সাংবাদিকই ভণ্ডপীরকে শিশুর গায়ে পা রাখতে প্রলুব্ধ করেন

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
‘প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক মাটিতে শুয়ে থাকা শিশুর গায়ে ভণ্ড চিকিৎসককে পা রাখতে বলেন, তারপর ছবি তোলেন। এরপর বাচ্চার পা উল্টোদিকে ধরতে বলেন এবং ফটোসাংবাদিকের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন ভঙ্গিমায় চিত্র ধারণ করেন।’ মুন্সীগঞ্জে ভণ্ডপীরের অপচিকিৎসার প্রত্যক্ষদর্শীরা এভাবেই বিবরণ দিয়েছেন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে।

‘ভণ্ডপীর, ভয়ঙ্কর চিকিৎসা’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে গত ১২ এপ্রিল সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়। এরপর ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনা তদন্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটির প্রধান করা হয় মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাসানুল ইসলামকে। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীনগর সার্কেল) সায়েদুজ্জামান ফারুকী ও মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ রুশদুল করিমকে কমিটির সদস্য করা হয়। দুই দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তদন্ত কমিটি মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে ওই দিন জেলা প্রশাসক প্রতিবেদনটি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু সাংবাদিকদের জানাতে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভণ্ড চিকিৎসকের ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, তেল মালিশের নামে অপচিকিৎসার ঘটনাটি সত্য। তবে আলোকচিত্র সাংবাদিক তাকে প্রলুব্ধ করে ছবিগুলো অতিরঞ্জিত করেছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘ঘটনাস্থলের আশপাশে কথা বলে জানা যায়, পত্রিকার সাংবাদিক প্রকাশিত সংবাদ ও ছবি প্রকাশের আগে এলাকায় অবস্থান করে ভণ্ড চিকিৎসকের ঝাঁড়ফুক, পানি পড়া, তেল মালিশ ও অন্যান্য চিকিৎসা সম্পর্কে অবহিত হন। প্রথম আলোর ঢাকার ক্যামেরাম্যান কবীর হোসেন (যার বাড়ী ভণ্ড চিকিৎসকের বাড়ীর কাছে) তিনি ছবিগুলো ধারণ করেন বলে জানা যায়।’ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘স্থানীয় লোকজন এবং উক্ত ভণ্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রথম আলোর সাংবাদিক/ফটোগ্রাফার বলেন, এভাবে ছবি তুলে সংবাদ প্রকাশ করলে সারা দেশের লোক তাকে ভালোভাবে চিনবে এবং তার চিকিৎসা প্রসারিত হবে। চিকিৎসার জন্য এ রকম ছবি ছাপা হলে লোকজন আকৃষ্ট হয়ে এসব চিকিৎসায় প্রলুব্ধ হয়ে কঠিন রোগের চিকিৎসার জন্য তার নিকট লোকজন আসবে মর্মে আশ্বস্ত করা হয়। এতে তার আয় অনেক বেড়ে যাবে বলা হয়। এভাবে আমজাদ হোসেনকে ছবি তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে চিত্রগুলো ধারণা করা হয়েছে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, স্থানীয় আশপাশের লোকজন জানিয়েছে, কিছুদিন আগে ভণ্ড চিকিৎসক চিকিৎসা শুরু করে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই শ রোগী চিকিৎসার জন্য আসে। এতে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। তবে বৃহস্পতিবার ৪০০ থেকে ৫০০ লোকসমাগম হয় এবং আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। ভণ্ড চিকিৎসকের আশপাশের বাড়ির লোকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে লোকসমাগম হয়। স্থানীয় বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিককে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানান। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সিরাজদিখান থানার অফিসার ইনচার্জকে ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দিতে বলা হলে তাঁরাও ওই বিষয়ে অবহিত নন বলে জানান।

গত ১২ এপ্রিল খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দেন। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্য পর্যালোচনা করে কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করে।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের ‘মতামত’ অংশে বলা হয়: ‘সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ঘটনার পারিপাশ্বর্িক অবস্থা, নির্যাতিতদের বক্তব্য পর্যালোচনায় নিম্নের বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে। (১) কথিত ভণ্ড চিকিৎসক আমজাদসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির লোকজন প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য সিন্ডিকেট করে অবৈধ অপচিকিৎসা করে। (২) পত্রিকায় প্রকাশিত ভণ্ড চিকিৎসকের ঝাড়ফুঁক পানি পড়া ও তেল মালিশের নামে অপচিকিৎসার ঘটনাটি সত্য। তবে আলোকচিত্র শিল্পী তাকে প্রলুব্ধ করে ছবিগুলো অতিরঞ্জিত করে। (৩) এলাকার জনগণ যথাসময়ে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেননি। (৪) স্থানীয় বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের নূরু মেম্বার নিজেই এর সাথে জড়িত।’

[ad#co-1]