বিক্রমপুরের পীর সাহেব

গওহার নঈম ওয়ারা
‘বিক্রমপুরের পীর সাহেবকে নিয়ে লিখছেন নিশ্চয়ই’ একজন পাঠক এ রকমই একটা ই-মেইল পাঠিয়েছেন। পাঠিকাও হতে পারেন তিনি। কারণ নামটা এদেশে নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। কাজল। এ রকম আরো অনেক নাম আছে বাংলায়, যা সবার জন্য প্রযোজ্য। যেমন বাবলা, বুবলা, বাবুই, পদ্ম, পনীর ইত্যাদি। ই-মেইল প্রেরক নারী কি পুরুষ সেটা কোনো বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে পীরের বিষয়টি সকলকেই নাড়া দিয়েছে। যে পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে এই বর্বরতা আর নৃশংসতার কথা ছাপা হয়েছে তার পাল্টা শিবিরের পত্রিকার সম্পাদক সেদিন সকালে বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের বর্ণনায় এসেছিলেন। তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেন এই সাহসী প্রতিবেদনের। আমি মনে মনে বললাম, ধন্য ধন্য। ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করার মহানুভবতা দেখে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এই তো চাই, শিখুক আমাদের রাজনীতিবিদরা কেমন করে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে হয়।

শিশু নির্যাতনের কোন সংজ্ঞায় পীরের এই কাজকে সংজ্ঞায়িত করা হবে তা আমার জানা নেই। ভাবতে অবাক লাগে প্রকাশ্যে এসব ঘটনা ঘটেই চলছিলো আর আমরা কেউ সেটা বুঝতে পারছিলাম না। এটা কেমন করে হয়। তাহলে কি এদেশে সক্রিয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা নেই। সবাই কি ঘুমিয়ে থাকেন। গুঁতো দিলেই তবে নড়েচড়ে বসেন আর না ঘুমিয়ে জেগে ছিলেন বলে প্রচার চালান। পুলিশ, গ্রাম-পুলিশ, আনসার ভিডিপি, হালের কমিউনিটি পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কতদূরে বসে ডিম পাড়েন তা জানা দরকার। ঋণের টাকা দিতে আর সুদ তুলতে যেসব উন্নয়ন কর্মী বাড়ি বাড়ি চোষে বেড়ান এটা কি তাদেরও চোখে পড়েনি? নাকি এটা প্রজেক্টের মধ্যে পড়ে না। যেসব স্বাস্থ্যকর্মী গর্ভবতী মায়ের খোঁজে তন্ন তন্ন করে ফেলেন গ্রাম-মহল্লা তারাও দেখতে পেলেন না এই অনাচার। ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার, মহিলা মেম্বার এদের কারো নজরে পড়ল না।

’৭১-এর বর্বরতাকে হার মানায় এসব কর্মকাণ্ড। কেউ এসবের জবাব চাইবে না। কেউ এসব প্রশ্নের জবাব দেবে না। কিন্তু এ প্রশ্নের কূল-কিনারা না হলে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনোই ঠেকানো যাবে না।

প্রতিবেদন দেখে একজন ‘মৌলবাদী’ উন্নয়ন কর্মী প্রশ্ন তোলেন ‘এ ছবি তোলা এবং ছাপানো কতখানি শিশু সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে?’ একেবারেই বইয়ের কথা। কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে খুব সম্ভবত ইংরেজি লাইফ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল এক ব্যক্তি অন্য একজনকে খুন করতে উদ্যত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত খুন করেছে। যিনি ছবিটা তুলেছিলেন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘লোকটাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে আপনি তার ছবি তুলতে গেলেন কেন? খুবই নৈতিক প্রশ্ন। ছবিওয়ালার উত্তর ছিল- আমি তাকে বাঁচাতে পারতাম না তবে ছবি তুলে ঐ ঘাতকের হাত থেকে অন্য আরো অনেককে বাঁচাতে পেরেছি বলে আমি মনে করি’। এ ক্ষেত্রে হয়ত পীরকে বাধা দিতে গেলে পীর বা পীরের সাঙ্গোপাঙ্গরা ছবিওয়ালাকেও শূন্যে ঘুরিয়ে দিতেন। কে জানে?

বিরোধী শিবিরের পত্রিকা এখন প্রশ্ন তুলেছেন এসব ছবির মৌলিকতা নিয়ে। তারা সন্দেহ করছেন এসব পাতানো ছবি। রং চড়ানোর জন্য তোলা হয়েছে। সেনসেশনাল সংবাদ ফ্যাঁদা হয়েছে, আসলে সব ভুয়া। বলা হচ্ছে পীরকে জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে সাংবাদিক ভাড়া করা হলে তিনি পীরকে বোকা বানিয়ে তাকে দিয়ে বিভিন্ন সাজানো ভঙ্গিতে ছবি তুলে নিজেই বিখ্যাত হতে চেয়েছেন। এটা যদি সত্যি হয় তাহলে কি পীর পার পেয়ে যাবেন। যারা বিখ্যাত হওয়ার জন্য একটা শিশুকে পা ধরে শূন্যে ঘোরাতে পারে বা তার পেটের ওপর পা রেখে ভঙ্গিমা করতে বা পোজ দিতে পারে সে নিছক শয়তান নয় বরং ভয়ঙ্কর খবিশ শয়তান। তার শাস্তি তো আরো কঠোর হওয়া দরকার। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে পীরের দিক থেকে ক্রমশ দৃষ্টি ছবিওয়ালার দিকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এই চেষ্টা যতই জোরালো হবে পীরের বেড়া ততই ফাঁক হবে আর সেই ফাঁক দিয়ে কোন সময় যে পীর পগার পার হয়ে যাবে তা কেউ টের পাবে না।

ভাবতে কষ্ট হয় যখন বিক্রমপুরে তথাকথিত ‘আধুনিক সভ্যতার’ কোনো ছোঁয়া ছিল না, পোড়া ইটের বাড়ি ছিল না। আলু চাষ, কোল্ড স্টোরেজ, ডিস এন্টেনা, কম্পিউটার, মোবাইল, টেলিফোন এসব কিছুই ছিল না তখন এক নিভৃত পল্লী থেকে অতীশ দীপঙ্কর বেরিয়ে পড়েছিলেন চীনের মানুষদের দীক্ষা দিতে। প্রথম বেতার যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন এই বিক্রমপুরে বড় হওয়া জগদীশ চন্দ্র বস্।ু এরকম আরো অনেক বিখ্যাত মনীষীর জন্ম যেখানে, সেখানে এই ২০১০ সালে যখন মানুষ অন্য গ্রহে গিয়ে ‘ব্যবসাবাণিজ্য’ করার কথা ভাবছে তখন দীপঙ্করের আর জগদীশের উত্তরসূরিদের কোন কুশিক্ষা পা ধরে শূন্যে ঘোরাচ্ছে। আর প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্দরলোকরা তা অবাক চোখে কেউবা কৌতুক অনুভব করতে করতে ক্যামেরার সামনে দিব্যি ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকছে।

অবসরপ্রাপ্ত এক বামপন্থী বন্ধু এখন প্রগতিশীল পত্রিকায় কাজ করেন হঠাৎ বলে বসলেন, এই সামান্য খেটে খাওয়া পীরকে নিয়ে তুমি মাতম করছ কেন? বিজ্ঞাপনওয়ালারা কি শিশুদের নিয়ে একই কাম করে না? বরং আরো বেশি করে। শিশুকে দিয়ে তারা মোবাইল কেনায়, গাড়ি কেনায়। এক শিশু আরেক শিশুকে টেলিভিশন দেখতে দেয় না, গাড়ি থেকে ঠেলে নামিয়ে দেয়। কোন শিশুকে দিয়ে মোবাইলে তার মৃত মায়ের সঙ্গে কথা বলায় এসবই করে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে টুপাইস কামাইয়ের জন্য। পীরের সঙ্গে তাদের তফাৎ কি? এদের লেজে হাত দিতে পারবে। পীর তো একবার ঘুরায়ে ২০০ টাকা নিয়ে শেষ। আর বিজ্ঞাপনওয়ালারা যে পুরো জেনারেশন ধরে ঘুরিয়ে দিচ্ছে সেটা দেখবে কে? সঙ্গে সঙ্গে অন্নদাশংকরের কবিতাও আওড়ায় : ‘তেলের শিশি ভাঙলে বলে/খোকার উপর রাগ করো/তোমরা যেসব বড় খোকা/দেশটা…।’

কথা ঠিক শিশুদের বিজ্ঞাপনে যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কেউ বলার নেই, কেউ দেখার নেই। এটা পুলিশের কাজ নয়। র‌্যাবের ক্রসফায়ারের প্যাকেজেও এদের ফেলা যাবে না। ক্ষুদ্রঋণ কারবারীদের প্রজেক্টেও এসবের স্কোপ নেই। তাহলে কী হবে। কে দেখবে এসব কেমন করেই বা এসব অনাচারের বিহিত হবে?

আমাদের সংবিধানে ন্যায়পালের ব্যবস্থা আছে। অনেক ভালো জিনিসের মতো সেটাও আমরা ভুলে গেছি। গত পনেরো বছরে অন্তত ছয়বার জাতিসংঘের কাছে আমরা ওয়াদা করে এসেছি- বড় ন্যায়পাল না হলেও শিশুদের স্বার্থ রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা একটা সাংবিধানিক ন্যায়পালের পদ তৈরি করব। যিনি ও যার অফিস শিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে নজরদারি করবে। শিশুদের স্বার্থ রক্ষা না হলে লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কাজ আর এগোয় না। সবার ভয় ন্যায়পাল যদি সত্যি সত্যি যুধিষ্ঠির মতো ন্যায়ের পক্ষে চলে যায় শিশুদের পক্ষে কথা বলে তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে। তার চেয়ে আরেকটু দেখি। আমার পরে যে আসবে সে ‘শালা’ না হয় দেখবে। আমি কাটিয়ে দেই না কেন আমার কটা দিন। আগে তো কখনো ছিল না তখন কি দিন চলেনি। আমরা কি ‘মানুষ’ হইনি। তারা যে মানুষ হয়েছেন তারাও জানেন আর জানেন ঈশ্বর।

nayeem5508@gmail.com

[ad#co-1]