ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন ফয়েজ আহমেদ

৮২ বছরে পা দিলেন প্রবীণ সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ছড়াকার ফয়েজ আহ্মদ। গতকাল ছিল তার জন্মদিন। বরাবরের মতো এবারও কোনো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন ছিল না দেশবরেণ্য এই ‘ব্যক্তিত্বের জন্মদিনে। তবে শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণমুগ্ধ শিষ্যরা তার ধানমণ্ডির বাসায় গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত করেন তাকে। দিনটি ফয়েজ আহ্মদের কেটেছে বাসায় অভ্যাগতদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পরিবাবের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গল্প করে। অভ্যাগতদের চা, মিষ্টান্ন ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়িত করা হয়। অন্যান্যের মধ্যে এদিন তাকে শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মনজুরুল আহসান খান, সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পলিটবুর্যের সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর (এমপি) প্রমুখ।

জন্মদিনের অনুভূতি বিষয়ে গতকাল ফয়েজ আহ্মদ বলেন, ৮২ বছর বয়স হওয়ার কারণে লেখায় কমতি হবে কিন্তু বিরতি হবে না। আগামী বইমেলায় পুস্তক প্রকাশের জন্য এখন থেকেই আমি যেমন ভাবছি, তেমনি প্রকাশক হিসেবে হাক্কানী এবং বাংলা একাডেমীও প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বর্তমান সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক, প্রতিবেদক এবং পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্কিত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেও তারা প্রথম শ্রেণীর কাগজ বের করছেন। তবে শত কোটি টাকার মালিকরাও এখন পত্রিকা প্রকাশ করছে। এক্ষেত্রে এখন দেখতে হবে একই ধারার গতানুগতিক কাগজ যেন বের না হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও পত্রিকার মালিককে কাগজের দাম হ্রাস করতে হবে এবং বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন থেকে আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, দক্ষ সাংবাদিক তৈরির দায়িত্বও মালিকদের নিতে হবে। ক্রসফায়ার, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি সংবাদ দিয়ে আর কত দিন সংবাদপত্র চালানো সম্ভব হবে—এটাই এখন প্রশ্ন।

বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের অধিকারী ফয়েজ আহ্মদ ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বাসাইলভোগ গ্রামে এক সামন্ত পরিবারে ১৯২৩ সালের ২ মে জন্মগ্রহণ করেন। সাংবাদিকতা করার সময় থেকে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। তিনি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এই পদে প্রায় তের বছর থাকার পর তিনি পদত্যাগ করেন। সে সময় তিনি আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ থেকে অবসর নেন। ফয়েজ আহ্মদ ১৯৪৮ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ ও পরবর্তীতে পূর্বদেশে চিফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক ইনসাফ ও ইনসান পত্রিকায় রিপোর্টিং করেছেন। ১৯৫০ সালে হুল্লোড় এবং ১৯৭১ সালে স্বরাজ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি জাতীয় সংবাদ সংস্থার (বিএসএস) প্রথম প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে তিনি দৈনিক বঙ্গবার্তার প্রধান সম্পাদকরূপে কাজ করেন। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় ঢাকাস্থ অফিসের প্রধান সাংবাদিকরূপে কাজ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর সিন্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে। তিনি ’৮০-র দশকে জাতীয় কবিতা উত্সবের প্রথম পাঁচ বছর আহ্বায়ক ছিলেন। তাছাড়া ১৯৮২ সালের দিকে বাংলা একাডেমীর কাউন্সিল সদস্য (গোপন ব্যালটে) নির্বাচিত হন। কিন্তু সামরিক শাসনের প্রতিবাদে তিনি অন্য ৬ জনের সঙ্গে পদত্যাগ করেন।

তিনি সারাজীবনই প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। বর্তমানে তার বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশ’। এর মধ্যে ৫০টি শিশু-কিশোরমূলক ছড়া ও কবিতার বই। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী তার চারটি শিশু-কিশোরমূলক গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তার লেখা ছড়া নিয়ে একটি আবৃত্তি ও একটি সঙ্গীতের ক্যাসেট বেরিয়েছে। তার বইগুলোর মধ্যে ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ ট্রিলজী সবচাইতে বিখ্যাত। এটি তার শ্রেষ্ঠ পুস্তক বলে বিবেচিত। ছড়ার বইয়ের মধ্যে ‘হে কিশোর’, ‘কামরুল হাসানের চিত্রশালায়’, ‘গুচ্ছছড়া’, ‘রিমঝিম’, ‘বোঁ বোঁ কাট্টা’, ‘পুতিল’, ‘জোনাকি’, ‘ছড়ায় ছড়ায় ২০০’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনসহ বিভিন্ন দেশের কবিতার ৫টি বই তিনি অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে হো চি মিন-এর জেলের কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দশটি দেশের অনুবাদ কবিতার বই-এর নাম ‘দেশান্তরের কবিতা’।

ফয়েজ আহ্মদ এ পর্যন্ত বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমী পুরস্কার, সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার, দু’বার ব্যাংক পুরস্কার ও ১৯৯১ সালে সাংবাদিকতার জন্য একুশে পদক লাভ করেন। তাকে নুরুল কাদের সাহিত্য ও মোদাব্বের হোসেন আরা শিশু সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, ঋষিজ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদ ও জাতীয় প্রেসক্লাব তাকে গুণীজন হিসেবে সম্মাননা প্রদান করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ২৫ মার্চ রাতে প্রেসক্লাবে আশ্রয় নিয়ে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হন। রাত ১১টায় আশ্রয় নেয়ার পর ভোর রাতে ঐ২৪ ট্যাংক দিয়ে শত্রুবাহিনী প্রেসক্লাবের দোতালায় গোলাবর্ষণ করে। এখানেই একটি রুমে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ সময় তিনি বাঁ উরুতে আঘাত পেয়ে মেঝেতে পড়ে থাকেন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে এ ঘটনার পর তিনি ভোরে জ্ঞান ফিরে পান। পরে সচিবালয়ে আশ্রয় নিয়ে ২৭ মার্চ সকাল প্রায় ১০টায় কারফিউ ওঠার পর তিনি চিকিত্সার জন্য বেরিয়ে যান। আগরতলায় চিকিত্সার পর তিনি পার্টির সহযোগিতায় কলকাতায় যান। তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হন। পরে বাধ্য হয়ে কেবিনেটের অনুরোধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ যোগদান করেন এবং সেখানে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ওপর ‘পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে’ শেষ দিন পর্যন্ত লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার এভাবেই যোগদান। তিনি কলকাতা থেকে এসে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলের ওপর রিপোর্ট করতেন।

তিনি ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরে বিনা পাসপোর্টে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্টদের ছত্রছায়ায় ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনে সে জন্য তাকে ‘হিরো’ বলা হতো। এই সম্মেলনে ইরান থেকে ১৮ জন ও মেক্সিকো থেকে ৬ জন তার মতো গুপ্ত পথে ও পরিচয়ে যোগ দেন। তারাও সেখানে ছিলেন হিরো। ১৯৫৭ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় লেখক সম্মেলনে, ১৯৯৫ সালে মার্কিন ব্লকেড বিরোধী কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এবং একই বিষয়ের ওপর ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে চীন ও উত্তর কোরিয়ার আমন্ত্রণে লেখক ইউনিয়নের পক্ষে বিখ্যাত লেখকদের একটি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে দুটি দেশে মাসব্যাপী সফর করেন। সর্বশেষ তিনি ১৯৯৮ সালে উত্তর আমেরিকার বাঙালিদের ‘ফোবানা’ মহাসম্মেলনে নিউইয়র্কে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন।

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় তিনি গ্রেফতার হন। ৪ বছর কারান্তরালে থাকার পর ১৯৬৩ সালের প্রথমদিকে মুক্তি পান। চার বছর কারাভোগের পর তাকে এক বছরের জন্য ঢাকায় রমনা থানা এলাকায় নজরবন্দি করে রাখা হয়। এরশাদের আমলে দীর্ঘদিন আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার পর তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন ঢাকায়। দেশের রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট এরশাদের পতন এক সময় আবশ্যক হয়ে ওঠে। সে সময় দুই নেত্রীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সবাই কামনা করেন। ফয়েজ আহ্মদ তখন দুই নেত্রীকে এক রাতে গোপনে ঐক্যবদ্ধ করেন। এ ছিল ঐতিহাসিক ঐক্য। তিনি ১৯৮৮ ও ’৯৯ সালে দু’বছর দিল্লির জওহরলাল নেহরুর আন্তর্জাতিক সমঝোতা পুরস্কারের গোপন নির্বাচক ছিলেন। ১৯৯১ সালে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে গঠিত ‘গণআদালত’-এর ১১ জন বিচারকের একজন ছিলেন। এ ব্যাপারে সরকারি মামলায় ২৪ জনের মধ্যে তিনিও গ্রেফতারি পরোয়ানার আসামি হন। সে থেকে পাঁচ বছর তিনি জামিনে ছিলেন। তিনি মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতি কমিটির প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে তিনি ঢাকার প্রাচীন ও সুবৃহত্ আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে। তিনি প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক আর্কাইভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা।

তিনি পিকিং রেডিওতে (১৯৬৬ ও ৬৭ সালে) বাংলা ভাষায় প্রোগাম চালু করার জন্য দু’বছর মেয়াদে নিযুক্ত হন। পিকিং রেডিওতে বাংলা প্রোগ্রাম চালু হয়। সে সময় চীনে কালচারাল রেভ্যুলিউশন শুরু হয়। তাছাড়া তিনি ঢাকা রেডিওতে ১৯৫২ থেকে ৫৪ সালে ছোটদের বিভাগ ‘সবুজের মেলা’ পরিচালনা করতেন।

জীবনে তিনি তিনবার আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বাধ্য হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফয়েজ আহ্মদ কলকাতায় বাংলাদেশ সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী পরিষদের কার্যকরী সদস্য ছিলেন। শহীদ মতিউর পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন ১৯৭৫ সালে। নয় বছর পর এরশাদের সামরিক শাসনের সময় ১৯৮৩ সালে বন্ধ হয় এর কার্যক্রম। তিনি ১৯৯১ সালে ঢাকায় প্রথম আধুনিক আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠা করেন।

[ad#co-1]