ফজল একজন ড্রাইভার।

আলো ভুবন ভরা
ইমদাদুল হক মিলন
এক ভদ্রলোকের প্রাইভেটকার চালায়। মালিকের নাম হায়াত হোসেন। তাঁর বাড়ির কাছাকাছি মেসে থাকে। ভোরবেলা এসে মালিকের মেয়েকে গাড়ি চালিয়ে স্কুলে নিয়ে যায়, আবার এগারোটার দিকে গিয়ে নিয়ে আসে। তারপর বেরোয় ভদ্রলোককে নিয়ে। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে সারা দিন ব্যস্ত থাকেন। এদিক যান, ওদিক যান। তাঁর সঙ্গে গাড়ি নিয়ে দৌড়াতে হয় ফজলকে। সপ্তাহের ছুটিটাও সব সময় পায় না সে। ছুটির দিনে ভদ্রলোকের স্ত্রী বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেড়াতে বেরোন। তবে তাঁরা মানুষ ভালো। ছুটির দিনে কাজ করলে তাকে পঞ্চাশ-এক শ টাকা বখশিশ দেন। এই টাকাটা সে জমিয়ে রাখে। মাসে সব মিলিয়ে বখশিশ সে পায় হয়তো দেড়-দু শ টাকা। এটুকুই সে জমাতে পারে, এর বাইরে দশটা টাকাও জমানোর সুযোগ নেই। বেতন যা পায় সেই টাকায় সকাল আর রাতের খাবার এবং মেস ভাড়া। দুপুরে খাওয়ার জন্য মালিক পঞ্চাশ টাকা করে দেন, পঞ্চাশ টাকা খাওয়ায়ই চলে যায়। ফজল গোবেচারা, চুপচাপ ধরনের মানুষ। গাড়ি চালায় খুবই মন দিয়ে, অতি সাবধানে। এত বছরের ড্রাইভার, জীবনে কোনো অ্যাকসিডেন্টের ঘটনা নেই। তেল-গ্যাস চুরি, গাড়ির এটা নেই-ওটা নেই বলে বেশির ভাগ ড্রাইভার টুকটাক যে চুরিটা করে, এটা ফজল কোনো দিনও করে না। খুবই সৎ লোক সে। ফজলের বয়স ৩৫-৩৬ বছর। পিরোজপুরের এক গ্রামে বাড়ি। সে যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখন বাবা মারা যান, এইটে পড়ার সময় মারা যান মা। তারা তিন ভাইবোন। বড় ভাই মানসিক প্রতিবন্ধী। দুই ভাইয়ের মাঝখানে একমাত্র বোন। মা বেঁচে থাকতে বোনটির বিয়ে হয়েছিল এক গৃহস্থ পরিবারে। সুখেই ছিল বোনটি। বৃষ্টির সন্ধ্যায় গোয়ালঘরের ওদিকে গেছে কাজে, বিষাক্ত সাপে ছোবল দিল। ওঝা ডাকার আগেই মুখ দিয়ে ফেনা উঠে বোনটি মারা গেল। ফজলদের অভিভাবক তখন তাদের একমাত্র চাচা। এই চাচা তার বাবার ছোট ভাই। একই বাড়িতে বসবাস। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচা-চাচি ফজলের বাপ-মায়ের ভূমিকা নিয়েছেন। চাচাতো ভাইবোনরা তাদের সব সময়ই আপন ভাইবোনের মতো দেখে আসছে। কোথাও কোনো বিরোধ নেই। ফজলের প্রতিবন্ধী ভাইটিকে সবাই জান-পরান দিয়ে আগলে রাখে।

একসময় ফজলের পড়াশোনার খরচ আর চালাতে পারছিলেন না চাচা। তারা গরিব গৃহস্থ। চাষের জমি বলতে গেলে নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। আধাআধি ফসল পান। তাতে বছর চলা মুশকিল। বাধ্য হয়ে রোজগারের পথ দেখতে হলো ফজলকে। কিন্তু ক্লাস এইটের বিদ্যা নিয়ে কী কাজ করবে সে? কী রোজগার করবে? কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করে সে ঢাকায় এল। দূরসম্পর্কীয় এক আত্দীয়র কাছে উঠেছে। সেই আত্দীয় নামকরা এক কম্পানির মাইক্রোবাস চালায়। ফজলের মুখে সব শুনে তাকে দিল ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি করে। ফজল একসময় ড্রাইভার হয়ে গেল। দু-তিন জায়গায় দেড়-দুবছর করে কাজ করে শেষ পর্যন্ত আজ চার বছর হায়াত সাহেবের গাড়ি চালাচ্ছে। নিজে একটি বাড়তি পয়সা খরচ করে না। সাত বছর আগে বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে হয়েছে। বউ-মেয়ে থাকে গ্রামের বাড়িতে। বউটি আপন বড় ভাইয়ের মতো আগলায় ফজলের প্রতিবন্ধী ভাইটিকে। আর প্রতিবন্ধী ভাইটি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে ফজলের ওইটুকু মেয়েটিকে। মেয়েটি সারাক্ষণ চাচার কোলে। ওদিকে ফজলের চাচার সংসারে অভাব-অনটন বেড়েছে। চাচার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। চাচার একমাত্র ছেলেটির নাম রুস্তম। ফজলের চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। বাজারের ধান-চালের আড়তে কাজ করত। বিয়ে করেছে, বাচ্চার বাপ হবে, এ সময় ভয়ংকর এক দুর্ঘটনা ঘটল রুস্তমের জীবনে। মালবাহী নৌকা থেকে ধানের বস্তা মাথায় করে নামাচ্ছিল। পা পিছলে পড়ল বস্তা নিয়ে। ঘাড়টা পড়ল বেকায়দায়। বহু চিকিৎসায় সে ঘাড় সোজা তো হলোই না, ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে গেল রুস্তম। এখন হাঁটাচলাও করতে পারে না। মা-বাবা কিংবা অল্পবয়সী বউটি ধরে ধরে ঘর থেকে বের করে, ধরে ধরে ঘরে নেয়। রোজগারপাতি বন্ধ। ফলে নিজের সংসার আর চাচার সংসার দুটোই সামলাতে হয় ফজলকে। বেতনের টাকা থেকে সে জমাবে কেমন করে? নিজের খরচ বাদ দিয়ে যেটুকু থাকে ওই টাকায় দুটো সংসারই চলে না। তিনবেলা ভরপেট খেতে পায় না বাড়ির লোকজন। দুই ঈদে বোনাসের টাকা পায় ফজল। রোজার ঈদে বেতনের সমান, কোরবানির ঈদে বেতনের অর্ধেক। ওই পয়সায় বাড়ির সবার জন্য বছরের জামাকাপড়টা কেনে।

এই ফজলের হাতে হঠাৎই এল এক দুর্দান্ত সুযোগ। হায়াত সাহেবের অফিসে তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধু মামুন সাহেব এসেছেন। সঙ্গে গাড়ি নেই। হায়াত সাহেব বললেন, ফজল, তুমি আমার বন্ধুকে তাঁর বাড়িতে পেঁৗছে দিয়ে আসো। রাত হয়ে গেছে। প্রথমে আমাকে বাড়িতে নামাও, তারপর তাঁকে নামিয়ে দিয়ে আসো গেণ্ডারিয়ায়। তবে ওর কিছু কেনাকাটা আছে। তুমি গাড়িতে বসো, ও কেনাকাটা সারবে।

ঠিক আছে স্যার।

মামুন সাহেবকে নিয়ে ধানমণ্ডি থেকে রওনা দিয়েছে ফজল। মামুন সাহেবের হাতে একটা শপিং ব্যাগ। ধানমণ্ডির ওদিককার দোকান থেকে প্রচুর কেনাকাটা করলেন তিনি। চার-পাঁচটা শপিং ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে চড়লেন। ফজল তাঁকে গেণ্ডারিয়ায় নামিয়ে দিয়ে এল। মামুন সাহেব শপিং ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে নেমে গেলেন। ফজল গাড়ি নিয়ে ফিরছে। গাড়ি পার্ক করে অভ্যাসমতো গাড়ি চেক করতে গেছে, দেখে পেছনের সিটের পায়ের কাছে একটা শপিং ব্যাগ রয়ে গেছে। ব্যাগটা তুলে দেখে, ব্যাগে দুই প্যাকেট চা আর চায়ের প্যাকেটের আড়াল থেকে একটা পাঁচ শ টাকার বান্ডিল উঁকি দিচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে চায়ের প্যাকেট সরিয়েছে সে। দেখে একটা বান্ডিল নয়, অনেক বান্ডিল। আশ্চর্য ব্যাপার, এতগুলো টাকা শপিং ব্যাগে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। আর কেমন ভুলো মন, অন্যান্য শপিং ব্যাগ ঠিকই হাতে নিলেন, আসলটাই ফেলে গেলেন!

জীবনে এই প্রথম ফজলের অদ্ভুত একটা লোভ হলো। দূরে গেটের কাছে বসে আছে দারোয়ান, যাতে সে দেখতে না পায় এমন ভঙ্গিতে শপিং ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে বান্ডিলগুলো গুনল সে। চৌদ্দটা বান্ডিল। সাত লাখ টাকা। এই টাকায় জীবন বদলে যেতে পারে ফজলের। টাকাটা নিয়ে গ্রামে গিয়ে গঞ্জের বাজারে ভালো একটা দোকান করতে পারে। দোকানের আয়ে তার এবং চাচার পরিবারের চেহারা ঘুরে যেতে পারে। সচ্ছল জীবন হতে পারে দুঃখী-দুস্থ মানুষগুলোর। মামুন সাহেবের মতো মানুষের কাছে সাত লাখ টাকা কোনো টাকাই না। এ রকম কত সাত লাখ তিনি রোজগার করেন।

ফজল আর কিছুই ভাবল না। অনেক রাত হয়েছে, এত রাতে এতগুলো টাকা মেসে নিয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না। টাকার ব্যাগটা সে গাড়ির কেরিয়ারে খবরের কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখল। হায়াত সাহেব জীবনেও গাড়ির ডালা খুলবেন না। সুতরাং ওখানে কী আছে জানার প্রশ্নই ওঠে না।

গভীর উত্তেজনা নিয়ে মেসে ফিরে এল ফজল। রাতে আর ঘুমাতে পারল না। চোখের সামনে সাত লাখ টাকা দিয়ে জীবন গোছানোর স্বপ্ন। সকালবেলা মালিকের বাড়িতে এসেছে, গাড়ির চাবি রেখে যায় বাড়িতে, চাবি নিতে এসেছে, হায়াত সাহেব ডাইনিং টেবিলে বসে নাশতা করছেন আর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন। ফজল শুনতে পেল তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলছেন, মামুন কী করেছে জানো? সাত লাখ টাকা হারিয়ে ফেলেছে। এই টাকাটা সে রেখেছিল তাদের গ্রামে যে এতিমখানা আছে সেই এতিমখানায় দেওয়ার জন্য। ওর একটা বাজে স্বভাব হলো, টাকা ক্যারি করে শপিং ব্যাগে। যুক্তি হলো, শপিং ব্যাগে টাকা থাকলে কেউ সন্দেহ করবে না, এ রকম ব্যাগে টাকা থাকতে পারে। ছিনতাই হওয়ার ভয় নেই।

শুনে মুহূর্তে কেমন দিশেহারা হলো ফজল। মাথাটা যেন একটু ঘুরে উঠল। এতিমখানার টাকা? ওই টাকায় কতগুলো এতিম শিশুর হক। সেই হক ছিনিয়ে নিচ্ছে সে? না না, এ হতে পারে না। এ কোনো মানুষের কাজ না। এই টাকা দিয়ে নিজের জীবন বদলালেও সারা জীবন সে এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগবে। উঠতে-বসতে তার শুধু মনে হবে, সে কিছু এতিম শিশুর হক ছিনিয়ে নিয়েছিল। না না, এ কাজ সে করবে না।

খানিক পর টাকার ব্যাগটা নিয়ে হায়াত সাহেবের কাছে এল সে। বিনীত গলায় বলল, স্যার, মামুন স্যার এই টাকার ব্যাগ আমাদের গাড়িতে ফালাইয়া গেছিল। নেন, এইটা তারে ফিরত দিয়েন।

হায়াত সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী অবাক বিস্ময়ে ফজলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]