‘নিভে যায় বারে বারে’

ড. মীজানূর রহমান শেলী
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন ছুঁয়ে যাওয়া আক্ষেপ আজ বুঝি বাংলাদেশের নগরে, বন্দরে, জনপদে, পল্লীতে নিশিদিন প্রতিধ্বনিত :
‘যতবার আলো জ্বালাতে চাই
নিভে যায় বারে বারে’

‘লোডশেডিং’ নামের ভীতিকর প্রক্রিয়াটির সঙ্গে কবিগুরুর পরিচয় ছিল, এমন কথা ইতিহাসে নেই। তার আমলে ঝড়-তুফানে আলো নিভে যাওয়ার পর তাকে দুর্বিপাকের ফল বলেই মেনে নেয়া হতো, মানুষের দ্বারা পরিকল্পিত ও রূপায়িত অভাবক্লিষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাপনা হিসেবে নয়। তাই কবি যখন লেখেন,
‘নগরীর দীপ নিভেছে পবনে
দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে’ঃ

তখন ঝড়-ঝঞ্ঝাকেই এর কারণ হিসেবে ধরা হয়, ‘লোডশেডিং’কে নয়। আসলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সংকট এ ভূখণ্ডে আগেও ছিল। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজ্যের ‘লোডশেডিং’য়ের কথা পড়লেও এই এলাকার মানুষ এর সঙ্গে তেমন পরিচিত ছিল না। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংকট এতই তীব্র ও প্রকট যে, দীর্ঘ প্রহরব্যাপী ‘লোডশেডিং’ অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের অভিজ্ঞতা এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
সংকটের মুখের রেখা স্পষ্টÑ চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহে রয়েছে বিপুল ঘাটতি, প্রায় অর্ধেক। সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি আর সে তুলনায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এ তো গেল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকার কথা। পল্লী বিদ্যুতের আওতায় গ্রাহকদের চাহিদা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে তার অর্ধেক। মহানগরী ঢাকায় চাহিদা যেখানে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, সেখানে প্রতিদিন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ মেগাওয়াট। সন্দেহের অবকাশ নেই, এই পরিস্থিতি এ বছরের গ্রীষ্মকালকে করে তুলেছে ভয়াবহ সঙ্কটের কাল। আগের যে কোন সময়ের তুলনায় এ অবস্থা জনজীবনে এনেছে বিপুল দুর্ভোগ। বিদ্যুতের অভাব শুধু মানুষকে অসহনীয় দাবদাহের অসহায় শিকারে পরিণত করে না, তাদের জীবনের নিত্যদিনের কাজকর্মেও সৃষ্টি করে মারাÍক বাধাবিঘœ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, শিল্প উৎপাদন হয় ব্যাহত। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে শিল্পজাত পণ্য সরবরাহ যেমন অপ্রতুল হয়ে পড়ে, তেমনি তৈরি পোশাক শিল্পসহ রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলো দারুণ বিপাকে পড়ে। রফতানি হয়ে ওঠে অনিশ্চিত এবং বিদেশী বাজার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন হয় দারুণভাবে বিঘিœত। বিদ্যুতের অভাবে ‘লোডশেডিং’য়ের ফলে যেমন বাসা-বাড়িতে তেমনি বিদ্যাপীঠেও ঘটে আলো-বাতাসের অভাব। শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে সবাই ভোগান্তির শিকার হন, পাঠদান ও অধ্যয়নের তপস্যা হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য, দুষ্কর।

ঘর-গেরস্থালির কাজ হয় কষ্টকর। ঘরণী-গৃহিণীরা রান্নার কাজ, ঘর পরিচ্ছন্ন রাখা ও গোছানোর কাজÑ সবকিছুতেই হয়রান, পেরেশান হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে গ্যাসের সঙ্কট যুক্ত হয়ে সৃষ্টি করে আরও ভয়াবহ পরিবেশ। গ্যাসের ঘাটতিতে সহজে চুলা জ্বলে না, যদিওবা জ্বলে তাতে থাকে না প্রয়োজনীয় উত্তাপ। রান্না হয়ে ওঠে এক বিলম্বিত কষ্টকর প্রক্রিয়া।

সবচেয়ে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হয় পানির অভাবে। শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহ প্রায় পুরোপুরিভাবেই অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্যাহত হলে পানির সরবরাহে বিঘœ ঘটে। পিপাসা মেটানোর দাবি, রান্নার প্রয়োজন এও পয়ঃনিষ্কাশনের চাহিদা প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানির অভাবে পূরণ করা যায় না। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হয় নয়া কারবালা। পল্লী অঞ্চলেও বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহ চাষের মৌসুমে সেচের কাজে দারুণ ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। নগরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে সেচের জন্য পানি সরবরাহের সীমিত ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত পরিমাণ খাদ্যশস্য ও অন্যান্য ফসল ফলানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সন্দেহ নেই, এই করুণ রেখাচিত্র বহুদিনের অবহেলা, উদাসীনতা ও অক্ষমতার পুঞ্জীভূত ফল। বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা এখানে অনস্বীকার্য। কিন্তু অতীতের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে বসে থাকা যুক্তিযুক্ত বা বাস্তবসম্মত কাজ নয়। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যথার্থই লিখেছেন :

‘অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে
আমাদের ’পরে দেনা শোধবার ভার।’

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ষোল মাস ধরে ক্ষমতাসীন। অতীতের পুঞ্জীভূত দেনা, বিশেষত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দেনা শোধ করার দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ এ সরকারকে বিপুল বিজয় দিয়েছে এবং তা তারা করেছেন বিশাল আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। এ আস্থার পরিপূর্ণ মর্যাদা আন্তরিকভাবেই সরকার দেবে, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী যুক্তিযুক্তভাবেই বলেছেন, সংকট মোচন রাতারাতি সম্ভব নয়। তিনি যথার্থই গ্যাস তথা জ্বালানি সংকটকে বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ বলে অভিহিত করেছেন এবং এই বহুবিধ সংকট মোকাবেলা ও নিরসনের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সে কথাও বলেছেন। তিনি আরও আশ্বাস দিয়েছেন, লোডশেডিংয়ের প্রাবল্য অচিরেই কমানো যাবে এবং আগামী তিন বছরে জাতীয় গ্রিডে আরও ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজিত হবে।

কারিগরি দিক থেকে যে সময় প্রয়োজন, তা তো দিতেই হবে। ইচ্ছা করলেই গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় কয়লা বা তেলসহ অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো। কিন্তু সমস্যা মোকাবেলা ও সমাধানের পথে এগিয়ে তো যেতেই হবে। এক্ষেত্রে পদক্ষেপগুলো হতে হবে দৃঢ় সংকল্প ও দ্রুত সিদ্ধান্তে বলীয়ান।

বিদ্যমান বিদ্যুৎ সংকটের মূলে রয়েছে প্রাথমিক জ্বালানির অপ্রতুলতা। এমনি একটি অপেক্ষাকৃত সুলভ প্রাথমিক জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস। যার মজুদ এদেশে সন্তোষজনক পরিমাণে আছে। এর উত্তোলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের অতীত অক্ষমতা ও ব্যর্থতা সৃষ্টি করেছে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির। সাবেক জ্বালানি সচিব ও ২০০২ সালের ‘গ্যাস ব্যবহার সম্পর্কিত কমিটি’র প্রধান আজিমউদ্দীন আহমদ যথার্থই বলেন, ‘প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান অপ্রতুল উৎপাদন ও সরবরাহের কোন কারণই ছিল না।’ঃ তিনি বলেন, ‘প্রচুর গ্যাসসমৃদ্ধ পাঁচটি ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো হলে এই সংকট সৃষ্টি হতো না। এই গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে অন্ততপক্ষ ১০ টিসিএফ গ্যাস মজুদ আছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে তুলনামূলকভাবে তিনগুণ বেশি গ্যাসের মজুদ থাকা সত্ত্বেও তারা বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোর চেয়ে কম গ্যাস উত্তোলন করছে।’ আজিমউদ্দীন আহমদ আরও বলেন, ‘২০০২ সালের গ্যাস ব্যবহার সম্পর্কিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পেট্রোবাংলার আওতাধীন তিতাস ও হবিগঞ্জ ইত্যাদি গ্যাসক্ষেত্র থেকে অধিক পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করলে দেশে গ্যাসের অভাব নয়, প্রাচুর্যই দেখা যাবে। এই সহজ, সরল ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অধিকতর ব্যয়বহুল ডিজেল বা ফারনেস তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করার প্রয়োজন হবে না।’

গত ২ ও ৩ এপ্রিল বিভিন্ন আলোচনা সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম. তামিম আজিমউদ্দীন আহমদের এই বক্তব্যের অনুরূপ বক্তব্য পেশ করে বলেন, স্বল্পমেয়াদে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদে কয়লাসহ অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিদ্যুৎ খাতকে গ্যাসের ওপর একমুখী নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশীয় সংস্থার আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্র থেকে অধিক পরিমাণে গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হলে যে অর্থায়ন প্রয়োজন তা কোথা থেকে আসবে? আজিমউদ্দীন আহমদ মনে করেন, বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ দিয়েই এ প্রয়োজন মেটানো যায়। এক্ষেত্রে যা দরকার তা হচ্ছে, বর্ধিষ্ণু ও উদ্যোগী বেসরকারি খাতকে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত করা।

বিদ্যুৎ সংকট মূলত প্রাথমিক জ্বালানি যুক্তিযুক্ত খরচে সরবরাহ করার অক্ষমতার সংকট। সংকটের মূলকে নির্মূল করতে হলে যা দরকার, তা হচ্ছে সাহসী সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং শ্লথ ও অসমন্বিত আমলাতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া প্রায়ই পর্বতপ্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাধা দূর করার দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রধানত রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই। বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এক অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন না করতে পারলে দেশ আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকারে ডুবে যাবে। আর সে পরিস্থিতিতে যে করুণ সুর দিক-দিগন্তে অনুরণিত হবে, তা গীতিকাব্যের ছন্দময় সুর নয় বরং বাস্তবতার নির্মম প্রহারে জর্জরিত হতাশার বিষণœ গান : ‘ও আমার আঁধার ভালো’।

ড. মীজানূর রহমান শেলী : সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক


Leave a Reply