জাপানের পাঠ্যপুস্তকে ড. ইউনূস : ‘আব্বু দেখ দেখ… ইউনূস ভাই!’

রাহমান মনি
বাইরে থেকে বাসায় ফিরতেই কলেজপড়–য়া মেয়ে অনেকটা উত্তেজিতভাবে হাত টেনে তার পড়ার টেবিলে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেই বলে, আব্বু দেখ দেখ… এই দেখ ইউনূস ভাই! আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ইউনূস ভাই এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর পড়তে হবে। এই বলে সে ড. ইউনূসের সঙ্গে তার ছবি যেটি এর আগে তোলা হয়েছিল সেগুলো দিতে বলে। আমি বললাম, ড. ইউনূস তো স্যার, সম্মানিত ব্যক্তি, তোমার আব্বুসহ তাবৎ দুনিয়ার মানুষ উনাকে স্যার বলে এবং সম্মান করে, আর তুমি কিনা বলছ ইউনূস ভাই! উল্লেখ্য, আমার মেয়ে রাহমান মাহিনুর আইকো (ইফা) মোটামুটি বাংলা জানে, লিখতে, পড়তে ও বলতে পারে। সে জানে বাংলাদেশে সবাই সবাইকে ভাই বলে সম্বোধন করে। আমাকেও সবাই ফোন করে মনি ভাই আছে কিনা জানতে চায়। ছোটবেলায় সেও মনি ভাই বলে ডাকত। কেউ বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে বলত রাহমান মোঃ মোখলেসুর মনি ভাই। তাছাড়া ইতোপূর্বে ড. ইউনূস যতবারই জাপান সফর করেছেন ততবারই তার সঙ্গে ইফার ছবি আছে। এমনকি তার কোলে বসেও ছবি তুলেছে। আজ সেই লোকটিই তার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত এটা তার জন্য বিরাট কিছু তো বটেই।

আমি বললাম ছবি দিয়ে কি করবে? সে জানাল ছবি তার বন্ধু এবং স্যারদের দেখাবে। কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানাল। ক্লাসের বন্ধুরা নাকি তাকে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে সব সময়। গরিব দেশ। পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ। মিডিয়ার কল্যাণে বন্ধুরা তাই-ই জানে। আর একটু সুযোগ পেলেই বাবা বাংলাদেশি হওয়ায় কটাক্ষ করে। তাই এ সুযোগ সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। বন্ধুদের এক হাত নিতে পারায় আনন্দ তার চোখেমুখে ভেসে ওঠে। আমি অভিভাবক হিসেবে পরামর্শ দিয়ে বললাম ছবি নাও ভালো কথা। তবে এটা যেন কোনো হাতিয়ার হিসেবে কাজে না লাগাও। বরং তুমি এই অধ্যায়টি এমন ভাবে রপ্ত করবে যেন ক্লাসে সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাও এবং ক্লাসের শিক্ষকরা যেন তোমার কাছ থেকে ড. ইউনূস সম্পর্কে বইয়ে যা লেখা আছে তার চেয়েও বেশি কিছু জানতে পারে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী দেশ জাপান। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম দাতা দেশ জাপান। সেই জাপানের কলেজ (দ্বাদশ শ্রেণী) পর্যায়ে অন্যতম দরিদ্র দেশের একজন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংক এবং তার জীবনী পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাবে সেটা যে বাংলাদেশিদের জন্য কতটা গৌরবের তা সহজেই অনুমেয়। আর তা যদি হয় খোদ জাপানে, তা হলে তো জাপান প্রবাসীদের জন্য আরো সম্মানজনক।

ডধঃধহধনব নামে আমার এক কলিগ আছেন। তার মেয়েও এবার দ্বাদশ শ্রেণীতে। সে আমার জন্য ড. ইউনূসের ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছে। তার সঙ্গে প্রায়ই গল্প হয় বিভিন্ন বিষয়ে। বাংলাদেশিদের যে কোনো বড় আয়োজনে সে যায়। অনেকটা আমার পীড়াপীড়িতেই প্রথম প্রথম যেত। এখন নিজ থেকেই যেতে চায়। কোনো আয়োজন আছে কিনা জানতে চায়। আমিও ই-মেইল করে বিভিন্ন খবরাখবর দিয়ে থাকি দেখা সাক্ষাৎ হওয়া সত্ত্বেও। গৎ. ডধঃধহধনব বললেন, আমার মেয়েকে নিয়ে তোমার বাসায় একদিন আসব। বাংলাদেশি খাবার খাব। বাংলাদেশি সংস্কৃতির প্রতি আমি দুর্বল হয়ে গেছি। আমি শুনেছি বাংলাদেশিরা খুব অতিথিপরায়ণ। আমি বললাম তুমি আস যে কোনো দিন। এলেই বুঝতে পারবে।

ঞধহধশধ নামের এক বন্ধু আছে আমার মেয়ের। ঞধহধশধ-এর মা রাস্তায় দেখা হলেই খোঁজখবর নেন। আমি যে বাচ্চা দুটোকে একাই মানুষ করার চেষ্টা করছি সেটা তিনি জানেন। বাবা কীভাবে দু’টি সন্তানের দেখভাল করে তাতে তার সীমাহীন কৌতূহল। অনেক সময় আমাকে বিভিন্ন সহযোগিতার হাতও বাড়ায়। গ্রামীণ ব্যাংকের ড. ইউনূসের পুরো চ্যাপ্টারটি (১৬ পৃষ্ঠা) কালার কপি করে একটি ফাইল তৈরি করে নিয়ে এসেছেন আমার জন্য। তার পরামর্শ হলো ছেলেমেয়েদের এই বার ড. ইউনূসকে নিয়ে গর্ব করতে বলবে। এইটা তোমাদের (বাংলাদেশিদের) জন্য অনেক সম্মানের। জাপানের নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে জানবে। জাপানে বাংলাদেশিদের সন্তান বর্তমানে অনেক বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে ২/১ জন করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আছে। ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। কাজেই তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সেতুবন্ধন হবে এই লেসনটি। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম পরামর্শের জন্য। ভাবলাম আসলেও তো তাই।

২০০৬-এর ১৩ অক্টোবর নোবেল কমিটি শান্তিতে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের যৌথ নাম ঘোষণার মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। মনে হয়েছে ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি শুধু তার একার নয়, এ প্রাপ্তি ছিল বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের অর্জন। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বাংলাভাষিদের অধিকাংশ। যেমনটি হয়েছিল অর্থনীতিতে অমর্ত্য সেনের নোবেল প্রাপ্তির সময় উভয় ক্ষেত্রে নোবেল পেয়েছিল বাংলাভাষি প্রতিটি মানুষ। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ। প্রবাসীদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল আরো শতগুণে বেশি।
আনন্দ প্রকাশের ভাষাও ক্ষণিকের জন্য প্রবাসীরা হারিয়ে ফেলেছিল। প্রবাসীরা হয়েছিল পুলকিত, আনন্দিত, উদ্ভাসিত। সেই সঙ্গে বিমোহিত। পৃথিবীর সব প্রান্তের প্রবাসীদের কাছে ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি ছিল গর্বের। কারণ প্রবাসীদের জন্য ভালো কোনো খবর সাধারণত মিডিয়ায় স্থান পায় না। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে। জাপানের মিডিয়ায় বাংলাদেশ মানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডর, বন্যা, খড়া) এবং মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ (রাজনৈতিক সহিংসতা, হরতাল, ক্যু)-এর দেশ। সেই সঙ্গে দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের দেশ। যে সব খবরে প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত হতাশার মধ্যে ডুবে থাকতে হয়, হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়। বাংলাদেশিদের বড় অর্জন প্রতিনিয়ত ক্ষয় হতে দেখা যায় প্রতিদিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে রাজনীতিবিদদের কাদা ছোড়াছুড়িতে কলুষিত হয়। সেই দেশেরই একজন যখন এত বড় গৌরব বয়ে আনল তখন প্রবাসে আমাদের হীনম্মন্যতা দূর হয়। আমাদের বুকের পাটা বড় হয়ে যায়। আমরা আনন্দে, ভালোবাসায় উদ্বেলিত হই।

জাপানের মিডিয়ায় বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়ায় বাংলাদেশের পজিটিভ খবর যেটি নিয়ে প্রবাসীদের মাথা উঁচু হবে সে রকম কোনো নিউজ পাওয়া যায় না। খেলার পাতা খুললে টাইগার নামের বিড়ালদের নিয়ে ক্রিকেট দলের ব্যর্থতার পাল্লা কেবলই ভারি হওয়ার খবর ছাড়া আর কোনো আশাব্যঞ্জক খবর পাওয়া যায় না। তখনই ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত খবর জাপানের পত্রিকার পাতাজুড়ে স্থান পায়। টিভির টকশোগুলোতেও ড. ইউনূসকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। আলোচনা হয় গ্রামীণ ব্যাংক, মাইক্রো ক্রেডিট ইত্যাদি নিয়ে। প্রসঙ্গক্রমেই চলে আসে প্রিয় দেশ বাংলাদেশের কথা। অনেক সময় বন্ধুরা এসে সুনাম করে।

গত ১ এপ্রিল ২০১০ সকালে ট্রেনে করে কাজে যাচ্ছি। দেখে যেন মনে হয় ‘চিনি তাহাকে’ টাইপের এক লোক (দেখা হয় কিন্তু পরিচয় নেই) বললেন, তুমি বাংলাদেশি, তাই না? আমি বললাম হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরতে পেরেছ। তখন সে তার হাতে থাকা জাপানের অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি পত্রিকা ঞযব ঔধঢ়ধহ ঞরসবং আমাকে দেখিয়ে বললেন, এই লোককে চেনো? সে তো তোমার দেশি। ড. ইউনূসের ছবি দেখে বুকে আশার সঞ্চার হলো এই ভেবে যে, পজিটিভ নিউজই হবে। বললাম, হ্যাঁ চিনি, পরিচয়ও আছে। এৎধংংৎড়ড়ঃং ধষঃবৎহধঃরাব ঃড় ৎরপযসধহ’ং ড়িৎষফ শিরোনামে লন্ডন থেকে ঞরস অফধস’ং-এর একটি প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে যেখানে ড. ইউনূসের একটি সুন্দর ছবি এবং বক্তব্যও স্থান পেয়েছে। জাপান টাইমস-এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকায় পুরো এক পাতাজুড়ে প্রতিবেদনটি ছাপানো হয়।

অথচ এর আগে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাপান সফরে এসেছিলেন। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে জাপানের দু’-একটি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু জাপানের কোনো মিডিয়ায় যতদূর মনে পড়ে এক ইঞ্চি সংবাদও ছাপা হয়নি! আর ড. ইউনূস প্রায়ই আসেন মিডিয়ায়। তিনি বাংলাদেশকে সারা পৃথিবীতে পরিচিত করে তুলে ধরেন। নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন দেশকে পরিচিত করার কাজে। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির পর একদিনে তিনি যেভাবে বিশ্বের কাছে দেশকে পরিচিত করাতে পেরেছেন তা আর কোনো ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। অথচ নিজ দেশেই তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। সুদখোর, কাবুলিওয়ালা ইত্যাদি উপাধি পেয়েছেন। অবশ্য এতেই প্রমাণিত হয় যে তিনি কাজ করেছেন। কাজ করলেই সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। যিনি কোনো কাজ করেন না তার কোনো সমালোচনাও নেই। সবশেষে ড. ইউনূস স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব আমার সন্তানরা তাকে ভাই বলার জন্য এবং ধন্যবাদ জানাব প্রবাসে আমাদের মাথা উঁচু করানোর জন্য। স্যারের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]