখন নিজেকে ধন্য মানি। সংবাদে আরো রয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। ভোকসওয়াগন গাড়ি চালিয়ে আসেন পত্রিকা দপ্তরে, সবসময়ে ব্যস্ত ছোটখাটো এই মানুষটি, কেবল সাংবাদিকতা নয়, পত্রিকার ব্যবস্থাপনার সমস্ত দায়ও তিনি বহন করছেন। কিন্তু তাঁর প্রাণোচ্ছল হাস্যময় চেহারা দেখে বোঝার উপায় থাকে না কত গুরুভার দায়িত্ব তিনি বহন করছেন। তাঁর দেখা পাওয়ার সুযোগ আমাদের কম, কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মের সুবাদে তাঁর সানি্নধ্য পাই মাঝে-মধ্যে, তিনি যে সকলের স্বাভাবিক নেতা সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।

২৬৩ বংশাল রোড-এর বাড়িতে সসঙ্কোচে আমাদের প্রবেশ ঘটলেও খুব সহজ এক স্থান ছিল উল্টোদিকের ‘নিশাত’ সিনেমা হল-সংলগ্ন রেস্টুরেন্ট। পুরনো ঢাকার রেস্তোরাঁ বলতে বোঝাতো আড্ডার জায়গা, চলতো অবিরাম পান ও গুলতানি এবং সেইসাথে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজতো গান। খুব অবাক করে রেস্টুরেন্টে বাজতো পুরনো দিনের হিন্দি গান। তখন লতা-রফি-মহেন্দ্রকাপুরের যুগ হলেও এই রেস্টুরেন্টে বেশি করে বাজতো ‘মওলা, মেরে কিস্তি পার লাগা দেনা’, দিনে যে কতবার সেই গান শোনা যেত তার ইয়ত্তা নেই। আর বাজতো শামশাদ বেগম, সিএইচ আত্মা, নৌশাদ, নূরজাহান, কেএল সায়গল প্রমুখের কালজয়ী গান। হালফিল গায়ক-গায়িকাদের চটুল গান পরিহার করে চিরায়ত সুরের প্রবাহে ভিন্নতর পরিবেশ তৈরি হতো এই রেস্টুরেন্টে। এখানকার আড্ডায় প্রায় স্থায়ী আসন নিয়ে বিরাজ করতো কতক বন্ধু, যাদের মধ্যমণি ছিল মুনীরুজ্জামান, এখন সংবাদের গুরুদায়িত্ব যাঁর ওপর বর্তেছে।

আমাদের জন্য তাই বংশালের রাস্তা ছিল পরম আনন্দময়। একদিকে গীতিরস, আরেকদিকে মুক্তিস্নান; একদিকে গুলতানি, আরেকদিকে স্বপ্নচারিতা। আর এই পথ ধরে কিছুটা এগুলে মালিটোলার মোড়ে, বংশালেরই আরেক বাড়িতে, আমাদের মতো তরুণদের প্রশ্রয়ের স্থান মতিউর রহমানের আব্বাস। এই পথ আবার এঁকে বেঁকে পেঁৗছে যায় তাঁতিবাজারে। পুরনো স্যাঁতসেঁতে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন বাড়ির দোতলায় অপরিসর কক্ষে বাস করেন রণেশ দাশগুপ্ত। ঘরে কোনো আসবাব নেই, তাঁর জন্য পাতা রয়েছে ভূমিশয্যা, চারপাশে ছড়িয়ে আছে বই, কুলুঙ্গিতেও বই, সার্ত্রে দর্শন থেকে শুরু করে মার্কসবাদের চিরায়ত গ্রন্থ, কি না নেই সেখানে। এই রণেশদা ‘ঢাকায় থাকি’ শিরোনামে কলাম লেখেন সংবাদে, আমরা গ্রোগ্রাসে তা গিলি, কিছু বুঝি, কিছু বোঝার চেষ্টা করি, তবে বেশিরভাগ রয়ে যায় উপলব্ধির বাইরে, তবুও মুগ্ধ হই রূপের ছটায়, ভাষার বৈভবে এবং চিন্তার গভীরতায়।

সংবাদের তরুণ কর্মী আবুল হাসনাতের সূত্রে সাক্ষাৎ পাই শহীদ সাবেরের, তাঁর লেখা তখন কোনোভাবে লভ্য নয়, আমরা শুনি সেই কবে পঞ্চাশের দশকে ‘নতুন সাহিত্য’ শারদীয় সংখ্যায় ছেপেছিল শহীদ সাবেরের কারা-উপন্যাস ‘আরেক দুনিয়া থেকে’। মানসিক বৈকল্যের শিকার ছোটখাটো এই মানুষটি উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ালেও তাঁর ভিন্ন ধরনের এক স্থিতি ছিল। কেবল প্রেসক্লাব ও সংবাদ, এই দুই জায়গাতে তিনি বিচরণ করে ফিরতেন, এর বাইরে আর কোথাও তাঁকে পাওয়া যাবে না, নেয়াও যাবে না। পরনে ময়লা পোশাক, অবিন্যস্ত চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পারতপক্ষে কারো সঙ্গে বাক্যবিনিময় করেন না, আবুল হাসনাতের সঙ্গে কেবল তাঁর এক বিশেষ সম্পর্ক। মাঝে মাঝে হাসনাত ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত কণ্ঠে বলে উঠতেন, ‘চার আনা পয়সা হবে, চা খাব।’ হাসনাত ভাইয়ের পকেটে খুচরো সিকি সবসময়ে মজুত থাকতো, কখন শহীদ ভাই চেয়ে বসেন। এমনি এক দিনে হাসনাত ভাই এগিয়ে দিয়েছিলেন কাগজ, সংস্কৃতি সংসদের একুশে সংকলনের জন্য কবিতা লিখে দিতে। নিউজপ্রিন্টের সেই প্যাডে গুটি গুটি হরফে ঠিকই লিখে দিলেন কবিতা, মুক্তি সাধনার কঠোর পথপরিক্রমণে নানা চাপ ও পীড়নে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক শহীদ সাবের কী ভেবে লিখেছিলেন সেই পঙ্ক্তিমালা কে জানে! তিনি লিখলেন, ‘পাশাপাশি কিন্তু দূরে নয় এমন সঙ্গীত/দুই একটি কথা জানা থাকলেও/সব কিছুই জানা আছে এমন মনে করব না।’ শিহরণ জাগে সেই লেখা পড়ে, মনে হয় তাঁর দৃষ্টি যায় জীবনের অনেক গভীরে, তিনি যা বুঝছেন আমরা বুঝি তার হদিশ পাচ্ছি না। কবিতার কোনো শিরোনাম দেননি শহীদ সাবের, রণেশদা এর নামকরণ করলেন ‘মনে মনে’। ১৯৬৮ সালে এমন কবিতা লিখেছিলেন শহীদ সাবের, অনেক দিন পর আবার তাঁর লেখালেখি কোন খেয়ালে কে জানে! এরপর মাঝে-মধ্যে হাসনাত ভাইয়ের অনুরোধে এমনি কিছু কবিতা তিনি রচনা করে দিয়েছেন, প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে সংবাদে প্রকাশিত অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘দেখ দেখ/তমিস্রার পার হতে আলোক/সমুদ্রস্নাত যৌবনের কি অপূর্ব মহিমা এবার/এখানে সঙ্গীত হয় প্রত্যহ।’

এর এক বছরের স্বল্পকাল পর, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘সংবাদ’ অফিসের সমস্ত কিছুর সঙ্গে পুড়ে কাঠকয়লা হয়ে গেলেন শহীদ সাবের। আমি তাঁর অগি্নশয্যা স্মরণ করবার চেষ্টা করি। মনোবিকলন সত্ত্বেও প্রাণরক্ষার স্বাভাবিক তাগিদে ক্রমপ্রসারমাণ আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা তিনি নিতে পারতেন। তাতে হয়তো আগুনের হাত থেকে তিনি বাঁচতেন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে বাঁচতেন কি-না বলা যায় না। তবে শহীদ সাবের ‘সংবাদ’ দপ্তর ছেড়ে কোথাও যাননি, চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যেও তিনি রইলেন অবিচল। গোটা জাতির হয়ে তিনি বরণ করলেন অগি্নপরীক্ষা, সার্থক করে তুললেন নিজের নাম ও জীবন।

‘সংবাদ’ বলতে এমন সব দৃশ্য আমার দৃষ্টিসীমায় ভেসে ওঠে। মনে হয় এমন এক পত্রিকায় লিখতে পারছি এ আমার পরম সৌভাগ্য। জয় হোক ‘সংবাদ’-এর চিরকালের মুক্তিসাধনার।