মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল
মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের পাতক্ষীরের স্বাদ যারা নিয়েছেন তাদের পক্ষে পাতক্ষীরের কথা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। শুধু দুধ দিয়ে তৈরি এ সুস্বাদু খাবারের চাহিদা সুদূর ইউরোপেও। শতাব্দীর প্রসিদ্ধ এই খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দেশ-বিদেশে। একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামেই তৈরি হয় বিশেষ এই মুখরোচক খাবার। মুন্সীগঞ্জের নানা উৎসবে এ ক্ষীরের উপস্থিতি না থাকলে যেন অসম্পূর্ণ থাকে সে উৎসব।

সব মওসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে চাহিদা বেড়ে যায়। বাঙালি ঐতিহ্যের পাটিসাপটা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। নতুন জামাইয়ের সামনে পিঠাপুলির সঙ্গে এ ক্ষীর না দিলে অপূর্ণ থাকে খাদ্য তালিকা। মুড়ির সঙ্গেও এ ক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি রয়েছে।

সন্তোষ গ্রামের সাতটি পরিবার এখন এই ক্ষীর তৈরির সঙ্গে জড়িত। পুলিনবিহারী দেব প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে এ ক্ষীর তৈরি করে বিক্রি করতেন বলে তার উত্তরসূরিরা জানান। সে শত বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্র মোহন ঘোষ, লক্ষ্মীরানী ঘোষও তৈরি করতেন পাতক্ষীর। তারা সবাই প্রয়াত। কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ সাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মদুসূদন ঘোষ, সমীর ঘোষ ও ধনা ঘোষ এখন এ পেশায় রয়েছেন। সুনীল ঘোষের ৫ ভাই এ পেশায়। ক্ষীর তৈরিতে পারদর্শী পারুল ঘোষ বলেন, একখ- পাতক্ষীর তৈরিতে তিন কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। অনেকক্ষণ জ্বাল দিতে হয় এ দুধ। তিন কেজির দুধের সঙ্গে ৫০ গ্রাম চিনি ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না এ ক্ষীর তৈরিতে। তবে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে চিনিও দেওয়া হয় না। জ্বাল দেওয়ার এক পর্যায়ে দুধ ঘন হয়ে এলে মাটির দৈয়ের পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে রাখা হয়। ঘণ্টাখানেক পর ঠা-া হলে তা কলাপাতায় পেঁচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতের যশ ও কৌশলের কথাও বলেন কারিগররা। ঘন করতে গেলে চুলায় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে নাড়তে হয় অনবরত।

তৈরি হওয়ার পর কলাপাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই ক্ষীরের নাম হয়েছে পাতক্ষীর, বললেন ভারত ঘোষ। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরি হয় ৫০টিরও বেশি। প্রতিটি ক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পিস পাতক্ষীরের মূল্য ১শ থেকে ১শ ২০ টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষীরের দামও। ঘরের বউরা এ ক্ষীর তৈরিতে কষ্ট করেন বেশি।

হাড় ভাঙা পরিশ্রমের পর তৈরি হয় এ ক্ষীর। তবে প্রতিটিতে ১০/৫ টাকার বেশি লাভ হয় না। দোকানে নিয়ে বিক্রি ছাড়াও বাড়িতে এসেও অর্ডার দিয়ে থাকে অনেকে।
নয়নতারা ঘোষ বলেন, আমেরিকা, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপান থেকেও এ ক্ষীরের অর্ডার আসে। পারুল ঘোষ বলেন, আমরা কষ্ট করে এ ক্ষীর তৈরি করলেও আমাদের মেয়েদের তা শিখাই না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে পড়ে। তবে এ বাড়ির বউ হিসাবে যারা আসেন তাদেরই এ কাজ শেখার রীতি।

সাপ্তাহিক ২০০০

[ad#bottom]