সালমান রুশদির কথাশিল্প তিনটি উপন্যাস

সরকার মাসুদ
ইন্দো-ইংরেজি উপন্যাসের আলোচনায় সালমান রুশদি (১৯৪৭) আজ একটি অপরিহার্য নাম। ফ্যান্টাসি তার কথাশিল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান। কিন্তু আজগুবি ও স্বপ্নকল্পনার ভিতের ওপর তার উপন্যাসের প্লট নির্মিত হলেও তার অন্তর্বাস্তবতাকে বুঝে নিতে আমাদের অসুবিধা হয় না। রুশদির সাফল্যের প্রধান কারণও ঐ অন্তর্গত বাস্তবতা। ফ্যান্টাসির ভেতর দিয়েই সালমান রুশদি জীবনের বহু বিচিত্র সত্যের উদঘাটন করেছেন করতে পেরেছেন সার্থকভাবে। সেজন্য কেবল এই উপমহাদেশেই নয়, বহির্বিশ্বের আন্তর্জাতিক সাহিত্য আসরেও উঁচু একটি পিঁড়ি পেয়েছেন তিনি।

উপন্যাসে সরলরৈখিক কাহিনী বয়ানের দিন ফুরিয়েছে চল্লিশের দশকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই কাহিনীর চারিত্র পাল্টে গেছে রীতিমতো। কাহিনী বলতে আমরা কোন ধারাবাহিক ঘটনা বুঝে থাকি। কিন্তু আধুনিক উপন্যাস বিশেষত ১৯৫০ পরবর্তী উপন্যাস, কাহিনীর ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিয়েছে। কারো কারো হাতে তা একেবারে দুমড়ে মুচড়ে গেছে। উপন্যাস সর্বগ্রাসী শিল্পমাধ্যম। সেজন্য তাতে কী কী যাবে আর কীকী থাকবে না তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তবে একটি জিনিস সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, উপন্যাসে থাকতে হবে গল্প। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঘটেছে গল্প বলার রীতি পরিবর্তনের ঘটনা এবং গল্পের এই ঢঙ পরিবর্তমান। সালমান রুশদির কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে কোনও সন্দেহ নেই, এই উপস্থাপন রীতির পরিবর্তমানতা ও অভিনবত্বের বিষয়টি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। রুশদির তিনটি উপন্যাসের আলোকে আমরা এসব জিনিস তুলে ধরতে সচেষ্ট হবো। সালমান রুশদির প্রথম দিককার উপন্যাসসমূহ, বিশেষ করে গরফহরমযঃ’ং ঈযরষফৎবহ (১৯৮১) এবং ঝযধসব (১৯৮৪) তাকে সাহিত্যিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। আর তাকে দুনিয়াজোড়া পরিচিতি এনে দিয়েছে ঝধঃধহরপ াবৎংবং সেই সূত্রে ভীষণ বিতর্কিতও হয়ে উঠেছেন।

কিন্তু রুশদির খ্যাতির চৌদ্দআনাই দাঁড়িয়ে আছে, আমার মতে, ঐ স্বোপার্জিত Midnight’s Childrenএবং Shame -এর ওপর। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে প্রথমেই মনে আসে Fury (২০০১), The Satanic verses এবং The Moor’s Last sigh নিয়ে আমরা এখানে কথা বলবো না। এখানে আলোচিত হবে উপরে উল্লিখিত অপর তিনটি উপন্যাসের বিষয় ভাবনা ও সাহিত্যকৃতি।

গত তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের ভেতর যাদের উত্থান ঘটেছিল এরকম বিশ্বমানের আধুনিক কথা সাহিত্যিকদের প্রত্যেকেই গল্প বলার সনাতন ধারা এড়িয়ে গেছেন। প্রসঙ্গত পাঠকের মনে পড়তে পারে, মার্কেজ, মিলান, কুন্ডেরা, গ্যুান্টার গ্রাস, মারিয়ের ভার্গাস, রোসা, কেনজাবুরোউইয়ে, ঝাও শিনঝিয়াঙ প্রমুখের কথা।

মাহাত্ম্য দিয়ে পাঠককে আকর্ষণ করেছিলেন তাদের ভেতর থেকে দৃষ্টান্তস্বরূপ নিতে পারি লরেন্স ও হেমিংওয়েকে। আর যারা আঙ্গিক ও ভাষাশিল্পের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে আমরা চোখ বন্ধ করে বাছাই করতে পারি জেমস জয়েস, আলব্যেয়র কামু, কুন্ডেরা প্রমুখকে। যাই হোক, আঙ্গিক এবং গল্প বলার স্টাইল-এর যে কোনো একটির দিকে পাল্লা ভারি হলেই গল্প/উপন্যাস ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। সে কারণে এই দুয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারেন যারা তারাই শ্রেষ্ঠ কথা সাহিত্যিক। উৎকৃষ্ট উদাহরণ মার্কেজ, কেনজাবুরো উইয়ে হেনরি মিলার, মার্গারেট, এ্যাটউড, কুররাতুল আইন হায়দার, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (ছোটগল্পের ক্ষেত্রে), সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ। ফ্যান্টাসি ও ফ্যাক্ট উভয় দিকের বিবেচনায় সালমান রুশদি অসামান্য সাহিত্যিক। দুটো বিষয়ই চমৎকারভাবে প্রযুক্ত হয়েছে তার উপন্যাসে।

Midnight’s Children দিয়ে তার উপন্যাস সাহিত্যের আলোচনায় প্রবেশ করা যাক। স্বপ্নকল্পনা এই উপন্যাসের একটি বড় উপাদান। দীর্ঘ আত্মকথন (Monologue)-এর মাধ্যমে সেলিম সিনাই নামের এক ব্যক্তি বইয়ের ঘটনাবহুল কাহিনী বর্ণনা করেছেন। বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, সেলিমের দাদা আদম আজিজ সপরিবারে কাশ্মীর থেকে আগ্রায় যান। নাদির খান নামে এক ব্যক্তি আদম আজিজের শ্যামলা মেয়ে মমতাজকে বিয়ে করতে চায়। নাদির খান পলাতক এবং আজিজ পরিবারে আশ্রিত। সুতরাং নিজের সুবিধার জন্যই সে মমতাজকে বিয়ে করে। একটা পর্যায়ে সে আবার আত্মগোপন করে। মমতাজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে কৌশলে আবার বিয়ে দেয়া হয় আহমেদ সিনাইয়ের সঙ্গে। মমতাজ তখন আমিনা নামধারণ করে। দেশভাগের বিশৃঙ্খলাহেতু আহমেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়লে সে বম্বেতে পাড়ি জমায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে সেলিমের জন্ম হয়। যেহেতু স্বাধীনতার উন্মেষলগ্নে তার জন্ম, সেজন্য স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তাকে দেয়া হয় Times of India পুরস্কার। কিন্তু সেলিম প্রকৃতপক্ষে এক এ্যাংলো ইন্ডিয়ান দম্পতির ঘরে জন্ম নেয়া শিশু। আহমেদ আমিনার অগোচরে তাদের আয়া ঐ ছেলে শিশুটিকে (সেলিম) একটি নার্সিংহোম থেকে নিয়ে আসে শিশু বিনিময় প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। সেলিম তার মিথ্যা বাবা-মার আশ্রয়ে বম্বে শহরে বড় হতে থাকে। পরে অবশ্য সে জানতে পারে যে, সে আহমেদ-আমিনা দম্পতির আসল সন্তান নয়। তখন তার সৎ বোনকে সে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। এটা সে করে নিজের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল এবং আহমেদ ও আমিনা স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার আগে তাদের ঐ আয়া দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিল। এভাবে সেলিম সংক্রান্ত রুঢ় সত্যটি তাদের কাছে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধে পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যায়। ধসে পড়া ছাদের নিচে চাপা পড়ায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও কিশোর সেলিম স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে সেলিম পদ্মায় মানসিক আশ্রয় পায়। তার অকুণ্ঠ ভালোবাসা সেলিমকে মনের শক্তি বাড়াতে প্রভূত সাহায্য করে। সেলিমের হারানো স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও সে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়, অবশেষে ব্যর্থ হয়।

সেলিম সিনাই লেখাবাহুল্য, Midnight’s Children-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। উপন্যাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে পদ্মা। উপন্যাসটি তিনটি BOOK (অংশ) এ বিভক্ত। এর প্রথম অংশ গড়ে উঠেছে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ (সেলিমের জন্ম সাল) এই সময়ের মধ্যে। দ্বিতীয় অংশটি বিস্তৃত ১৯৬৩-র সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং তৃতীয় অংশের বিস্তার ঘটেছে ১৯৭৭-এর মার্চে ঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় পর্যন্ত। এই পর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথাও উঠে এসেছে।

Shame (লজ্জা) উপন্যাসের পটভূমি পাকিস্তান। আধুনিক উপন্যাস সাহিত্যে রূপক প্রয়োগের অনন্য দৃষ্টান্ত এই বই। অপরাজনীতি ইতিহাস আর ব্যঙ্গবিদ্রƒপের দক্ষ মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। পাকিস্তানের জন্ম এবং তৎসংশ্লিষ্ট ইতিহাসকে কটাক্ষ করেছেন রুশদি। ঘোলাটে রাজনীতি ও অস্পষ্ট আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল স্মারক এই গ্রন্থ। রাজনীতিকদের কূট স্বার্থবুদ্ধি, সংশ্লিষ্ট দেশবাস্তবতা এবং এর সঙ্গে জড়িত চরম ব্যর্থতার গ্লানি ফুটিয়ে তোলার জন্য উপন্যাসের ব্যতিক্রমী কাঠামো নির্মাণ করেছেন লেখক। ড্রামা ও এলিগরির মিশেল সেইসঙ্গে প্রযুক্ত অন্যান্য কলাকৌশলের মাধ্যমে রুশদি ইতিহাসের সত্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।

Shame -এর বর্ণিত Q হচ্ছে পাকিস্তান। দু’টি পরিবারের কর্মকান্ড ঘিরে লতিয়ে উঠেছে গল্প। রাজা হায়দার আসলে জেনারেল জিয়া এবং ইসকান্দার হরপ্পা হচ্ছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। অন্যদিকে মিস আরজুমান্দ ও রানী হরপ্পা যথাক্রমে মিস ভুট্টো আর মিসেস ভুট্টোর প্রতীকী নাম। ওমর খৈয়াম, শাকিল চুন্নি, মুন্নি, ও বুন্নি নামের তিন বোনের কাল্পনিক পুত্র। এরা তাদের মৃত পিতার বাড়িতে একজন ওয়েটারের আশ্রয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। ঐ ওয়েটার বোবা এবং তার সঙ্গে ঐ কাল্পনিক পুত্রদের গোপন জীবনযাপন একসূত্রে গাঁথা। খৈয়াম বড় হয়ে ডাক্তার হয়। বিয়ে করে সেনা অফিসার রাজা হায়দারের মেয়ে সুফিয়া জয়নবিকে। উত্তরকালে হায়দার এক সফল সেনাঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কাল্পনিক রাষ্ট্র Q -এর প্রেসিডেন্ট হয়। এরপর সাবেক প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার হরপ্পাকে ঝোলানো হয় ফাঁসিতে। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় বিচার ব্যবস্থা বিঘিœত করা হয়। নির্বাচন বাতিল হয়। এভাবে ধুলায় লুণ্ঠিত হয় গণতন্ত্র এবং সমগ্র জাতি সেনাশাসনের কবলে পড়ে যায়। অনাচার- অবিচারে পিষ্ট ও পর্যুদস্ত হতে থাকে জনগণ।

রুশদি উদ্ভাবিত এই Q রাষ্ট্রের চরম দুর্দশার ভেতর দিয়ে সমকালিক পাকিস্তানের শোচনীয়চেহারা সাকার হয়ে উঠেছে। ঝযধসব এ বর্ণিত প্রায় সবই কাল্পনিক এবং প্রতীকী। সঙ্কেতময়তা আর স্বপ্নবাস্তবতা এই উপন্যাসের দুটি উল্লেখযোগ্য দিক। ঠাট্টা, তামাশা এবং কৌতুকাবহ পরিবেশের সিদ্ধহস্ত বয়ান এতে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা।

গুন্টার গ্রাস-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই লেখক উপন্যাসের ভেতর দিয়ে দেশ বাস্তবতার কঠিন সমালোচনা করেছেন। তার ফিকশনকে সমালোচনা উপন্যাস বলা যেতে পারে। একই কথা কি আমরা রুশদি সম্বন্ধে বলতে পারি না? Midnight’s Children – মূর্ত হয়ে উঠেছে। ভারতবর্ষের অপরাজনীতির সমালোচনা, Shame -এ ঘটেছে পাকিস্তানের সেনা নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির শিল্পীত রূপায়ণ। একটি সেক্যুলার সমাজের অবক্ষয় ও ভাঙন যথেষ্ট দক্ষ হাতে চিত্রিত করেছেন লেখক। রূপক উপন্যাস তার প্রকাশের শ্রেষ্ঠ পথ খুঁজে পেয়েছে রুশদির হাত ধরেই। ফ্যান্টাসি সার্থক হয়ে উঠেছে সব দিক থেকেই। রুশদি সচরাচর দরদ দিয়ে নারী চরিত্র আঁকেন না। নারীদের তিনি একটু অবজ্ঞাই করেন বলে মনে হয়। ঝযধসব -এ কিন্তু দেখা যাচ্ছে নারীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ছ নামক রাষ্ট্রের চরম দূরবস্থার প্রতীক হিসেবে অঙ্কিত হয়েছে সুফিয়া নামের চরিত্রটি । সুফিয়া এমন এক ক্ষ্যাপা চরিত্র যে তার স্বামীকেও আক্রমণ করতে দ্বিধান্বিত হয় না। দেবরও আক্রান্ত হয় তার দ্বারা। পাশবিকতা চিহ্নিত এই অর্ধউন্মাদ নারী একদিন রাতে বেরিয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশ্যে। কাহিনীর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখি ওমর খৈয়াম অপরাধবোধে ভুগছে কেননা তার কারণেই গর্ভবতী হয় জয়নবির আয়া শাহবানু। উপন্যাসের শেষ অংশ রাজনৈতিকভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ। খৈয়াম ও হায়দার দম্পতি গোপনে শাকিল ম্যানসনে গিয়ে ওঠে। সেখানে শাকিলের বোনেরা তাদের বোবা ওয়েটারের সহযোগিতায় তাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। ওমর খৈয়ামকে দোষীসাব্যস্ত করা হয়। অবশেষে জেনারেল তালবারের ছোঁড়া গুলিতে সে প্রাণ হারায়। গণরোষে আক্রান্ত হয় শাকিল ম্যানসন। জনতা বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করে ফেলে। কাহিনীর শেষে আমরা দেখতে পাই, প্রধান চরিত্র ওমর খৈয়ামের আত্মার কল্পছবি।

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের ভেতরকার নিচতা ও ভন্ডামির মুখোস উন্মোচিত হয়েছে ঝযধসব এ। সাহিত্যকর্ম হিসেবে এই বই যথেষ্ট উঁচু দরের বলে মনে হয়। তার কারণ রূপক, প্রতীক আর ড্রামার মাধ্যমে লেখক তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন। বাককুশলতা এবং ফ্যান্টাসির আশ্রয়, তাকে পুরোপুরি সহায়তা দিয়েছে। উপন্যাসে বর্ণিত স্থান কাল পাত্র সৃজনশীল মনের খেয়ালি আবিষ্কার হওয়ার কারণে রুশদি অনেক বেশি কল্পনার স্বাধীনতা নিতে পেরেছেন। লেখকের এই ফ্যান্টাসিপ্রীতিক নেতিবাচক দিকও আছে। এ ধরনের কলাকৌশল প্রধান সাহিত্যে অনেক ফাঁক-ফোকর থেকে যায়। বাস্তবতার উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তার মধ্যে অন্যতম। উদ্ভটতার কিংবা বীভৎস রসের অতিরেক বক্তব্য পরিষ্কার করে তোলার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঙ্গিক ও লিখনরীতির ক্ষেত্রে রুশদি যে ওস্তাদি দেখিয়েছেন তা একই সঙ্গে শৈলীগত গোলকধাঁধারও জন্মদাতা। এখানেই শিল্পগত সংযমের প্রশ্নটি এসে যাচ্ছে। বিষয়বস্তুগত জিজ্ঞাসাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ঝযধসব এ যে রাজনৈতিক নৈরাজ্যের প্রতিফলন ঘটেছে তা কি পুরোপুরি হতাশাব্যঞ্জক ? শুভ সম্ভাবনার কোন বীজই কি তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল না? উত্তরকালে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছিল; রাষ্ট্রিক সামাজিক জীবনে বইতে আরম্ভ করেছিল সুবাতাস। লেখক কিন্তু সচেতনভাবেই এসব এড়িয়ে গেছেন। আশাবাদী লেখক বলতে যা বুঝায় রুশদি তা নন। সামাজিক মানুষের কপটতা, বেহায়াপনা, আর ব্যর্থতা দেখানোই তার প্রধান উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। রূপক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভরশীল কল্পনাশক্তির উর্বরতার ওপর। এ জাতীয় রচনার দুর্বলতা হচ্ছে, সামাজিক অঙ্গীকারকে গুরুত্ব না দেয়া। বুদ্ধিমত্তা, শব্দচাতুর্য কিংবা লিপিকৌশলের বিচারে রুশদি বড় কারিগর। কিন্তু প্রজ্ঞা, প্রাণরস আর সুগভীর সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে তার ঊন্নতা স্পষ্ট।

এবার ঋঁৎু (২০০১) উপন্যাসের আলোচনায় প্রবেশ করা যাক। সুঠাম কোন কাহিনী এখানে পাওয়া যাবে না। গল্পের কাঠামোটি বরং বেশ দুর্বল বলেই মনে হয়। এক সংসারত্যাগী মানুষের আত্মসংকট ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষজনের মানসিক বিড়ম্বনাই হচ্ছে ঋঁৎু -র প্রধানতম উপজীব্য। প্রধান চরিত্র ব্রিটেন প্রবাসী ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মালিক সোলাঙ্কা। রুশদির মতই ইনিও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। সোলাঙ্কা একদিন তার বছর চারেকের ছেলে আসমান ও বিদেশী স্ত্রী এলিনরকে ইংল্যান্ডে রেখে সবার অজান্তে নিরুদ্দেশের পথে পাড়ি জমায়। ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে নিউইয়র্ক শহরে আসে। স্বামী স্ত্রীর তীব্র মনোমালিন্য কিংবা সংসার ভেঙে যাওয়ার মতো কোন ঘটনার উল্লেখ নেই বইতে এমনকি তার কোনো ইঙ্গিতও নেই। তাহলে এই পলায়নের কারণ কি? মনে হয় সংসারে অনাসক্তিই এর কারণ। গৃহত্যাগী হলেও একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, সোলাঙ্কা নিউইয়র্কে পৌঁছে তার ফেলে আসা স্ত্রী এলিনরের কাছে টেলিফোন নম্বর পাঠায় এবং পরিচিত লোকজনকে সেই নম্বর দিতে নিষেধ করে। এলিনর কিন্তু সেই নির্দেশ মান্য করেনি। ফলে আত্মীয়-স্বজনরা এলিনরের সঙ্গে ফোনে সোলাঙ্কা সম্বন্ধে আলাপ করে। তারা এও বলে যে, এলিনর ও সোলাঙ্কার মধ্যে মানুষ হিসেবে এলিনরই বেশি ভালো। এদিকে সোলাঙ্কার বন্ধু-বান্ধবরাও একই রকম বক্তব্য দেয়। সোলাঙ্কা তাদের সঙ্গে দ্বিমত করে না। কিন্তু সে স্ত্রীর কাছে ফিরেও যায় না। ভেতরে ভেতরে সে অবশ্য পুড়তে থাকে। তার এ সময়ের মানসিক টানা পোড়েন বর্ণিত হয়েছে নিউইয়র্কের রাস্তায় গভীর রাতে হেঁটে বেড়ানো, অন্যমনস্কভাবে বৃষ্টিতে ভেজা প্রভৃতি ঘটনার ভেতর দিয়ে। নিউইয়র্কভিত্তিক উপন্যাস ঋঁৎু একই সঙ্গে তীক্ষ্ম রাজনৈতিক সচেতনতাও তুলে ধরেছে। আলী মজনু নামে এক পাকিস্তানির (ট্যাক্সি ড্রাইভার) মাধ্যমে লেখক আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। আমেরিকার উদ্দেশে ঐ ট্যাক্সিচালকের উর্দুভাষায় গালাগাল লেখকের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার একটি কৌশল বলে মনে হয়। এছাড়া আমজনতাও যাদের রাজনীতিজ্ঞান অতসূক্ষ্ম নয়, যে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপের প্রতি ভীষণ খ্যাপা, এবিষয়টিও এতে পরিষ্কার হয়েছে। অসংখ্য বাট্রালির কাছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র স্বপ্নের দেশ, স্বপ্নপূরণের দেশ। কিন্তু একবার সেখানে পৌঁছে গেলে বোঝা যায়, জীবনের ইঁদুর দৌড় (ৎধঃ ৎধপব) মানুষকে কতটা ব্যতিব্যস্ত রেখেছে সেখানে আর প্রকৃত শান্তির কতটুকুইবা অবশিষ্ট আছে ওই দেশে।

নিউইর্য়ক শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখতে পাই- ঋঁৎু উপন্যাসে। বইয়ের প্রধানতম চরিত্র নি:সন্দেহে মালিক সোলাঙ্কা। কিন্তু নিউইয়র্ক নগরীও একটি মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ বলে মনে হয়। এখানে বিত্ত-বৈভবের দিক থেকে ফুলে ফেঁপে ওঠা নিউইয়র্ককেই বুঝানো হয়েছে। আত্মজৈবনিকতাও এই বইয়ের এক উল্লেখযোগ্য উপাদান। দীর্ঘকাল লণ্ডনে জীবন কাটিয়ে রুশদি এখন ঠাঁই গেড়েছেন নিউইয়র্কে। ফেলে এসেছেন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী এবং বছর চারেকের পুত্র সন্তান। নিউইর্য়ক সিটি লেখকের মনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে তার মোটামুটি একটা পরিচয় বিধৃত হয়েছে উপন্যাসটিতে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণবিদ্বেষের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। খালি চোখে বর্ণবিদ্বেষহীন কালো মানুষের এই শহরে (কেননা এরাই গরিষ্ঠ) বর্ণবিদ্বেষ যে ভেতরে ভেতরে কতটা সক্রিয় তা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জ্যাক রাইনহার্টের জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতির ভেতর দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। সালমান রুশদির লেখায় যৌনতাও একটি বিষয়। ঋঁৎু তে দেখা যাচ্ছে, যৌন সংযমের প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও মালিক সোলাঙ্কা নিউইয়র্কে এসে সেই কথা রাখতে পারছে না। আমেরিকার অবাধ যৌন স্বাধীনতা তাকে একপর্যায়ে ক্ষেপিয়ে তোলে। বসনিয়ার মিলা, ভারতের নীলা প্রভৃতি নারীর গভীর সংস্পর্শে আসাই তার প্রমাণ।

কাহিনীর শেষদিকে আমরা দেখি, সোলাঙ্কার অকৃত্রিম ভালোবাসা পাওয়ার পরেও নীলা কিছু সময়ের জন্য নিজ দেশে ফিরে যায়। কিছুদিন পর সোলাঙ্কাও সেখানে যায় এবং বন্দি হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রুশদি নীলার স্বদেশকে ফিজি দ্বীপের আদলে চিত্রিত করেছেন। যাই হোক, নীলা মহেন্দ্র কৌশলে মালিক সোলাঙ্কাকে মুক্ত করে দেয়। এরপর নীলা স্বদেশেই মারা যায় এবং সোলাঙ্কা নীলার স্মৃতি মাথায় নিয়ে লন্ডনে ফিরে যায়। কিন্তু স্ত্রী এলিনর ও ছেলে আসমানের কাছে গিয়ে সোলাঙ্কা আবিষ্কার করে, তার পরিত্যক্ত স্ত্রী-পুত্র অন্য একজনের সঙ্গে সুখেই জীবন কাটাচ্ছে। সোলাঙ্কার হৃদয়ের যন্ত্রণার অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে শেষ হয় উপন্যাসটি।

প্রায় সমস্ত লেখাতেই রুশদি তার মাতৃভাষা উর্দু অথবা হিন্দি শব্দ কিংবা ফ্রেজ ব্যবহার করেছে। ঋঁৎু -তেও একই জিনিস ঘটেছে। স্বীকার করা ভালো তার লেখায় প্রযুক্ত অনেক কিছুই পুরোপুরি উদ্ধার করা যায় না। কেননা অনেক রেফারেন্স এবং স্বোপার্জিত অনেক কূটকৌশলের আশ্রয় নেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্রিক, ফরাসি, ল্যাটিন ভাষা থেকে শব্দ বা ফ্রেজ প্রায়শই তিনি ব্যবহার করেন। রুশদি লম্বা লম্বা ইংরেজি বাক্য লিখতে অভ্যস্ত। ঐসব বেগানা শব্দ বা বাক্যাংশ যখন তিনি দীর্ঘ ইংরেজি বাক্যের ভেতর ঢুকিয়ে দেন তখন তার মর্ম উদ্ধার করা সত্যিই কঠিন হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে খানিকটা ব্যতিক্রম। তার কারণ এই উপন্যাসে প্রযুক্ত ঐ ধরনের শব্দ বা শব্দবন্ধের অর্থ বলে দিয়েছেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত সুপরিচিত শব্দের কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন ইংরেজি শব্দ তৈরিতে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেছেন এই লেখক। রচনারীতির অনন্যতাসহ সার্বিকভাবে কথা-সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতাকে যে উঁচু তারে বেধে দিতে সক্ষম হয়েছেন সালমান রুশদি তাকে এক কথায় অসাধারণ বা অতুল বললেও কম বলা হয়।

[ad#co-1]