রাজনীতির বিকল্পটা কী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
না, রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই, অথবা বলা চলে রাজনীতির বিকল্প হচ্ছে রাজনীতিই, ঠিক যেভাবে মেনে নিতে হয় যে মানুষের কোনো বিকল্প নেই, যার অর্থ হলো মানুষের বিকল্প হচ্ছে মানুষ নিজে_দেবতাও নয়, পশু নয়। তবে হ্যাঁ, রাজনীতির প্রকারভেদ রয়েছে। ঠিক যেভাবে মানুষের ভেতর সবাই এক রকমের নয়_ কেউ ভালো, কেউ মন্দ, রাজনীতিতেও তেমনি ভালোও আছে, আবার মন্দও আছে, কিন্তু রাজনীতি ছাড়া চলার কোনো উপায় নেই। কেন যে নেই, সেটা মোটেও দুর্বোধ্য নয়। কারণটা হলো রাষ্ট্রের উপস্থিতি। রাষ্ট্র যেখানে আছে রাজনীতিও সেখানে থাকবেই। আর রাষ্ট্র কোথায় নেই, কখন নেই? বিশেষ করে আজকের যুগে?

এই উপমহাদেশে অনেক সময়ই আমরা ভাবতে চেয়েছি, আমাদের জন্য সমাজই বরং বড়, রাষ্ট্রের চেয়ে। এমনও বলা হয়েছে, আমাদের সমস্যাগুলো আসলে সামাজিক বটে, রাজনৈতিক নয়। দুটো বক্তব্যেই সত্য আছে। সমাজ নিশ্চয়ই বড় রাষ্ট্রের চেয়ে, রাষ্ট্রের শাসকরা আসেন যান, কিন্তু সমাজ তো রয়েই যায় এবং আমরা তো সমাজেই বসবাস করি। আমাদের সমস্যাগুলোকে তাই সামাজিক বলাটা মোটেই অন্যায় নয়। কিন্তু বড়ই নিষ্ঠুর সত্য হলো এটি, রাষ্ট্রই সমাজের ওপর লাঠি ঘোরায়, রাষ্ট্রই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সামাজিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে পার পেতে পারি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করলে শাস্তি যে পাব, সেটা অবশ্যম্ভাবী। আর ওই যে সামাজিক সমস্যাগুলো, সেগুলোও পুষ্ট হয় রাষ্ট্রের আনুকূল্যেই। যেমন ধরা যাক, সমাজে শোষণ আছে, সেখানে ধনী লোকেরা শোষণ করে গরিবদের; কিন্তু ওটা তারা করতে পারে রাষ্ট্র তাদের সমর্থন করে বলেই। আইন-কানুন, পুলিশ, মিলিটারি সবই ধনীদের পক্ষে। কেননা, রাষ্ট্রকে যাঁরা চালনা করেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় যাঁরা থাকেন তাঁরা সবাই ধনী। সরকার বদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্র বদলায় না, রাষ্ট্র রয়ে যায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং সরকার গরিবকে লাঞ্ছিত করে ধনীর স্বার্থে।

রাষ্ট্র যে কেমন নৃশংস হতে পারে তার পরিচয় তো আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালে, পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন ওই রাষ্ট্রেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। ব্যাপারটা ছিল একটি অতি নাটকীয় উন্মোচন, কিন্তু তাই বলে ওই রাষ্ট্রের কাছ থেকে ওই ধরনের আচরণ যে অপ্রত্যাশিত ছিল তা তো নয়। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের স্বভাবের মধ্যেই ছিল বাঙালিকে লাঞ্ছিত করা, বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাস বলে রাষ্ট্র বদলেছে। একসময় আমরা ছিলাম ব্রিটিশের রাষ্ট্রে, যেটা আয়তনে ছিল বিশাল, সেখান থেকে বের হয়ে এসে আমরা তুলনায় ছোট একটি রাষ্ট্র গঠন করলাম। নাম তার পাকিস্তান। সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আরো ছোট একটি রাষ্ট্র গড়লাম, নাম তার বাংলাদেশ। রাষ্ট্র বদলাল, কিন্তু সেটা বাইরের শুধু, ভেতরে সে রয়ে গেল সমানভাবে নিপীড়নকারী।

বদলাল না কেন? কারণটা হলো জনগণ আন্দোলন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আন্দোলন রাষ্ট্রের চরিত্রে যে পরিবর্তন আনবে তা করতে পারেনি। ব্রিটিশের শাসন শেষ হলে শাসনকর্তারা পাকিস্তানি শাসকদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করেছিল। বাংলাদেশ যখন প্রতিষ্ঠিত হলো মানুষ তখন আশা করেছিল, রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু শাসন বদলায়নি। আগের শাসকরা যেমন নিজেদের স্বার্থ দেখত এবং দেখতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে ছাড়ত, নতুন শাসকরাও ঠিক সেই কাজই করতে থাকল। অর্থাৎ কিনা এবারও স্বাধীনতা এল না, মুক্তি তো দূরের কথা, যা ঘটল তা ওই পুরনো ক্ষমতা হস্তান্তরই।

রাষ্ট্রের ভেতরে যে আদর্শটি কাজ করছে তাকে বলা যায় পুঁজিবাদী। দুটি বিশেষ বিষয়ে পুঁজিবাদ অত্যন্ত বেশি আগ্রহী। একটি হলো মানুষকে আত্দস্বার্থসর্বস্ব করে তোলা, দ্বিতীয়টি হলো মানুষকে ভোগবাদী হতে উৎসাহ দান। পুঁজিবাদী আদর্শের তৎপরতা ব্রিটিশ আমলে ছিল। পাকিস্তান আমলে অবশ্যই ছিল। বাংলাদেশের সময়ে সেটা কমেনি বরং আরো ব্যাপক ও গভীর আকার ধারণ করেছে। বাঙালির অনেক দুর্নামের একটি হলো এই, সে বড় বেশি রাজনীতি করে, হোক না হোক সবকিছুতেই সে রাজনীতিকে টেনে আনে; কিন্তু বাঙালির পক্ষে রাজনীতিসচেতনতা না হয়ে উপায়টা কী? রাষ্ট্রই তাকে বাধ্য করে রাজনীতি সচেতন হতে। কেননা, রাষ্ট্র তার মিত্র নয়, কখনো ছিল না, এখনো হয়নি। রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেয় না, উপরন্তু নানাভাবে তাকে পীড়ন করে। রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা তাই বাঙালির পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি, এখনো হচ্ছে না। আর এই যে উপেক্ষা করতে না-পারা, এটাকেই তো বলা হয় রাজনীতি করা। বাঙালি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে, আন্দোলনও করে। বাধ্য হয় ওই কাজে।

দেশে যখন অরাজনৈতিক সরকার আসে তখন যাঁরা শাসনক্ষমতা পান তাঁরা মূলত হচ্ছেন আমলা। তাঁরা তখন প্রকাশ্যে চলে আসেন এবং বলতে থাকেন, তাঁরা রাজনীতি করছেন না। অথচ সত্য হলো এই_ওই রাজনীতি না করাটাই হলো একটা রাজনীতি। তথাকথিত অরাজনৈতিক শাসকরাও রাজনীতিই করেন এবং চেষ্টা করেন মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলতে, যাতে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে লোকে রাজনীতি বলে চিনতে না পারে, না চিনে মনে করে যে দেশে যা চলছে তা হচ্ছে রাজনীতি নয়, জনকল্যাণ। রাষ্ট্রশাসন আর রাজনীতি যে একই বস্তুর দুটি ভিন্ন নাম এই সত্যটিকে তাঁরা চাপা দিয়ে রাখতে চান। তা যার কর্র্তৃতাধীনই থাকুক না কেন, রাজনীতি কিন্তু থাকবেই। বাঙালিকে তাই রজনীতি নিয়ে ভাবতেই হয়, রাজনীতি সম্পর্কে কথা বলতেই হয়। সে আন্দোলনও করে, কিন্তু তার দুর্ভাগ্য এই_আন্দোলনের ফলে শাসকের পরিবর্তন আসে না। রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে আসে না, বিপক্ষেই রয়ে যায়। আসলে সঠিক রাজনীতির সন্ধান বাঙালি পায়নি। সঠিক রাজনীতি বলতে কী বুঝব? এটা হচ্ছে সেই রাজনীতি, যা সমাজব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের বিদ্যমান সম্পর্কে পরিবর্তন এনে মানুষকে মানুষের শত্রু হিসেবে না রেখে তাদের পরস্পরের মিত্র করে তুলবে এবং সবার মুক্তি সম্ভব করে প্রত্যেকের জন্য মুক্তি নিয়ে আসবে। সমাজ বিপ্লবই হবে আসল লক্ষ্য এবং সেই বিপ্লবের প্রয়োজনেই এই রাজনীতি চাইবে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় কাঠামো ও আদর্শ উভয় দিক দিয়েই পরিবর্তন ঘটাতে। ভালো রাজনীতির যে প্রশ্ন শুরুতে এসেছে এটা হচ্ছে সেই রাজনীতি। এই ভালো রাজনীতি না পাওয়ার দরুনই আমাদের এতটা দুর্ভোগ।
আমাদের বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতির আবার দুটি ধারা রয়েছে_একটি আন্দোলনের, অপরটি নির্বাচনের। এ দুটি এক হয়। আন্দোলন চায় সমাজ পরিবর্তন, নির্বাচন চায় সরকার পরিবর্তন। দুইয়ের ভেতর পার্থক্যটা একেবারেই মৌলিক। আমাদের রাজনৈতিক অর্জনগুলো আন্দোলনের পথেই এসেছে, নির্বাচনের পথে নয়। সত্তরের নির্বাচনের পরে যে আমাদের যুদ্ধে যেতে হয়েছে, এটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। তবে মানতেই হবে, আমাদের আন্দোলন তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

মূল কথাটা হলো, রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই এবং রাজনীতিকে যদি সঠিক পথে এগোতে হয়, তাহলে আন্দোলন ভিন্ন উপায় নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

[ad#co-1]