বাংলা-উর্দু ছবির নায়িকা নাসিমা খান

ঢাকার দ্বিতীয় সবাক ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’য় প্রথম অভিনয় করেছিলেন নাসিমা খান। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালে। ছবিতে নাসিমা খান ছিলেন সহনায়িকাদের মধ্যে একজন। নায়িকা হিসেবে নাসিমা খানের প্রথম ছবি ‘যে নদী মরু পথে’ মুক্তি পায় ১৯৬১ সালে। বাংলা ছবিতে অভিনয় করে তার নামধাম হওয়াতে উর্দু ছবিতে এক সময় তার চাহিদা বেড়ে যায়। পরিচালক মোহসীনের সহযোগিতা ও উত্সাহে উর্দু ছবিতে অভিনয় করার পর তার নাম ছড়িয়ে পড়ে বাংলার বাইরে সিন্ধু, পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানে। সেই নাসিমা খান এখনও অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত। ফিল্মের চেয়ে তাকে নাটকেই দেখা যাচ্ছে বেশি।

নাসিমা খান ফিল্মে যখন আসেন তখন ঢাকার নায়িকা ছিলেন সুলতানা জামান, রওশন আরা, সুমিতা দেবী, চিত্রা সিনহা প্রমুখ। নাসিমা খানের বাবার বাড়ি ছিল বিক্রমপুরে। তার দাদা ঢাকার লালবাগে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জন্ম তার লালবাগের বাড়িতে। তার ছয় ফুফু ছিল। জন্মের দিন বাড়িতে খুশির ধুম পড়ে গিয়েছিল। তার বাবা ছিল কাঠের ব্যবসায়ী। একটু বড় হয়ে উঠতেই তাকে স্কুলে পাঠানো হলো। তিনি খুব মিশুক ছিলেন না বলেই স্কুলজীবনে তার কোনো ক্লাসমেটের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। খান আতা অর্থাত্ নায়ক আনিসের বাসা ছিল তাদের বাসার কাছাকাছি। তার সঙ্গে নাসিমার বাবার একটা ভালো সম্পর্ক থাকায় তিনি একদিন বললেন, মেয়েকে ফিল্মে দিলে নামধাম করবে। আনিসের প্রস্তাবে রাজি হলেন তার বাবা। আর এভাবেই ফিল্ম জগতে জড়িয়ে পড়লেন নাসিমা খান।

নাসিমা খান অভিনীত প্রথম ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছিল। যে জন্য বেবী ইসলাম ১৯৫৯ সালে তার ‘তানহা’ (উর্দু ছবি) ছবিতে নাসিমা খানকে নিলেন। ‘তানহা’ ছবিতে তার সঙ্গে ছিলেন শবনম, সুমিতা দেবী আর লাহোরের নায়িকা শামীম আরা। এরপর নাসিমা খান অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে—যে নদী মরু পথে (নায়ক-আনিস), সূর্যস্নান (নায়ক-আনোয়ার হোসেন) ধারাপাত, কার বউ (নায়ক-হারুন), উজালা (নায়ক-আনোয়ার হোসেন ও হাসান ইমাম), বেগানা (নায়ক-মুস্তফা), আপন দুলাল (নায়ক-আজিম), উলঝন (নায়ক-হাসান ইমাম), ম্যায় ভি ইনসান হু, দুই ভাই, গৌরী (নায়ক-রহমান), আমার বৌ, ঢেউয়ের পরে ঢেউ ইত্যাদি। ১৯৬৬ সালের পরে নাসিমা খান লাহোরে গিয়ে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। ওখানে তার অভিনীত ‘আসবন গ্যায়ে মতি’ ছবিটি তাকে অসম্ভব খ্যাতি দিয়েছিল। নাসিমা খান একবার জানিয়েছিলেন, আমার জীবনে স্মরণীয় দিন ১৬ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি স্বাধীন বাংলার পতাকা বানিয়ে রেখেছিলাম। তখন পুরানা পল্টনে ফুফুর বাসায় থাকতাম। ১৬ ডিসেম্বরে দেখলাম দলে দলে মুক্তিবাহিনী আসতে শুরু করল। সেদিন আমি স্বাধীন বাংলার পতাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিলাম। এটা আমার জীবনে স্মরণীয় দিন।

আরেকটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে নাসিমা খান বলেন, ‘কার বৌ’ ছবির কথা খুব করে মনে পড়ে, আমি একা নায়িকা। নায়ক হাফডজন যেমন— হারুন, গোলাম মোস্তফা, সুভাষ দত্ত প্রমুখ। ছবিতে এরা সবাই আমার স্বামী। আসল স্বামী ছিলেন হারুন। এটাতো হাস্যকর ঘটনা। আবার দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছিল। একটা দৃশ্যে আমাকে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে পড়তে হবে। এটা কিছুতেই আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যখন দৌড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এলাম তখন কে যেন একজন আমাকে এমন ধাক্কা মারল যে আমি তালগোল পাকিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়লাম। সেদিন ভীষণ ব্যথা পেয়েছিলাম। ছবির এ শর্টটা নাকি দারুণ হয়েছিল।

সূর্যস্নান, গৌরীসহ কয়েকটি ছবিতে নাসিমা খানের উপস্থিতি দেখে তাকে বলা হতো সেক্সি নায়িকা। ‘গৌরী’ ছবিতে মা ও মেয়ের দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। ‘গৌরী’তে খাটো করে শাড়ি পরেছিলেন বলে অনেকেই সেদিন তার সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু নাসিমা খান তা পরোয়া করেননি বলেই সফল হয়েছিলেন। বাংলা-উর্দু ছবির স্মরণীয় নায়িকাদের মধ্যে তিনিও একজন।

লিয়াকত হোসেন খোকন

[ad#co-1]