বিসিসিআইজে নির্বাচন ও প্রবাসীদের ভাবনা

জা পা ন
রাহমান মনি
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ইন জাপান (বিসিসিআইজে) বা বাংলাদেশ শিল্প বণিক সমিতির নির্বাচন নিয়ে জাপান প্রবাসীদের মধ্যে বিশেষ করে ব্যবসায়ী সমাজে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে ইতোমধ্যে আর কোনো নির্বাচনকে ঘিরে হয়নি। ১৯৯৬-এর বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে। এই নির্বাচন প্রতিবেদন তৈরি করতে বিভিন্ন স্তরের প্রবাসীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সাধারণ, ভোটার এবং সম্ভাব্য প্রার্থী প্রবাসীদের এ তিনটি ভাগে ভাগ করে একই প্রশ্ন করে উত্তর চাওয়া হয় সবার কাছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন রাহমান মনি

বিসিসিআইজে জাপান সরকারে নিবন্ধিকৃত একমাত্র বাংলাদেশি সংগঠন। যদিও নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ দূতাবাসের হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকবে সংগঠনটি। তার পরও বিসিসিআইজে দূতাবাসের হস্তক্ষেপ মুক্ত নয়। দূতাবাসই আড়ালে সংগঠনটির সকল কলকাঠি নাড়ছেন। এমনকি দূতাবাসের কনস্যুলার ভবনের একটি কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয় সংগঠনটির নামে। ছোট একটি কক্ষের সামনে নামফলক শোভা পাচ্ছে। তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ (বর্তমানে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী) জাপান সফরকালীন সময় ফিতা কেটে তা উদ্বোধন করেন।

নিয়ম অনুযায়ী গত ২৮ মার্চ বিসিসিআইজে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ১১ সদস্য বিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছিলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে সদস্য সংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেতে থাকলে স্টিয়ারিং কমিটিকে হিমশিম খেতে হয়। এই সদস্য বৃদ্ধির নানা কারণ রয়েছে। কারণগুলো না খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বর্তমানে বিসিসিআইজে সদস্য সংখ্যা ১৭০ জন। তার মধ্যে ৭ জনের কাগজে কিছু গরমিল থাকায় বৈধ সদস্য ১৬৩। যা বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত যে কোনো সংগঠনের সদস্য সংখ্যার চেয়ে বেশি।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদিন একাধিক বৈঠক চলছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা গ্রুপে ভাগ হয়ে। বন্ধের দিন এ বৈঠকের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। ১২টি পদের জন্য অর্ধশতাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন ইতোমধ্যে। যদিও নির্বাচন কবে নাগাদ হতে পারে তার কোনো নিশ্চিত তারিখ এখনো ঘোষণা আসেনি। এর ওপর আবার ‘মড়ার উপর ঘাড়ার ঘা’ হিসেবে রাষ্ট্রদূত বদলি হয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে চলে যাচ্ছেন বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কমার্স কাউন্সিলর আবুল মনসুর মোঃ ফয়েজুল্লা। ফলে কবে নাগাদ নির্বাচন হবে বা আদৌ হবে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত কেউ কিছু বলতে পারছে না। নতুন একজন রাষ্ট্রদূত এখনো নিয়োগ দেয়া হয়নি। নিয়োগ হননি কমার্স কাউন্সিলরও। তারা যোগ দেয়ার পর কিছু সময় নেবে বুঝে ওঠার জন্য। অন্যদিকে বর্তমান স্টিয়ারিং কমিটির বিরুদ্ধেও কানাঘুষা আছে। তারা নিজেরাও নাকি চাচ্ছেন না সহসা নির্বাচন হোক। নির্বাচন হলে নতুন কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এতে করে অনেকের নির্বাচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সামনে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কথা পত্রিকান্তরে খবর বেরিয়েছে। তাই তারা চাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর সফরকালীন সময়টা পর্যন্ত তারা কমিটিতে বহাল থাকবেন। তাই তারা ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন। বর্তমান কনভেনর হিসাসি সিচিদা (জিয়াউল ইসলাম) যথেষ্ট উদার হলেও কমিটির অন্যান্য সদস্য তাকে ধীরে চলো নীতি গ্রহণে বাধ্য করছেন। তবে বর্তমান কমিটির বড় কৃতিত্ব হলো সংগঠনটি জাপানে সরকার কর্তৃক অনুমোদন নিতে পারা।

সাধারণ প্রবাসীদের মতামত

সিরাজুল ইসলাম দুলাল
Map-Across Travels, টোকিও
ব্যবসায়ীদের সংগঠন অবশই দরকার আছে। সংগঠিত হলে ব্যবসায়ীদের তথ্য আদান-প্রদান সহজ হয়। যা ব্যবসার অত্যাবশ্যকীয় একটি পুঁজি। তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিক এ যুগে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছ। ব্যবসায়ীদের একটি কার্যকর সংগঠন এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। শিক্ষিত, সহনশীল ও নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকেই সংগঠনের নেতৃত্বে আসা দরকার। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে সংগঠন অকার্যকর হতে পারে। সংগঠিত ব্যবসায়ীরা ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার এবং দেশের সংস্কৃতি বিদেশের মাটিতে তুলে ধরবে। একজন প্রবাসী হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা।

জেড এম আবুসিনা
সম্পাদক, বিডি কমিউনিটি
দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ী সংগঠন থাকাটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরই নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন যারা জাপানের বিভিন্ন আইনকানুনগুলো সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত। যারা জাপান সরকারের পলিসি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, যারা নতুন আইন সম্পর্কে সর্বক্ষণ নিজেকে আপডেট রাখেন, প্রবাসী সকল ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষিত হলেই তার স্বার্থ রক্ষিত হবে যিনি এ কথাটি বুঝতে সক্ষম। জাপানে বেশ কিছু বিতর্কিত আইনকানুন রয়েছে যা, যারা এ দেশের নাগরিক নন এমন লোকদের মেনে চলা কষ্টকর। নতুন নেতৃত্বকে জটিল ও বিতর্কিত আইন, জাপান সরকারের এমন কোনো নীতি যা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থহানি করতে পারে এমন সব বিষয়ে প্রয়োজনে জাপান সরকারের সঙ্গে সাহসিকতার সঙ্গে আলোচনা করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে জাপান সরকারের কাছে ফলপ্রসূ লবিং করার ক্ষমতা থাকতে হবে। দেশীয় পণ্য বাজারজাতকরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সক্ষম হতে হবে। সর্বোপরি তার নেতৃত্বকে তাদের পদের মর্যাদা অনুধাবন করতে হবে যে, তিনি দলীয় লোক নন, সকলের লোক। তাদের অবস্থান ন্যায়সঙ্গত।

মোঃ জাকির হোসেন
ব্যবসায়ী এবং চাকরিজীবী, কানাগাওয়া-কেন্
প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই জরুরি। তবে সমস্যা হলো কোনো সংগঠন হলেই শুরু হয় নেতৃত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ি। জাপানেও এই মনমানসিকতার কোনো পরিবর্তন নেই। সবাই চায় পদ। পদ পেলেই তারা খুশি। কাজে বিশ্বাসী নয়। তাদেরই নেতৃত্বে আসা উচিত যারা দেশের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করবে। নিজ সুবিধার্থে সবুজ পাসপোর্ট ত্যাগ করে লাল পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশের চেম্বার্স বাংলাদেশিদের হাতেই থাকা উচিত। অন্যদের হাতে দেয়া ঠিক হবে না। নির্বাচনে যারা জয়ী হয়ে আসবেন তারা দেশের স্বার্থটাকে আগে প্রাধান্য দেবেন। বাংলাদেশ থেকে এনে এখানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবেন। বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা গড়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করবেন। বাংলাদেশের মান উজ্জ্বল করবেন।

বদরুল বোরহান
লেখক ও ছড়াকার, টোকিও
শতভাগ জরুরি। সৎ ও শিক্ষিত এবং দেশের প্রতি কমিটমেন্ট আছে এমন লোকদের আসা জরুরি। দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে হবে। দেশ ও জাতির মান-সম্মান নষ্ট করা চলবে না। বাংলাদেশের জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

নাহিদ
চাকরিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী, চিবা-কেন্
বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বে ব্যবসায়ীরা একটি চালিকাশক্তি। সারা বিশ্বে ব্যবসায়ীদের একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। সংগঠনের স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য কতটুকু কাজ করছে তার ওপর নির্ভর করে সংগঠন থাকাটা জরুরি কিনা। আমি এমন ব্যবসায়ীকে নেতৃত্বে চাই যিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে দেশের উন্নয়নে কাজ করবেন। প্রয়োজনে আমরা সহযোগিতার হাত বাড়াব। যিনি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসবেন তাকে অবশ্য দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলকে নিয়ে কাজ করবেন। যাতে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে অন্য একটি দুবাই। এই প্রত্যাশাই করি।

মোঃ জসীম উদ্দিন
ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী, সাইতামা-কেন্
ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন থাকা প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। বিভিন্ন আইডিয়াকে একত্রিত করলে প্রবাসী সমাজ এবং দেশের কাজে আসবে। যা খুবই জরুরি তবে শুধু নামেই থাকলে হবে না। কাজেও গতিশীলতা আনতে হবে। একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী নেতৃত্বে থাকলে ভালো হবে। যিনি সময়, মেধা ও শ্রম এই তিনের সমন্বয় ঘটিয়ে কাজ করে সংগঠন এবং দেশের সুনাম বয়ে আনতে পারবেন। তার মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হবে। দেশের স্বার্থকে যিনি প্রাধান্য দেবেন। জাপানের আইনকানুন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। একজন প্রবাসী হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে আসা করব তারা যেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে কাজ করেন। জাপানি বিনিয়োগ, প্রয়োজনে যৌথ বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে কল-কারখানা স্থাপনে কাজ করবেন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেবেন এই প্রত্যাশাই একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে আমার থাকবে।

মোঃ সাইফুল ইসলাম
সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার, টোকিও
ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য সংগঠন থাকা জরুরি। সৎ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, যোগ্য ও সৃজনশীলদের নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বৃহৎ স্বার্থে কাজ করবে এবং জাপানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এটাই আমার প্রত্যাশা থাকবে।

শিকদার সাগর
চাকরিজীবী, সাইতামা-কেন্
ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন থাকা প্রয়োজন আছে যদি তা সত্যিকার অর্থে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কল্যাণে কাজ করে। তবে কেবলমাত্র নেতৃত্বের জন্য নামসর্বস্ব হলে চলবে না। তাকেই নেতৃত্বে আনা প্রয়োজন যিনি নিজেকে বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। দেশের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না, স্পষ্টবাদী, সামাজিক অথচ সিদ্ধান্তের বেলায় ইস্পাত কঠিনসম। ধোঁকাবাজ নয়। কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে। কেবলমাত্র পঁথিগত হলেই চলবে। মনে রাখতে হবে, স্বশিক্ষা এবং সুশিক্ষাকই হলো আসল শিক্ষা। যে শিক্ষা সমাজের কোনো কাজে আসে না সে শিক্ষার কোনো দাম নেই। বিজয়ী দল বিজিত দলকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে কাজ করবে। যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা আগে চিন্তা করবে। প্রবাসীদের পাশে সাধ্য অনুযায়ী থাকার চেষ্টা করবে। প্রবাসীদের ভিসা সমস্যা, চাকরি সমস্যা, বাসস্থান সমস্যায় পাশে দাঁড়াবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে একজন প্রবাসী হিসেবে এই প্রত্যাশাই করি।
ভোটারদের মতামত

প্রতিবেদনটি তৈরি করার জন্য পাঁচজন ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ভোটারগণ প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। অর্থাৎ কারো বিরাগভাজন হতে চাচ্ছেন না তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের মতামতগুলোর সারসংক্ষেপ হচ্ছে : ক) নেতা হিসেবে তার প্রথম যোগ্যতা তিনি প্রবাসীদের স্বার্থে কতটুকু কাজ করেছেন এবং করবেন। প্রবাসীদের ডাকে কতটুকু সাড়া দেবেন। এই পর্যন্ত তার কাজকে মূল্যায়ন করা হবে। নেতা হলে কি করবেন সে দিকে না দেখা, নেতা হওয়ার আগে কি করেছেন, নতুন ব্যবসায়ীদের কতটুকু সহায়তা করেছেন, প্রবাসী সমাজে তার অবদান কতটুকু, সাধারণ প্রবাসীদের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা কেমন, জাপানের নিয়মকানুন সম্পর্কে ধারণা কেমন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা সব কিছুকেই মূল্যায়ন করে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিককেই নেতা হিসেবে দেখতে চান ভোটাররা।

ভোটার কেনার ব্যাপারে আসলে সবাই কম-বেশি জড়িত। ভোটার কেনার কথা যেভাবে উঠছে আসলে ঘটনাটা তা নয়। আর যেহেতু কোনো ভোটারই স্বীকার করবে না যে সে বিক্রি হয়েছে তাই এটা নিয়ে কথা না বলাই ভালো। তবে সকলেই বিষয়টি অবগত আছেন।

খ) নির্বাচনকে সামনে রেখে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মনস্থির করেছেন তারা নিজ ঘরোয়ানার লোকদের সদস্য করার কারণেই হঠাৎ করে ভোটার বৃদ্ধির প্রধান কারণ। অনেকেই আছেন জাপানে কেন জীবনেও ব্যবসা করেননি অথচ হঠাৎ করেই আরেকজন তার নামে ভোটার বা সদস্যপদ পাওয়ানোর তদ্বির করেছেন। আগে দিনে চাকরি করতেন এখনো করেন তবে রাতে। ওয়েব সাইট তৈরি করেছেন এতেই সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছেন অথচ দেখা যাচ্ছে তিনিও বিসিসিআইজের একজন সদস্য হওয়ার আবেদন করেছেন। এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে কিছু নিয়ে চলছেন আর এটাই যদি ব্যবসা হয় তাহলে ভোটার তো বাড়বেই।

গ) সৎ ও যোগ্য লোককে নেতা নির্বাচিত করা। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা। দেশের সম্মান কোনোমতেই ভূলুণ্ঠিত হতে দেয়া যাবে না। তাই সদা সতর্ক থাকা। সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মতামত

এমডি এস ইসলাম (নান্নু)
সি.ই.ও, এন.কে ইন্টারন্যাশনাল
নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া। যে কোনো সংগঠনেরই কেবল নির্বাচিত ব্যক্তিদেরই গ্রহণযোগ্যতা থাকে এবং জবাবদিহিতা করতে পারে। আসন্ন শিল্প বণিক সমিতির নির্বাচনকে তাই ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনকে গতিশীল এবং ব্যবসায়ী তথা প্রবাসী সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মনস্থির করেছি। জাপানের মতো উন্নত দেশে প্রবাসীরা অতি সচেতন। বাংলাদেশে গ্রাম্য রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। তাছাড়া সদস্য হওয়ার ক্ষমতা অর্থাৎ আর্থিক সচ্ছলতা আছে বলেই তারা ব্যবসা করেন। সামান্য টাকার বিনিময়ে তারা বিক্রি হবেন আমি তা মনে করি না। এটা আমার প্রবাসী ভাইয়েরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি তিনটি ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি : ১. মানবিক : এ দিকটি আমার কাছে সব সময় প্রাধান্য পায়। APES (Asian Peoples Friendship Society)-এর মতো সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে প্রবাসীদের চাহিদা মোতাবেক পাশে থাকার চেষ্টা করছি। ২. সামাজিক : প্রবাসীদের দ্বারা আয়োজিত যে কোনো সামাজিক সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে সাধ্যমতো পাশে থাকার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ থেকে স্বনামধন্য শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠান করে প্রবাসীদের বিনোদনের চেষ্টা করি। ৩. আয়ের উৎস তৈরি করা : প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে সেখানে নিয়োগের ব্যবস্থা করে প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে নিজ কোম্পানিতে ১০০জন কর্মরত অবস্থায় আছে। এ ছাড়াও জাপানি কোম্পানি কর্মসংস্থান এবং ভিসা সাপোর্ট দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার মূল্যায়ন করবে আমার স্বদেশী ভাইয়েরা। নিজেরটা তো আর নিজে জানা যায় না। জানে অন্যরা।

প্রবাসীদের জন্য কাজ করা মানেই কিন্তু দেশের জন্য কাজ করা। নিয়োগকৃত প্রবাসীরা দেশে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে নিয়োমিত। দেশের অর্থনীতিতে তা অবদান রাখছে। রেমিটেন্স করে বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত প্রবাসী ঈওচ তালিকাভুক্ত হয়েছি আমি নিজেও। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই আমার লক্ষ্য। কাজ করতে পারলে মানুষ খারাপ কিছু করার সময় পায় না। গার্মেন্টস শিল্প (রপ্তানিমুখী) গড়ে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে ট্রান্সপোর্টেশনের আধুনিকায়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জাপান থেকে ট্যাক্সি পাঠিয়ে ট্যাক্সি ক্যাব কোম্পানি করে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর আদলে করার চেষ্টা করেছি।

জাপান-বাংলা উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য সেতুবন্ধন রচনা করাই হবে আমার প্রথম পদক্ষেপ। ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো এবং নতুন ব্যবসায়ীদের সার্বিক সহযোগিতা করে প্রতিষ্ঠিত হতে সহযোগিতা করা, জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা, যৌথ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাব। ফলে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। প্রবাসীরা দেশে ফিরে গেলে অভিজ্ঞ হিসেবে প্রাধান্য পাবে।

মোঃ দেলোয়ার হোসেন
Director, Sael Corporation
আসন্ন বিসিসিআইজে নির্বাচন জাপান ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও শিল্পায়নে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করার সুযোগ ঘটবে। যার সুফল পাবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমি এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।

আমি একজন উদীয়মান তরুণ ব্যবসায়ী। প্রবাসে ব্যবসা করি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে জাপান-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই। এ জন্য একটি প্লাটফর্ম দরকার। একটি প্লাটফর্ম থেকে কাজ করলে নিজ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বিসিসিআইজে হচ্ছে আমার জন্য সে রকম একটি প্লাটফর্ম। আসন্ন বিসিসিআইজে নির্বাচন আমাকে সে সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগকে আমি কাজে লাগাতে চাই। বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্বে তরুণদের সবাই গ্রহণ করেছে। জাপান প্রবাসীদেরও তরুণদের নেতৃত্বে আনার জন্য জোর দাবি আছে। আমি তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানাই। তাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনস্থির করেছি। টাকা দিয়ে ভোটার বানানোর বিষয়টির ব্যাপারে আমি অবগত নই। কানাঘুষা হচ্ছে। আমার কানেও এসেছে। নিজের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় শোনা কথায় কান দিতে চাই না। আমার মূল্যায়ন আপনারাই করবেন। নিজের কথা নিজে বলতে অভ্যস্ত নই। তবে প্রবাসীদের যে কোনো আয়োজনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রবাসীদের ডাকে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।

প্রয়োজনের তাগিদে সব কিছু ছেড়ে প্রবাস জীবনযাপন করছি। নিয়মিত রেমিটেন্স পাঠাচ্ছি। পরিবারের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। বিশ্ব অর্থনীতি মন্দা সত্ত্বেও কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে প্রবাসীদের রেমিটেন্স। আমার লক্ষ্য বাংলাদেশে ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা গড়ে তোলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আশা করি আগামী ২০১২ নাগাদ তা বাস্তবায়ন হবে। তখন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে, দেশ উপকৃত হবে। তাছাড়া নিজেকেও একদিন ফিরে যেতে হবে। তাই আয়ের পথ বিস্তৃত করতে হবে।

আমার পরিচয় আমি একজন বাংলাদেশি। বাংলাদেশি পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করি। নির্বাচিত হলে এমন কিছু পদক্ষেপ নেব যাতে জাপানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। প্রবাসীরা যাতে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। মনে রাখতে হবে একজন প্রবাসী স্ব-স্ব ক্ষেত্রে একজন এ্যাম্বাসেডর। আর প্রবাসীদের উপকার মানেই তো দেশের উপকার। বিসিসিআইজের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নে ভূমিকা রাখব। জাপান বণিক সমিতি, জাইকা, জেট্র’র মতো বিশ্বনন্দিত সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে আরো বেশি নজর দেয়ানো, শিল্প-কারখানা গড়ায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তথ্য ও প্রযুক্তি খাতকে আধুনিকায়ন করার কাজে মনোনিবেশ করার আশা রাখি।

এস এইচ এম তসলিম উদ্দিন
ব্যবসায়ী, টোকিও
আসন্ন শিল্প বণিক সমিতির নির্বাচনকে আমি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে বলে মঈন ইউ আহমেদের শাসনের কথা মনে হয়। দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি দ্বারা পরিচালিত হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে অভিজ্ঞতায় নেতৃবৃন্দের প্রশাসনের লেজরবৃত্তি করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। বিসিসিআইজে যেন আপন মহীমায় এবং স্বকীয়তা বজায় রেখে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে সেই লক্ষ্যে কাজ করার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনস্থির করিয়াছি। ভোট কেনা ও ভোট বিক্রি করা দুটোই গর্হিত বলে মনে করি। কোনো প্রবাসীর সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করেই পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করে আসছি শুরু থেকেই। ভবিষ্যতেও করব। দেশের স্বার্থ আমার কাছে সব সময়ই প্রাধান্য পায়। বৈধ পথে রেমিটেন্স করার জন্য প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করি। আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য সবাইকে সতর্ক করি। দেশের যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।

নির্বাচিত হলে সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিজেকে উৎসর্গ করার চেষ্টা করব। প্রবাসীদের রেমিটেন্স স্বল্প খরচে এবং দ্রুততম সময়ে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেব। বাংলাদেশের জিডিবি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করব। দুর্নীতমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলার কার্যকরী পদক্ষেপ নেব বিসিসিআইজে-এর মাধ্যমে।

আরো কিছু কথা…
বিসিসিআইজে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ প্রবাসী, ভোটার, সম্ভাব্য প্রার্থীসহ ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুললেও বর্তমান স্টিয়ারিং কমিটি রয়েছে নির্বিকার। তারা রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। উপদেষ্টা কাজী ইনসান, এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান, কনভেনার জিয়াউল হক (ঐরংধংযর ঝযরপযরফধ) সদস্য সুখেন ব্রহ্ম, কাজী এনামুল হক, কাজী সারোয়ার হাবীব, লিটন মাঝি প্রমুখদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কোনো উত্তর দেননি। রাষ্ট্রদূতের মেয়াদ মার্চ ২০১০ পর্যন্ত পূর্বে জানা থাকলেও সে মেয়াদও অতিক্রম করেন।

প্রবাসী, ব্যবসায়ী, ভোটার এবং প্রার্থীগণ চান যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। নির্বাচিতরা দু’দেশের বাণিজ্যিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এটাই সাধারণ প্রবাসীদের প্রত্যাশা।

প্রশ্নাবলী
প্রতিবেদনটি তৈরি করতে বিভিন্ন স্তরের প্রবাসীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। প্রবাসীদের তিনটি ভাগে ভাগ করে একই প্রশ্ন করে উত্তর চাওয়া হয় সবার কাছে। সাধারণ, ভোটার এবং সম্ভাব্য প্রার্থী এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্নগুলো হলো-

সাধারণ প্রবাসী
* ব্যবসায়ীদের একটা সংগঠন থাকা কতটা জরুরি?
* কেমন ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
* নির্বাচনে যারা জয়ী হয়ে আসবেন তাদের কাছে প্রবাসী হিসেবে, বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আপনাদের প্রত্যাশা কি থাকবে?

ভোটার
* নেতা নির্বাচনে তার কোন যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেবেন।
* আসন্ন নির্বাচনে ভোটার কেনার একটি কথা বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। আসলে বিষয়টি কী?
* নির্বাচনকে সামনে রেখে হঠাৎ করেই ভোটার বেড়ে যাওয়ার কারণ কি বলে মনে করেন?
* একজন ভোটার হিসেবে আপনার করণীয় কি বলে মনে করেন?

সম্ভাব্য প্রার্থী
* আসন্ন নির্বাচনকে আপনি কি হিসেবে দেখছেন?
* নির্বাচনে কেন নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনস্থির করলেন?
* ভোট কেনা নিজ টাকা দিয়ে সদস্য বানানোর বিষয়টি অনেক আলোচনা হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? আদৌ বিষয়টি সত্য কি না?
* প্রবাসী সমাজে আপনার অবদান কি?
* বাংলাদেশের স্বার্থে এ পর্যন্ত কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?
* আপনি নির্বাচিত হলে প্রবাসীদের, বাংলাদেশের কী উপকার হবে?

rahmanmoni@gmail.com

[ad#co-1]