গণতন্ত্রের প্রতিভূর নাম হলো নদী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
নদী শুকায় প্রাকৃতিক কারণে, শুকায় মানবিক কারণেও। ভূপৃষ্ঠে পরিবর্তন ঘটলে নদী আপন গতিপথ হারিয়ে ফেলে, তাতে সে হারিয়ে যায়, মারা পড়ে। কিন্তু নদী মারা যায় মানবিক কারণেও, মানুষ যেমন নদীতে ঝাঁপায়, তেমনি আবার নদীর ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়ে। নদীর ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন অবশ্য মানুষ আর মানুষ থাকে না, দৈত্যে পরিণত হয়। অথবা বলা যায়, দৈত্য তার কাঁধের ওপর ভর করে। সেই দৈত্যটির নাম হলো পুঁজিবাদ। কথাটা বেশ সরল শোনাচ্ছে, কিন্তু ঘটনাটা সত্য। আমাদের নদীগুলো যে মরে যাচ্ছে তার মূল কারণ পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য।

নদী আসলে দুই প্রকারের, প্রাকৃতিক ও মানবিক। মানুষের নিজের ভেতরে এবং সামনেও নদী আছে, নদী থাকে, থাকতে হয়, না থাকলে বিপদ ঘটে; যেমনটা ঘটছে এখন আমাদের দেশে। মানবিক নদীও প্রাকৃতিক নদীর মতোই, সেও প্রবহমান থাকতে চায়, কিন্তু অনেক সময় পারে না। পারে না ওই পুঁজিবাদের কারণেই। আমরা নদীর মতো হতে চাই, জীবন্ত থাকতে চাই। নদীর অনেক গুণ। জলই যে প্রাণ সে তো জানাই আছে, ওই জলের জন্যই জলপ্রবাহ দরকার। দরকার নদীর। নদীর আছে মমতা, আবার সে উর্বর করে, সৃষ্টিশীল রাখে মানুষকে। আমাদের সামনে তাই সে দৃষ্টান্ত। দৃষ্টান্ত অনেক কিছুর। নদী প্রাণবন্ত, উচ্ছল, উজ্জ্বল। ডাক দেয় সে মানুষকে, সামনে চলতে, তার মতো করে। যুক্ত হতে বলে অন্যের সঙ্গে। নদী বিচ্ছিন্নতাবিরোধী, নদী যোগাযোগের ব্যবস্থা করে; তার আছে শক্ত মেরুদণ্ড, সে বাধা ডিঙ্গিয়ে চলে। নদী রাষ্ট্র মানে না, এক রাষ্ট্র ভেদ করে চলে যায় অন্য রাষ্ট্রে। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলা চলে। নদী সাম্যবাদী, সবাইকে সমান চোখে দেখে। জনপদের ভেতর দিয়ে চলে, বহমান থাকে অরণ্যের ভেতরও, পর্বতে আছে সে, রয়েছে সমতল ভূমিতে। জনপদ গড়ে তোলে, বড় হতে চায়, যেতে চায় সমুদ্রের দিকে। সব মিলিয়ে নদী হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতীক_ ভোটের গণতন্ত্র নয়, প্রকৃত গণতন্ত্র, যে গণতন্ত্র মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা ভেঙে দিতে চায়, প্রতিষ্ঠা চায় সাম্যের, শোষণের সুযোগ তৈরি করে না, বরং মানুষকে লালন-পালন করে। নদীর কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র একাধারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক। পুঁজিবাদের শত্রু সে, পুঁজিবাদ তাকে রাখবে কেন, তার গলাটিপে ধরতে চায় এবং ধরেও। সেটাকে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি আমাদের চতুষ্পার্শে; দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

আমাদের সাহিত্যে ও গানে নদীর উপস্থিতি সার্বক্ষণিক। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় জন্মেছেন, কিন্তু তিনি তো নদীরই কবি, তার সাহিত্য ও সঙ্গীত থেকে নদীকে বাদ দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। নজরুলের জন্ম কয়লাখনি অঞ্চলে, কিন্তু তিনিও নদীর মানুষ। জীবনানন্দ দাশ নদীকে নানাভাবে স্মরণ করেছেন, তার সব নদীই পূর্ববঙ্গের। জসীমউদ্দীন পদ্মাপারের মানুষকে নিয়েই লিখেছেন এবং এক সময়ে যে আর লিখতে পারেননি, তার কারণ পদ্মাপারের ওই জীবন থেকে তার বিচ্ছিন্নতা। মধুসূদন বাংলা ছেড়ে দূর দেশে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু কখনোই তার গ্রামের পাশের কপোতাক্ষ নদকে ভোলেননি।

ত্যক্তবিরক্ত হয়ে একদা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর। নগর বলতে আধুনিক সভ্যতাকেই বুঝিয়েছেন তিনি, এখন আমরা যাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বলে চিনতে পারি। কিন্তু অরণ্যে তো কাজ হবে না, তার জন্য রোদনও ব্যর্থ হতে বাধ্য, কেননা সে নিজেই উধাও হয়ে যাচ্ছে_ পুঁজিবাদের কঠিন কুঠারের নির্মম আঘাতে। এখন যাকে চাইতে হবে সেটা হচ্ছে নদী। নদীকে আমরা বাইরে চাইব, আমাদের ভেতরেও চাইব। কেননা নদী হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতিভূ, সে বিচ্ছিন্নতাবিরোধী এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐকান্তিকভাবে বিদ্রোহী; শুকিয়ে যাবে, তবু আত্মসমর্পণ করবে না। নদী বদান্যতারও প্রতীক, প্রাণ ঢেলে অর্পণ করে, অপরকে যতই দিতে পারে নিজেকে ততই সার্থক মনে করে। পুঁজিবাদের বুকের ভেতর যে রাক্ষস রয়েছে নদী তাকে পরোয়া করে না, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় নিজের স্থানীয় অবস্থান থেকে; আবার দৃষ্টিভঙ্গিতে নদী হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্বায়নের বাজার সে মানে না, আন্তর্জাতিকতাকে সমর্থন করে।

[ad#co-1]