ডাকাত শহীদ : ঠাণ্ডা মাথার এক খুনি

‘আমি শহীদ, পুরনো ঢাকার সেই ডাকাত শহীদ। আমাকে চিনতে পারছেন? আমার ছেলেরা আপনার কাছে যাবে। যা চাইবে দিয়েন; ওরা আমাকে পৌঁছে দেবে। অন্যথায় ঝামেলা হবে।’ এভাবেই কোনো ব্যবসায়ীকে মোবাইল ফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ। সহযোগীদের পাঠিয়ে এভাবে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলে। আর টাকা না পেলে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। ডাকাত শহীদের চাঁদাবাজি চলছে এমনিভাবে। পুরনো ঢাকাবাসী ডাকাত শহীদের নামে চাঁদা দিতে দিতে অতিষ্ঠ। ডাকাত শহীদ নামটি তাদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু যার নামে এত চাঁদাবাজি, তাকে অনেকেই সরাসরি দেখেনি। চিনেও না। শুধু নাম শুনেছে। নামেই চলে চাঁদাবাজি। সহযোগীরা পুরনো ঢাকায় চষে বেড়াচ্ছে। হাতেগোনা দু’একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও আবার জামিনে বেরিয়ে এসে দ্বিগুণ উত্সাহ নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সহযোগীদের কেউ গ্রেফতার হলে এর বদলা হিসেবেও খুনখারাবি করছে ডাকাত শহীদ। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ডাকাত শহীদ এক ঠাণ্ডা মাথার খুনি। নিজে এলাকায় না থাকলেও তার নামে চলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

গত এক যুগে পুরনো ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাসহ একডজনেরও বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট হাবিব মণ্ডল, যুবদল নেতা সাগির, ওয়ার্ড কমিশনার আহমেদ হোসেন হত্যার নায়ক কে? পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা এক কথায় বলছে, ডাকাত শহীদ। পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার বংশাল থানার সাব-ইন্সপেক্টর গৌতম রায় খুনের পেছনেও রয়েছে ওই ডাকাত শহীদ। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৬ বছর ধরে পালিয়ে থেকেও সে নিয়ন্ত্রণ করছে পুরনো ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড।

নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় বেশ কয়েক ব্যবসায়ী জানান, চাঁদা না দিয়ে তারা ব্যবসা করতে পারেন না। দলের লোকজন এসে চাঁদার টাকা নিয়ে যায়। চাঁদা না দিয়ে কেউ এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে পারে না। কেউ বাড়ি নির্মাণ করতে গেলেই ডাকাত শহীদের লোকজন হাজির। ধার্য করা হয়, মোটা অঙ্কের চাঁদা। টাকা না দিলে হুমকি দেয়া হয় হত্যার। বাধ্য হয়ে চাঁদা দেন তারা। বংশালের গ্রিল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন—পুরনো ঢাকার একচ্ছত্র আধিপত্য ডাকাত শহীদের। একসময় ৮৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার সাইদুর রহমান শহিদ, শীর্ষ সন্ত্রাসী কচি ও ডাকাত শহীদ—এই তিনজন নিয়ন্ত্রণ করত পুরনো ঢাকা। কচি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। শহীদ কমিশনারও অনেকদিন কারাগারে আটক ছিল। বর্তমানে সে জামিনে মুক্ত। ২০০৫ সালের পর প্রায় দুই বছর ডাকাত শহীদের চাঁদাবাজি কিছুটা বন্ধ ছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে আবার পুরোদমে শুরু হয় চাঁদাবাজি। ব্যবসায়ীরা বলেন, ডাকাত শহীদের ন্যূনতম চাঁদা ২ লাখ টাকা। তবে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্তও সে চাঁদাবাজি করেছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। পুরনো ঢাকার নিহত আহমেদ কমিশনার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত বিদ্যুত্ ডিবি কর্মকর্তাদের কাছে বলেছিল, আহমেদ কমিশনারের কাছে ডাকাত শহীদ প্রথম চাঁদা চেয়েছিল ১ কোটি টাকা। পরবর্তীকালে ৫০ লাখ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। এ টাকা না দেয়ায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। একইভাবে লক্ষ্মীবাজারে জুয়েলারি ব্যবসায়ী প্রেমকৃষ্ণের কাছে ডাকাত শহীদ চাঁদা দাবি করেছিল ১০ লাখ টাকা। এ টাকা না দেয়ায় তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ায় ডাকাত শহীদের দোসররা। পরবর্তীকালে গত ৪ মার্চ তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিছুদিন আগে ওয়ারীতে এসকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বোমা ফাটায় সন্ত্রাসীরা। ৫ মাস আগে ফরাশগঞ্জে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ডাকাত শহীদের ৩ স্যাঙ্গাত গ্রেফতার হয়।

পুলিশ জানায়, ডাকাত শহীদের দোসরদের গ্রেফতারের জন্য র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তত্পর রয়েছে। শহীদ ২০০৫ সাল থেকে দেশে নেই। ভারতের কারাগারে আটক হলেও পরে মুক্তি পেয়েছে। বর্তমানে ভারতে আছে সে। তবে ভারত সরকার পুলিশকে বলেছে সে নেপালে রয়েছে। কিন্তু পুলিশের ধারণা, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সে মোবাইলে চাঁদাবাজি করছে বাংলাদেশে। পুলিশ জানায়, এরই মধ্যে ডাকাত শহীদের অর্ধশত সহযোগীর মধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন কিলারও রয়েছে। প্রেমকৃষ্ণ ও আহমেদ কমিশনার খুনের পর শুটার নান্টু, আসলাম, নূরে আলম, শহীদুল ওরফে বিদ্যুত্, কাওসার আহম্মেদ ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। ৪/৫ জনকে ক্রসফায়ার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯৮ সালে শ্রীনগর থেকে অপরাধ করে পুরনো ঢাকায় পালিয়ে আসে শহীদ। এরপর একাধারে অপরাধ করে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে সে। নৌডাকাতি, বাস ডাকাতি ও টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করে সে হয়ে ওঠে দুর্ধর্ষ। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কোতোয়ালি ও কেরানীগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে দু’ডজন মামলা রয়েছে। পুলিশ বলছে, ডাকাত শহীদ এক ঠাণ্ডা মাথার খুনি। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের মামলায় তার বিরুদ্ধে

নাছির উদ্দিন শোয়েব

[ad#co-1]