আলো ভুবন ভরা

ইমদাদুল হক মিলন
মেয়েটির নাম সানজিদা আকতার।
ছসাত বছর বয়স। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গেছে। সংসারে সৎমা এসে সানজিদাকে খেতে দেয় না। ওই অতটুকু মেয়েটিকে মারধর করে। মেয়েটির আপন বড়ফুফু এবং বাবার খালাতো বোন আরেক ফুফু দুজন আমাদের বাড়িতে কাজ করে। সৎমায়ের অনাদর-অবহেলার কারণে সানজিদা মাঝেমধ্যে আমার ফ্ল্যাটে এসে তার ফুফুদের কাছে থাকে। আমার দুটো মেয়ে বড় হয়ে গেছে। আমি থাকি চারতলায়, তিনতলায় থাকে আমার ছোটভাই খোকন। ওরও দুটো মেয়ে, নাফিসা ও নূহা। নূহা সানজিদার বয়সী। যখনই সে আমার ফ্ল্যাটে আসে তখনই দেখি সানজিদার সঙ্গে খেলছে। তাদের কচিকণ্ঠের খিলখিল হাসিতে আমার ফ্ল্যাট মুখরিত হয়। লিখতে বসে প্রায়ই দুটি শিশুর হাসি-আনন্দের শব্দে আমি অন্যমনস্ক হই। বাড়িতে ছোট বাচ্চা কে না পছন্দ করে। আমার খারাপ মন অনেক সময়ই নূহা-সানজিদার হাসির শব্দে, ছুটোছুটিতে ভালো হয়ে যায়।
একদিন-দুদিন থেকে সানজিদা চলে যায়।

আমি স্ত্রীর কাছ থেকে মেয়েটির খবরাখবর নিলাম। সব শুনে মন খারাপ হলো। ফুলের মতো এইটুকু একটা শিশুকে কেমন করে না খাইয়ে রাখে সৎমা? কেমন করে মারধর করে? সেও তো মা। নিজের সন্তানের জন্য তার মায়া থাকলে স্বামীর ওইটুকু সন্তানটির জন্য থাকবে না কেন?

স্ত্রীকে বললাম, সানজিদার প্রতিপালনের দায়িত্ব যদি আমরা নিই ওর বাবা কি রাজি হবে? সেই অর্থে দত্তক নেওয়া না, এমনিতেই বাচ্চাটি আমাদের কাছে থাকল। আমাদের বাড়ির বাচ্চাদের মতোই লেখাপড়া শিখে বড় হলো। যেহেতু ওর দুই ফুফু আছে আমাদের বাড়িতে, মেয়েটির বোধ হয় খারাপ লাগবে না এখানে থাকতে।

সানজিদার বাবা চাচা ফুফু এবং দাদি সবাই সানন্দে রাজি। সানজিদা আমাদের ফ্ল্যাটে চলে এল। আমার মেয়েরা তার ডাকনাম রাখল ‘সানজি’। এক-দুমাসের মধ্যে সানজি একদমই আমাদের মেয়ে হয়ে গেল। সুন্দর উচ্চারণে কথা বলে, জলতরঙ্গের মতো মিষ্টি শব্দে খিলখিল করে হাসে। এই এদিকে ছুটছে, এই ওদিকে ছুটছে। আমার স্ত্রীর যত্নে শিশুটির গায়ের রং বদলে গেল, চাপাপড়া সৌন্দর্য যেন ফুটে বেরোলো। কেউ কেউ আমাদের ফ্ল্যাটে এসে হঠাৎ করে সানজিকে দেখে আমাকে কিংবা আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, আরে, আপনাদের আবার এই মেয়েটি কবে হলো? দেখতে তো বড় দুটির মতোই হয়েছে।

আমরা হাসি। আমাদের সঙ্গে সানজিও হাসে। তার পরই নূহার সঙ্গে ছুটে চলে যায় খেলতে।

আমাদের বাড়ির কাছেই একটা স্কুলে সানজিকে ভর্তি করা হলো। নীল-সাদা ড্রেস পরে সে স্কুলে যায়। তার এক ফুফু সকাল ৭টার দিকে গিয়ে স্কুলে দিয়ে আসে, আরেক ফুফু সাড়ে ১০টার দিকে গিয়ে নিয়ে আসে। স্কুলের একজন টিচার বাসায় এসে সানজিকে পড়ায়। তার মুখে খবর পাই, সানজি খুব শার্প। একবারের বেশি কোনো পড়াই তাকে দেখাতে হয় না। ক্লাসের শিশুদের সঙ্গে খুবই ভাব তার। টিচাররা খুবই আদর করেন।

তত দিনে আমাদের বাড়ির দুপাশের ফ্ল্যাট বাড়ির সানজির বয়সী সব শিশুই সানজির বন্ধু। বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সে অন্য বাড়ির শিশুদের সঙ্গে গল্প করে, হাসে। আর নূহার সঙ্গে বন্ধুত্ব তো আছেই। আমি, আমার স্ত্রী আর কন্যাদ্বয় সানজি বলতে পাগল।

সানজি একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল।

স্কুল থেকে ফুফুর সঙ্গে ফিরছে। আমাদের বাড়ির কাছেই স্কুল। চার-পাঁচ মিনিট লাগে হেঁটে ফিরতে। মগবাজারের দিকটায় সব সময়ই এত জ্যাম, গাড়ি নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল। আমার ছোট মেয়েটি ভিকারুননিসায় পড়ে। সে হেঁটে স্কুলে যায়। আমার দুই মেয়েই ভিকারুননিসার ছাত্রী। এক-দুবছরের মধ্যে সানজিকেও আমি ভিকারুননিসায় ভর্তি করব। তাকে নিয়ে নিজের মেয়ে দুটোর মতোই স্বপ্ন দেখি।

সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল এক সকালে।

বাড়ি ফেরার পথে পথপাশের এক বাড়ির বিশাল একটা লোহার গেট খুলে পড়ে গেল সানজির ওপর। ফুফুর সঙ্গেই হাঁটছিল সে, ফুফুর কিছুই হলো না। পড়ল সানজির ওপর। আমাদের বাড়ির গলিতেই আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। গলির মুখে চায়ের দোকানের যুবক কর্মচারীটি অচেতন সানজিকে পাঁজাকোলে নিয়ে দৌড়ে গেল হাসপাতালে। সানজির ফুফু কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে এল আমাদের খবর দিতে।

দিনটি ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯।

আমি আর আমার স্ত্রী দৌড়ে গেলাম হাসপাতালে। গিয়ে দেখি সানজিকে ঘিরে হাসপাতালের সব মহিলা। রোগী নার্স ডাক্তার। সবাই এমন করছে মেয়েটিকে নিয়ে যেন সানজি তাদেরই মেয়ে। সানজি অন্য কারো মেয়ে নয়। কেউ মাথায় পানি দিচ্ছে সানজির, কেউ বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এক বৃদ্ধা দোয়া পড়ে সানজির মাথায় ফুঁ দিচ্ছেন, তাঁর চোখে জল। এদের মাঝখানে চোখ উল্টে পড়ে আছে সানজি। ডাক্তার নার্স ছুটোছুটি করছেন। আমাকে দেখেই ডাক্তার বললেন, দেরি করবেন না। এক্ষুনি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যান। ওর চিকিৎসা এখানে করা যাবে না।

ওরাই অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে দিলেন। সদ্য যুবক হওয়া একটি ছেলে ড্রাইভার। আমি সানজিকে কোলে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসেছি। ছেলেটি হাওয়ার বেগে অ্যাম্বুলেন্স ছুটাল। পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো বিভাগে এলাম। সানজিকে কোলে নিয়েই আমি দৌড়ে গেলাম ডক্টরস রুমে। এখানেও এক ভদ্রমহিলা ডাক্তার। তিনি এত দিশেহারা হলেন সানজিকে দেখে; নিজের সন্তানের মতো করে আমাদের সানজিকে তিনি বাঁচাতে চেষ্টা করলেন। ভদ্রমহিলার তৎপরতা দেখে বুকে ভরসা পেলাম। অ্যাম্বুলেন্স তখনো দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়ে এলাম ভাড়া দিতে।

কত ভাড়া?

১৬০ টাকা।

আমি দুটো এক শ টাকার নোট দিয়ে বললাম, চলি্লশ টাকা তুমি নিও।

ছেলেটি বিনীত গলায় বলল, না স্যার। একজন রোগী নিয়ে এসেছি। ১৬০ টাকা ভাড়া। বেশি নেব কেন?

চলি্লশ টাকা সে আমাকে ফেরত দিল।

সানজি মারা গেল আধা ঘণ্টা পর। সানজির কত টুকটাক স্মৃতি আমার ফ্ল্যাটের এদিক-ওদিক, কত চিহ্ন এখনো ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিন কতবার যে সানজির কথা আমার মনে পড়ে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে সানজির কথা ভেবে এখনো জলে ভরে আসে চোখ। আর সানজির সঙ্গে মনে পড়ে কিছু মানুষের কথা। ওই যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহিলারা সানজিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, এক বৃদ্ধা দোয়া পড়ে সানজির মাথায় ফুঁ দিচ্ছিলেন আর চোখের জলে ভাসছিলেন মেয়েটির জন্য, সেই অচেনা মানুষটির কথা মনে পড়ে। মানুষের জন্য কতটা ভালোবাসা থাকলে অচেনা একটি শিশুর জন্য এভাবে কাঁদে মানুষ! বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ডাক্তার ভদ্রমহিলা যিনি আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, তারপর হতাশ হয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। আর ওই যে অ্যাম্বুলেন্সের যুবক ড্রাইভার। ইচ্ছে করলেই তো সে আমার ওপর বিশাল একটা সুযোগ নিতে পারত। এক হাজার টাকা ভাড়া চাইলে এক হাজার টাকাই তাকে আমি দিয়ে দিতাম। কিন্তু সে নিল মূল ভাড়া ১৬০ টাকা। ৪০ টাকা বেশি দিতে চেয়েছিলাম, নেয়নি।

ওই একটি সকালের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছি, আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই খুব ভালো, খুব হৃদয়বান। মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি আমরা, অচেনা মানুষের কষ্টে চোখের জল ফেলতে পারি। মানুষের কল্যাণে হাতে হাত ধরে দাঁড়াতে পারি। এত দুঃখ বেদনা হতাশা চারদিকে তার পরও এসব ভালো মানুষ আছে বলেই, ভালো মানুষদের মুখের পবিত্র আলোয় এখনো আলোকিত হয়ে আছে বাংলাদেশ।

ih-milan@hotmail.com

[ad#co-1]

Comments are closed.