জমজমাট ‘সেক্স ট্রেড’ এইডস ঝুঁকি বাড়ছে

রাজধানীর চার শতাধিক আবাসিক হোটেল, অসংখ্য ফ্ল্যাট, রেস্ট হাউসে দেহ ও মাদক ব্যবসার সুযোগ করে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোয়ারা তুলছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা, মাহবুব আলম লাবলু

জাতীয় এইডস কমিটির মতে, দেশে এইডস ভাইরাস বাহকের সংখ্যা সহস্রাধিক এবং এইডস রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯ শতাধিক। ঘাতক ব্যাধি এইডসে এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তি মারা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে এইডস রোগীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার। আতঙ্কজনক এ পরিস্থিতিতে সরকার এইডসবিরোধী প্রচার-প্রচারণা চালালেও খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে এইডস ভাইরাস ছড়ানোর মূল ক্ষেত্র দেহ ও মাদক ব্যবসা চলছে যত্রতত্র। অবৈধ এ ব্যবসার সুযোগ করে দিয়ে মাসোহারা তুলছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা থেকে শুরু করে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও রামপুরার দেড় শতাধিক গেস্ট হাউসে চলে মদ, জুয়ার আসর ও দেহ ব্যবসা। এছাড়া চার শতাধিক আবাসিক হোটেলের পাশাপাশি দুই শতাধিক রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার, ম্যাসেজ পার্লার ও অসংখ্য ফ্ল্যাট, বাসাবাড়িতে দেহ ব্যবসা চলছে। বেসরকারি একটি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, নগরীর শতকরা ৮৫ ভাগ আবাসিক হোটেলে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে সাত হাজার খদ্দেরের সমাগম ঘটে। এসব হোটেলে পাঁচ হাজার দেহপসারিণী খদ্দেরের মনোরঞ্জনে নিজেদের বিলিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় কাটায়। যৌন ব্যবসায় লিপ্ত হোটেলগুলোর মাসিক আয় ছয় কোটি টাকা।

যৌনকর্মীদের স্বার্থ রক্ষার সংগঠন ‘দুর্জয় নারী সংঘে’র মতে, সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলগুলোতে একবার নারী দেহ ভোগ করতে খদ্দেরকে খরচ করতে হয়ে ২৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। খদ্দেরের দেওয়া টাকা তিন ভাগ হয়ে যায়। হোটেল ভাড়া বাবদ ১০০ টাকা, স্টাফ তহবিলে ৫০ টাকা, দেহপসারিণী ৮০ টাকা ও দালাল ২০ টাকা। দালালবিহীন খদ্দের পেলে দেহসারিণীর ভাগ্যে ২০ টাকা বেশি জুটে। স্টাফ তহবিলে জমানো টাকা প্রতি সপ্তাহে তারা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। নগরীতে বিউটি পার্লারের আড়ালে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ম্যাসেজ পার্লার। সুন্দরী তরুণীদের দিয়ে এসব পার্লারে চালানো হয় ‘ওরাল সেক্স’ ও ‘ভ্যাজাইনাল সেক্স’। অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট-বাড়িতে ‘মিনি পতিতালয়’গুলোতে যাতায়াত করে এলিট শ্রেণীর লোকজন। সাধারণ হোটেলে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের যাতায়াত। আবাসিক হোটেলগুলোতে ১৩ থেকে ৩০ বছর বয়সের নারীরা দেহ বিক্রি করে। ভাবী, ইনটেক ও অ্যাঙ্গেজ_ শব্দ তিনটি ফ্ল্যাট-বাড়ি ও হোটেলভিত্তিক দেহ ব্যবসায় বহুল প্রচলিত। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী বিবাহিত পতিতাদের বলা হয় ভাবী। সঙ্গম করা হয়নি এমন পতিতাদের খদ্দেরের সামনে তুলে ধরা হয় ইনটেক হিসেবে। আর কাঙ্ক্ষিত রমনী সঙ্গমে লিপ্ত থাকলে বলা হয় অ্যাঙ্গেজ।

শুধু আবাসিক হোটেল ও বাসাবাড়ি নয়, রাতের নগরী চলে যায় পতিতাদের দখলে। প্রায় পাঁচ হাজার ভাসমান পতিতা শতাধিক স্পটে খদ্দের ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠে। ঢাকার বিভিন্ন বস্তি ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, বিক্রমপুর, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীর চর, সাভার, টঙ্গীসহ আশপাশের এলাকা থেকে রমনীরা কর্মস্থলে আসার নাম করে রোবখা পড়ে সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আবাসিক হোটেলগুলোতে প্রবেশ করে দেহ ব্যবসায় লিপ্ত হয়। আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া ছাত্রী ও এক শ্রেণীর গৃহবধু ফ্ল্যাট বাড়ির দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। হোটেল থেকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের পাশাপাশি সন্ত্রাসীরাও চাঁদা তুলে থাকে। চাঁদা না দিলে ঘটে গুলির ঘটনা। সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে হোটেল ম্যানেজারসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের টানবাজার ও পুরনো ঢাকার ইংলিশ রোডের পতিতা পল্লী তুলে দেওয়ার পর ভাসমান পতিতাবৃত্তি রাজধানীজুড়ে বিস্তার ঘটেছে। যা রোধ করা না গেলে দেশে এইডস মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এইডস রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে প্রতি বছর পাঁচ লাখ এইডস রোগী মারা যাবে। তাই এইডসের হাত থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে যত্রতত্র দেহ ও মাদক ব্যবসা বন্ধে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

[ad#co-1]