অরণ্য কন্যার গল্প : বাঁধন

কম কাজ করে বেশি সাফল্য পাওয়ার গল্পের নতুন নায়িকার নাম আজমেরী হক বাঁধন। গেল পহেলা বৈশাখে মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নিঝুম অরণ্যে’। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বাঁধন এখন একজন ডেন্টিস্ট। পাশাপাশি নাটকেও কাজ করছেন দাপিয়ে। বাঁধনের চলচ্চিত্রে কাজের সাফল্য ও তার নতুন নাটকের গল্পসহ ক্যারিয়ারের নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন রকিব হোসেন

একটি কমন প্রশ্ন প্রায়ই বাঁধনকে জ্বালাতন করে। অনেকে এখন তাকে দেখলেই বলেন, আচ্ছা বাঁধন, তুমি আসলে কী হতে চাও- সফল চিকিৎসক নাকি অভিনেত্রী? এমন প্রশ্নে বাঁধন খানিকটা মন্দ লাগা অনুভব করলেও সবাইকে তিনি হাসিমুখে জানিয়ে দেন যে, আমি ভালো অভিনেত্রীও হতে চাই আবার ভালো চিকিৎসকও হতে চাই। বাঁধনের কথায়, ‘আমি জানি না কেন এই প্রশ্নটা করে অনেকে আমাকে পেইন দেয়। বিষয়টি আমার কাছে অনেক পেইনফুল। কারণ তারা কেন যেন বুঝতে চায় না, একজন মানুষ দু’ মাধ্যমেই ইচ্ছে করলে সফল হতে পারে। আসলে আমার জীবনটা তো আমাকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়। তারা কেন জানি আমাকে আমার কাঙিক্ষত লক্ষ্য ডিসাইড করতে দিতে চায় না। আমি আসলে অভিনয় ও চিকিৎসা দুটি কাজই সাফল্যের সঙ্গে করতে চাই। আমাকে আরো পড়াশোনা করতে হবে। আমি আমার টার্গেট ফুলফিল করবই। অনেকের ধারণা মিডিয়াতে কাজ করলে পড়াশোনা হয় না। সত্যি বলতে কি, আমার কাছে বরাবরই পড়াশোনার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। ছাত্রী হিসেবে আমি সবসময়ই মেধাবী ছিলাম। আমি ডেন্টালে পড়লেও এমবিবিএস বিভাগের সবাই আমাকে চিনত। সবসময়ই আমার চেষ্টা ছিল ভালো একটি রেজাল্ট করার। মিডিয়াতে কাজ করি বলে যে আমার রেজাল্ট, যেনতেন তা নয়। আমি ভালো রেজাল্ট নিয়েই ডেন্টিস্ট হয়েছি। সবসময় ভালো রেজাল্ট করতাম বলে আমার শিক্ষকরা আমাকে খুব স্নেহ করতেন।’

নিঝুম অরণ্যে

গেল পহেলা বৈশাখে মুক্তি পেয়েছে বাঁধন অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নিঝুম অরণ্যে’। মুশফিকুর রহমান গুলজার পরিচালিত এ ছবিতে বাঁধনের বিপরীতে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা সজল। এ ছবির দর্শকসাড়া নিয়ে বাঁধন বলেন, ‘নিঝুম অরণ্যে’ ছবির কাজ করেছিলাম আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে। তখন আমি সবেমাত্র লাক্স থেকে বের হয়েছি। যেহেতু আমাদের সময় ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ছবির নায়িকা খোঁজার মিশন নিয়ে প্রতিযোগিতাটি হয়েছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ছবিটিতে আমার কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু ঐ সময়ে আমার সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আমি ছবিটিতে কাজ করতে পারিনি। পরবর্তীতে যখন ‘নিঝুম অরণ্যে’ ছবির কাজের অফার আসে বিষয়টি ছিল আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। কারণ লাক্স থেকে বের হওয়ার পরই ইমপ্রেসের ছবিতে কাজ করার সুযোগ যে কোনো মেয়ের জন্যই লোভনীয়। এ কারণে এ ছবিতে কাজের বিষয়ে আমি খুব আগ্রহী ছিলাম। ‘নিঝুম অরণ্যে’ ছবির গল্পটি সুইট ছিল। এটি লিখেছেন মাহবুব জামিল। এ ছবিতে কাজ করতে গিয়ে আমি আমার কো-আর্টিস্ট হিসেবে সজলকে পেয়েছি। ও সত্যি অসাধারণ। সজলের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। যেহেতু সে দীর্ঘদিন ধরেই অভিনয় করে তাই অভিনয় বিষয়ে অনেক সহযোগিতা তার কাছ থেকে পেয়েছি।’ বলতে বলতে একটু স্মৃতির খেয়ায় ভাসতে শুরু করলেন বাঁধন। জলের স্রোতের মতো গড়গড় করে তিনি বলতে থাকলেন, ‘এ ছবির ক্যামেরায় ছিলেন জেড এইচ মিন্টু ভাই। আর মেকআপ-এ ছিলেন খলিল ভাই। আমি নতুন হিসেবে তারা আমাকে প্রচণ্ড সহযোগিতা করেছেন। সব মিলিয়ে তিন বছর আগে যখন এ কাজটি করি, ঐ সময় আমি অভিনয়ে ইমম্যাচিউরড ছিলাম। তবে এখন যে, আমি অভিনয়ে পাকা হয়ে গেছি তা বলছি না। যাই হোক, তিন বছর আগে ঐ ছবিটি বাঁধনের জন্য একটি বিরাট পাওয়া ছিল। তো ছবিটি যেহেতু তিন বছর আগে করা, তাই তিন বছর পর এর রিলিজের সময় আমি খানিকটা টেনশনে ছিলাম। তবে দর্শকরা যখন এই সময়ে এসে তিন বছর আগের বাঁধনের কথা চিন্তা করেই ছবিটি দেখেছেন, তাই তাদের ভালো লেগেছে আমার পারফরমেন্স। প্রিমিয়ার শো’তে ছবিটি দেখার পর সাধারণ দর্শকদের অনেকেই আমাকে বলেছেন, বাঁধন তুমি আসলে চলচ্চিত্রের জন্যই পারফেক্ট ‘তোমার গ্ল্যামার, চাহনি, চলন-বলন, ফিগার সবকিছুই আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য মানানসই। আর একটু নিজেকে তৈরি করে এ মাধ্যমে ভালো ভালো কাজ করো। আসলে আমার দর্শক ও ভক্তদের এই রিপারকেশন আমাকে আনন্দ দিয়েছে। সবাই যে আমাকে পজিটিভভাবে নিয়েছেন এ জন্য আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।’ একটু দম নিয়ে বাঁধন আরো বলেন, ‘আসলে আমি লাক্সে অংশ নিয়েছিলাম ফিল্মে কাজ করার জন্যই। আমার টার্গেট ছিল আমি শুধু ফিল্মই করব। এজন্য আমি কম কম কাজ করেছি নাটকে। এখনও আমার ইচ্ছা আছে বড় পর্দায় নিজেকে সুন্দর একটি জায়গায় দাঁড় করানোর। আমি যখন ‘নিঝুম অরণ্যে’ ছবির কাজ করছিলাম তখন অনেক ফিল্ম ডিরেক্টরের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছিল নতুন ছবিতে কাজের বিষয়ে। কিন্তু পড়াশোনার জন্য তাদের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়নি। এখন যেহেতু আমার পড়াশোনা শেষ তাই ব্যাটে-বলে মিলে গেলে আমি ভালো ভালো চলচ্চিত্রে কাজ করতে চাই।’

নাটকের গল্প

লাক্স- চ্যানেল আই ‘দারুচিনি দ্বীপের’ নায়িকা খোঁজার মিশন থেকে বের হবার পর হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরেই নাটকে নাম লেখান বাঁধন। তার প্রথম অভিনীত নাটক ছিল ‘বুয়া বিলাস’। এরপর তিনি একে একে নুহাশের বেশকিছু নাটকে কাজ করেন। তার অভিনীত অন্য নাটকগুলোর মধ্যে ছিল ‘অতঃপর শুভ বিবাহ’, ‘হামিদ সাহেবের একদিন’, ‘চন্দ্র কারিগর’। হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলোতে কাজ করাই ছিল অভিনেত্রী হিসেবে বাঁধনের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর তিনি কাজ করেন ‘প্রাইভেট রিকশা’, ‘উচ্চমাধ্যমিক সমাধান’, ‘ভালো থেকো ভালো রেখো’, ‘রঙ’ ইত্যাদি একক ও ধারাবাহিক নাটকগুলোতে। বাঁধন বলেন, ‘আমি আসলে সৌভাগ্যবতী বলতে পারেন। এমনিতেই আমার কম কাজ করা হয়েছে, তবে এই সামান্য কিছু কাজ করার পরও আমার ভক্তরা আমাকে দারুণভাবে মনে রেখেছে। আমি জানি না লাক্সের আর কোনো মেয়ে আছে কিনা যে, আমার মতো কম কাজ করেও দর্শকদের এতবেশি ভালোবাসা পেয়েছে। নুহাশের ব্যানারে আমি যে কাজগুলো করেছি, সেই কাজগুলোই আমার মনে হয়, আমাকে দর্শকদের মনে স্থান দিয়েছে। পরবর্তীতে ছবিয়াল গ্রুপের কিছু নাটকেও কাজ করেছি। সেই কাজগুলো ভালো দর্শক রিপারকেশন পেয়েছে।’

এবং সাম্প্রতিক

ডাক্তারি করার পাশাপাশি এখন বাঁধন অভিনয় নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। বেশ কয়েকটি ধারাবাহিকে কাজ করছেন তিনি। নতুন কাজের গল্প নিয়ে বাঁধন বলেন, ‘আমি যে ধারাবাহিকগুলোতে কাজ করেছি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মাহফুজ আহমেদের ‘চৈতা পাগল’, আলভী আহমেদের ‘এয়ারকম’, রাজিবুল ইসলাম রাজিবের ‘অগ্নিরথ’। চৈতা পাগল ধারাবাহিকে আমি দুষ্টু টাইপের একটি গ্রামের মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছি। এ নাটকে আমাকে নোয়াখালীর ভাষায় সংলাপ আওড়াতে হয়েছে। যেহেতু এ ভাষাটা আমাদের লিপে নাই, তাই তা রপ্ত করতে আমাকে খানিকটা বেগ পেতে হয়েছে। আর এ কাজে নাটকের পরিচালক আমাকে দারুণ সহযোগিতা করেছেন। মাহফুজ ভাইয়ের পরিচালনায় কাজ করে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। আমার চোখে তিনি ‘ওয়ান অব দি বেস্ট ডিরেক্টর’। তার অনেক ধৈর্য। কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক ‘এনজি’ শট হয়। কিন্তু তাতে তিনি কখনো রাগ করেন না। যতক্ষণ তিনি তার মনঃপুত কাজ বের করে নিতে না পারেন ততক্ষণ পর্যন্ত টেক নিতে থাকেন। আর ‘এয়ারকম’ নাটকে আমি একজন কর্পোরেট লেডির চরিত্রে কাজ করেছি। এছাড়া এখন কাজ করছি আরিফ খানের ধারাবাহিক ‘ফুল চাঁদ অমাবস্যা’, কাফি বীরের পুরনো ঢাকার গল্পের একটি নাটকে। এছাড়াও আশুতোষ সুজনের একটি ধারাবাহিকে কাজ করেছিলাম। ধারাবাহিকটির নাম ‘ইউ টার্ন ট্যাক্সি ড্রাইভার’। এখানে আমি একজন পতিতার ভূমিকায় রূপদান করেছি। চ্যানেল ওয়ান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নাটকটির কাজ আপাতত বন্ধ আছে।’

নাম : আজমেরী হক বাঁধন

ডাক নাম : বাঁধন

বাবার নাম : মোঃ আমিনুল হক

মায়ের নাম : চামেলী হক

জন্ম তারিখ : ২৮ অক্টোবর

জন্মস্থান : ঢাকা

প্রথম প্রেম : পড়াশোনা

প্রথম নাটক : বুয়া বিলাস

অবসরে করি : ঘুমাই, শপিং করি

প্রিয় রঙ : লাল

প্রিয় পোশাক : শাড়ি

প্রিয় কাজ : এখনও করা হয়ে ওঠেনি

যে বই বার বার পড়ি : হুমায়ূন আহমেদের অনেক বই আমার বার বার পড়া হয়েছে

প্রিয় উপন্যাস : আলাদা করে বলা যাবে না

মানুষের যে গুণটি বেশি ভালো লাগে : সিমপ্লিসিটি ও অনেস্টি

মানুষের যে কাজ খারাপ লাগে : মিথ্যা বলা। কারণ মিথ্যাবাদীরা সবকিছু করতে পারে

সাফল্যের সংজ্ঞা : এটা একেক জনের কাছে একেক রকম হয়। কেউ তেত্রিশ পেয়ে পাশ করাকে সাফল্য মনে করে, আবার কেউ আশি পাওয়াকে সাফল্য হিসেবে ধরে নেন।

[ad#co-1]