লোক-সংস্কৃতির ভদ্র-চর্চা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
কথাটা স্পষ্ট করে বলে নেয়া যাক : আমি লোক-সংস্কৃতির ভদ্র-চর্চার বিরোধী। এমনকি আজকের দিনে লোক-সংস্কৃতির বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে আলাদা-একটা সংস্কৃতিকে যদি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়, তবে তার, সে চেষ্টারও আমি বিরোধিতা করতে চাইবো। সমাজতন্ত্রকে যদি আমরা সত্যি সত্যি লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি তাহলে ভদ্রলোক এবং ততো বেশি ভদ্র নয় লোক, বা গরিব লোকের মধ্যে ভেদরেখাটাকে কায়েমি করে রাখতে পারে এমন বিভাজনকে সমর্থন করতে পারার কোনো উপায় নেই। সমগ্র দেশজুড়ে মানুষের এক ও অখ- সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে আমাদের কাম্য। তার মানে অবশ্যই এ নয় যে, বৈচিত্র্য থাকবে না সংস্কৃতিতে, স্থানের রং এসে লাগবে না তার গায়ে। বৈচিত্র্য অবশ্যই থাকবে, কিন্তু বিভেদ থাকবে না আমরা ও ওরার। ব্যাপারটা হবে বাগানের মতো; জঙ্গলের মতো না-হয়ে।

আমরা যখন লোক-সংস্কৃতির প্রশংসা করি বা বলি যে, চর্চা করতে হবে লোক-সংস্কৃতির, তখন আমরা ও ওরার পার্থক্যটাকে পাকাপোক্ত করে রাখবার ইচ্ছাটাই ব্যক্ত করিÑ সে জ্ঞাতসারেই হোক, কি হোক অজ্ঞাতসারেই। আমরা চাই আমরা আমরাই থাকি, তোমরা তোমরাই থাকো। তোমাদের আমরা পিঠ চাপড়ে দেব সময় সময়, তোমাদের মুখের গান গাইব টেলিভিশনে, তোমাদের কাহিনী সংগ্রহ করে এনে জমিয়ে রাখব একাডেমীতে, তোমাদের কাঁথা কি পিঠে এসে সাজিয়ে দেব প্রদর্শনীতে। তোমরা আমাদের গর্ব, তোমরা আমাদের ঐতিহ্য।

এতোই যদি হবে তাহলে আমরা কেন তোমরা হচ্ছি নাÑ এই বিশ্রী প্রশ্নটা কেউ তোলে না। তুললেও কেউ শোনে না, কেউ তার জবাবও দেয় না। আমাদের বাসনাটা থাকে এই যে, তোমরা লাইনের ওপাশেই থাকো, সন্তুষ্টচিত্তে থেকো, কখনো বিদ্রোহ, বিপ্লব বা হাঙ্গামা বাঁধিয়ে তুলো না, তাহলে আমাদের সুখে-স্বস্তিতে বিঘœ ঘটবে। আরো একটা অভিলাষ থাকে, খুব গোপনে নয়, থাকে প্রকাশ্যেই। সেটা হলো জীবনের জটিলতা থেকে পালাবার জায়গা পাওয়া। এই কথাটা একজন গবেষক স্পষ্ট করেই বলেছেন দেখলাম তার এক প্রবন্ধে। বলেছেন, আধুনিক জীবন জটিল ও কৃত্রিম, অতএব লোক-সংস্কৃতি আমাদের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সেখানে গিয়ে আমরা কোমলতা পাব, পাব মধুরতা। অর্থাৎ যে কারণে লোকে ক্রাইম ফিকশন পড়ে অথবা কখনো-কখনো যায় বনভোজনে, সেই কারণেই চর্চা করব আমরা লোক-সংস্কৃতির। এছাড়া এ কথাও প্রমাণ করতে চাই আমরা, অন্যদের কাছে এবং নিজেদের কাছেও যে, আমরা সাধারণ লোক নই, আমরা ভদ্রলোকÑ লোক-সংস্কৃতির আমরা পৃষ্ঠপোষক। সবটা মিলে কারণ একটাই লোক-সংস্কৃতিকে আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই ভদ্রলোকদের প্রয়োজনে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন তাতে মেটে যদি ভালো, কিন্তু সে-বিবেচনা মুখ্য নয়, গৌণ।

কিন্তু পিঠ চাপড়ানো আমাদের একার কারবার নয়। আমাদের চেয়েও বেশি ভদ্রলোকেরা আছেন, আছেন প্রতীচ্যদেশীয় ব্যক্তিরা, সাম্রাজ্যবাদীরা, তারা আবার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন আমাদের। বলেছেন ওই একই কথা। লোক-সংস্কৃতি তোমাদের অমূল্য সম্পদ, ওটাকে ছেড়ো না। বলেছেন ওই একই প্রয়োজনে, আমরা যাতে জেগে না উঠি, উঠে বিদ্রোহ না-করি তাদের সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে। এবং যাতে তারা কালেভদ্রে মানস-ভ্রমণ করতে পারেন এই সংস্কৃতিতে। এককালে তারা বলতেন প্রাচ্য হচ্ছে আধ্যাত্মবাদীদের দেশ, অর্থাৎ মহৎ মানুষদের দেশ, আর তারা, প্রতীচ্যের মানুষেরা, নিরতিশয় বর্বর, তারা অনাধ্যাত্মিক, তারা বস্তুবাদী। কিন্তু সেই কথায় আজ আর তেমন জোর পাওয়া যাচ্ছে না, প্রাচ্যের মানুষেরা জেনে ফেলেছে যে আত্মাকে বাঁচাতে হলে দেহকে বাঁচাতে হবে আগে এবং দেহের জন্য বস্তুর প্রয়োজন। পশ্চিমকে এখন তাই নতুন কথা খুঁজতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। লোক-সংস্কৃতির মহিমা প্রচার তাদের খুঁজে পাওয়া নতুন কথা। প্রবীণ কবি সেদিন বলছেন, শুনলাম, ওরা (পশ্চিমারা) আমাদের লোক-সংস্কৃতির কথা শুনলে একেবারে অজ্ঞান। বলাই বাহুল্য, ওরা আমাদের যে জিনিসটা নিয়ে অজ্ঞান তাকে অবশ্যই আমাদের দুর্বলতা জ্ঞান করতে হবে; ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এই রকমেরই।

ঠিক তেমনিভাবে আমরা ভদ্রলোকেরা যখন লোক-সংস্কৃতির প্রশংসা শুরু করি, তখন গরিব ও গ্রামের মানুষদের পক্ষে সন্ধিগ্ধ ও সতর্ক হওয়া কর্তব্য, কেননা তাদের সঙ্গে আমাদের শ্রেণীগত সম্পর্ক এমন কিছু সৌহার্দ্যরে নয়। লোক-সংস্কৃতির মূল্য ও মহিমা বিষয়ে অতিশয়োক্তি তাই মোটেই নিরীহ কোনো ব্যাপার নয়, এর মধ্যে প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র, প্রতারণা সব কিছুই রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের এবং আমরা আমাদের দেশের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর মানুষদের সন্তুষ্ট ও অবদমিত রাখবার জন্যই লোক-সংস্কৃতির ভদ্র-চর্চার বিষয়ে উৎসাহ প্রকাশ করছি কথাটা মোটামুটি এই রকমই দাঁড়ায়। সাম্রাজ্যবাদ আমাদের মধ্যে নানা ভাবে নানা মুখোশে নানা ফ্রন্টে কাজ করছে এবং তার অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় আমরাও জড়িয়ে আছি, অনেকটা স্বার্থগত কারণে, কিছুটা হয়তোবা অজ্ঞতাবসে।

তা হলে কি বলব যে লোক-সংস্কৃতি বলতে কিছু নেই, বা তার কোনো গুণও শুধুই কল্পনা? তার সমাজতান্ত্রিক মূল্য ও শিল্পমূল্য উভয়ই আছে যদিও সমাজতান্ত্রিক মূল্যটাই অধিক, শিল্পগত মূল্যের তুলনায়। লোক-সংস্কৃতি আছে। যেমন আছে আমাদের দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতা। থাকবেও ততোদিন যতোদিন আমাদের কিছু অংশকে আমরা ‘লোক’ বলে চিহ্নিত করে রাখব। সেটা স্বাভাবিকভাবে থাকা, স্বাভাবিক কারণে থাকা। কিন্তু অস্বাভাবিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখার কোনো আবশ্যক নেই, টিকিয়ে রাখার অর্থ হবে মানুষের অগ্রগামিতাকে বাধা দেয়া, দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যেই চিরস্থায়ী করে আটকে রাখা। আর এর পরিহাসটা এখানে যে কাজটা যদিও সাধারণ মানুষের সঙ্গে শত্রুতামূলক তথাপি ভান করছি যে, এর উদ্দেশ্য লোকহিতৈষণা।

লোক-সংস্কৃতির মধ্যে গুণ নিশ্চয়ই আছে। সে বিষয়ে লোক-সংস্কৃতির গবেষক ও পৃষ্ঠপোষকেরা আমাদের অবহিত রেখেছেন। প্রতিনিয়ত রাখছেন। কিন্তু আমাদের লোক-সংস্কৃতির ভেতরে যে মনটি আছে তার পরিচয় দিতে গেলে বলতেই হবে যে, এই মন একাধারে সঙ্কীর্ণ ও স্থবির। আমাদের লোক-জীবন দরিদ্র ও সামান্য, তাই আমাদের লোক-সংস্কৃতির মধ্যে আছে দারিদ্র্য, আছে সামান্যতা। আমাদের রূপকথা, কেচ্ছাকাহিনী ও পুঁথির (পাকিস্তানি আমলে যাকে বলা হতো অত্যুৎকৃষ্ট সাহিত্য) মধ্যে বড় রকমের ছেলেমানুষি রয়েছে। থাকবেই। এরা হচ্ছে সমাজের বাল্যকালে তৈরি। কিন্তু সেই ছেলেমানুষিকে সভ্যতার অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন বলে বিবেচনা করলে তার দ্বারা বয়স্কদের বয়স সম্মানিত হয় না। এইসব সৃষ্টির মধ্যে সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে ভূতপ্রেত ও রাক্ষস-খোক্কসের, পাওয়া যাবে থুরথুরে বুড়ির, সাপের ও বাঘের। দেখা যাবে সেখানে অভাব সব কিছুর, চালের, লাকড়ির, তেলের, চিনির। দেখা হবে বন্ধ্যা নারীর সঙ্গে, হবে অঙ্গুষ্ঠ কুমারের সঙ্গে। সবকিছু মিলিয়ে এই জগৎ অতিশয় ক্ষুদ্র-ভীষণভাবে স্বাস্থ্যহীন, অত্যন্ত অনুজ্জ্বল। এটা একটা ভীতির জগৎ, বেদনার জগৎ। এখানে বীর আছে কিন্তু বীরত্ব নেই। এর সবচেয়ে ভয়াবহ যে রাক্ষস তার প্রাণ-ভোমরা লুকানো আছে ছোট্ট একটি কৌটায়, তাকে হত্যা করতে হলে যুদ্ধের আবশ্যক নেই, ওই ভোমরাটিকে দুহাতে পিষে ফেলতে পারলেই কার্যোদ্ধার হয়। এখানে, এই জগতে, মানুষ ও পশু-পাখিতে কোনো ভেদাভেদ নেই, তারা একই স্তরের প্রাণী, একই পর্যায়ে তাদের সকলের সহাবস্থান। যে-রাজকন্যার প্রাণ আটকা আছে একজোড় কাঠির এপাশ-ওপাশ করার মধ্যে, সেই প্রাণের মতোই ক্ষীণ ও ভীরু এই জগতের প্রাণ। এ শুধু টিকে আছে কোনোমতে, থাকা না-থাকার প্রান্ত ঘেঁষে।

আমাদের লোক-সংস্কৃতিতে নৃত্য খুব একটা নেই, যেটুকু, বা যতোটুকু আছে তার গা-ভরা স্থূলতা। গানই এই সংস্কৃতির প্রধানতম সম্পদ। এই গানের মধ্যে আর্ত মানুষের স্বর আছে, আছে চিরন্তনতা ও সর্বজনীনতা। কিন্তু গানের সামান্যতার দিকগুলোও অবজ্ঞা করবার মতো নয়। এই গান মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমাদের সমাজে মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতার সুপ্রাচীন গভীরতা নিজেকে প্রকাশ করেছে লোকসঙ্গীতের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার মধ্য দিয়ে। গানের মধ্যে কোথাও কোথাও মরমীবাদ আছে, আছে আধ্যাত্মিকতা; কিন্তু যাই হোক সব কিছুকে জড়িয়ে আছে স্থূলতা ও দেহকেন্দ্রিকতা। না বলে উপায় নেই যে, আমাদের আধ্যাত্মিকতা আসলেই নিতান্তই বস্তুতান্ত্রিক, এর খানিকটা এসেছে পরকালের লোভ থেকে, খানিকটা ইহকালের ভয় থেকে।

মৈমনসিংহ গীতিকার মানবিক আবেদন বহুল-প্রশংসিত, কিন্তু নদের চাঁদ এমন-কিছু অসাধারণ মানুষ নয়, তার নিজের জীবন, তার আশপাশের জীবন অতিশয় দীন, নিতান্তই সামান্য। তদুপরি এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে দীনেশ চন্দ্র সেন যখন ময়মনসিংহ গীতকাসমূহ ভদ্রসমাজে উপস্থিত করেছেন তখন তাদের মেজে-ঘষে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভদ্র করে নিয়েছেন, গ্রামীণকে তার নিজের স্বাভাবিকরূপে আসতে দিতে ভরসা পাননি। মেওয়া সুন্দরীর মহুয়া হওয়া শুধু নাম বদল নয়, নিজের দীনতা স্বীকারও বটে। বস্তুত লোক-সংস্কৃতি আমাদের কাছে এমনভাবেই সাজগোজ করে, গ্রহণযোগ্য হয়ে তবে আসে। আমদের বেশিরভাগ গান আমাদের একতারার মতোই ক্ষীণ-প্রাণ। আমরা যে থেকে থেকে কারণে-অকারণে গান গাইতে ভালোবাসি তার মধ্যে যে ভাবালুতা ও অন্যমনস্কতা প্রকাশ পায় তা বড় সৃষ্টির কাজে সহায়তা দান করে না। অধিক কোমলতা অবশ্যই দুর্বলতা। তার ওপরে আছে লোক-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যহীনতা এবং সর্বোপরি এর স্থবিরতা। এই সংস্কৃতির মধ্যে বিকাশশীলতা নেই, নেই অগ্রসরমানতা। আমাদের লোক-সংস্কৃতি হচ্ছে একটি অতিদরিদ্র ও স্তব্ধগতি সমাজের সংস্কৃতি। পার্ল বাক তার ‘দি গুড আর্থ’ উপন্যাসে কৃষকের যে জীবন চিত্রিত করেছেন সেই জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষকের জীবনের তুলনা করলে বোঝা যাবে এর দারিদ্র্যটা কেমন, স্থবিরতা কতোটা। ওয়াং লাং দরিদ্র কৃষক, সে তার জমিকে ভালোবাসে তেমনি করে, যেমন করে গফুর ভালোবাসত তার মহেশকে। কিন্তু গফুরের তো মহেশ ভিন্ন আর কিছু সম্পদ বা সম্পত্তি নেই। মহেশের জীবন ও গফুরের নিজের একই স্তরের জীবন; ওদিকে ওয়াং লাংয়ের জীবনে দারিদ্র্য যেমন আছে, তেমনি আছে জমি কেনার সুযোগ ও সম্ভাবনা, আছে গৃহযুদ্ধ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের কৃষকের জীবনে যার কোনোটাই নেই।

আমাদের লোক-সংস্কৃতির মধ্যে সংরক্ষিত মন ও মানসিকতা তাই আমাদের জাগতিক অগ্রগতির পক্ষে আদৌ সহায়ক নয়, বরং সেই অগ্রগতির পরিপন্থী। ধর্মকে আফিম বলা হয়েছে, লোক-সংস্কৃতিও আফিম হয়ে পড়তে পারে।

এই সংস্কৃতিকেই যখন আমরা আমাদের সম্পদ বলে আস্ফালন করি তখন যে শুধু সাধারণ মানুষের সঙ্গেই শত্রুতা করি তাই নয়, শত্রুতা করি নিজেদের সঙ্গেও। দুর্বলতাকে সবলতা বলে আঁকড়ে ধরার মধ্যে আত্মশত্রুতাই প্রকাশ পায়। লোক-সংস্কৃতির ভেতর আমাদের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিহিত আছে এ কথা অবশ্যই সত্য, কিন্তু যে সত্যটা বাস্তবিক, তাকে নিয়ে উল্লসিত হওয়ার মতো কিছু নেই, তাকে নিয়ে আত্মতৃপ্ত থাকা তো রীতিমতো অপরাধ।

লোক-সংস্কৃতির জাতীয়তাবাদ যে-অহমিকার জন্ম দিতে পারে তা হবে আত্মঘাতী। আমাদের অনেককালের অন্ধকার নিজেকে জমা রেখেছে আমাদের লোক-সংস্কৃতির অভ্যন্তরে। সেই অন্ধকার ছিন্নভিন্ন করে এগিয়ে যাওয়াই আজ কর্তব্য। এই সংস্কৃতি নিয়ে যখন আমরা গবেষণা করব তখন লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে এই প্রয়োজনের কথাটা যেন কখনো না ভুলি, গবেষণা যেন প্রয়োজনকে, উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে না ওঠে, আর এও যেন আমরা মনে না করি যে, আমাদের পরিচয় সমস্তটাই লুকানো আছে লোক-সংস্কৃতির অন্তরে। আত্মপরিচয় বরং আরো বেশি পাওয়া যাবে অর্থনৈতিক সংগঠনে ও সামাজিক বিন্যাসে। লোক-সংস্কৃতি থেকে লোকেরা যে আনন্দ পায় ও পাবে এই সংবাদও অভ্রান্ত, কিন্তু তার মানে অবশ্যই এ নয় যে, এই আনন্দই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আনন্দ, এর বাইরে অন্য কোনো আনন্দ নেই। মজা খালে ডিঙ্গি ঠেলে খুব আনন্দ পাচ্ছি এমন কথা বলি আপত্তি নেই, কিন্তু তাই বলে বড় নদী বলে কিছু নেই দুনিয়াতে, বা ডিঙ্গির চেয়ে দ্রুত কোনো যান নেই কোথাও, বা বড় নদীর বড় যানের যাত্রীরা কোনো আনন্দ পায় না সমুদ্র-যাত্রায়, এইসব কথা বলতে যাওয়া আত্মপ্রবঞ্চনামূলক হবে।

লোক-সংস্কৃতির নব-রূপায়ণের কথা বলা হয়েছে এবং আশঙ্কা করছি আরো হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু এর অর্থটা পরিষ্কার বোঝা যায় না। লোক-সংস্কৃতির কাহিনী, শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প বা অন্য কোনো উপাদানকে যদি আমরা আমাদের নতুন প্রয়োজনে ব্যবহার করি তবে তাকে কি লোক-সংস্কৃতিক নব-রূপায়ণ বলা সঙ্গত হবে? নিশ্চয়ই নয়। বহুবিচিত্র লোককাহিনীর ব্যবহার আছে হোমারের ‘অডিসি’তে কিন্তু যে-সৃষ্টি এই সাহিত্যকর্ম তা লোককাহিনী নয়, তা মহাকাব্য। শেকসপিয়রের ‘কিং লিয়র’ নাটকের কাহিনী অনেক দেশের লোককাহিনীতে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু আমরা কি বলবো যে শেকসপিয়র লোককাহিনীর নব-রূপায়ণ সাধন করেছেন, নাকি বলব শেকসপিয়র একটি নাটক লিখেছেন যার কাহিনীর কিছুটা হয়তো লোককাহিনী থেকে এসেছে, যেমন তার কোনো কোনো কাহিনী এসেছে ইতিহাস থেকে? রবীন্দ্রনাথ যদি বাউল গানের সুর ব্যবহার করেন তার নিজের রচনায় তবে কি সেই রচনার পরিচয় হবে বাউলধর্মী বলে, নাকি রবীন্দ্রধর্মী বলেই তাকে জানতে হবে আমাদের? ফ্রয়েড মানুষের একটি মানসিক জটিলতার নাম দিয়েছেন ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’ তার অর্থ কি এই যে, ফ্রয়েড ইডিপাসের কাহিনীর নব রূপায়ণ সাধন করেছেন? অনুরূপভাবে মাইকেল মধুসূদন যখন রামায়ণের কাহিনী ব্যবহার করে মহাকাব্য রচনা করেন, তখন রামায়ণের প্রয়োজনে তা করেন না, করেন নিজের প্রয়োজনে। প্রয়োজনটাই কথা। উপাদান দিয়ে নতুন সৃষ্টির পরিচয় হয় না, পরিচয় হয় কোন প্রয়োজনে এই উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রয়োজন দিয়ে। লোক-সংস্কৃতির ভেতরকার মানসিকতাটা পুরনো, তার স্বার্থক নব-রূপায়ণ আদৌ সম্ভবপর নয়, আজকের মানুষ আর পেছনে ফিরে যেতে পারবে না, মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়, সম্ভব শুনেছি শুধু ভূতের পক্ষে।

অন্যদিকে লোক-সংস্কৃতির নব-রূপায়ণ বলতে যদি বোঝানো হয় রূপকল্পের নব-রূপায়ণ, তবে তো প্রায় কিছুই বলা হলো না। কেননা রূপকল্প বা ফর্ম দিয়ে তো সৃষ্টির পরিচয় নয়, পরিচয় তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু দিয়ে। যদি নতুন বিষয়বস্তু ও নতুন মানসিকতা প্রকাশ করার জন্য পুরনো রূপকল্প ব্যবহার করি তবে তাতে নতুন সৃষ্টিই বলতে হবে, পুরনোর নব-রূপায়ন নয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমাদের লোক-সংস্কৃতির রূপকল্পসমূহও তাদের অন্তর্গত বিষয়বস্তুর মতোই সামান্য।

ব্যক্তিগতভাবে কোনো ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা যদি লোক-সংস্কৃতির চর্চা করতে চান তবে তিনি তা নিশ্চয়ই করবেন, কিন্তু দেশের উপকারের জন্য কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইলেই আমাদের আপত্তি। ব্রতচারী নৃত্য নিজ নিজ গৃহে যিনি যতোখুশি করুণ, কিন্তু আমাদের সবাইকে ডেকে যেন বলবেন না, আসুন নৃত্য করি, কেননা তখন আমাদের বলতেই হবে, মাফ করবেন, আমাদের করার মতো আরো অনেক জরুরি কাজ আছে বাকি পড়ে। নকশিকাঁথা তৈরি করবার মতো অখ- অবসর যাদের আছে তারা তা করুন, কিন্তু সবাইকে প্ররোচিত করবেন না ওই কাজে, কেননা আমাদের দরকার হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ শীতবস্ত্র, একটি-দুটিতে কুলাবে না।

তাছাড়া লোক-সংস্কৃতি বড় বেশি উপস্থিত আছে আমাদের ভদ্রজীবনে, আমাদের সমাজনীতি অর্থনীতি রাজনীতিতে, আমাদের উৎসবে-অনুষ্ঠানে, মনে ও মানসিকতায়। সমস্যা তার উজ্জীবনের নয়, সমস্যা তার প্রাণঘাতী শীতল হস্ত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার। মাইকেল মধুসূদন বিদ্রোহী কবি ছিলেন, আজ যখন ‘মধুমেলা’ নাম দিয়ে গ্রাম্য অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে তার জন্মস্থানে, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না শতাব্দীবাহিত গ্রাম্যতা ভীষণ বড় এক প্রতিশোধ নিচ্ছে এই বিদ্রোহীর বিদ্রোহের ওপর। জীবনে সে তার অনাদর করেছে, রেহাই দেয়নি মৃত্যুর পরও। (বাঙালিও জানে সুদখোর কাবুলিওয়ালা হতে) এই গ্রাম্যতার কারণেই আমাদের দেশে বিজ্ঞানী এসেছে, যদিও কিন্তু বিজ্ঞান প্রায় আসতেই পারল না। এর কারণেই আমাদের প্রকৌশলীরা হন তাবলিগী, পদার্থ-বিজ্ঞানীরা হন জামায়াতি।

লোক-সংস্কৃতির ভদ্র-চর্চার বিরোধিতা না করে উপায় কী? এই চর্চায় শুধু রক্ষণশীলতা নেই, আছে প্রতিক্রিয়াশীলতা, আছে প্রতারণা, সমূহ অপচয়, একটা বিকটাকার ক্ষতি।

[ad#co-1]