আগ্রাসী পদ্মা প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে ভাগ্যকূলের জনপদ

গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ)
পদ্মার ভয়াল ভাঙনের মুখে এভাবেই জীবনসংগ্রামে বিভোর মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূলের অসহায় বাসিন্দারা : শফিউদ্দিন বিটু
‘গতবার সরকার একটু দিছিল, এইবার সরকার দিতাছে না; বান দিমু কিভাবে। আল্লাহ কই যামু, আমগো তকদির খারাপ, কেউই দেখতাছে না। ওহরে… দেখছোনি। কি রকম! আগুনে পুড়লেও ভিটাবাড়ি কিছু থাকে কিন্তু ভাঙনে কিছুই থাকে না। জীবনে যা করলাম সবই গাঙে নিয়া গেল। অহনে কিন্তু নদীর (ভাঙনের) কথা কয় না সরকার, পদ্মা ব্রিজের কথাও কয় না।’

গতকাল মঙ্গলবার প্রাচীন জনপদ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙনকবলিত ভাগ্যকূল ও বাঘড়ার বাসিন্দাদের এসব আক্ষেপের কথা শোনা যায়।

কথা হয় ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকূল বাজারের ৫০ বছরের মুদি ব্যবসায়ী সত্তরোর্ধ্ব নুর ইসলাম দেওয়ানের সাথে। তিনি বলেন, গত ৩৫ বছরেও এমন ভাঙন দেখিনি। তিন বছর আগেও ওই (দূরে) মাঝখানে গাঙ আছিল। সংসার চলে এই দোকান দিয়া, অহন দোকানের কোনাডু গেছে। এক রাইতের মধ্যে বাকিডুও যাইব গা। তাই দোকানে থাকতে পারি না, থাকলে মইরা যামু।

সূর্য বানুর (৫০) বংশপরম্পরায় ৬০ বছরের স্খায়ী বসতি ভাগ্যকূল গ্রামে। লাগ ঘেঁষা পদ্মাতীরেই খোলা আকশের নিচে রান্না করছেন। প্রচণ্ড বাতাসে আগুন ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তিন ছেলে ও এক মেয়ের জন্য তারপরও আহার জোগানের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। জুবুথুবু অবস্খায় ইশারায় রান্নাঘরের অবস্খার দিকে দেখিয়ে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ডর করে কখন কি ভাইঙ্গা পড়ে। ভাবতেও খারাপ লাগে। অর্ধেক ফুটে, অর্ধেক ফুটে না। এত কষ্ট কইরা রান্না করি। আর রাতের বেলায় ডরের ঠেলায় রাতভর হাঁটি। ঘুম যাই না। সবই তো গাঙে নিয়া যাইতাছে।
পাশেই একই অবস্খায় পঞ্চাশোর্ধ্ব মমতাজ। তিনি বলেন, ঘর ওই বাগানে ভাইঙ্গা থুয়া দিছি। এখন ছাপড়ায় থাকি। যামু কই?

ভাঙছে নদী, বাড়ছে মানুষের আহাজারি। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে দুর্বার হয়ে উঠেছে পদ্মা। আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন নদী তীরের বাসিন্দারা। তাদের মুখে এখন একটাই কথা, ভিটামাটি হারিয়ে কোথায় যাব!

ব্রিটিশ আমলের দেশের অন্যতম প্রখ্যাত নৌবন্দর ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকূল। গত কয়েক দিনের পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন এখন তাদের দুর্ভাগ্যেপরিণত হয়েছে। ভাঙন দেখা দিয়েছে পার্শ্ববর্তী লৌহজং উপজেলার মশলদিয়া ও কান্দিপাড়া গ্রামেও।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী জানান, গ দু’সপ্তাহের ব্যবধানে পদ্মায় পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ঢেউয়ের আঘাতে ভাগ্যকূল বাজারের ১৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ মাওয়া থেকে বাঘড়া পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় শতাধিক বিঘা বসতভিটা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তেই ১০-১৫ হাত জায়গা কেড়ে নিচ্ছে পদ্মা। এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে ভাগ্যকূল মাছের আড়ত, মনির হোসেন ও রাধে গোবিন্দর মুদি দোকান, গোকুল শাহের চালের দোকান, নবীন খান, ওবায়দুল মুন্সি, হানিফা হাওলাদার ও রুহুল আমীনের গ্রিলের দোকানসহ ১৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সরিয়ে নেয়া হয়েছে­ ভাগ্যকূল, দক্ষিণ কামারগাঁও, কেদারপুর, বাঘড়া, মাঘডাল, মাঠপাড়া, মান্দ্রা, চারিপাড়া ও কবুতরখোলা গ্রামের ২০-৩০টি বাড়িঘর। প্রচণ্ড হুমকির মুখে রয়েছে ভাগ্যকূল বাজারের ৪০০টি দোকান। আরো হুমকির মুখে রয়েছে ঢাকা-দোহার সড়কসহ নদীতীরবর্তী পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি।

ভাগ্যকূল বাজারের ব্যবসায়ী আয়নাল হক জানান, নদীতীরবর্তী সহস্রাধিক পরিবারের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অথচ স্খানীয় প্রশাসন নদীভাঙন রোধে কোনো স্খায়ী ব্যবস্খা নিচ্ছে না। গত বছর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মাথাপিছু দুই হাজার টাকা ও আধা মণ চাল দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বছর এখনো কোনো খোঁজই নেয়া হয়নি।
জমিজমা হারিয়ে নি:স্ব আবুল কাশেম ভূঁইয়ার ছেলে শফিকুল ভূঁইয়া বলেন, তিন বছর আগে প্রথম ভাঙনে আমাদের সব কিছুই গেল। রিফিউজির মতো অন্য একজনের বাড়িতে ঠিকানা গড়েছি।

জানা গেছে, পদ্মার করাল গ্রাসে ইতোমধ্যে গত তিন বছরের ব্যবধানে আড়াই হাজার একর ফসলি জমি, বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কামারগাঁও-শাইনপুকুর বাইপাস সড়কের সাত কিলোমিটার।

ভাগ্যকূল ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম খান একুল জানান, প্রতি বছরই কিছু বালুদস্যু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এসব এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর ভাঙন রোধ করা কঠিন বিষয়। তাই স্খানীয় সংসদ সদস্য নিজ উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করে ব্যবস্খা নিলে নদী সিকস্তিরা উপকৃত হবে।

শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল লতিফ আকস্মিক ভাঙনের কথা স্বীকার করে বলেন, ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে ‘অবস্খা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নেয়া হবে।

[ad#co-1]