ভাড়া দ্বিগুণ, মধ্যস্বত্বভোগীর দখলে হিমাগার

সোনিয়া হাবিব লাবনী, মুন্সীগঞ্জ থেকে
আলু রাখমু! উপায় নাই, গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া। যারা অল্প দামে হিমাগারের কোঠা কিনে রাখছে, তারাই লাভের মুখ দেখব। আমাগো মতন ছোট চাষিদের লোকসান গুনতে হইব।’ বলছিলেন মুন্সীগঞ্জের এক আলুচাষি।

দেশের মোট উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ গোল আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জ। প্রতিবছরই আলুর বাম্পার ফলন হয় এ জেলায়। অন্যান্যবারের তুলনায় এবারও আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক মহাব্যস্ত আলু তোলার কাজে। জেলার সর্বত্র জমির পর জমিতে আলুর স্তূপ। মুন্সীগঞ্জের আলুচাষিদের চিন্তা এখন শুধুই আলু সংরক্ষণ নিয়ে। আলু উত্তোলন মৌসুমের শুরুতেই হিমাগারে আলু সংরক্ষণ নিয়ে কৃষককে পড়তে হয় মহা বিপাকে। তার সঙ্গে যোগ হয় পাইকারের অভাব, কম দাম, হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি আর দালালদের দৌরাত্দ্য। এসব সমস্যা ভাবনায় ফেলে দিয়েছে আলুচাষিদের। উৎপাদন খরচের তুলনায় আলুর দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদিত আলু নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের। বাম্পার ফলনের পরও হিমাগারে আলু সংরক্ষণের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে হাজার হাজার বস্তা আলু। শিলমণ্ডি এলাকার আলুচাষি মো. আমির হামজা জানান, গতবারের চেয়ে সারের দাম কম এবং ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও ভারত থেকে আলু আমদানি করায় আমরা এবার লাভ পাব না। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীরা হিমাগারে আলুর অগ্রিম কোঠা ক্রয় করে আলুর দাম কমানোর জন্য জমিতে গিয়ে সরাসরি আলু কিনছে না। ফলে কৃষকরা আলু নিয়ে পড়েছেন মহাবিপাকে। দেওভোগের কৃষক মনির হোসেন প্রতিবারের মতো এবারও এক কানি জমিতে আলু চাষ করেছেন। বারবার তাঁকে লাভ হাতছানি দিলেও এবার লাভের দেখা পাবেন না বলে জানান। মনির আরো জানান, এবার প্রতিমণ আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, আর বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। হিমাগারে আলু রাখব তার উপায় নেই, ভাড়া গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ। যারা অল্প দামে হিমাগারের কোঠা কিনে রেখেছে, তারা লাভের মুখ দেখতে পাবে আর প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার মান্দ্রা গ্রামের আলুচাষি রমিজ মিয়া জানান, জমিতে আলু উত্তোলন শুরু হওয়ামাত্রই পাইকারদের ঢল নামে জমিতে। তাঁরা আলু কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অথচ এবার মাঠে পাইকারদের দেখা মিলছে না বললেই চলে। উপরন্তু কৃষকরা আলু বিক্রি করতে পাইকারদের হন্যে হয়ে খুঁজছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় ৩৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে এক হাজার ৮২ হেক্টর বেশি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৩০ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে জেলায় ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। এবার তার চেয়ে এক হাজার মেট্রিক টন আলু বেশি উৎপাদন হবে বলে কৃষি কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জেলায় সাড়ে চার লাখ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ৭১টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টিতে চালু রয়েছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আলু হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করা যায়, বাকিগুলো কৃষকরা তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে থাকেন। এর ফলে অনেক আলু কৃষকদের ঘরেই নষ্ট হয়ে যায়। চাহিদার শতকরা ৬৫ ভাগ আলুবীজ কৃষকরা হিমাগারে সংরক্ষণ করে থাকেন। এ ছাড়া খাওয়ার আলুও সংরক্ষণ করা হয় হিমাগারগুলোতে, যা বর্ষা মৌসুমে বের করে নিয়ে আসা হয় বাজারে বিক্রির জন্য। এবার কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ৮০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা আলুর হিমাগার ভাড়া ২৬০ টাকা হারে নির্ধারণ করেছে। অথচ গত বছর তা ছিল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নির্ধারিত উচ্চহারের ভাড়ার লাগাম টেনে ধরতে হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণ বিষয়ে কয়েক দফা সভা আহ্বান করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) মো. জসিমউদ্দিন মুন্সীগঞ্জ প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। সারা দেশের ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আর চক্রান্তের অভিযোগ ভিত্তিহীন। বস্তাপ্রতি ২৬০ টাকা ভাড়া নির্ধারণের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধিসহ একাধিক বিষয় পর্যালোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, সারা দেশের হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি অ্যাসোসিয়েশনের। তাই মুন্সীগঞ্জ প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। সুবিধাভোগী, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদরা অভিযোগ তুলবেন_এটাই স্বাভাবিক।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো.মোশারফ হোসেন বলেন, প্রশাসন থেকে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যারা নির্ধারিত ভাড়া মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হিমাগারে আলু সংরক্ষণের জন্য ভাড়া বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা এখন চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। একে তো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, তার ওপর হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়া কৃষকদের বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিগন্তজুড়ে আলু উত্তোলনের উৎসব, তবু কৃষকের মুখে হাসি নেই। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা একদিন আলু চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।