অন্যদের সময়ে বেঁচে থাকা হুমায়ুন আজাদ

তুহিন ওয়াদুদ
হুমায়ুন আজাদ প্রথাবিরোধী লেখক। তিনি প্রথাগত সমাজের অসারতা নির্দেশপূর্বক সে সমাজের বাইরের মানুষ ভাবতেন নিজেকে। তার সব লেখনীজুড়ে তার যে প্রকাশ তা প্রকৃতভাবে তার চেতনারই প্রতিবিম্ব। স্রষ্টা হিসেবে তার সব সৃষ্টিকর্মের মূল সুর মুক্তচিন্তা। বাঙালি সত্তা মৌলিকতা থেকে অনেক দূরে। অনুকরণে অনুকরণে সৃষ্টিশীলতা বিলীনপ্রায়। হুমায়ুন আজাদ এ ধরনের প্রথাগত সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বের করে নিতে পারেননি। তখন তিনি বলেছেন, বাধ্য হয়েই যেন অন্যদের সময়ে তাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। আমরা আরোপিত এক সমাজ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। আমরা আমাদের মতো করে কোনো কিছুই করতে পারিনি। না পেরেছি বলতে, না পেরেছি ভাবতে, না পেরেছি শিখতে। ফলে যে সমাজ নির্মিত হয়েছে, সে সমাজ যেন অন্যদের সমাজ। সে সমাজের কেউ নন হুমায়ুন আজাদ। তিনি এ ব্যর্থতাকে বলেছেন সীমাবদ্ধতা।

সীমাবদ্ধতার উৎসমূল হিসেবে তিনি সমাজকে দায়ী করেছেন_ ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা মস্তিষ্কের নয়, দ্বিতীয় মস্তিষ্কের অর্থাৎ সমাজের’ (সীমাবদ্ধতার সূত্র)। তার ধর্ম ও নারীবিষয়ক সব ভাবনার প্রাণ হচ্ছে মানবতাবাদ। ধর্ম ও নারী নিয়ে সমাজে প্রচলিত খোলস সর্বস্বতার পরম বিরোধী ছিলেন তিনি। তার সে বিরোধিতা মূলত অন্তঃসারশূন্য সবকিছুর বিরুদ্ধে।

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিকথা গ্রন্থে দশের মধ্যে এক না হয়ে দশের মধ্যে এগারো হওয়ার যে নির্দেশ কিংবা পরামর্শ, হুমায়ুন আজাদ ছিলেন তেমনই। সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করেছিলেন তিনি। ফলে সময় তাকে মেনে নেয়নি। চাঁছাছোলা বাক্য বাণস্বরূপ নিক্ষিপ্ত করেছেন সমাজের বুকে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক নান্দনিকতায়, বাঙালি সংস্কৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হুমায়ুন আজাদ তাই বাঙালির চেতনা গঠনে হতাশ হন : ‘সে তুমি কেমন করে, বাংলা, সে তুমি কেমন করে/দিকে দিকে জন্ম দিচ্ছো পালে পালে শুয়োরকুকুর?’ (যে তুমি ফোটাও ফুল, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে)।

বহুমাত্রিক শিল্পপ্রতিভায় বিকশিত হুমায়ুন আজাদ। কথাসাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ প্রভৃতিতে বিন্যস্ত হয়েছেন তিনি। স্থিতধী এ শিল্পপ্রতিভা বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাষাবিষয়ক তার গবেষণা গ্রন্থগুলো বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কিশোর উপযোগী তার ‘লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ এবং ‘কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী’ অনবদ্য সৃষ্টি। সরস ভাষাবিন্যাসে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে আত্মস্থ করার মতো দুটি অমর গ্রন্থ।

‘আমার অবিশ্বাস’, ‘সবকিছু ভেঙে পড়ে’, ‘আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে’, ‘নারী’, ‘সীমাবদ্ধতার সূত্র’, ‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ’, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানসহ বেশকিছু গ্রন্থ তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে এসেছে।

বাংলার সক্রেটিস হুমায়ুন আজাদের কাঙ্ক্ষিত সমাজ বিনির্মাণের পথ প্রসারিত হোক। প্রথাবিরোধী সত্যানুসন্ধানী হুমায়ুন আজাদের জন্মদিনে তার প্রতি বিনম্র প্রণতি।

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. Tar jonmo vul somaye hoyechilo, somayer theke tini druto gotite cholechen.