ভণ্ড পীর গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তারের পর সিরাজদিখান থানায় সহযোগী নুরু মেম্বার, আবুল কালাম, ভণ্ড পীর আমজাদ হোসেন ও ইলিয়াস মাতবর. ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
শতদল সরকার ও তানভীর হাসান, মুন্সিগঞ্জ থেকে
সেই ভণ্ড পীর আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর তিন সহযোগীকেও। গতকাল সোমবার সকাল আটটায় পুলিশ মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসনগর গ্রামের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে আমজাদকে গ্রেপ্তার করে। তারপর গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর তিন সহযোগী নুরু মেম্বার, ইলিয়াস মাতবর ও আবুল কালামকে। তাঁদের সবার বাড়ি একই গ্রামে।

এ ঘটনায় সিরাজদিখান থানায় দুটি মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আরও একটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। জেলা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে চিকিৎসার নামে নির্যাতিত রোগীদের খোঁজখবর নিয়েছেন।

‘ভণ্ড পীর, ভয়ংকর চিকিৎসা’ শিরোনামে গতকাল প্রথম আলোতে খবর প্রকাশের পর সকালেই প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে বহু পাঠক সারা দিন প্রথম আলো কার্যালয়ে ফোন করে পীর আটক হয়েছেন কি না জানতে চান। তাঁরা চিকিৎসার নামে নির্যাতিত আড়াই মাসের যমজ শিশু দীপা ও নীপার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান।
গতকাল সরেজমিনে আমজাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উৎসুক মানুষের ভিড়। এরা আমজাদের গ্রেপ্তারের খবর শুনে তাঁর আস্তানায় আসে। এ সময় কয়েকজন অসুস্থ নারী-পুরুষও সেখানে ছিলেন।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, প্রথম আলোয় খবর ও ভণ্ড পীরের শিশু নির্যাতনের ছবি দেখেই সিরাজদিখান থানার পুলিশ আমজাদের বাড়ির আস্তানায় হানা দেয়। আমজাদ বাড়িতেই ছিলেন। পুলিশ তাঁকে ধরে থানায় নিয়ে আসে। একই সময়ে র‌্যাবের একটি দলও সেখানে হাজির হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইলিয়াস, আবুল ও নুরু মেম্বারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা সবাই গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশের হেফাজতে ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আমজাদ শিশুদের যেভাবে ‘চিকিৎসা’ দিতেন, তাঁকেও গ্রেপ্তারের পর মাটিতে ফেলে সেভাবে কিছু ‘নমুনা চিকিৎসা’ দেওয়া হয়। সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান জানান, শিশুদের যেভাবে মাটিতে ফেলা হয়েছিল, তাঁকেও সেভাবে মাটিতে ফেলে দেখানো হয়েছে মাত্র।

গ্রেপ্তার নুরু মেম্বার প্রথম আলোর কাছে এই কাজে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেন। কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে তো কিছু নাই। একটা কমিটি গঠন করলেই কি কমিটি হইয়া যায়?’

পুলিশের জেরায় স্বীকার: জিজ্ঞাসাবাদে আমজাদ দোষ স্বীকার করে বলেন, ‘আমার ভুল হয়েছে। অভাবের কারণে গ্রামের কিছু লোকের প্ররোচনায় এই পেশায় নেমেছি। আমার এই কর্মের কারণে সাজা হওয়া উচিত, যাতে আর কেউ এই কাজ না করে।’ তিনি পুলিশকে জানান, তাঁর এই ভণ্ডামির পেছনে গ্রামের লোকজন মিলে গঠিত কমিটি জড়িত। তিনি কমিটির সদস্যদের নামও পুলিশকে বলেন।

যেভাবে শুরু: থানায় এ প্রতিবেদককে আমজাদ জানান, দুই মাস আগে তিনি প্রথম নুরু মেম্বারের মা গোলেনুর বেগমের চিকিৎসা করেন। গোলেনুর বেগম প্যারালাইজড। তাঁর রোগ ভালো হয়েছে—এটা গ্রামের মানুষের কাছে প্রচার করা হয়। আমজাদ জানান, নুরু মেম্বারই প্রথম তাঁকে প্ররোচনা দেন এই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে। পরে নুরু মেম্বার ১৪ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। প্রথম দিকে রোগী কম ছিল। প্রচারের পর রোগী বৃদ্ধি পেয়ে প্রতিদিন তিন থেকে চার শ হয়। বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি রোগী হতো।

পরিচালনা কমিটি: পরিচালনা কমিটির কর্মকর্তারা হচ্ছেন—সভাপতি আরব আলী, কোষাধ্যক্ষ মনজিল ও কালাম মাতবর; সদস্য নুরু মেম্বার, আলমাস মাতবর, খালেক মাতবর, ইলিয়াস মাতবর, রেজা মাতবর, সাইদ মাতবর, রুহুল মেম্বার, হোসেন মোল্লা, সুরুজ আলী, আমির আলী, জুলহাস, মো. হান্নান ও পিয়ার আলী।

কমিটির সদস্যরা রোগীদের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। টাকা আমজাদসহ সবাই ভাগাভাগি করে নিতেন। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক-দেড় হাজার টাকা নিতেন তাঁরা। আমজাদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কমিটির লোকজন আমাকে সহায়তা করেছেন বলে আয়ের টাকার বেশির ভাগ তাঁরাই নিয়ে যেতেন। আমাকে স্ত্রী-পরিবার নিয়ে চলতে চাল ও ডাল কিনে দিতেন। চিকিৎসার জন্য তাঁরা টিন দিয়ে একটি ছানি টাঙিয়ে দিয়ে আস্তানা করে দিয়েছেন। থাকার জন্যও একটি টিনের ঘর নির্মাণ কইরা দিতাছে।’

দীপা-নীপা কেমন আছে: আড়াই মাসের শিশু দীপা-নীপার মা পুষ্পরানী মণ্ডলকে পুলিশ গতকাল বিকেল সাড়ে চারটায় লতব্দি ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে আসে। পুষ্পরানী বলেন, ‘লোকমুখে হুনছি ওইহানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। লোকজন নাকি ভালোও হইতাছে। এই কথা হুইনা আমার দুই মাইয়ারে লইয়া যাই। মেয়ে দুইডা খালি কান্দে আর জ্বর আহে। যাওয়ার পরে আমারে অন্য একটি রুমে নিয়ে রাখে। মাইয়াগো কাছে আসতে দেয় নাই।’

পুষ্পরানী বলেন, ‘মাইয়া দুইডার জ্বর ভালো হয় নাই। হেয়ানে গিয়া কোন লাভ হয় নাই।’ পুষ্পরানীর স্বামীর নাম দিলীপ মণ্ডল। তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। বাড়ি কেরানীগঞ্জের পানগাঁও গ্রামে। পুষ্পরানী বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ভণ্ড পীরের কবলে পড়েন।

থানায় মামলা: গতকাল পুষ্পরানী বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আরেকটি মামলা করেছেন জরিনা বেগমের ছেলে এনামুল হক। দুটি মামলায় আমজাদকে প্রধান আসামি কর ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দুটি করা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে একটি প্রতারণার মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ওসি জানান।

তদন্ত কমিটি: ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এর প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাসানুল ইসলাম। সদস্য সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীনগর সার্কেল) সায়েফুজ্জামান ফারুকী ও মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ রুশদুল করিম।

আমজাদের পরিবার:
আমজাদের স্ত্রী ও চার মেয়ে আছে। মেয়েরা হচ্ছে রোকেয়া (১৭), রিয়া মনি (৭), সাদিয়া (৫), ইফা (১১ মাস)। স্ত্রী রাশিদা বেগম জানান, তাঁর সঙ্গে আমজাদের বিয়ে হয়েছে ১৯ বছর। স্বামীর এই চিকিৎসাকে আল্লাহর দান আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি হচ্ছেন একটা অসিলা মাত্র। আর আল্লাহই সবকিছু।’ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন: জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’

পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই ধরনের চিকিৎসা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এরা চিকিৎসার নামে ব্যবসা করে আসছিল। ভণ্ড পীর আমাদের কাছে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ভুল স্বীকার করেছেন।’
আমজাদের আস্তানায় চিকিৎসা নেওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার পর সিভিল সার্জন কে এম মোসলেহ উদ্দিন বলেন, এটা তো চিকিৎসার মধ্যেই পড়ে না। এটা এক ধরনের অপচিকিৎসা। তিনি আমজাদের নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দাউদ উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগে জানতাম না এখানে এই ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার নামে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এখন এই বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

র‌্যাব-১১-এর এএসপি মিলন রহমান জানান, বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

[ad#co-1]