নাচ হলো সকল সংস্কৃতির জননী

ইউনেস্কো ১৯৮২ সালে ২৯ এপ্রিলকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে আন্তর্জাতিক নৃত্য সংস্থা (সিআইডি) দিনটিকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ফ্রান্সের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী জিয়ান জর্জিস নভেরার জন্মদিনটিই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের মতো ২০১০ সালেও বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উপলক্ষে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য সংগঠক লায়লা হাসান তার ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে কবে থেকে বিশ্ব নৃত্য দিবস পালিত হচ্ছে? এবছরের আয়োজনে কি থাকছে?

বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল থেকেই বিশ্ব নৃত্য দিবস পালন করা হচ্ছে। সেসময় দিবসটিকে কে ঘিরে নানা অনুষ্ঠান হতো। তখন শিল্পীদের মধ্যে একধরনের পারস্পরিক যোগাযোগ সবসময়ই থাকতো। মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানই ছিলো সেগুলো। এবছর আন্তর্জাতিক নৃত্যদিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে। সারা দেশ জুড়েই নানা ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান থাকছে। এতে করে সারাদেশের নাচের শিল্পীদের একত্রিত হওয়ারও একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দেশের নাচকে এগিয়ে নিতে হলে কি কি পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশের নাচকে একটি প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হলে এখন নাচকে দেশের শিক্ষা কারিকুলামের আওতায় আনতে হবে। এবিষয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবিটি পেশ করা হয়েছে। এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে নৃত্যকে দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এক্সট্রা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে স্মারক লিপিও দেওয়া হয়েছে। এবং সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে গ্রহণ করা হয়েছে। জানা গেছে, বিষয়টি আলোচনাধীন। হয়তো খুব শিগগিরিই নৃত্যশিল্পীরা এসংক্রান্ত একটি ভালো খবর পাবেন।

নাচকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি কেনো উঠেছে?

সংস্কৃতি ছাড়া কোন দেশই এগিয়ে যেতে পারে না। সংস্কৃতির শুদ্ধ চর্চা ছাড়া দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়, এটা সবাই জানে। ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদেরকে সংস্কৃতিবান করে গড়ে তুলতে হবে। নাচ এক্ষেত্রে অন্যতম সাংস্কৃতিক শিক্ষার মাধ্যম। নৃত্য মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করে। একটা সময় ছিলো, যখন নাচ ছিলো রাজা বাদশাদের বিনোদনের মাধ্যম। এখন সময় বদলে গেছে। এ নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে। বর্তমানে এটি সার্বজনীনভাবেই স্বীকৃত যে, নাচ হলো সকল সংস্কৃতির জননী। এর অতীত ঐতিহ্য যেমন আছে তেমনি রয়েছে বিশাল বিস্তৃত ইতিহাস। নাচ এখন আর শুধু মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মঞ্চের চৌহদ্দি পেরিয়ে এটি এখন গবেষণা আর শিক্ষার উপাদান হিসেবে সারা বিশ্বেই সমাদৃত। এদিক থেকে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। যদিও এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুগে যুগে কালে কালে নৃত্য ব্যবহৃত হয়েছে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই। নারী মুক্তি আন্দোলনে আর অধিকার আদায়েও এর ভূমিকা অনন্য।

আগামী প্রজন্মকে সংস্কৃতিবান করে গড়ে তুলতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। এখন সময়ের ফাঁদে পড়ে অনেকেই সংস্কৃতির বলয় থেকে ছিটকে গেছে বলেই মনে হয়। সেজন্য এ প্রজন্মের অনেকেই নানা ধরনের অপকর্ম ও অপসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজও করছে। অপর দিকে একজন সংস্কৃতিবান মানুষ কখনোই এটা করতে পারেন না। নাচ একজন মানুষকে পুরোপুরি সংস্কৃতিবান করে গড়ে তোলে। সুনাগরিক, সুদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নাচ হচ্ছে অন্যতম মাধ্যম।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?

শত বাধা প্রতিক‚লতার মধ্যেও বাংলাদেশের নাচ এগিয়ে চলছে। আমাদের দেশে নাচের ক্ষেত্রে প্রথম বাঁধা ধর্মান্ধতা। কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক বাঁধাও কাজ করে। অনেক মেয়েই ছোট বেলায় নাচ শিখলেও একটা সময়ে গিয়ে নাচ ছাড়তে বাধ্য হয়। এখন অবশ্য বাবা মার আগ্রহে অনেকেই নাচ শিখছে। কিন্তু ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে এক সময় নাচের চর্চাটা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে তারা। তবে সেই জায়গা থেকে সরে আসতে শুরু করেছি আমরা। সামাজিক দেয়ালগুলো এখন আর তেমন বাঁধা নয়। বর্তমানে সমাজে একজন নৃত্যশিল্পীর সম্মানের জায়গা তৈরি হয়েছে। নাচ করে বলে এখন আর কাউকে কটু কথা শুনতে হয়না। যত দ্রুত নাচকে শিক্ষা ব্যবস্থার অর্ন্তভূক্ত করা যাবে এর ভীত ততো শক্ত হবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাচ নিয়ে আলাদা বিভাগ খোলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা কার্যকর হলে এর গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক লোকদের সঙ্গে সেমিনার হয়েছে। সেখান থেকে আমরা একটা ইতিবাচক আশ্বাস পেয়েছি।

নৃত্য শিল্পীদের পাশাপাশি আর কোন কোন দিকে গুরুত্ব দিতে হবে?

নাচ কে শিক্ষার অর্ন্তভ‚ক্ত করা গেলে সারাদেশে নৃত্যশিল্পী বাড়ানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে শুধু নৃত্য শিল্পীর সংখ্যা বাড়ালেই চলবেনা আমাদের শুদ্ধ বাংলা নাচের চর্চাও করতে হবে। এখন অনেকেই ভারতের অনুকরণে নাচছে। আবার দেখা যাচ্ছে অনেকের নাচের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের প্রভাবই বেশি। এই জায়গাটা নিয়ে প্রচুর কাজ করতে হবে। একমাত্র নৃত্যকে শিক্ষার আওতায় আনতে পারলেই এই কাজটা খুব সহজে করা সম্ভব।

আর একটা বিষয় বলার আছে। তা হলো নাচ যে শুধু শিক্ষা মাধ্যমে আনলেই হলো তা কিন্তু নয়। এজন্য প্রচুর শিক্ষক ও প্রশিক্ষকও দরকার। এজন্য শিল্পকলা একাডেমীকে আরো এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে যেসব নাচের শিক্ষক আছেন তাদেরকে আরো প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। এই মুহ‚র্তে কেবলমাত্র রাজবাড়িতে একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। নাচকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এখনো প্রচুর কাজ বাকি। এসব কিছু করা সম্ভব হলে অনেকেই নাচকে পেশা হিসেবে নেবে। এতে করে দেশের সামগ্রিক নৃত্য কলা অনায়াসেই এগিয়ে যেতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

[ad#co-1]