মাদক ধরিয়ে দিয়ে জেল খাটছেন প্রতিবন্ধী চালক

মুন্সিগঞ্জে রমরমা মাদক ব্যবসা
রংপুর-মুন্সিগঞ্জ রুটের বাস নিউ মোল্লা পরিবহনের চালক আহম্মেদ মিন্টু বাকপ্রতিবন্ধী। গত ২৪ মার্চ মুন্সিগঞ্জ বাস টার্মিনালে যাত্রীরা নামার পর বাসের পেছনে মিন্টু অনেকগুলো প্যাকেট দেখতে পান। প্যাকেট খুলে দেখেন ভেতরে ফেনসিডিলের ৮৬টি বোতল। তিনি বিষয়টি বাসের মালিক বখতিয়ার উদ্দিন খান ও পুলিশকে জানান।

পুলিশ এসে মিন্টু ও বাসের সহকারী (হেলপার) জাহিদ হাসানকে আটক করে মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় নিয়ে যায়। দুজনকে আসামি করে উপপরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন মামলা করেন। ওই দিনই তাঁদের মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁরা এখনো ওই কারাগারে আছেন।

মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, মিন্টু ও জাহিদের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য আটকে সহায়তা করে মিন্টু ও জাহিদ কারাগারে গেলেও প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা আটক হন না। মুন্সিগঞ্জ শহর মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

গত ২০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও মাদক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সভায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারা মাদকের ব্যাপারে তাঁদের আতঙ্কের কথা বলেন।

মুন্সিগঞ্জ শহরে প্রায় সব পাড়া-মহল্লায় মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। গত ৩০ মার্চ রাত সোয়া ১১টায় মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে দুই যুবককে ফেনসিডিল বিক্রি করতে দেখা যায়। লঞ্চঘাটের দোকানদারেরা বলেন, এঁদের সবাই ভয় পান। সন্ধ্যায় মুক্তারপুর সেতুর নিচে বসে থাকলে দেখা যায়, মাথায় পাগড়ি বা পুলিশের মতো টুপি পরা ১০-১২ জনের একটি দল। স্থানীয় লোকজন এঁদের চেনেন। এঁদের পাগড়ি ও টুপির ভেতরে গাঁজার পোঁটলা থাকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, ব্যবসায় নিয়মিতভাবে নতুন মানুষ জড়িয়ে পড়ছে। তাঁরা জানান, ২৯ মার্চ আলম চান ওরফে টাইগারকে এক কেজি গাঁজাসহ মুক্তারপুর থেকে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাউসিয়া থেকে ৮৬ বোতল ফেনসিডিলসহ রেখা ও রাখী নামের দুই বোনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে পুলিশ গত ৭ মার্চ মুন্সিগঞ্জের টরকী গ্রাম থেকে ২০ বোতল ফেনসিডিলসহ নয়ন ও জিতুকে, ১০ মার্চ উত্তর ইসলামপুর থেকে ৩০ বোতল ফেনসিডিলসহ শরীফকে এবং ২৩ মার্চ নয়নতারা নামের মাদক ব্যবসায়ীকে রামপালের দালালপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে শরীফ আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সন্ধ্যা মিস্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা মূলত হেরোইন, ফেনসিডিল, দেশি-বিদেশি মদ, গাঁজা, ইয়াবা বড়ি বিক্রি করেন।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানা সূত্র জানায়, গত চার মাসে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার পুলিশ মাদক নিয়ে ৫৫টি মামলা করেছে এবং ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাঝেমধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। মানিকপুর এলাকায় মাদকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাহাঙ্গীর ও সুমন গ্রুপের মধ্যে গত ২৪ এপ্রিল মারামারি হয়। এতে পুলিশ জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই ওমরকে গ্রেপ্তার করে।

শহরের সাধারণ মানুষ ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের কর্মীরাই জড়িত। তাঁরা গ্রেপ্তার হলে ছাড়ানোর জন্য তদবির করেন ওই সব রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। তদবিরের অভিযোগ আছে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার ছেলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, মুক্তারপুরে একসময় মাদক কেনাবেচা হতো শহর বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমদের নির্দেশে। মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসের অভিযোগে যৌথ বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তারও করে। এ ব্যাপারে মহিউদ্দিন বলেন, ‘সেটা বিএনপির আমলের কথা এবং এসব অভিযোগ সত্য নয়।’

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, কার্যকরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে জনগণকে সম্পৃক্ত হতে হবে।

শতদল সরকার ও তানভীর হাসান