নেই আলু নীতিমালা

এম মামুন হোসেন মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে
মাঠে পড়ে আছে প্রচুর আলু; কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা অপ্রতুল
ইরি-বোরো ধান উৎপাদনের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে ইউরিয়া ও ডিজেল সরবরাহ করে, সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে, সরকারিভাবে ধানের মূল্য ঘোষণাসহ অনেক কিছুই করে থাকে। কিন্তু প্রতি বছর লাখ লাখ টন আলু উৎপাদন হলেও এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা সরকারের নেই। আলুচাষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেরও কোনো সহযোগিতা পায় না।

এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম আমিনুর রহমান বলেন, কৃষি সংক্রান্ত সব কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক, কৃষি অধিদপ্তরের কোনো ক্ষমতা নেই। কৃষকের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কৃষকও দুর্বল কৃষি অধিদপ্তরও দুর্বল। কৃষি অধিদপ্তর ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার।

কৃষিবিদ আবুল কাশেম জানান, আলুর জীবনযৌবন নয় মাস। মার্চ মাসে যে কোনোভাবে আলু বাজারে উঠে। নভেম্বরের মধ্যে তা শেষ করতে হয়। এ দেশের বেশিরভাগ চাষীর অক্ষরজ্ঞান সীমিত। এ বিষয়গুলো কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়ে চাষীদের সচেতন করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বর্ষাকালে দেশে রবিশস্য থাকে না তখন আলুর দাম বাড়ে। সরকার এ সময়টায় আলুর দাম সীমার মধ্যে রাখতে বাম্পার ফলনের সুবিধা নিতে পারতো বলে মনে করেন। এসব দিক দেখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। কিন্তু দেশের সবচেয়ে দুর্বল গঠন কৌশলে পরিচালিত হয় এ প্রতিষ্ঠানটির। কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে কৃষি অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিতে হবে। সার সঙ্কট, বীজ নিয়ে অসাধু ডিলারদের কারসাজি এগুলো বন্ধে কৃষি অধিদপ্তর কোনো ভূমিকা নিতে পারে না। তাদের স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ রহিম বলেন, এ দেশের কৃষি বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা নেই। গত বছর কৃষক আলুর ভালো দাম পেয়েছে। এজন্য এবার হুমড়ি খেয়ে আলুর আবাদ করেছেন। আলুর লেট ব্রাইড রোগ না হওয়ায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু দেশের মোট আলুর চাহিদা কতোটুকু তার পরিসংখ্যান না থাকায় এখন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের কাছে আলুর চাহিদার পরিসংখ্যান থাকলে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারতো কতো হেক্টর জমিতে আলু চাষ করতে হবে।

তিনি বলেন, কৃষক এবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই আগামী বছর আর আলুর আবাদ করবেন না। যেমন গতবার রসুনের দাম পায়নি বলে কৃষক রসুনের আবাদ করেননি।

জানা গেছে, কৃষি অধিদপ্তরের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষি উন্নয়নে যতোটুকু দায়িত্ব আছে তাও তারা পালন করে না। বর্তমানে ধানের পরেই সবচেয়ে বেশি জমিতে আলু চাষ হয়। তারপরও আলু নিয়ে সরকারের কোনো পক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রতি বছর শুধু সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রচুর আলু নষ্ট হয়। অথচ কোল্ডস্টোরেজ ছাড়াও কিভাবে আলুকে তিন-চার মাস সংরক্ষণ করে রাখা যায় তার বৈজ্ঞানিক নিয়মকানুন কৃষককে হাতে-কলমে শিক্ষা দিলে অনেক আলুই রক্ষা করা যায় বলে মনে করেন কৃষিবিদরা। তবে কাজটি করার দায়িত্ব যাদের তারা এ ব্যাপারে অনেকটাই নির্বিকার। কৃষকরাও কৃষি অধিদপ্তরের কাছে যান না।

আলুচাষীরা জানান, দেশে আলু সংরক্ষণের জন্য কিছু কোল্ডস্টোরেজ থাকলেও আলুবীজ সংরক্ষণে কোনো হিমাগার নেই। যার জন্য প্রতি বছরই কৃষক আলুবীজের অভাবে ভোগেন এবং খোলাবাজার থেকে আমদানিকৃত প্রতি বাক্স আলুবীজ ৯ থেকে ১০ হাজার টাকায় কিনতে বাধ্য হন। ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ আলু মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়।

এ ব্যাপারে বাকৃবির অধ্যাপক ড. এম এ রহিম বলেন, মালয়েশিয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয় হচ্ছে মিনিস্ট্রি অফ অ্যাগ্রো অ্যান্ড অ্যাগ্রো ইন্ডাস্টিজ। তারা কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট শিল্প সবকিছু তদারক করে। আমাদের দেশে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কৃষিবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে রশি টানাটানি করে। আলু সংরক্ষণে হঠাৎ করে কোল্ডস্টোরেজ বাড়ানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তবে কৃষক খড়ের ঘরে তিন-চার মাস আলু সংরক্ষণ করতে পারে। এ বছর বেশি করে আলু খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
তিনি বলেন, সরকার ধান নিয়ে বেশি সচেতন। সরকারের সচেতনতায় ধান যদি ২০ টাকা কেজি আর ডাল ১৫০ ও রসুন ১০০ টাকা কেজি খেতে হয় তাহলে লাভটা কোথায়। ধান ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। ধানের সঙ্গে আরো অনেক ফসল আছে যার আবাদ করা এবং এ নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সবার টার্গেট শুধুই ধান। সরকার এখন বোরো ধান নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। বোরো ধান ছাড়াও আরো কয়েক প্রজাতির ধান আছে সরকারকে তা জানতে হবে।

ড. রহিম আরো বলেন, কৃষকের হাতে টাকা থাকলে কৃষক কিনতে পারবেন। এবার যারা আলুর আবাদ করেছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। টমেটো চাষ করে কৃষক ক্ষেত থেকে টমেটো তোলার খরচ তুলতে পারছেন না। এ বিষয়ে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগের পরিকল্পনার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা টমেটো দিয়ে সস তৈরি করে দেশে বাজারজাত করা হয়। সরকারের নীতিমালা থাকবে, দেশীয় উৎপাদিত টমেটো দিয়ে সস তৈরি করা।

তিনি বলেন, জেলার ৩৫ থেকে ৩৬টি কমিটির সভাপতি ডিসি। কৃষি অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। ডিসি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। তিনি বলেন, দেশের মন্ত্রী, এমপিরা শিক্ষিত নন, তারা আমলাদ্বারা বেষ্টিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করা না গেলে দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

[ad#co-1]