রেবতী বর্মণ এবং মধ্যবিত্তের শ্রেণীচ্যুতি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
রেবতীমোহন বর্মণকে স্মরণ করতে গেলে আমাদের মুক্তি আন্দোলনকেই স্মরণ করতে হয়। কারণ ওই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন; সেই কৈশোর থেকেই নিজেকে অর্পণ করেছিলেন আন্দোলনের কাছে। মুক্তি অবশ্য দেখে যেতে পারেননি; দেখবেন কী করে, মুক্তি তো আসেইনি; উল্টো যা দেখে গেলেন তা হলো স্বাধীনতার নাম করে দেশভাগ, যার দরুন তিনি জন্মভূমি কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। মারা গেলেন আগরতলায়, ১৯৫২-তে, মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে। আগরতলা ততদিনে ভারতের অংশ হয়ে গেছে, অথচ একসময়ে ওই শহর তো ছিল কুমিল্লার সঙ্গে সংলগ্ন, যে কুমিল্লাতে রেবতী বর্মণ রাজনৈতিকভাবে কাজ করেছেন। বলাবাহুল্য তাঁর রাজনৈতিক কাজের সবটাই ছিল দেশবাসীর মুক্তির লক্ষ্যে নিয়োজিত এবং তার সকল কাজই ছিল রাজনৈতিক।

মুক্তি কেন আসেনি সেটা তো আমরা সবাই জানি। ব্রিটিশের শাসন ও শোষণ ছিল। তাদেরকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করবার জন্য মানুষ চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা চলেও গেছে। কিন্তু যাবার আগে ভাগ করে দিয়ে গেছে বাংলা ও পাঞ্জাব, তথা সমস্ত ভারতবর্ষকেই। দুই দিকের দুই জাতীয়তাবাদী দল, কংগ্রেস এবং লীগ ওই ভাগাভাগিকে মেনে নিয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ, উৎপাটিত হয়েছে কতজন তার সংখ্যা জানা নেই।

মুক্তির জন্য ব্রিটিশকে বিতাড়িত করাটা দরকার ছিল। রেবতী বর্মণ সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তখন তিনি স্কুলের ছাত্র। আন্দোলনটা জাতীয়তাবাদীরা করছিল। জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে একাংশের ভেতর উপদ্রব ছিল সাম্প্রদায়িকতার, তাছাড়া তাদের মধ্যে বিভাজন ছিল নরম ও কঠোরের। স্কুলের ছাত্র রেবতী বর্মণ নরম নয়, কঠোর অংশের সান্নিধ্যেই এসেছিলেন; সেই বয়সেই দীক্ষা নিয়েছিলেন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের। এতে যুক্ত থাকার দরুন তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত একটানা আট বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি।

কিন্তু হতাশ হননি, ভেঙে পড়েননি; বরঞ্চ বন্দিজীবনকে পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন অধ্যয়নে; সেই সঙ্গে অনুবাদ ও মৌলিক লেখালেখির কাজে। অধ্যয়ন ও চিন্তার ফলে বুঝে নিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদে কাজ হবে না; কেননা জাতীয়তাবাদীরা তা তারা নরমই হোক, কিংবা হোক কঠিন যা চায় সেটা হলো ক্ষমতার হস্তান্তর। ক্ষমতার রূপান্তর তাদের লক্ষ্য নয়। ব্রিটিশ চলে যাবে, ব্রিটিশের জায়গাতে স্থানীয় লোকেরা ক্ষমতায় বসবে, তাদের দৃষ্টিতে এটাই হলো স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতায় যে মানুষের মুক্তি আসবে না, মুক্তির জন্য সমাজের গঠনে ও চরিত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আবশ্যক হবে রেবতী বমর্ণ তা বুঝে ফেলেছেন। পড়তে পড়তে বুঝেছেন এবং যা বুঝেছেন লেখার মধ্য দিয়ে তা অন্যদেরকে জানাতে সচেষ্ট হয়েছেন। কেবল তাই নয়, ঠিক করেছেন কারামুক্ত হলে যোগ দেবেন সমাজবিপ্লবীদের রাজনৈতিক সংগঠন, কমিউনিস্ট পার্টিতে। পার্টি তখন নিষিদ্ধ ছিল, যোগাযোগ করতে হয়েছে সংগোপনে।

জেলে যাবার আগে যুক্ত ছিলেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সঙ্গে। স্বাধীনতার জন্য এঁরা সংগ্রাম করেছেন। এর পরে তিনি সন্ধান পান চিন্তাচেতনার দিক থেকে আরো অগ্রসর অনিল রায় ও লীলা নাগের সংগঠন ‘শ্রী সংঘের’ এবং তাদের সঙ্গে কাজ করেন। এই দুই ধারাই যুক্ত হয় সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে। ফরওয়ার্ড ব্লক গান্ধীর অহিংসা ও আপোসপন্থী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় অসন্তুষ্ট ছিল, যে জন্য তাদের ওই নতুন দল গড়া। কিন্তু এরাও জাতীয়তাবাদীই ছিলেন। কারামুক্ত রেবতী বর্মণ ওই সীমানাটা লঙ্ঘন করলেন, নিজেকে তিনি পরিণত করলেন যথার্থ সমাজবিপ্লবীতে। বদলে গেলেন একবারে গুণগতভাবে। তিনি অবসান ঘটাতে চাইলেন সমাজের বিদ্যমান শ্রেণীবিভাজনের। যে জন্য তাঁর পক্ষে উপায় ছিল না কমিউনিস্ট না হয়ে।

এই যে সমাজবিপ্লবী হওয়া এর প্রথম শর্তটা হচ্ছে শ্রেণীচ্যুতি। রেবতী বর্মণের ক্ষেত্রে সেটা পরিপূর্ণরূপে ঘটেছিল। জন্ম তাঁর জমিদার পরিবারে। পিতা ছিলেন জমিদার এবং প্রতিষ্ঠিত আইন ব্যবসায়ী। তাঁর কাকা ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও ঋণসালিশী বোর্ডের চেয়ারম্যান; রেবতী নিজে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। রাজনৈতিক কাজে পড়াশোনায় বিঘœ ঘটেছে, তবু তার মধ্যেই কিশোরগঞ্জের অজপাড়াগাঁয়ের এক স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রথম হয়েছেন। সবাই চমকে গেছে। সেকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এলাকাটা ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত, তার ভেতর অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলা, বিহার, আসাম, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর। পরে কলকাতায় এসে তিনি আইএ পড়লেন প্রেসিডেন্সি কলেজে; বিএ সেন্ট পলস কলেজ থেকে। ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পরীক্ষায় তিনি প্রথম হন এবং জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পান। এমএ পড়েন অর্থনীতিকে বিষয় হিসেবে বেছে নিয়ে। সে পরীক্ষাতেও প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান। তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়া। কিন্তু তিনি সেদিকে যাবার কথা ভাবলেনই না; চলে গেলেন একেবারে ভিন্নপথে, যে-পথটা একাধারে কঠিন এবং দ্রুত সাফল্যের প্রতিশ্রুতিবিহীন। মধ্যবিত্ত ধ্যানধারণার গ-িকে অতিক্রম করে তিনি কেবল যে জাতীয়তাবাদী হলেন তা নয়, মেহনতি মানুষের স্বার্থকে প্রধান বিবেচনার বিষয় করে ব্রিটিশবিতাড়নের সঙ্গে সমাজপরিবর্তনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগুতে থাকলেন।

পৃথিবীকে যাঁরা বদলাতে চান তাঁদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হচ্ছে পৃথিবীটাকে জানা ও বোঝা। কেবল শ্রেণীচ্যুতি হলেই চলবে না, পৃথিবীটাকে যে জানতে বুঝতে হবে সেটাও রেবতী বর্মণের জানা ছিল। এই জ্ঞান সাধারণত আসে দু’দিক থেকে। একটি হচ্ছে অভিজ্ঞতা, অন্যটি অধ্যয়ন। রেবতী বর্মণ উভয় দিক থেকেই জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন। সমাজকে তিনি জানতেন, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গেই তিনি অকাতরে মিশেছেন, সেখান থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার ব্যাপারে তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না। কিন্তু পাশাপাশি অধ্যয়নও চলেছে। বন্দি অবস্থায় সামাজিক অভিজ্ঞতা সংগ্রহের সুযোগ ছিল না, কিন্তু সমাজকে বোঝার জন্য যে ধরনের অধ্যয়ন প্রয়োজন ছিল সেটা তিনি করেছেন একেবারে বিরতিহীনভাবে। এই অধ্যয়ন অগোছালো, খাপছাড়া বা পরিকল্পনাবিহীন ছিল না। ছিল সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক।

মার্কসের সবচেয়ে জটিল গ্রন্থ হচ্ছে ‘ক্যাপিটাল’। এর তিন খ-ই তিনি একবার নয়, ছয় বার পুরোপুরি পড়েছেন। কেবল পড়েননি ওই বইয়ের মার্জিনে মার্কসের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে মন্তব্য লিখেছিলেন, ভারতবর্ষের সমসাময়িক ঘটনাবলীকে বিবেচনায় নিয়ে। অর্থাৎ তত্ত্বকে নিয়ে আসতে চেয়েছেন ঘটনার কাছে এবং ঘটনাকে বুঝতে চেয়েছেন তত্ত্বের সাহায্যে। মার্কসবাদীদের পক্ষে যেটা করা কর্তব্য; যেটা না করলে মার্কসবাদ যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, তার সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে যায়, মার্কসবাদ পরিণত হয় শুকনো পা-িত্যে। মার্কসবাদ যে পথের পাথেয় ও নির্দেশক, রেবতী বর্মণকে তা কেউ বলে দেয়নি, তিনি নিজে নিজেই বুঝে নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁর নোটসহ ওই বই হারিয়ে গেছে; নইলে তা একটি মূল্যবান প্রকাশনা হতে পারত। কিন্তু যা তিনি পড়েছেন, বুঝে নিয়েছেন এবং বুঝে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে সেই জ্ঞান ভাগ করে নিতে চেয়েছেন তার পরিমাণও কম নয়। এ ক্ষেত্রে তিনি অভিযাত্রীও। ‘ক্যাপিটাল’-এর সংক্ষিপ্তসার তিনি বাংলা লিখেছেন। হেগেলের সঙ্গে মার্কসের সম্পর্ক বোঝাটা খুবই জরুরি, কেননা সেটা না বুঝলে মার্কসের চিন্তায় দ্বন্দ্ববাদের গুরুত্ব এবং সেই দ্বন্দ্ববাদের নিজস্বতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। রেবতী বর্মণ ‘হেগেল ও মার্কস’ নামে একটি বই লিখেছেন। ‘মার্কস প্রবেশিকা’ নামেও তার একটি বই আছে। স্মরণে রাখতে হবে যে এই সব গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে তার সামনে তেমন কোনো পথপ্রদর্শক ছিলেন না, অনেক পরিশব্দও তখন উদ্ভাসিত হয়নি, তিনি কঠিন শ্রম ও অভিনিবেশ সহকারে এগিয়ে গেছেন।

মার্কসবাদের যেমন দর্শন আছে তেমনি আরো জরুরিভাবে রয়েছে অর্থনীতি; সেই বিবেচনা থেকে রেবতী বর্মণকে লিখতে হয়েছে ‘অর্থনীতির গোড়ার কথা’। এঙ্গেলসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি রচনার, যে দু’টি পাঠ না-করলে সমাজ বিকাশের ধারা এবং সমাজতন্ত্রের কি ও কেন বোঝা যায় না, তাদেরও তিনি অনুবাদ করেছেন ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ এবং ‘সমাজতন্ত্রবাদ-বৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক’ নাম দিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল যথার্থ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দৃষ্টান্ত, সে জন্য রেবতী বর্মণকে লিখতে হয়েছে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে দু’টি বই এবং রুশ বিপ্লবে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁকে নিয়েও লিখেছেন তিনি ‘লেনিন ও বলশেভিক পার্টি’। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদও ছিল তাঁর মনোযোগের ক্ষেত্র, যে জন্য লিখেছেন ‘সাম্রাজ্যবাদের সঙ্কট’।

ভারতবর্ষ ও বাংলা প্রদেশের সমাজ পরিবর্তনকারীদের জন্য কৃষক ও ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন ছিল অত্যাবশ্যকীয়। রেবতী বর্মণের পক্ষে সেই আবশ্যকতাকে অস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কৃষক ও তার সংগ্রামকে নিয়ে রেবতী বর্মণের দু’টি রচনা আছে; একটির নাম ‘কৃষক ও জমিদার’, অপরটির নাম ‘ভারতের কৃষক সংগ্রাম ও আন্দোলন’। বাংলার ভূমিব্যবস্থাকে তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন। এ বিষয়ে সরকারি সেটেলমেন্ট রেকর্ড ও সেন্সাস রিপোর্ট পাঠ করেছেন; কৃষক কীভাবে শোষিত হয়, কী উপায়ে ও প্রক্রিয়ায় তাকে ভূমিহীন করে তোলা হয় তা ছিল তার পর্যালোচনার বিশেষ বিষয়। ১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের উদ্যোগে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য যে ফ্লাউড কমিশন গঠিত হয় সেই কমিশনের কাছে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ৬২ পৃষ্ঠার একটি জরুরি স্মারকলিপি যোগ করা হয়। এটির মুখ্য রচয়িতা ছিলেন রেবতী বর্মণ।

কিন্তু কেবল লিখে ও গবেষণা করে ক্ষান্ত হবেন এমন পাত্র তিনি ছিলেন না। রেবতী বর্মণ নিজের লেখা প্রকাশ করেছেন এবং অন্যের লেখা প্রকাশে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। প্রথম জীবনেই তিনি ‘বেণু’ নামে একটি কিশোর মাসিক সম্পাদনাও প্রকাশ করেন এবং প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহের জন্য ছাত্রজীবনে পাওয়া স্বর্ণপদক তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ‘বেণু’র প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছিল। ঢাকায় তিনি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন গণ-সাহিত্যচক্র। পরে কলকাতায় ন্যাশনাল বুক এজেন্সি নামে যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে তার পেছনেও কার্যকরভাবেই তিনি উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু এসবই তাঁর একদিনের কাজ। রেবতীমোহন যথার্থ বিপ্লবী হতেন না যদি না জ্ঞানানুশীলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কাজকে যুক্ত করতেন। এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশেষ দুর্বলতাগুলোর মধ্যে একটি ছিল তত্ত্বজ্ঞানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মের বিচ্ছিন্নতা। যাঁরা মাঠে কাজ করেন তাঁরা তত্ত্বের বিষয়ে যথার্থরূপে চিন্তা করার দিকে মনোযোগ দেন না, বা দিতে পারেন না। অন্যদিকে যাঁরা জ্ঞানের অনুশীলন করেন তাঁরা প্রয়োগের ক্ষেত্রটিকে অবজ্ঞা করেন। অথচ একজন মার্কসবাদীর পক্ষে এই দু’য়ের সংমিশ্রণ না ঘটালেই নয়। ওটা ঘটাতে না পারলে তত্ত্ব থাকবে একপাশে, কর্ম আরেক পাশে; দু’য়ের সংযোগ ঘটিয়ে প্রাণবন্ত ও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব হবে। রেবতী বর্মণ তেমনটি ঘটতে দিতে চাননি।

সমাজবিপ্লবীদের আরেকটি গুণ তারা হতাশ হন না এবং আপোসও করেন না। রেবতী বর্মণ সে-ব্যাপারেও দৃষ্টান্ত বৈকি। শেষ দিকে দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে আক্রমণ করেছিল; কিন্তু তাতে ক্ষতি যা হবার তাঁর দেহেরই হয়েছে, মনের দিক থেকে তিনি সম্পূর্ণ নীরোগই ছিলেন। আর আপোস করবার তো প্রশ্নই ওঠেনি। তাঁর নিজের পরিবারের ভেতরেই ফরওয়ার্ড ব্লকের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন, তাঁর সঙ্গে রেবতী বর্মণের কখনোই মতের মিল হয়নি, তাই মনের মিলও ঘটেনি। জাতীয়তাবাদকে অপরিপূর্ণ জ্ঞান করে সেই যে তিনি এগিয়ে এলেন আর পিছু ফিরলেন না ।

কিন্তু মুক্তি তো আসেনি। আর তাঁর কথাই বা ক’জনে আজ স্মরণ করেন? রেবতী বর্মণের একটি ছবি নাকি কোনোমতে উদ্ধার করা হয়েছিল; তাঁর লেখা শেষ বই ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’-এর প্রকাশনা তিনি দেখে যেতে পারেননি, এটি মুদ্রিত হয়েছে তার অকালমৃত্যুর পরে।

মুক্তি কেন এলো না তার ব্যাখ্যা আছে। ব্রিটিশের চক্রান্ত তো অবশ্যই ছিল; সেই সঙ্গে ছিল জাতীয়তাবাদ যে সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হলো সেই নির্মম সত্য। ব্রিটিশ শাসকেরা বামপন্থীরা তখনো সজাগ হয়ে উঠতে পারেনি জেনেও তাদেরকে দমন করতে ছাড়েনি। কাজটা তারা করেছে এই জ্ঞান থেকে যে তাদের আসল শত্রু জাতীয়তাবাদীরা ছিল না। ছিল বামপন্থীরাই, যারা একদিকে পূর্ণ স্বাধীনতা চাইত, অপরদিকে ভারতবর্ষকে এমনভাবে গড়ে তুলতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল যেখানে সাম্রাজ্যবাদীদের পুনর্প্রবেশ অসম্ভব হয়ে পড়ত। জাতীয়তাবাদীরা নিজেরাও জানত যে বামপন্থীরা তাদের মিত্র নয়। তাই সাতচল্লিশের পরে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেই বামপন্থীরা ছিলেন রাষ্ট্রশক্তির প্রধান প্রতিপক্ষ; তাদেরকে যতভাবে সম্ভব নিগৃহীত করা হয়েছে। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু বামপন্থীদের ওপর নির্যাতন কমেনি।

রেবতী বর্মণরা কি তবে হারিয়ে গেলেন? মোটেই না। তাঁরা আছেন। তাঁরা আছেন দৃষ্টান্ত হিসেবে। এঁরা দৃষ্টান্ত হচ্ছেন প্রকৃত সমাজবিপ্লবীর। আছেন তাঁরা অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে। আর তাঁদের কাজ তো রয়েছেই। সে-কাজ ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। তাঁদের সামনে তখন কেউ ছিলেন না। আমাদের সামনে তো তাঁরা রয়েছেন।

[ad#co-1]

One Response

Write a Comment»
  1. He is the most important writer in Bangladesh. I found no one comparable with his writings. In this article, he captured the overview of R. Bormon in an amazing way. Without having much proficiency and bearing good thought it would highly impossible to write in this easily articulated way. Thanks.