স্মৃতির আলোয় বিউটি বোর্ডিং

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তরুণ কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, প্রগতিশীল রাজনীতিকদের আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল পুরান ঢাকার ১ নম্বর শ্রীশ দাস লেনের বিউটি বোর্ডিং। কবি শামসুর রাহমানের তো বিখ্যাত কবিতাই আছে ‘বিউটি বোর্ডিং’ নামে। কে বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দেননি? তারপর বহুদিন গড়িয়েছে। সেই তরুণেরা আজ দেশের শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।

বিউটি বোর্ডিংয়ে যাঁরা এককালে আড্ডা জমিয়েছেন, তাঁদের প্রথম পুনর্মিলনী হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তার পর থেকে প্রতিবছর স্মৃতিচারণার আয়োজন করা হচ্ছে নিয়মিত। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ ট্রাস্ট’। ট্রাস্টের উদ্যোগে ইমরুল চৌধুরীর সম্পাদনায় স্মৃতিচারণামূলক রচনা নিয়ে প্রকাশিত হলো পূর্ণিমার মধ্য বয়সে বিউটি বোর্ডিং।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিউটি বোর্ডিংয়ের সামনের বাগানে আয়োজন করা হয়েছিল বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে মিলিত হয়েছিলেন বিউটিয়ানরা। আড্ডায়, স্মৃতিচারণায় তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন তারুণ্যের দিনগুলোতে।

বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন সৈয়দ শামসুল হক। তিনি বলেন, পুরান ঢাকার নাম শুনেছেন কিন্তু পুরান ঢাকা দেখেননি এমন অনেকেও বিউটি বোর্ডিংয়ের নাম জানেন। বোর্ডিংয়ের আগে এখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস ও প্রেস। তারপর বিউটি বোর্ডিংকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রগতিশীল রাজনীতিকদের সমাবেশ। এখানকার মাটি সৃজনশীলতার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এই ভবনকে ‘ন্যাশনাল হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হায়াত্ মামুদ। ইমরুল চৌধুরী, সোনারং প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী হাসান, কবি সানাউল হক খান আলোচনা করেন। নায়লা তারান্নুম শামসুর রাহমানের ‘বিউটি বোর্ডিং’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন।

প্রথম আলো
——————————————————————————————————–

বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে অতীত দিনের সাথীদের জমজমাট আড্ডা

‘হলুদ দেয়ালে সবুজ শ্যাওলা/আলো-ছায়া দোলা দুঃখ-সুখ/যেন, সব মিলেমিশে আজও কথা কয়/পুরনো আড্ডা সেই শতমুখঃ।’ হ্যাঁ পুরনো ঢাকার সেই বিউটি বোর্ডিং নিয়ে রচিত পঙ্ক্তি। পঞ্চাশ, ষাট আর সত্তরের দশকের বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, ছড়াকার, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, টিভি ব্যক্তিত্বসহ সৃজনশীলতা চর্চার মানুষের পুরনো আড্ডাস্থল। যেখানে কেটেছে তাদের সকাল-বিকাল, দুপুর, রাত। প্রাণবন্ত আড্ডায় আলোচিত হয়েছে সরস-নিরস অনেক কথা। রচিত হয়েছে অনেক কাব্য। সক্রেটিয় তর্কের ফাঁদে বেরিয়েছে কত রূঢ় সত্য! দেশের রাজনীতি আর রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্মিলনেরও জায়গা এই বিউটি বোর্ডিং। পরস্পর ভাববিনিময় এমনকি প্রেমের জায়গাও বিউটি বোর্ডিং। সময় গড়িয়েছে। পুরনো ঢাকার বাংলাবাজার, নর্থব্র“ক হল আর প্যারিদাস রোড এলাকা ও তার অলিগলির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রশস্ততা ঘুচে ঘিঞ্জিত্ব বেড়েছে। কিন্তু ১ নং শ্রীশদাস লেনের বিউটি বোর্ডিংয়ের কোন পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য নকশার অনুকরণে নির্মিত গ্রাম্য আম-জাম-কাঁঠাল গাছ কিংবা নয়নতারা, বেলী আর হাসনাহেনা ফুলের বাগানের সোঁদা গন্ধযুক্ত উম্মুক্ত আঙ্গিনাসমৃদ্ধ হরিদ্রা বর্ণের বিউটি বোর্ডিং আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পুরনো জায়গায় শনিবার ফের বসেছিল অতীত দিনের সাথীদের আড্ডা। আড্ডায় চায়ের কাপের ধোঁয়ার সঙ্গে আলোচনার ঝড়ও ওঠে। স্মৃতিচারণে ধূসর অতীতকে সজীব করতে প্রচেষ্টারও অন্ত ছিল না কারও।

স্মৃতিঘেরা ঐতিহ্যবাহী এ বোর্ডিং নিয়ে কবিতা আর গদ্যে স্মৃতিচারণ করেছেন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, অনুপম হায়াৎ, প্রতিভা সাহা প্রমুখ। বিখ্যাত এসব লোকের লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘পূর্ণিমার মধ্য বয়সে বিউটি বোর্ডিং’ গ্রন্থের মোড়ক উম্মোচন করা হয় শনিবার। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক-লেখক হায়াৎ মামুদ। বইটির মোড়ক উম্মোচন ও স্মৃতিচারণ করেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘বিউটি বোর্ডিং’ কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে।

কবিতাটি আবৃত্তি করেন নায়লা তারান্নুম কাকলি। আলোচনায় অংশ নেন কবি সানাউল হক খান, বইয়ের সম্পাদক ইমরুল চৌধুরী, সোনারং প্রকাশনার প্রকাশক কাজী হাসান। সৈয়দ শামসুল হক স্মৃতিচারণে বলেন, তার কবিতা লেখার স্থান ছিল এ বোর্ডিং। প্রথম প্রেম, প্রেমিকার সঙ্গে টেলিআলাপ আর প্রথম প্রেমপত্র লেখার স্থানও এ বিউটি বোর্ডিং। হায়াৎ মামুদ বলেন, বিউটি বোর্ডিং বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়েছে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ষাটের দশকের একমাত্র মহিলা আড্ডা প্রদানকারী প্রতীতী দত্ত। উপস্থিত ছিলেন বিউটি বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার সহধর্মিণী প্রতিভা সাহা। তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কবি সৈয়দ হককে বিদ্যার দেবী ‘সরস্বতী’র কাঁচে ঘেরা একটি প্রতিমা উপহার দেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ ট্রাস্টের সদস্য সচিব ও বোর্ডিংয়ের মালিকের ছেলে তারক সাহা ও সমর সাহা। অনুষ্ঠানে ট্রাস্টের পক্ষে আর্থিক সমস্যার কথা জানালেন কবি ইমরুল চৌধুরী।

যুগান্তর
——————————————————————

ছবি নেওয়া হয়েছে ফেছবুক থেকে
—————————————————————-
বিস্তারিত…১

বিস্তারিত…২

[ad#co-1]