দৈনিক ‘সংবাদ’ এবং পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মধ্যবিত্তই তো সংবাদপত্রের পাঠক এবং সংবাদপত্র মধ্যবিত্তের রুচিকে লালন-পালন করে, এমনকি গঠনেও সাহায্য করে, আবার অল্পস্বল্প হলেও সেই রুচির ডাকে সাড়া দেয়। ১৯৫১-তে ‘সংবাদ’ যখন প্রকাশিত হলো তখন তাকে মনে হয়েছিল মধ্যবিত্তের নিজস্ব পত্রিকা। আগের পত্রিকাগুলোর পাঠকও মধ্যবিত্তই ছিল; কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ‘আজাদ’, ‘জিন্দেগী’ এমনকি ‘ইত্তেফাকে’র পক্ষেও পূর্ববঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যে অগ্রগমন ঘটছিল তার সঙ্গে রুচির দিক থেকে তাল রাখার ব্যাপারে বিঘ্ন ঘটছিল।

মধ্যবিত্ত তখন বেড়ে উঠেছে, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে এগোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার আকাঙ্ক্ষা ও রুচি দুটোই তখন এমন একটা পত্রিকা দেখতে চাইছিল যাকে মনে হবে আধুনিক। সেই সঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদী তো বটেই, কিছুটা সমাজতান্ত্রিক হওয়াটাও অভিপ্রেত ছিল, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ সমাজের কাছে।

‘সংবাদ’ সে প্রয়োজনটা অনেকটা মিটিয়েছিল। ঢাকা থেকে বাংলা নামে শোভিত দৈনিক পত্রিকার প্রকাশ ওই প্রথম। আর এতে যাঁরা কাজ করতেন তাঁরা রুচিতে আধুনিক ছিলেন তো বটেই, অনেকেই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উঠেছিলেন। ‘সংবাদে’র বিভাগগুলোও ছিল আকর্ষণীয়। ভাইয়া নামে ‘খেলাঘর’ পাতাটির সম্পাদনা করতেন কবি হাবীবুর রহমান, যাঁকে আমরা কিশোররা চিনতাম তার লেখার মধ্য দিয়ে এবং যাঁর হাত দিয়ে অনেক ছেলেমেয়ের তাদের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে একজন ছিল আমার স্ত্রী নাজমা জেসমিন, যার সঙ্গে তখন আমার পরিচয় ছিল না; কিন্তু পরে সে জানিয়েছে আমাকে এই সত্যটি যে, ‘সংবাদে’র ‘খেলাঘরের’ পাতাটি না পেলে তার লেখক-জীবনের সূত্রপাত কেমন করে ঘটতো সে জানে না। নাজমা জীবিত থাকলে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় সেও হয়তো লিখত, এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে কৌতুক মিশিয়ে ‘খেলাঘর’ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে জানাতে পারত। আমি নিজেও ‘খেলাঘরে’ লিখেছি যদিও সদস্য হিসেবে নয়; সে প্রসঙ্গটিতে পরে আসছি। মেয়েদের পাতা সম্পাদনা করতেন লায়লা সামাদ, পারিবারিকভাবে যার সম্পর্ক ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এবং যিনি সেকালে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন নির্ভয়ে। সাহিত্য বিভাগ দেখাশোনা করতেন আবদুল গণি হাজারী, সঙ্গে ছিলেন ফয়েজ আহমদ। চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদির জন্য পাতা ছিল, যার দেখাশুনা করতেন সৈয়দ রেদওয়ানুর রহমান, যিনি নিজেও নাট্যশিল্পী ছিলেন। সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী এবং সৈয়দ নুরুদ্দিন, যাদের দক্ষতার বিষয়ে আমরা লোকমুখে শুনতাম। কলকাতায় ‘মিল্লাত’ পত্রিকার নেপথ্য সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস সম্পাদকীয় লিখতেন, যেমন লিখতেন তরুণ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও ফজলে লোহানী। বার্তা বিভাগে ছিলেন কে. জি. মুস্তাফা। এসব ভেতরের ব্যাপার, তবু আমরা যারা কৌতূহলী ছিলাম সংবাদপত্রের ব্যাপারে তারা এগুলোই জানতাম। আর বাইরে থেকে দেখতাম নতুন ধরনের একটি পত্রিকা বের হয়েছে।

আমার পিতার প্রজন্মের লোকেরা ‘আজাদ’ পড়তেন। কিন্তু আমাদের প্রজন্মকে ‘আজাদে’র ভাষারীতি ও রাজনীতি কোনটিই আকর্ষণ করতে পারেনি, যদিও ‘মুকুলের মহফিলে’ আমি লিখতাম এবং ‘আজাদ’ অফিস থেকে প্রকাশিত মাসিক মোহাম্মদীতে আমার নতুনভাবে প্রস্তুত মোপাসাঁর দু’টি গল্পের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘মোহাম্মদী’র নেপথ্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। আমরা পড়তাম পাকিস্তান অবজারভার। আমার পিতা সম্ভব হলে কলকাতার ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকা রাখতেন; কিন্তু ঢাকায় তা দুষ্প্রাপ্য হওয়াতে হকারকে বলে রেখেছিলেন ‘অবজারভার’ দিতে। এরই মধ্যে ‘সংবাদ’র আবির্ভাব। কিন্তু পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভেতরে যেমন ‘সংবাদ’_ এও তেমনি একটা দ্বন্দ্ব ছিল। মালিকানা ছিল মুসলিম লীগপন্থি। কিন্তু কাগজের রুচি আধুনিক বাঙালির। রাজনীতিটা মুসলিম লীগের রুচি বাঙালির, অমীমাংসেয় এই দ্বন্দ্বটা অচিরেই একটা প্রকাশ্য রূপ নিল, বায়ান্ন সালে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল তখন। আমার মনে আছে বাইশে ফেব্রুয়ারিতে একুশে ফেব্রুয়ারির খবর সঠিকভাবে দেয়নি দেখে আমরা আজিমপুর কলোনিবাসী ছাত্ররা ‘আজাদ’ অফিসের সামনে হকারদের কাছ থেকে নিয়ে আজাদের সঙ্গে ‘সংবাদে’র বান্ডিলেও অগি্নসংযোগ করেছিলাম। সকল পার্থক্য সত্ত্বেও রাজনীতির কারণে ‘সংবাদে’ আর ‘আজাদে’ তখন পার্থক্য করা যায়নি।

এরপর এলো ১৯৫৪’র নির্বাচন। বায়ান্নতে যা ছিল অভ্যুত্থান চুয়ান্নতে তা রূপ নিল নির্বাচনের। এ ছিল ‘সংবাদে’র জন্য আরেক বিড়ম্বনা।
‘সংবাদে’র সঙ্গে যারা কর্মসূত্রে জড়িত ছিলেন তাদের অধিকাংশই কেবল যে লীগবিরোধী ছিলেন তা নয়, প্রায় সবাই আস্থা রাখতেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে, কেউ কেউ ছিলেন আরও অগ্রসর চিন্তার মানুষ, তারা বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্রে। কিন্তু ‘সংবাদ’ তো তাদের মুখ চেয়ে আত্মপ্রকাশ করেনি, তার লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগকে জয়ী করা। টাকা যে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, সেটা তো ওই লক্ষ্যেই। মুসলিম লীগ ভীষণভাবে পরাজিত হলো এবং ‘সংবাদ’ পড়ল বিপদে। সেই বিপদ কাটিয়ে ওঠার কঠিন কাহিনী এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারা জানেন, কেউ কেউ লিখেছেনও।

‘সংবাদ’কে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কেবল তাই নয়, রাজনীতি থেকে মুসলিম লীগের আপাত প্রস্থান ‘সংবাদ’র জন্য অগ্রযাত্রার পথ খুলে দিল। বিশেষভাবে খুশি হয়েছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীরা। তারা কেউ কেউ ‘সংবাদে’র সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন, যারা সেভাবে যুক্ত ছিলেন না তারাও এই দৈনিকটিকে আত্মীয়ের মতো ভাববার অবকাশ পেলেন, কারণ নতুন ব্যবস্থাপনায় যারা এলেন তারা সকলেই ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তাধারার লোক। মুসলিম লীগের একদা কর্তৃত্বের কোন চিহ্নই ওই দৈনিকে আর রইল না। দীর্ঘদিন পরে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে কমিউনিস্ট রাজবন্দিদের কেউ কেউ অন্য ঠিকানার অভাবে ও সন্ধানে ‘সংবাদ’ কার্যালয়েই চলে আসতেন। মুক্ত হয়ে শহীদুল্লা কায়সার তো ‘সংবাদের’ সম্পাদনার সঙ্গেই যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। একই ঘটনা রণেশ দাশগুপ্তের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। একাত্তরে শহীদুল্লা কায়সার শহীদ হন। রণেশ দাশগুপ্তও হতেন যদি দেশত্যাগ না করতেন।

একাত্তরের হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকেরা ‘সংবাদ’ অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়। তাতে অফিসের এবং প্রেসের ক্ষতি তো হয়ই, শহীদ হন শহীদ সাবের। প্রতীকের মতো ঘটনা বটে। শহীদ সাবের যখন ছাত্র, একেবারেই কিশোর তখনই কমিউনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে কারাবন্দি হয়েছিলেন। সেটা সাতচলি্লশের অল্প কিছুদিন পরের ঘটনা। দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। একাত্তরে যখন আমরা পুনরায় স্বাধীনতার পথে এগুচ্ছি তখনও শহীদ সাবেরের জন্য থাকবার মতো কোন জায়গা ছিল না। পঁচিশে মার্চের রাতে পাখি যেমন বাসায় ফিরে আসে তেমনিভাবেই তিনি ‘সংবাদ’ অফিসে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই ছিলেন আঠাশ তারিখের সকাল পর্যন্ত, তারপরে আর থাকা সম্ভব হয়নি। কেননা হানাদাররা অগি্নসংযোগ ঘটিয়েছিল। তিনি ঘুমিয়েছিলেন, ঘুমন্ত অবস্থাতেই অগি্নদগ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করেন। সাতচলি্লশের পরে তিনি বন্দি হয়েছিলেন, একাত্তরে তিনি শহীদ হলেন।

হানাদারদের বিশেষ ক্রোধ ছিল, ‘দি পিপল’ নামের একটি ইংরেজি দৈনিকের ওপর। ওই পত্রিকাটি আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল, এবং একাত্তরের ঘটনাগুলো অত্যন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে তুলে ধরত। পঁচিশের রাতেই তারা ওই পত্রিকার অফিসে আগুন লাগায়। ছয় দফার ব্যাপারে প্রথম দিকে ‘ইত্তেফাক’ কিছুটা দোদুল্যমান ছিল বলে মনে হয়, পরে সে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পুরোপুরি সমর্থন করে; স্বভাবতই ওই পত্রিকাও আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু ‘সংবাদে’র স্বত্বাধিকারী এবং পরবর্তীতে সম্পাদক আহমদুল কবির আওয়ামী লীগের নয়, ন্যাপের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ‘সংবাদ’ও রেহাই পায়নি, স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রীরা তখন পৃথক ছিলেন না। হানাদাররাও উভয়কে একই চোখে দেখত। স্বভাবতই।

চুয়ান্নর পর থেকে ‘সংবাদে’র জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের আমলে ‘দৈনিক পাকিস্তান’ প্রকাশিত হয়। সেটিও মধ্যবিত্তের রুচিকে ধারণ করত। ওই দৈনিকে শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমান কাজ করতেন। প্রাণের তাগিদে নয়, জীবিকার প্রয়োজনে। সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। কিন্তু ‘দৈনিক পাকিস্তানের’ রাজনীতিটা ছিল সামরিক শাসনের পক্ষে, সেজন্য আকারে-প্রকারে-আচরণে আধুনিক হলেও দৈনিকটি ‘সংবাদে’র গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ‘সংবাদ’ তখন ঢাকায় নয় শুধু মফস্বলের সুদূর প্রান্তেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এক সময়ে ‘আজাদ’ পড়া যেমন লোকের অভ্যাস ছিল, চুয়ান্নর পর থেকে ‘সংবাদ’ পড়া তেমন অনেকের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে বামপন্থিরা ‘সংবাদ’কে পছন্দ করতেন। আজাদের ছিল ‘মুকুলের মহফিল’ সেটি ততদিনে মস্নান হয়ে গেছে। ‘ইত্তেফাকে’র ছিল ‘কচি-কাঁচার আসর’, সেটি কিশোরদের আকৃষ্ট করত; কিন্তু ‘সংবাদে’র ‘খেলাঘরে’র প্রতি বামপন্থিদের সমর্থন থাকায়, ওই পাতাটি একটি নতুন ভূমিকা পালন করা শুরু করেছিল।

একাত্তরের ‘সংবাদ’ গণহত্যার পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, নতুন করে বের হলো স্বাধীনতার পরে। আগে তার অফিস ও ছাপাখানা ছিল পুরাতন ঢাকার বংশালে, তাকে বলা যেত পুরাতন ঢাকার শেষ প্রান্ত। স্বাধীনতার পর ঢাকা ছুটেছে উত্তরমুখো। ‘সংবাদ’কেও কিছুদিন পরেই চলে আসতে হয়েছে বংশাল ছেড়ে পুরানা পল্টনে। সেখান থেকে তার আরেক যাত্রা শুরু, যে যাত্রায় সে আগের মতোই জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী রইল। কিন্তু তার পক্ষপাত ছিল সমাজতন্ত্রের প্রতিই। যেজন্য বামপন্থি মহলে তার কদর বাড়ল।

২.
‘সংবাদে’র সঙ্গে আমার নিজের সম্পর্কটি ছিল প্রথমে পাঠকের, পরে কেবল পাঠক নয়, পরিণত হয়েছিলাম লেখকেও। সূত্রপাত শুরুর কাছাকাছি সময়েই। সেই একান্ন সালেই। তখন আমি স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকেছি। ‘সংবাদে’র ঈদ সংখ্যা বের হবে জেনে আমি একটি লেখা পাঠিয়েছিলাম ‘খেলাঘরে’র জন্য। খেলাঘরের আমি সদস্য ছিলাম না, নবীন লেখক হিসেবেই আমার ওই রচনা প্রেরণ। লেখার নামটা পরিষ্কার মনে আছে ‘রচনাতেও বিপদ আছে।’ ওই বয়সে আমি কিশোরদের জন্য লিখা শিবরাম চক্রবর্তী এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। তাদের আদলেই একজন বচনবিলাসী ও ভঙ্গিপ্রিয় মামাকে নিয়ে গল্পটি সাজিয়েছিলাম। এই মামার শখ হয়েছিল তিনি লেখক হবেন, উপদেশাত্মক ও বিরক্তিকর একটি প্রবন্ধ লিখে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন, পরে ওই রচনাই তার বিপদ ডেকে এনেছিল, এবং সেটা আমারই কারসাজিতে_ গল্পটা এই রকমের। ঈদ সংখ্যা বের হলো, কিন্তু দেখা গেল তাতে আমার লেখাটি নেই; লব্ধপ্রতিষ্ঠ এবং সদস্যদের রচনাতেই ‘খেলাঘরে’র দু-তিন পাতা ভরপুর।

পরের সপ্তাহে অবশ্য লেখাটা ছাপা হয়েছিল। তখন মন ভরে গিয়েছিল খুশিতে। তার কারণ গল্পের সঙ্গে হেডপিস হিসেবে চমৎকার একটি ছবি ছিল। সেকালে ঢাকা শহর একেবারেই ভিন্ন ধরনের ছিল। সংবাদপত্রে হাতে অাঁকা ছবি ছাপানো ছিল কষ্টসাধ্য কাজ; পাতার সম্পাদক হাবীব ভাই আমার গল্পটিকে সচিত্র আকারে মুদ্রিত করে লেখার মর্যাদাটা বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন_ আমার নিজের দৃষ্টিতে তো বটেই। মর্যাদা অবশ্য আরও বৃদ্ধি পেল যখন এই লেখার জন্য আবার সম্মানীও পাওয়া গেল।

সে ঘটনাটাও বেশ নাটকীয়। আমরা আজিমপুর কলোনিতে তখন ছাত্র সংঘ নামে প্রতিষ্ঠান গড়েছি। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে নানা রকমের অনুষ্ঠান করা হতো। তারই একটির খবর দিতে এক বন্ধুর সঙ্গে আমি গেছিলাম ‘সংবাদ’ অফিসে। সেই বিকেলে হাবীব ভাই ছিলেন শিফট-ইন-চার্জ। খবরের বিজ্ঞপ্তিটি পড়ে তিনি বলেন, ‘ভাল কথা, কিন্তু নিয়ম তো এই যে সংবাদদাতার নাম-ঠিকানা তো লাগবে।’ টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আমি নাম-ঠিকানা লিখলাম এবং সেটি অবলোকন করে হাবীব ভাই সুমিষ্ট কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি কি লেখ?’ আমি বুঝি ওই প্রশ্নটির অপেক্ষাতেই ছিলাম, লজ্জিতভাবে বললাম, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি চমকপ্রদ খবরটি দিলেন, ‘তোমার লেখার জন্য বিল করা হয়েছে, এসে নিয়ে যাও।’ আমি তো বটেই, সঙ্গের সাথীটিও বিস্মিত হলো। লেখা ছাপা হয়েছে সেই তো অনেক বড় ব্যাপার, তার ওপর আবার সম্মানী? বলা বাহুল্য, লেখার জন্য সরকার প্রকাশনা ‘মাহে নও’-এর বাইরে তখন নিয়মিত সম্মানী প্রদান’র ব্যবস্থা অন্য পত্রিকায় তেমন একটা ছিল না। ‘সংবাদ’ই প্রথম পেশাদারিত্বের ওই ব্যাপারটাকে স্বীকৃতি দেয় বলে আমার মনে পড়ে।

টাকা তো পাবো? কিন্তু কবে পাবো জানবো কি করে? বুদ্ধি করে একটা কাজ করেছিলাম। একটি খামের ভেতর ঠিকানা লেখা পোস্টকার্ড ভরে হাবীব ভাইয়ের নামে সংবাদ অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, প্রদানের জন্য অর্থ যখন প্রস্তুত থাকবে তখন তা ওই পোস্টকার্ডের মাধ্যমে তামাকে জানানোর অনুরোধসহ। কয়েকদিন পর হাবীব ভাইয়ের পরিষ্কার হস্তাক্ষরে খবর এলো ক্যাশিয়ারের সঙ্গে দেখা করলে টাকা পেয়ে যাব।

দেখা করেছিলাম। এবারও সঙ্গে এক বন্ধু ছিল। ধুরু ধুরু বক্ষে যাচ্ছি। ক্যাশিয়ার সাহেব যদি বলেন ঘুরে আসুন, অথবা আরেকদিন আসবেন তাহলেই তো হয়েছে কাজ। তা তেমন কোন বিপত্তি ঘটেনি। ক্যাশিয়ার ভদ্রলোক মনে হলো পশ্চিমবঙ্গের লোক, বয়স্ক এবং হাসিখুশি। প্রসন্ন মনে ভাউচার এগিয়ে দিলেন, সই করে টাকাও পেয়ে গেলাম। কত টাকা ‘পাঁচ, নাকি দশ’ পাঁচ টাকা ভাবতে খারাপ লাগে, আবার আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে দশ টাকার তো অনেক মূল্য, অত টাকা পেয়েছিলাম ভাবতেও সাহস হয় না। যাই হোক পেলাম। এর আগে বৃত্তির টাকা পেয়েছি, পুরস্কার হিসেবে বইও যে দু’চারটে পাইনি তা নয় কিন্তু লিখে টাকা পাওয়ার অভিজ্ঞতা ওই প্রথম। সেই সুখস্মৃতি এখনও অমলিন।

এর পরে ‘সংবাদে’ তেমন একটা লেখা হয়নি। ‘মাহে নও’তে গল্প বের হয়েছে। ‘সওগাতেও’ একটি বের হয়েছিল। ‘দ্যুতি’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা আমরা কয়েকজন মিলে সম্পাদনা করতাম। তাতে লিখেছি, সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এ তো অনবরতই লিখতাম।

সব সময়েই আমার একটা ঝোঁক ছিল বেনামীতে লেখার দিকে। তাতে অনেক সুবিধা থাকে, আমি জানতাম। আমার বন্ধু মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ মাসিক ‘পূবালী’ সম্পাদনা করতেন, তাতে আমি ‘ঢাকায় থাকি’ নাম দিয়ে একটি লেখা লিখতাম, প্রতি মাসে, নিয়মিত। লেখকের নাম ছিল ‘নাগরিক’। তাতে বিশেষভাবে সে-সময়ের তরুণদের, যারা নিজেদের হাঙ্গরি ব্যাঙ্গরি ইত্যাদি বলতো, তাদের লেখা নিয়ে কটুকাটব্য করা হতো। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আবার বিলেত থেকেও একবার ঘুরে এসেছি। তাই আমার ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’ দেখে তরুণরা ক্ষোভ প্রকাশ করতো, অথচ আমার ধারণা ছিল প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিচয় তারাই দিচ্ছে, দায়িত্বহীন রচনায় আত্মনিয়োগ করার মধ্য দিয়ে। দৈনিক পাকিস্তান যখন বের হলো তখন আমি সাপ্তাহিক একটি কলাম লিখলাম, ‘মিতভাষী’ নাম দিয়ে। কিন্তু কয়েক মাস পরে আমার দ্বিতীয় বার বিলেত গমন ঘটে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এবং তখন স্বভাবতই কলাম লেখা বন্ধ হয়ে যায়। ফিরে এসে ঊনসত্তর সালের দিকে ‘দৈনিক পূর্বদেশে’ একটি কলাম লেখা শুরু করি, সেটিও ছদ্মনামেই।
এ কাহিনী একথাটাই বলছে যে, কলাম লেখার আগ্রহটা বরাবরই ছিল। সেটি একটি বিশেষ রূপ ধারণ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে, যখন ‘সংবাদ’-এ আমি ‘গাছপাথর’ ছদ্মনামে ‘সময় বহিয়া যায়’ কলামটি লেখা শুরু করি। লেখক হিসাবে সংবাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটি অবশ্যই অগি্নদগ্ধ ধ্বংসাবশেষ থেকে যখন নতুন উদ্যম, উৎসাহ ও অঙ্গীকার নিয়ে ‘সংবাদ’ পুনরুজ্জীবিত হয় তখন থেকেই। পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন আবুল হাসনাত। তার আগ্রহ ছিল ‘সংবাদ’র সঙ্গে আমাকে যুক্ত করবার। তখন আমি লিখতে শুরু করি। আরও একটি ঘটনা ঘটে সেটি ওই যে লেখক হিসাবে আমার প্রথম সম্মানী প্রাপ্তি সেটির মতোই উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটি এই যে, এবার কেবল সম্মানী নয়, সৌজন্য সংখ্যাও পাওয়া শুরু করলাম। দৈনিক পাকিস্তানে আমার বন্ধু আফলাতুম ‘সাত ভাই চম্পা নামে’ কিশোরদের পাতা সম্পাদনা করতেন। তার তৎপরতায় বিলেতে থাকতে দৈনিকটির সৌজন্য সংখ্যা পেতাম। তবে তা পাওয়া যেত দু’তিন মাস পরপর, কেননা যেত সে জাহাজে করে। ঢাকায় বসে প্রতিদিন, খুব সকালে সৌজন্য সংখ্যা পাওয়া ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। সংবাদের সম্পাদক আহমদুল কবিরকে জাতীয় বুর্জোয়াদের একজন বললে অত্যুক্তি করা হবে না; তার কারণেই লেখকরা ওভাবে কাগজ পেতেন।

আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা জমে আরেক দিক থেকে। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা তখন নানা ধরনের বই ছাপাতেন এবং একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশেও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাঁর ওই উদ্যোগের সঙ্গে হাসনাত এবং আমি উভয়েই যুক্ত ছিলাম। ‘সাহিত্যপত্র’ নামে যখন ত্রৈমাসিকটি আত্মপ্রকাশ করলো তখন আমাকে করা হয়েছিল সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি, সম্পাদনার সঙ্গে অন্য যারা যুক্ত ছিলেন তাদের নাম ছাপা হতো না, কিন্তু তাদের মধ্যে ছিলেন শিল্পী হাশেম খান, সামছুজ্জামান খান এবং আবুল হাসনাত। চিত্তরঞ্জন সাহা তো ছিলেনই, আমার স্ত্রী নাজমা জেসমিনও ছিলেন। সম্পাদনা পরিষদের বৈঠক মাসে অন্তত একবার বসতো, এবং সুবিধাজনক স্থান হিসাবে আমাদের বাসাতেই তার অনুষ্ঠান ঘটতো। হাসনাতের দক্ষতা ও ভদ্রতা ছিল অসাধারণ। এক সময়ে তার চিন্তায় এলো ‘সংবাদ’-এ আমার একটি কলাম লেখা দরকার। এর আগে জহুর হোসেন চৌধুরী ‘দরবার-এ-জহুর’ নামে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কলাম লিখতেন। কিন্তু ১৯৮০-তে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখতেন ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ সেটিও জনপ্রিয় ছিল। সন্তোষ গুপ্তও লিখতেন, তার লেখাও পাঠকেরা খুব পছন্দ করতো। কিন্তু হাসনাত কর্তৃপক্ষ এবং আমাকে বোঝালেন যে, আরও একটি কলাম থাকা ভালো।

তার সঙ্গে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমানের সঙ্গে আলাপ করে এলাম। ঠিক হলো প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার বের হবে কলাম। রবিবার লেখা তৈরি থাকবে, ‘সংবাদের লোক গিয়ে নিয়ে আসবেন। সেই যে শুরু হলো তারপর একটানা চৌদ্দ বছর ওই আমি কলাম নিয়মিত লিখেছি। মাঝখানে বিরতি পড়েছে শুধু দু’সপ্তাহ, ওই সময়ে ১৯৮৯-এর ১২ সেপ্টেম্বরে আমার স্ত্রী নাজমা জেসমিনের অতি অপ্রত্যাশিত ও অকাল মৃত্যু ঘটে। কোন দুর্ঘটনায় নয়, ক্যান্সারের কারণে। মৃত্যুর দিন অনেকেই এসেছিলেন। হাসনাতও এসেছিলেন, অফিস থেকে সরাসরি; এসে আমার কাছে দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে যে কথাটি বলেছিলেন তা এখনও মনে আছে, বলেছিলেন, ‘দুপুর বেলা রেডিওতে হঠাৎ খবরটা শুনেছি, এখানে আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে মনে আশা করেছিলাম হয়তো ভুল শুনেছি।’

এখন ফিরে দেখি ‘সংবাদে’র এই কলাম লেখার সময়ে আমি বেশ সৃষ্টিশীল ছিলাম। একবার চার সপ্তাহের জন্য আমরা কয়েকজন লেখক চীন ও উত্তর কোরিয়াতে গিয়েছিলাম, যাওয়ার আগে চার সপ্তাহের লেখা জমা দিয়ে গিয়েছিলাম, কোনটির পর কোনটি ছাপা হবে তার ক্রমনির্দেশ করে। বেইজিং-এ আমাদের দূতাবাসে ‘সংবাদ’ যেতো, সেখানে গিয়ে চোখে পড়েছে যে আমার কলাম ছাপা হয়েছে। যে দু’সপ্তাহ লেখা বন্ধ ছিল তার শেষ দিকে অফিস থেকে যিনি আসতেন লেখা নিয়ে যেতে তিনি যখন এলেন দেখি তার চোখে অশ্রু, আমার স্ত্রীর সঙ্গে তার আর কোনোদিন দেখা হবে না ভেবে। এমনই একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আমাদের মধ্যে। আমাদের ওই কলামের ভাবটা ছিল এই রকমের যে, সময়ের স্রোত বয়ে চলেছে, যেমনটা তার চলবার কথা, আর আমি, বয়সের যার গাছপাথর নেই সে তা দেখছি, তবে নীরবে নয়, স্বগোতোক্তির মতো মন্তব্য সহকারে। বাংলাদেশে তখন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতায় এনামে ওনামে যারা ক্ষমতায় আসা যাওয়া করছেন তারা সকলেই নিজেদেরকে জাতীয়তাবাদীই বলেন; কিন্তু সমাজের তো এগিয়ে যাবার কথা ছিল আরও সামনে; সমাজ এগিয়ে না গিয়ে বরঞ্চ যেন পিছিয়েই যাচ্ছে। এইটা ছিল মূল বক্তব্য। সমস্যা ও লক্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা করতাম এবং সমাধানের কথাও বলতে চাইতাম। সমাধানের নির্দেশিত কাঠামোটা ছিল সমাজতান্ত্রিক, সমাজতন্ত্র ততদিনে তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এমন কী ‘সংবাদ’- অফিসেও এক সময়ে যারা সমাজতন্ত্রের পক্ষে লিখতেন তাদের কেউ কেউ তখন বিপক্ষে লেখা শুরু করেছেন। কিন্তু আমি দেখেছি আমার লেখায় কখনও কাটছাঁট করা হয়নি, শুধু একবার বজলুর রহমান বলেছিলেন যে, একটি লিখা নিয়ে তার ইচ্ছা হয়েছিল আমার বাসায় এসে তর্ক বাধাবেন, কিন্তু সেটা না করে যা লিখেছিলাম তাই ছেপে দিয়েছিলেন। আহমদুল কবির ওই কলাম পছন্দ করতেন। কখনও কখনও তিনি বিদেশী সংবাদপত্রের ক্লিপিং পাঠিয়েছেন। দুপুরে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং একবার তার বাসাতেই আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে পরামর্শের জন্য দুপুরের খাবার আয়োজন করেছিলেন। যাতে আমি উপস্থিত ছিলাম। লায়লা কবিরের চমৎকার কিচেনে দেখেছিলাম কোন খাদ্যে কত ক্যালরি আছে তার একটি তালিকা টানানো রয়েছে ভোজনরসিকদের সতর্ক করে দেবার জন্যই হয়তো। ‘সময় বহিয়া যায়’ লিখে আমি বিস্তর আনন্দ পেয়েছি। সম্মানীর টাকাও পাওয়া যেত নিয়মিত এবং মাঝে মাঝে দেখতাম অঙ্কটি বর্ধিত হয়েছে, সে ব্যাপারটারও মনে হয় একটা ধারাবাহিকতা ছিল। বেশ কিছু চিঠিপত্র আসতো। সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন ওই বিভাগের দায়িত্বে, তিনি সেগুলো ছেপে দিতেন, আর যেগুলোর ওপর ‘ব্যক্তিগত’ লেখা থাকতো সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন আমার বাসায়।
সে সময়টা এখন আর নেই। এখন অনেক পত্রিকা, অনেক কলাম। কিন্তু এখনও খুব ভাল লাগে যখন কেউ বলেন ওই সময়ে ওই লিখাগুলো তিনি পড়তেন। বুঝতে পারি লেখাগুলো বৃথা যায়নি। পরবর্তীতে অনেক লেখাকেই বর্ধিত করে আমার বিভিন্ন বইয়ে চালান করে দিয়েছি।

আমার নিজের জীবনের মতো পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্তের জীবনেও ‘সংবাদ’ একটি ভূমিকা পালন করেছে, যেটি একাধিক অর্থেই ঐতিহাসিক বটে। বলাই বাহুল্য যে, নিজেকে আমি ওই শ্রেণীর একজন সদস্য হিসেবেই দেখি।