প্রতিক্রিয়া ছাত্রলীগ : একাল ও সেকাল

জয়নাল আবেদীন
বাংলাদেশ অর্জনে রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের অবদান সর্বাধিক। ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল মুখ্য। ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী বলেছিলেন ‘আওয়ামী লীগ সমুদ্র হলে ছাত্রলীগ তার উর্মিমালা’। ১৯৬৯-৭৬ পর্যন্ত অর্ধ যুগের বেশি সময় আমি ছাত্রলীগের কর্মকা-ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলন করেছি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে আমরাই জনমতকে সংগঠিত করেছি। নিজেরাই পোস্টার লাগিয়েছি, চিকা মেরেছি ও জনসভার মঞ্চ বানিয়েছি। এজন্যে একটি কানাকড়িও আওয়ামী লীগের নেতাদের থেকে আমরা নেইনি। নিজেদের লেখাপড়া ঠিক রেখে, বাপেরটা খেয়ে আমরা সংগঠন করেছি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছি ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে। স্বাধীনতার পরে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবেই পরপর দুবার একটি কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সহসভাপতি হয়েছি। ১৯৭২-৭৫ সালে আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য মন্ত্রীর পদমর্যাদায় জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তার এলাকার কলেজ সংসদের সহসভাপতি ও ছাত্রলীগের থানা কমিটির সভাপতি হিসেবে স্বভাবতই তার সঙ্গে আমার সখ্য ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ১৯৭২ সালে তিনি থানার প্রায় ১২-১৫ জনকে আমদানি লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তালিকায় আমার নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ তথ্য আমার আগে জানতে পারেন আমার গ্রামের ধনাঢ্য এক হাজি সাহেব ও আমাদের কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। তারা উভয়ে লাইসেন্স প্রাপ্তির পরে তা তাদের দিতে বলেন এবং বিনিময়ে অনেক অর্থের প্রলোভন দেখান। হাজি সাহেব ও ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেবের কথা সঠিক কিনা তা যাচাই করতে আমি তৎকালীন চিফ হুইপ সাহেবের মিন্টু রোডস্থ সরকারি বাসভবনে আসি। তাদের তথ্য সঠিকভাবে জানার পরে আমি তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিতে সবিনয় অনুরোধ করি। আমার মনোভাব টের পেয়ে তিনি অবাক হন এবং বলেন, ‘লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সবাই আমাকে পাগল করে তুলেছে আর আমি নিজ থেকে তোর নাম রেখেছি_ তা তুই নিবি না?’ প্রতি উত্তরে আমি জানাই যে, আমি ছাত্র, লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই আমার কাজ। লাইসেন্স-পারমিটবাজি করে ছাত্রজীবনে টাকা অর্থবিত্তের মালিক হওয়া আমার কাজ না।

০২
নিজের কথা নিজে বললাম এই কারণে যে, বর্তমানে পত্র-পত্রিকায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র-সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কর্মকা-ের যে সব খবর, মারামারি-খুনাখুনির ছবি দেখি_ তাতে নিজেকে একজন সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ভাবতে দারুণ লজ্জাবোধ করি। গতকাল (০৫.০৫.২০১০) তারিখে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগ নিজেরা নিজেদের ওপর যে বর্বর হামলা করেছে, তার ছবি দেখে সারাদিন মানসিক অশান্তিতে ভুগছি। ছাত্রজীবনে আমরা এ ধরনের হানাহানি তো কল্পনাও করতে পারতাম না। আমাদের সময়ে ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্রলীগ ভাগ হওয়ার পরে ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র) জাসদ-এর সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে- তবে এমন দা-ছেনি দিয়ে কোপাকোপি হয়নি কোনদিন। আমরা ছাত্রছাত্রীদের দলে ভেড়ানোর জন্য আদর্শকে সামনে তুলে ধরতাম। ভাল ব্যবহার, সামর্থ্যানুসারে উপকার করা, বক্তৃতা দিয়ে যুক্তি দিয়ে মটিভেট করে সংগঠনকে শক্তিশালী করতাম। ডর দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে কাউকে আমরা দলে ভিড়াইনি। ছাত্রজীবনে টাকা পয়সা কামানোর কথা তো আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন। এ সংগঠনকে যারা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে- হানাহানি-মারামারি করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে_ তাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে ছাত্রলীগকে তার পূর্ব চরিত্রে ফিরিয়ে আনার জন্য ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি।

[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও ডিএমডি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক]

[ad]