এম হামিদুল্লাহ্ খান

১৯৭১ সালের প্রতিটি মুহূর্তই আমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা যোগায়৷ তখন আমি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলাম৷ সময় যতই গড়াচ্ছে আমি ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠছিলাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য৷ একদিন সকালে পি এ এফ বেস ( তেজগাঁও ) ঢাকায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট লে. সাদ নামক একজন অফিসার ১৪তম ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার জন্য আমার জিপটির জন্য অনুরোধ করে৷ আমি তাকে জিপটি দিয়ে বললাম সে যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে৷ কিন্তু গাড়ি আর ফিরে আসছে না৷ আমি অস্বস্তি অনুভব করি৷ সাদ বেলা ১টার দিকে ফিরে এলো এবং আমার হাতে চাবি দিয়ে নির্বিকারভাবে বলল, ‘তোমার ড্রাইভার বোকার মতো বেয়োনেটের উপর ঝাঁপ দিয়ে মরে গেছে৷’ তার পাতানো গল্প শুনে রাগে আমার গা শিরশির করে উঠল৷ কারণ আমি বুঝতে পারি আমার সম্পর্কে তথ্য নেয়ার জন্য আমার ড্রাইভারকে টর্চার করা হয়েছে৷ সে কোনো ধরনের তথ্য দেয়নি বলে তাকে হত্যা করা হয়েছে৷ ফেরার পথে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবে আর চলতে পারে না৷ এবার প্রতিশোধের পালা৷ কারণ কাপুরুষের মতো মরা বা বাঁচা দুটোই নিরর্থক ৷


বিমানবাহিনীতে থাকাকালীন এম হামিদুল্লাহ খান

২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পূর্বেই আমার স্ত্রী ও আমি কবি সুফিয়া কামালের বাসায় যাতায়াত করতাম৷ এ বাড়িতে সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা ছিল৷ আমাদের আলাপ আলোচনার ধরন পরখ করে ছাত্রছাত্রীরা আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া কি মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী?’ আমার স্ত্রী তাত্‍ক্ষণিক জবাব দিল, ‘সে তো এই রাস্তাই খুঁজছে৷’ আমাদের সম্মতি পেয়ে তারা সেদিন বিকেলেই প্রাথমিক যোগাযোগের জন্য আমার স্ত্রীর হাতে একটা ম্যাগাজিন দিয়ে বলল, ‘হামিদুল্লাহ্ ভাই যেন আজই এই ম্যাগাজিনটি হাতে নিয়ে বিকাল ৪টায় স্টেডিয়ামের প্রভেন্সিয়াল বুক ডিপোর সামনে দাঁড়ায়৷’ পরিকল্পনা মতো আমি সেখানে যাওয়ার পর এক তরুণ আমার কাছে এসে সরাসরি বলল, ‘আপনি কি হামিদুল্লাহ্ ভাই?’
আমি বললাম, হ্যাঁ৷


১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি এম হামিদুল্লাহ খান

সে আমাকে একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে বলল, ‘আপনার বাড়ির সামনে ২৬ নম্বর সড়কের মোড়ে একটা সবুজ টয়োটা গাড়ি থাকবে৷ গাড়ি বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না৷ আপনারা দ্রুত চলে আসবেন৷’ আমি মনে মনে ভাবলাম যত সহজে বলে ফেলল বিষয়টা তত সহজ না৷

পরদিন সন্ধ্যা থেকেই বাসার সামনে পায়চারি করতে শুরু করলাম৷ মাঝেমধ্যেই বাড়ির বাইরে আসছিলাম৷ সন্ধ্যার দিকে দেখলাম ২৬ নম্বর রোডে গাড়িটা দাঁড়ানো৷ সুযোগ বুঝে আমরা বেরিয়ে পড়ি৷ আমাদের দেখেই গাড়ির দরজা খুলে দেয় ড্রাইভার৷ দ্রুত গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করি৷ গাড়ি চলতে শুরু করল৷ আমরা পৌঁছে যাই ইস্কাটনের একটি বাড়িতে৷ সেখান থেকে আরেকটি গাড়ি করে হাটখোলায় পৌঁছি৷ সদ্য পরিচিত এক শুভানুধ্যায়ীর বাসায় নিজের পরিবারকে রেখে রওয়ানা হলাম অনিশ্চিত এক গন্তব্যে৷ পাড়ি দিলাম সীমান্তের পথে৷ পথে যেতে অতি সর্তকতা অবলম্বন করতে হল৷ আমার সঙ্গে একটি পিস্তল ছিল৷ আমি যে গাড়িতে যাচ্ছিলাম সে গাড়ির ড্রাইভার পিস্তলটি দেখে ফেলে৷ সামনে গাড়ি তল্লাশি হচ্ছে দেখে সে আমাকে পিস্তলটি ফেলে দেয়ার জন্য বলল৷ ফলে বাধ্য হয়েই সিটের পিছনে ও গাড়ির বডির ফাঁকে পিস্তলটি ফেলে দিই৷ গাড়ি তল্লাশি হয়৷ আমরা এ যাত্রায় বেঁচে যাই৷ আর এভাবেই জড়িয়ে পড়ি মহান মুক্তিযুদ্ধে৷


এম হামিদুল্লাহ খান

এই কথাগুলো ১১নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ্ খানের৷ যিনি নিজ দেশের মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য পাকিস্তান বিমান বাহিনীর চাকরি ছেড়ে যোগ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এবং মরণপণ লড়াই করে ছিনিয়ে আনেন স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে৷ তাঁর মতো অসংখ্য বীর যোদ্ধা জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল৷

এম হামিদুল্লাহ্ খান বিক্রমপুর পরগণার লৌহজং থানার মেদিনীমন্ডল গ্রামে ১৯৪০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন৷ বাবার নাম (মরহুম ) এম দবিরউদ্দীন খান এবং মা (মরহুমা ) জসিম উন্নিছা খান৷ এম দবিরুদ্দীনের পাঁচ ছেলে তিন মেয়ে৷ এর মধ্যে হামিদুল্লাহ্ খান দ্বিতীয়৷ হামিদুল্লাহ্ খানের বাবা চাকরি করতেন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে এখানে সেখানে বদলি হতে হয়৷ হামিদুল্লাহ্ খানের প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু হয় গৌহাটি সিলভার জুবলি অ্যাংলো বেঙ্গলি হাই ইংলিশ স্কুলে৷ বাবার বদলির চাকরির কারণে এই বিদ্যালয়টি ছাড়াও তিনি দেশের অনেক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিচিত্রসব দৃশ্যাবলির ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে তিনি তাঁর শৈশব অতিবাহিত করেছেন৷ তাঁর শৈশব ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার৷ নদী, পাহাড়, গাছগাছালি, ফুল আর পাখি তাঁকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করত৷ বাবার সঙ্গে তাঁকে যেমন থাকতে হয়েছে আবার অনেক সময় একা একাও থাকতে হয়েছে৷ এতে করে তিনি তাঁর ছেলেবেলা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন অনেক বেশি৷ তিনি বিশ্বাস করেন, শৈশবের গড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ববোধই আজকের হামিদুল্লাহ্ খান৷ তিনি ১৯৫৪ সালে কাজীর পাগলা এটি ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ৷ এরপর ভর্তি হন তেজগাঁও টেক্সটাইল কলেজে ৪ বছর মেয়াদি অনার্স কোর্সে৷ কিন্তু এখানে পড়াকালীন ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে ১ বছর বিরতি দিয়ে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে৷ এরপর ১৯৫৭ সালে এইচএসসি পাশ করেন৷ মজার ঘটনা হলো একই সঙ্গে তিনি তেজগাঁও টেক্সটাইল কলেজের পড়ালেখাও চালিয়েছেন৷ কারণ জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও টেক্সটাইল কলেজের ভর্তিটি বাতিল করেননি৷ এইচএসসি পাসের পর জগন্নাথ কলেজেই তিনি বি.কম ভর্তি হন৷ এখানে দুইবছর পড়ার পর চাকুরিতে যোগ দেওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত বি.কম ফাইনাল পরিক্ষা আর দেওয়া হয়নি তাঁর৷ তিনি ১৯৬০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর রিসালপুর একাডেমিতে যোগদান করেন৷ সেখানে দুই বছর প্রশিক্ষণ শেষে কমিশন প্রাপ্ত হন৷ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নৃশংস বাঙালি হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে বিদ্রোহ করেন তিনি৷ অধিকার বঞ্চিত স্বজাতির শোষণ শাসন আর দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আকাঙ্খায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর চাকরি ছেড়ে যোগ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে৷

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার পর প্রথমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্ববৃহত্‍ গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেন৷ ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়ায় প্রবাসী সরকারের প্রধান সামরিক প্রতিনিধি হিসেবে এখানে কাজ শুরু করেন৷ সেইসঙ্গে চাকুলিয়ায় সি-এন-সি স্পেশাল ব্যাচের সফল ট্রেনিং পরিচালনা করেন৷ এরপর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী তাঁকে উত্তর ফ্রন্টে পোস্টিং দিয়ে পাঠান৷ এটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তেলঢালায় মেজর জিয়ার কমান্ড অধীন ২নং সেক্টর এবং জেডফোর্সের হেড কোর্য়াটার৷ সেখানে পৌঁছামাত্র মেজর জিয়া তাঁকে তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর রংপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিপরীতে মেঘালয়ের নদীবন্দরে স্থাপিত মানকাচর সাব সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন৷ তিনি ঐ ঘাঁটি থেকে রংপুরের কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় অবস্থিত শত্রু ঘাটিসমূহে যুদ্ধ পরিচালনা করেন৷ একই সঙ্গে রৌমারি ও রাজিবপুর থানাধীন ৫৫০ বর্গমাইল স্বাধীন অঞ্চলের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পান৷

দিনটি ছিল ৩ নভেম্বর৷ এদিন তিনি ১১নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন৷ এ সেক্টরের অধিনস্ত ৮টি সাব সেক্টরের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যাস্ত হয়৷ তিনি সফলতার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন৷ আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হামিদুল্লাহ্ খানের যুদ্ধের ব্যাপক সফলতার বিশদ বিবরণ পাঠানো হয় ( সিটরেপ অর্থাত্‍ সিচ্যুয়েশনাল রিপোর্ট এর মাধ্যমে ) তত্‍কালীন প্রবাসী সরকারের সদর দপ্তর ৮নং থিয়েটার রোডে৷ প্রবাসী সরকার ঐ সাফল্যের মূল্যায়ন করে তাঁকে ফিল্ড পদন্নতি দিয়ে স্কোয়াড্রন লিডার পদে উন্নীত করেন৷ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি আনুমানিক ২২৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি বিশাল বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন৷ তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ সফলতা আসে৷ তিনি মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ঢাকা অভিযানে অংশগ্রহণ করে ১৫/ ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর উপকন্ঠে সাভার ও জয়দেবপুর পৌঁছান৷ কিন্তু তখনই ঘটে বিপত্তি৷ বিডিএফ হেডকোর্য়াটার থেকে নির্দেশ দেয়া হয় সদলবলে ঢাকায় অগ্রসর হওয়া যাবেনা৷ অর্থাত্‍ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়৷ এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি একটি কমান্ডো ইউনিট নিয়ে বিকল্প পথে তত্‍কালীন তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে চলে আসেন৷ এভাবে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্বর হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে এবং দেশ স্বাধীন হয়৷

যুদ্ধের পরপরই তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পুরো উদ্যোমে কাজ শুরু করেন৷ যোগ দেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে৷ কিন্তু দেশের মানুষের প্রতি চরম অত্যাচার আর অনাচারের দিন যিনি জীবনবাজি রেখে বিদ্রোহ করে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁর মন সেইসব মানুষের কাছাকাছি থেকেই কাজ করতে বেশি আগ্রহী ৷ কারণ জনযুদ্ধে সম্পৃক্ততার স্মৃতি তাঁর মনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল৷ মাটি ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার তাগিদে তিনি ১৯৭৮ সালে বিমান বাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণ করেন৷ এরপর শুরু হয় ভিন্ন এক জীবন৷ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বেছে নেন রাজনীতি৷

এবার শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস৷ একদিন সামরিক পোশাক পড়ে তিনি বর্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন প্রিয় স্বদেশের জন্য৷ কিন্তু এবার লড়তে হলো স্বদেশী স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে৷ এ সময়ের একটি ঘটনাকে (জাফর ড্রাইভার এপিসোড) তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা বলে মনে করেন৷ ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৬ সালে৷ তখন দেশব্যাপী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করছে৷ এ সময়ে তিনি বেগম জিয়ার সঙ্গে এ আন্দোলনে দেশের নানা জায়গায় ঘুরছেন৷ একদিন ঢাকা ফেরার পথে কালিয়াকৈর থানায় বেগম জিয়ার গাড়ি বহর আটকানো হয়৷ গাড়ি থেকে নেতা কর্মী সবাইকে নেমে থানায় যেতে হয়৷ কিন্তু বেগম জিয়া ও তিনি থেকে যান গাড়িতে৷ এই সুযোগে গাড়িতে থাকা একটি গামছা তিনি তাঁর মাথায় বেঁধে নেন৷ কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে জানাল বেগম জিয়া গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারেন৷ এরমধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডাম ওনি কি আপনার গাড়ির ড্রাইভার৷’ বেগম জিয়া প্রথমে একটু ইতস্ততবোধ করলেন৷ পরে বললেন হ্যাঁ৷
কী নাম?

জাফর ড্রাইভার৷ এরপর তাদের গাড়ি বহর ছেড়ে দেয়া হল৷ হামিদুল্লাহ্ খান দ্রুতবেগে গাড়ি ড্রাইভ করে তাঁকে পৌঁছে দেন অজানা গন্তব্যে৷ এ ঘটনা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে যথেষ্ট তাত্‍পর্যপূর্ণ হয়৷ দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি মাঠে ময়দানে থেকেছেন৷ সংগ্রাম আন্দোলনে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি দুইবার কারারুদ্ধ হন৷

হামিদুল্লাহ্ খান ১৯৬৫ সালে বিয়ে করেন৷ তাঁর শ্বশুরালয় জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জে৷ স্ত্রীর নাম রাবেয়া সুলতানা খান৷ এই দম্পতি তিন সন্তানের জনক জননী৷ বড় ছেলের নাম তারেক হামিদ খান, মেঝো ছেলে জিয়াদ হামিদ খান ও ছোট ছেলে মুরাদ হামিদ খান৷ এরমধ্যে ছেলে জিয়াদ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮১ সালে৷ বাকি দুই সন্তান উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত৷

হামিদুল্লাহ্ খান জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত (১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬) হন তিন তিনবার৷ তাঁর নির্বাচনী আসন ছিল ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জ ২৷ সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জেনারেল এসেমব্লির প্লেনারি সেশনে নামিবিয়া, প্যালেস্টাইন ইত্যাদি সমস্যার উপর বক্তৃতা করেন৷ তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’-এর কনভেনর হিসেবে ঐ প্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন৷ এ সংস্থার ব্যাপক উন্নয়নে তিনি বহুবিধ কার্যক্রম শুরু করেন৷ সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, মন্ত্রীর পদমর্যাদায় হজ্জ্ব ডেলিগেশনের নেতৃত্ব দিয়ে সৌদি সরকারের মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষর করেন৷ তিনি প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও অনুমিত হিসাব সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিদ্যুত্‍ জ্বালানি এবং সড়ক ও যানবাহন সংক্রান্ত সাব কমিটিসমূহের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অস্ট্রেলিয়ার স্যার স্টিফেন্স নিনিয়ানের সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকার ও বিরোধীদলের সংলাপে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখে প্রশংসিত হন৷ তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও ইংরেজ আমল থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর গবেষণা এবং একাধিক পুস্তক রচনা করেছেন৷

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়৷ ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ এর রণক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের মূল্যায়ন হিসেবে ঢাকা শহরের অভিজাত বনানী এলাকায় ২৩ নম্বর সড়কটি তাঁর নামে নামকরণ করে তাঁকে সম্মানিত করেন৷


এম হামিদুল্লাহ খান

সংক্ষিপ্ত জীবনী :

জন্ম
এম হামিদুল্লাহ্ খান বিক্রমপুর পরগণার লৌহজং থানার মেদিনীমন্ডল গ্রামে ১৯৪০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন৷ বাবার নাম (মরহুম ) এম দবিরুদ্দীন খান এবং মা (মরহুমা ) জসিম উন্নিছা খান৷

শৈশব

তাঁর শৈশব কাটে স্কুলের মতোই বিভিন্ন স্থানে৷ শৈশব প্রসঙ্গে তিনি বলেন- আমার শৈশব ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার৷ নদী,পাহাড়, গাছগাছালি আর ফুল পাখি আমাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করত৷ বাবার সঙ্গে আমাকে যেমন থাকতে হয়েছে আবার অনেক সময় একা একাও থাকতে হয়েছে৷ এতে করে আমি আমার ছেলেবেলা দারুণ উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি।

পড়ালেখা
প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু হয় গৌহাটি সিলভার জুবলি আ্যংলো বেঙ্গলি হাই ইংলিশ স্কুলে৷ এই বিদ্যালয়টি ছাড়াও তিনি দেশের অনেক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন৷ রাঙামাটি মিশনারি স্কুল তার মধ্যে অন্যতম৷৷ তিনি ১৯৫৪ সালে কাজীর পাগলা এটি ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ৷ এরপর ভর্তি হন তেজগাও টেক্সটাইল কলেজে ৪ বছর মেয়াদি অনার্স কোর্সে৷ কিন্তু এখানে পড়াকালীন ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে ১ বছর বিরতি দিয়ে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে৷ এরপর ১৯৫৭ সালে এইচএসসি পাস করেন৷ মজার ঘটনা হলো একই সঙ্গে তিনি তেজগাও টেক্সটাইল কলেজের পড়ালেখাও চালিয়ে যেতে থাকলেন৷ কারণ জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও টেক্সটাইল কলেজের ভর্তিটি বাতিল করেননি৷ এইচএসসি পাসের পর জগন্নাথ কলেজেই তিনি বি কম’এ ভর্তি হন৷ এখানে দুইবছর পড়ার পর শেষ পর্যন্ত ফাইনাল পরিক্ষা দেয়া হয়নি চাকুরিতে যোগদানের জন্য৷

পেশা
১৯৬০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর রিসালপুর একাডেমিতে যোগদান করেন৷ সেখানে দুই বছর প্রশিক্ষণ শেষে কমিশন প্রাপ্ত হন৷ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নৃশংস বাঙালি হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে বিদ্রোহ করেন৷ অধিকার বঞ্চিত স্বজাতির শোষণ শাসন আর দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আকাঙ্খায় যোগ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে৷ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার পর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট পেলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্ববৃহত্‍ গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্পে৷ ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়ায় প্রবাসী সরকারের প্রধান সামরিক প্রতিনিধি হিসেবে এখানে কাজ শুরু করেন৷ সেইসঙ্গে চাকুলিয়ায় সি-এন-সি স্পেশাল ব্যাচের সফল ট্রেনিং পরিচালনা করেন৷ এরপর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী তাঁকে উত্তর ফ্রন্টে পোস্টিং দিয়ে পাঠান৷ এটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তেলঢালায় মেজর জিয়ার কমান্ড অধীন ২নং সেক্টর এবং জেডফোর্সের হেড কোর্য়াটার৷ সেখানে পৌঁছামাত্র মেজর জিয়া তাঁকে তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর রংপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিপরীতে মেঘালয়য়ের নদীবন্দরে স্থাপিত মানকাচর সাব সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন৷ তিনি ঐ ঘাটি থেকে রংপুরের কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় অবস্থিত শত্রম্ঘাটিসমূহে যুদ্ধ পরিচালনা করেন৷ একই সঙ্গে রৌমারি ও রাজিবপুর থানাধীন ৫৫০ বর্গমাইল স্বাধীন অঞ্চলের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পান৷ ৩ নভেম্বর তিনি ১১নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন৷ এ সেক্টরের অধিনস্ত ৮টি সাব সেক্টরের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যাস্ত হয়৷ তিনি সফলতার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন৷ আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হামিদুল্লাহ্ খানের যুদ্ধের ব্যাপক সফলতার বিশদ বিবরণ পাঠানো হয় ( সিটরেপ অর্থাত্‍ সিচ্যুয়েশনাল রিপোর্ট এর মাধ্যমে ) তত্‍কালীন প্রবাসী সরকারের সদরদপ্তর ৮নং থিয়েটার রোডে৷ প্রবাসী সরকার ঐ সাফল্যের মূল্যায়ন করে তাঁকে ফিল্ড প্রমোশন দিয়ে স্কোয়াড্রন লিডার পদে উন্নীত করেন৷ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি আনুমানিক ২২৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি বিশাল বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন৷ তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ সফলতা এনে দেন৷

রাজনৈতিক জীবন
মাটি ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার তাগিদে তিনি ১৯৭৮ সালে বিমান বাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসরগ্রহণ করেন৷ এরপর শুরু হয় ভিন্ন এক জীবন৷ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বেছে নেন রাজনীতি ৷ জন মানুষের রাজনীতি সংশ্লিষ্টার দরুণ তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত ( ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ ) হন তিন তিনবার৷ তাঁর নির্বাচনী আসন ছিল ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জ ২৷

পরিবার
হামিদুল্লাহ্ খান ১৯৬৫ সালে বিয়ে করেন৷ তাঁর শ্বশুরালয় জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জে৷ স্ত্রীর নাম রাবেয়া সুলতানা খান৷ এই দম্পতি তিন সন্তানের জনক জননী৷ বড় ছেলের নাম তারেক হামিদ খান, মেঝো ছেলে জিয়াদ হামিদ খান ও ছোট ছেলে মুরাদ হামিদ খান৷ এরমধ্যে ছেলে জিয়াদ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮১ সালে৷ বাকি দুই সন্তান উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত৷

সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়৷ ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ এর রণক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের মূল্যায়নে ঢাকা শহরের বনানী এলাকায় ২৩ নম্বর সড়কটি তাঁর নামে নামকরণ করে তাঁকে সম্মানিত করেন৷

তথ্যসূত্র : এই লেখাটি ৩১.০১.২০০৯ তারিখে উইং কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ্ খানের সঙ্গে সাক্ষাত্‍কারের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে৷

কৃতজ্ঞতা :
০১. নাঈমুল করিম নাঈম, সিনিয়র রির্পোটার, দৈনিক ডেসটিনি।
০২. জানে আলম, ( এম হামিদুল্লাহ্ খানের সহকর্মী)।

গবেষক : এহসানুল ইয়াসিন, গুনিজন

[ad#co-1]