মাওয়া ফেরিঘাটে চাঁদাবাজির মহোত্সব

কাজী জেবেল, মাওয়া থেকে ফিরে
রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার মাওয়া নৌবন্দরে চলছে চাঁদাবাজির মহোত্সব। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্সসহ সব ধরনের যানবাহনকে ওই বন্দর দিয়ে ফেরি পার হতে ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। স্পিডবোট, লঞ্চ মালিক এবং সরকারি খাস জমির ওপর গড়ে ওঠা দোকান থেকেও আদায় করা হয় বিভিন্ন অংকের চাঁদা। সবমিলিয়ে প্রতিদিন এ ঘাটে কয়েক লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসি’র বন্দর কর্মকর্তারা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ শ্রমিক লীগের কর্মীরা প্রকাশ্যেই এ চাঁদাবাজি করছে।

তারা কখনও স্লিপ দিয়ে আবার কখনও স্লিপ ছাড়াই চাঁদার টাকা তুলছে। চাঁদা না দিয়ে ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তির গাড়ি ফেরিতে উঠে পড়লেও ওই গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোরপূর্বক খুলে রেখে চালককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে শ্রমিক লীগের ক্যাডাররা। চাঁদাবাজির সুবিধার্থে সেখানে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ সাড়ে চারশ’ স্পিডবোট এবং অর্ধশত লঞ্চ। আর চাঁদাবাজির টাকার ভাগ ‘উপর মহল’ পর্যন্ত দিতে হয় বলে জানিয়েছে আদায়কারীরা।

এ কারণে মাওয়া ঘাট দিয়ে যাতায়াতকারী নৌমন্ত্রী শাজাহান খানসহ অন্যান্য মন্ত্রী এবং স্থানীয় প্রশাসন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না বলেও দাবি তাদের। আর এ কথার আংশিক প্রমাণ মেলে মুন্সীগঞ্জ জেলা ও লৌহজং উপজেলার একাধিক কর্মকর্তা, বন্দর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে আলাপ করে। বন্দরে চাঁদাবাজি হচ্ছে এমন কোনআে খবরই তাদের জানা নেই। চাঁদাবাজির স্লিপ দেখানো হলে তারা নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়েরের পরামর্শ দেন। বুধবার সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব চিত্র পাওয়া যায়।

বুধবার বিকাল সাড়ে তিনটা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) মাওয়া বন্দরের টোল আদায়কারী সেন্টারের সামনে থামলো মাল বোঝাই একটি ট্রাক (যশোর ট-১১-০৬০৭)। সরকারি বিধি অনুসারে প্রতি ট্রাকের টোল এক হাজার ২৬০ টাকা। টোল আদায়কারী বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তা এক হাজার ২৬০ টাকার স্লিপ ধরিয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা দাবি করলেন। স্লিপ নম্বর ২৮, বই নং ৯৬৯৭। কারণ হিসেবে বলা হলো, ট্রাকে ওভারলোড করা হয়েছে। এ নিয়ে কিছুটা বাকবিতণ্ডার পর ট্রাক চালক মোঃ নুরুল আমিন টোল আদায়কারীকে এক হাজার ৪০০ টাকা দিতে বাধ্য হন।

এরপর বাংলাদেশ অভ্যন্ত্যরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত পার্কিং ইয়ার্ডের ভাড়া ১৫ টাকা এবং মালের ভাড়া আরও ৪০ টাকা দিয়ে গাড়ি সিরিয়ালে দাঁড় করান চালক। এরপরই ২৮ বছরের এক যুবক উচ্চস্বরে ট্রাক ড্রাইভারের উদ্দেশে বলে, ‘ট্রাকে কি মাল আছে। ট্যাহাডা দিয়া দাও’। এ কথা বলে সে ‘বাংলাদেশ ট্রাক/কভারভ্যান মালিক সমিতি’র একটি স্লিপ ধড়িয়ে দেয়। দাবি করে ৫০০ টাকা। চালক একটু কম নেয়ার অনুরোধ জানালে যুবক ধমক দিয়ে সিরিয়াল থেকে ট্রাক সরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। বাধ্য হয়ে চালক ওই টাকা পরিশোধ করেন। পরে ওই যুবকই নিজ দায়িত্বে ট্র্রাকটি ফেরিতে তুলে দেয়। সেখানেও রেহাই পাননি ট্রাক চালক। চরজানাজাত ঘাটে পৌঁছলে ফেরির কর্মচারীরা তার কাছ থেকে বকশিশের নামে ৫০ টাকা দাবি করেন। অবশেষে ২০ টাকা দিয়ে পার পায় ট্রাক চালক।

চালক নুরুল আমিন জানায়, প্রতি সপ্তাহে সে এ রুটে মোট চারবার আসা-যাওয়া করে। প্রত্যেকবারই তাকে এ পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। ঝিনাইদহগামী ট্রাক (ট ১১-০০৮৫) চালক আক্তার হোসেন বিআইডব্লিউটিসি টোল আদায়কারীকে এক হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে সিরিয়ালে থাকার পরেও ফেরিতে উঠতে পারেননি। তার অভিযোগ, ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের দাবিকৃত ৩০০ টাকা না দেয়ায় তাকে নির্ধারিত ফেরিতে উঠতে দেয়া হয়নি। এক ঘণ্টা বন্দরে অবস্থান করে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে সেখানে যাওয়া প্রায় অর্ধশত ট্রাক থেকে একইভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে রেহাই নেই অ্যাম্বুলেন্সেরও। রোগী বহনকারী আদ-দ্বীন হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্স (ঢাকা মেট্রো-চ ৭১-০৮৩৪) বিকাল ৫টার দিকে জরুরি হর্ন বাজাতে বাজাতে বন্দরের পন্টুনের কাছাকাছি গাড়ি দাঁড় করাতে গেলে বাধা দেয় এক যুবক। সে নিজেকে লাইনম্যান পরিচয় দিয়ে ৫০ টাকা দাবি করে। পরে চালক অ্যাম্বুলেন্সের কোনো চাঁদা নেই বললে গাড়িটি সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ির পেছনে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। আর এ ঘটনাটি যখন ঘটে তখন মাত্র একশ’ গজ দূরে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে শুভেচ্ছা জানাতে অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে ছিলেন নৌপবিরহন সচিব মোঃ আবদুল মান্নান হাওলাদার, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মালেক মিয়াসহ নৌমন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আব্দুর রাজ্জাক ও স্থানীয় প্রশাসনের বেশ ক’জন কর্মকর্তা।

বেশ ক’জন ট্রাক চালক অভিযোগ করেছে, প্রতি ট্রাক থেকেই একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তারা নির্ধারিত টোলের অতিরিক্ত ৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা, পুলিশ ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নামধারী ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা ২০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র টোল আদায়কারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কোনো কথা বলতে এমনকি নিজের পরিচয় দিতে রাজি হননি। তারা এ প্রতিবেদকের সঙ্গে রুক্ষ আচরণ করেন। পরে চাঁদা আদায়কারীদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের লাইনম্যান পরিচয় দেয় এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। এরই মধ্যে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের গাড়ি সেখানে পৌঁছলে কথিত লাইনম্যানরা কোথায় যে হারিয়ে যান তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিসি’র মাওয়া বন্দরের সহকারী ম্যানেজার চন্দ্র শেখর রায় জানান, বন্দর এলাকায় সরকার নিয়োগকৃত কোনো লাইনম্যান নেই। তবে তারা কারা?

এমন প্রশ্নেরও কোনো জবাব দেননি তিনি। জানা গেছে, সেখানে ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের ৩৫ সদস্য এবং আন্তঃজেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত সদস্য পালাক্রমে পৃথকভাবে চাঁদা আদায় করে। ওই টাকা পরে সবার মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। আর তাদের নেতৃত্ব দেয় ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ আবুল ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক হামিদুল ইসলাম। মোঃ আবুল ফারুক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে স্থানীয়রা চেনে। আর হামিদুল ইসলাম মেদিনিমণ্ডল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তাদের ভয়ে কোনো বাস বা ট্রাক মালিক ও চালক বন্দরে কোনো কথা বলতে সাহস পায় না। এ বিষয়ে ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সেক্রেটারি হামিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, চালকদের টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান সম্পদ চুরি বা ছিনতাই হলে তা উদ্ধারে ইউনিয়নের সদস্যরা সহযোগিতা করে। এছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তারা এগিয়ে যায়। চাঁদা আদায়কারী কথিত লাইনম্যানদের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, দুই শিফটে ৫ জন করে লাইনম্যান বাস, ট্রাক ও ছোট গাড়িগুলোকে ম্যানেজ করে সিস্টেম মোতাবেক ফেরিতে তুলে দেয়।

চাঁদা আদায় সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত হলে তাদেরকে ২০ হাজার টাকা সংগঠনের পক্ষ থেকে দেয়া হয়। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, বিএনপি সমর্থিত আন্তঃজেলা ট্রাক শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা চাঁদাবাজি করে। আমরা যে চাঁদা আদায় করি তার শতকরা ৬০ ভাগ টাকা তারা নিয়ে যায়। বাকি ৪০ ভাগ টাকা আমরা খরচ করি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মাওয়া-চরজানাজাত/মঙ্গলমাঝি, কাঠালবাড়ি রুটে প্রায় সাড়ে চারশ’ স্পিডবোট এবং ৮০টি লঞ্চ যাত্রী পারাপার করে। এসব স্পিডবোটের ৭০টির রেজিস্ট্রেশন রয়েছে। তবে ওই রুটে চলাচলের জন্য কোনোটিরই রুট পারমিশন নেই। বেশিরভাগ লঞ্চের নেই আপডেট সার্ভে রেজিস্ট্রেশন। মেদিনিমণ্ডল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্পিডবোট ঘাট ইজারাদার রাশেদুল হক মুন্না নিয়ন্ত্রিত ঘাট দিয়ে এসব নৌযান চলাচল করে। তার নির্দেশনা অনুসারে স্পিডবোটগুলো সিরিয়াল পায়। এমনকি দুর্ঘটনারোধে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সন্ধ্যা ৬টার পরেও সে স্পিডবোট চালায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার বেশ কয়েকটি স্পিডবোট রয়েছে বলেও জানা গেছে। সে যাত্রীপ্রতি ২০ টাকা চাঁদা বোট মালিকদের কাছ থেকে আদায় করে। এছাড়া ওই রুটে চোরাচালানও তার নেতৃত্বে হয় বলে একাধিক স্পিডবোট মালিক অভিযোগ করেছেন। মাওয়া বন্দরে চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অনিয়মের জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর কর্মকর্তা বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ম্যানেজার স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে দায়ী করেছে স্থানীয়রা। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কয়েকবার নৌসচিবের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায়নি।

এসব বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট হাসানুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজিসহ অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আমি কিছু বলতেও পারব না। কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। সরকারের খাস জমিতে গড়ে ওঠা দোকান সম্পর্কে তিনি বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করার অনুরোধ জানান। লৌহজং উপজেলার নির্বাহী অফিসার আশরাফুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন আগে বদলি হয়ে আমি এ উপজেলার দায়িত্বে এসেছি। এগুলো খোঁজ-খবর নিচ্ছি। যদি চাঁদাবাজিসহ অন্য কোনো অনিয়ম থাকে তাহলে অবশ্যই তা বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেব।

[ad#co-1]